|
১৯৪৩-৪৪, বাংলার দুর্ভিক্ষ: একটি ভূমিকা (২)উৎসা পট্টনায়েক |
১৯৪০ সালে বিলেতফেরৎ জ্যোতি বসু ছিলেন ২৬ বছরের তরুণ কমিউনিস্ট। তিনি মুক্ত ছিলেন, ফলে দুর্ভিক্ষের ত্রাণের কাজে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। লন্ডন, কেম্ব্রিজ ও অক্সফোর্ডের দেশপ্রেমিক ভারতীয় ছাত্রদের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ অব্যাহত ছিল। এই পুস্তিকাটি যদি জ্যোতি বসুরই রচনা হয়ে থাকে, সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত হওয়া না গেলেও যার সম্ভাবনা খুবই বেশি, ১৯৪৩ সালে যখন এটা প্রকাশিত হয়, তখন দুর্ভিক্ষপীড়িত বাংলার সহায়তায় এগিয়ে আসার জন্যে ব্রিটিশ জনসাধারণের প্রতি তাঁর কাতর আবেদন অনেকটাই বিলম্বিত হয়ে গিয়েছে। ততদিনে লক্ষ লক্ষ মানুষ মৃত্যুমুখে পতিত হয়েই গিয়েছে। |
১৯৪৩, ব্রিটেনের কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় মজলিস থেকে বের হয় একটি পুস্তিকা। দ্য ম্যান মেড ফেমিন। লেখক জ্যোতি বোস। বসু নয়। জ্যোতি বসু তখন লিখতেন এই ছদ্মনামে। দিল্লির সাংকৃত্যায়ন-কোসাম্বি পাঠচক্র এটি পুনঃপ্রকাশ করে ২০২২ সালের মে মাসে। অধ্যাপক উৎসা পট্টনায়েক সেই সংস্করণের একটি ভূমিকা লিখে দেন। মার্কসবাদী পথে তারই ভাষান্তর। দু’টি বিষয় স্পষ্ট, শুধুমাত্র নোট ছাপিয়ে মিত্রবাহিনীর সমরাভিযানে অকল্পনীয় মাত্রায় ব্যয় বৃদ্ধি করলে দ্রুত মুদ্রাস্ফীতি ঘটানোর কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য পূরণ হবে, এটা ব্রিটিশ সরকার ভালভাবেই জানত। এবং তাদের নির্মম উপেক্ষা চালিত ছিল বাজারের খাদ্যশস্যের উপর নির্ভরশীল গ্রামাঞ্চলের সেই মানুষদের দিকে, ভোগের ভয়াবহ রকমের দ্রুত হ্রাসের ফলে, অনাহারে যাঁরা লাখে লাখে মৃত্যুর মুখে পড়ে। সাধারণ ভারতীয়দের আয় ছিল ব্রিটেনের গড় আয়ের মাত্র তিন শতাংশ, যারা তখন ইতোমধ্যেই ১৭৫ বছর ধরে রপ্তানি বাণিজ্য থেকে অর্জিত উদ্বৃত্ত স্বর্ণ ও বৈদেশিক মুদ্রা ভারত থেকে নিংড়ে নিয়েছিল। এবং ভারতের জনগণকে ঠেলে দিয়েছিল গুরুতর অপুষ্টির অতলে। যুদ্ধকালীন সময়পর্বে দীর্ঘতম সময় ধরে অধিকৃত থাকা বাংলায় এই হ্রাসের হার দাঁড়ায় সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশে। ত্বরিত মুদ্রাস্ফীতি মানে যে সাধারণ খাদ্য উৎপাদক জনগোষ্ঠীর অপরিহার্য অনাহার এটা ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে বোধগম্য হলেও, কেইনস বা তাঁর প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের এ নিয়ে ন্যূনতম সংবেদনশীলতা ছিল না। এন্ড্রু মারের মতে (২০০৯, পৃষ্ঠা ২০), ‘ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী মনে করতেন যে, ভারতীয়রা একটি ‘জঘন্য জাতি’ যাদের নিতান্ত ভাগ্যের জোরে তাদের প্রাপ্য বিনাশের হাত থেকে রক্ষা করা হয়েছে’। চার্চিলের ব্যক্তিগত ধ্যানধারণা ছিল ফ্যাসিবাদী ধারার (যাতে অন্তর্ভুক্ত ছিল তাঁর ইউজেনিকস বা সুপ্রজননবিদ্যার বিষয়ে গভীর আগ্রহ এবং তীব্র অপছন্দের ‘দুর্বলচিত্তরা’, যাদের সংখ্যা ব্রিটিশদের মধ্যে কমে যাক দেখতেই তিনি উৎসাহী ছিলেন)। ফ্রান্স দখল করার পর নাৎসি জার্মানি ব্রিটেনকে নিশানা করার জন্যেই তিনি শেষ পর্যন্ত হিটলারের বিরুদ্ধে অবতীর্ণ হন। প্রাতিষ্ঠানিক সংবাদমাধ্যম অহেতুক তাঁকে বীরোচিত যুদ্ধনায়কের স্তরে উন্নীত করেছে। ১৯৩৯ ও ১৯৪০ সালে ভারতে কেন্দ্রীয় সরকারের বার্ষিক ব্যয় ছিল গড়ে আনুমানিক ৯০ কোটি টাকা এবং চার বছর পর ১৯৪৩-৪৪ অর্থবর্ষে এটা ৯.৫ গুণ বাড়িয়ে ৮৫৭ কোটি টাকা করা হয়। প্রতি বছর যে বিশালাকার ঘাটতি তখন হত, তা মেটানো হত ইংল্যান্ডের টাঁকশালে নোট ছাপিয়ে, এবং প্লেন বোঝাই করে এখানে তুলে নিয়ে এসে। এই ঘাটতির ৮০ শতাংশ হয়েছিল মিত্রবাহিনীর সমরাভিযানের খরচের দরুণ, যে খরচ নাকি ছিল ‘পুনর্লভ্য ব্যয়’, যা ব্রিটেন যুদ্ধশেষে স্টার্লিংয়ের অঙ্কে মিটিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল (বাস্তবে প্রকৃত খরচের সামান্য ভগ্নাংশই পরিশোধ হয়েছিল)। নোট ছাপিয়ে ঘাটতি পূরণের অংক কতটা বিশাল ছিল তার ধারণা পাওয়া যাবে, যদি আজকের সময়ের বাজেট ও মোট ঘরোয়া উৎপাদন বা জিডিপি-র পরিসংখ্যানকে সেই সময়ের বৃদ্ধির হারে প্রয়োগ করা হয়। ২০১৮-১৯ সালে ভারতে কেন্দ্রীয় সরকারের মোট ব্যয় ছিল ১৫ লক্ষ কোটি টাকা (এক লক্ষ কোটিকে দশগুণ করে তাকে ১২ সূচকে উত্থিত করলে হয় এক ট্রিলিয়ন। তার মানে এই অঙ্কটি দাঁড়ায় ১৫ ট্রিলিয়নে; এতে রাজ্যের বরাদ্দ, এবং কিছু স্বল্পাঙ্কের ঘাটতি ধরা নেই)। এই খরচ ভারতের মোট ঘরোয়া উৎপাদন ১৯০ ট্রিলিয়ন টাকার ৮ শতাংশের সামান্য কম। ধরা যাক, পরবর্তী ৪ বছরে বর্তমান ২০২২-২৩ অর্থবর্ষে কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যয়ের পরিমাণ ৯.৫ গুণ বাড়িয়ে ১৪৩ ট্রিলিয়ন টাকা করা হল, যা দাঁড়াবে ২০১৯ সালের মোট ঘরোয়া উৎপাদনের ৭৫ শতাংশ! ধরা যাক, কর সংগ্রহ অতীতের ধারায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেল, তখন চলমান অর্থবর্ষে মোট ঘাটতির অংক দাঁড়াবে ১০০ ট্রিলিয়ন টাকা, যার পুরোটাই নোট ছাপিয়ে মেটানো হবে। ফলে দ্রব্যমূল্য বহুগুণ বেড়ে যাবে এবং খাদ্যের সাধারণ ক্রেতারা অনাহারে মৃত্যুমুখে পতিত হবে। পৃথিবীর কোনো দেশই এমন নির্দয় আর্থিক নীতি কখনো গ্রহণ করেনি, যা বিশেষ ছকে তৈরি হয়েছিল এমনভাবে, যাতে ভারতীয় জনগণের অবশ্যম্ভাবী দুর্দশার কথা না ভেবেই তাদের কাছ থেকে বিপুল সম্পদ নিংড়ে নিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত অন্তত ১০ লক্ষ শিশুসহ মোট ৩০ লক্ষ মানুষের মৃত্যুর মূল্যে মোট ১৬০ কোটি টাকা চাপিয়ে দেওয়া সঞ্চয় হিসেবে নিংড়ে নেওয়া হয়েছিল মিত্রবাহিনীর সমরাভিযানের অর্থায়নে। এই ঋণের তিন চতুর্থাংশ ছিল ‘পুনর্লভ্য ব্যয়’, কিন্তু ব্রিটেন সত্বর খাদ্য আমদানির জন্যে কোনো ব্যয় করতেই রাজি হয়নি। ১৯৪৪ সালের ব্রেটন উডস সম্মেলনে, তাঁরই নীতির খেসারতে সৃষ্ট হত্যালীলার কথা তাঁর জানা থাকলেও, কেইনস অর্থবিভাগের ইংরেজ সদস্যসহ ভারতীয় প্রতিনিধি দলের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্য আমদানির প্রয়োজনে প্রাপ্য স্টার্লিং-এর একটি ছোট্ট অংশ ডলারে মঞ্জুর করার জরুরি আবেদন নাকচ করে দেন। কেইনস গোঁ ধরেন যে, স্টার্লিং-এ ঋণের বিষয়টি ভারত ও ব্রিটেনের দ্বিপাক্ষিক বিষয়, যদিও ভারত শুধু ব্রিটিশ বাহিনী নয়, গোটা মিত্রবাহিনীর জন্যে ব্যয় করেছিল। তাঁর জীবনীকার রবার্ট স্কিডেলস্কির মতে (২০০১, পৃষ্ঠা ৪১৪), কেইনসের অভিপ্রায় ছিল, ভারত ও মিশরের কাছে ব্রিটেনের ঋণের অন্তত এক তৃতীয়াংশ কখনোই পরিশোধ হবে না, এবং আরো এক তৃতীয়াংশ বিলম্বিত করে পরবর্তীতে কিস্তিতে পরিশোধ করা হবে। কেইনস সহ সাম্রাজ্যবাদীরা নিজেদেরকে ‘সভ্য’ ও সম্মানিত হিসেবে তুলে ধরতেন, কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে উপনিবেশগুলিতে নিজের দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থে অসম্মানীয় আচরণই করেছেন। যে প্রতিশ্রুতি তাঁরা পূরণ করবেন না সেগুলিই তাঁরা দিয়ে গেছেন, এবং নিজেদের কৃতকর্মের দায়িত্ব নিতেও অস্বীকার করেছেন। ‘নিউ স্টেটসম্যান’ ও ‘নেশন’-এর সম্পাদকদের উদ্দেশ্যে লিখিত ব্যক্তিগত পত্রে কেইনস ঔদ্ধত্য দেখিয়ে বলেছিলেন যে, সিভিল সার্ভিসে ভারতীয়দের অন্তর্ভুক্তি এবং তাদের অদক্ষতাই দুর্ভিক্ষের জন্যে দায়ী (চন্দভারকার ১৯৮৯, পৃষ্ঠা ১৮১)। সাম্রাজ্যবাদীরা ছিল জাঁ পল সার্ত্র-এর মৌভাইস ফোয়া বা ভ্রান্ত বিশ্বাসের মূর্ত প্রতীক। কেইনসের মুনাফাস্ফীতির ভাবনার বিরুদ্ধে ইংল্যান্ডের শ্রমিক শ্রেণির প্রতিবাদের আদলে ভারতে কোনো প্রতিবাদ হল না কেন? তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, যা তিনি খোলাখুলিই বলেছেন, মানুষের ভোগে হ্রাস ঘটিয়ে চাপিয়ে দেওয়া সঞ্চয়ের বৃদ্ধি ঘটানো। ব্রিটিশ ভারতের মাথাপিছু আয় ছিল ব্রিটেনের তিরিশ ভাগের একভাগ এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ ছিল গড় আয়ের নিম্নভাগে। ক্ষুন্নিবৃত্তিতে দিন অতিবাহিত করা মানুষের ভোগ হ্রাস ঘটানোর একটিই মাত্র ফলাফল নির্দিষ্ট ছিল। কেইনস প্রস্তাবিত ইচ্ছাকৃত মুদ্রাস্ফীতির নীতি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হলেও এটা যে একটি বিতর্কিত ও বিপজ্জনক পদক্ষেপ এ সম্পর্কে ভারতে কেউ ধারণা করতে পারেনি। এর আংশিক উত্তর হয়তো নিহিত রয়েছে এই সত্যে যে, বিশাল সংখ্যক কমিউনিস্ট যারা একইসঙ্গে ছিলেন কংগ্রেস সমাজতন্ত্রী দলে অন্তর্ভুক্ত, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সেই বুদ্ধিদীপ্ত নেতারা সকলে ১৯৪২ সাল নাগাদ ছিলেন কারারুদ্ধ, এবং দীর্ঘ কয়েক বছর ধরেই তাঁরা কারান্তরালে ছিলেন। ১৯৪০ সালে বিলেতফেরৎ জ্যোতি বসু ছিলেন ২৬ বছরের তরুণ কমিউনিস্ট। তিনি মুক্ত ছিলেন, ফলে দুর্ভিক্ষের ত্রাণের কাজে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। লন্ডন, কেম্ব্রিজ ও অক্সফোর্ডের দেশপ্রেমিক ভারতীয় ছাত্রদের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ অব্যাহত ছিল। এই পুস্তিকাটি যদি জ্যোতি বসুরই রচনা হয়ে থাকে, সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত হওয়া না গেলেও যার সম্ভাবনা খুবই বেশি, ১৯৪৩ সালে যখন এটা প্রকাশিত হয়, তখন দুর্ভিক্ষপীড়িত বাংলার সহায়তায় এগিয়ে আসার জন্যে ব্রিটিশ জনসাধারণের প্রতি তাঁর কাতর আবেদন অনেকটাই বিলম্বিত হয়ে গিয়েছে। ততদিনে লক্ষ লক্ষ মানুষ মৃত্যুমুখে পতিত হয়েই গিয়েছে। এই প্রশ্নের উত্তরের অন্য অংশটি হল, কেন নীতি হিসেবে মুনাফাস্ফীতি নিয়ে কোনো সুস্পষ্ট বিশ্লেষণাত্মক মূল্যায়ন বা সুনির্দিষ্ট প্রতিবাদ হল না তার কারণ লুকিয়ে আছে বৌদ্ধিক সুবিধাবাদ ও অনভিপ্রেত কাজে সেই মানুষদের সম্পৃক্ততায়। সবাই না হলেও অর্থনীতির বহু ভারতীয় ছাত্র, যাঁরা কেম্ব্রিজে কেইনসের অধীনে অধ্যয়ন করেছেন, তাঁরা নিশ্চয়ই তাঁর যুক্তিধারা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন, এবং সম্ভবত ব্রিটেনের শ্রমিকসংগঠনগুলির বিতর্ক ও প্রতিবাদের খবরও তাঁরা রাখতেন, কিন্তু অনুগ্রহ বিতরণের ক্ষমতা রাখা শাসক শ্রেণির শক্তিধর বুদ্ধিজীবী প্রশাসক তাঁদের এই শিক্ষকটি সম্পর্কে এতটাই অভিভূত ছিলেন যে, প্রতিবাদী হওয়া তাঁদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। বাস্তবিকই কেইনসের সেরা ছাত্র তাঁর অনুমোদন পেয়ে নবগঠিত আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডারের প্রথম ভারতীয় নির্বাহী অধীক্ষকের নিযুক্তি পেয়েছিলেন। আমরা এর মধ্যে আজ ভারতের অভিজাত কূলের বহু বুদ্ধিজীবীদের অশোভন মুখচ্ছবি দেখতে পাব, যাঁরা নীরব থেকেছেন, অথবা যখন আন্তর্জাতিক পুঁজি নয়া উদারবাদ নামের নয়া সাম্রাজ্যবাদের মধ্য দিয়ে সর্বনাশ করে চলেছে, তখন সেই ভ্রান্ত নীতির সোৎসাহ সমর্থক হয়েছেন (যার জন্যে তাঁরা বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলির দ্বারা পুরস্কৃতও হয়েছেন)। এভাবেই নিজেরই দেশের অসহায় কৃষক ও দরিদ্র জনসাধারণের জীবনে কঠিনতম দুরবস্থা নামিয়ে আনা নীতিসমূহের পোষকতা ও বাস্তবায়নের সঙ্গে এই বুদ্ধিজীবীরা সম্পৃক্ত হয়ে গেছেন । বাংলার দুর্ভিক্ষ অর্থনীতির পথে সংঘটিত গণহত্যার চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না। যা বন্দুক ব্যবহারের নগ্ন উপায়ে নয়, চাহিদা সংকোচন থেকে চাপিয়ে দেওয়া সঞ্চয়ের চতুর সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতির মাধ্যমে সংগঠিত হয়। ভারতের জনসংখ্যা ছিল তরুণ-প্রধান, কারণ মহাযুদ্ধের পূর্ববর্তী সময়ে গড় আয়ু ছিল মাত্র ৩০ বছর। ১৪ বছর ও তার কম বয়সের শিশুর সংখ্যা আদমশুমারি অনুযায়ী ছিল জনসংখ্যার ৩৭ শতাংশ। যদি ধরেও নেওয়া হয় যে, দুর্ভিক্ষে মোট মৃতের মধ্যে শিশুদের অনুপাত ছিল অনেকটা কম, তবুও দুর্ভিক্ষের ২০ মাস সময়ে অন্তত ১০ লক্ষ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এটা ব্রিটেনের মোট মৃত্যুহারের দ্বিগুণ। সেখানে সেনাবাহিনী ও সাধারণ মানুষের সংখ্যা যোগ করে গোটা যুদ্ধকালীন সময়পর্বে মৃত্যুর সংখ্যা ৫ লক্ষের কিছুটা কম। বাংলায় দুর্ভিক্ষজনিত মৃত্যুর অত্যন্ত হিসেবী গণনাতেও শিশু ও পরিণত বয়সী মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩০ লক্ষে, যা গোটা যুদ্ধকালীন সময়ে ব্রিটেনের মোট মৃতের সংখ্যার ৬ গুণেরও বেশি। এছাড়া মোট ১ লক্ষ ভারতীয় সৈন্য যুদ্ধের ময়দানে প্রাণ হারায়। ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদীদের মধ্যে ব্রিটিশরাই হয়তো ছিল সবচেয়ে বেশি ধূর্ত। অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে এই সাম্রাজ্যবাদীদের অর্থনীতি ও অর্থবিষয়ক চাতুরির সঙ্গে যে চূড়ান্ত পর্যায়ের নিষ্ঠুরতা এবং ন্যূনতম নৈতিকতার অনুপস্থিতি যুক্ত ছিল, তা আজকের দিনেও দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলির সমালোচকেরা বুঝে উঠতে পারেননি। মুদ্রা ও মুনাফাকে একমাত্র অভীষ্ট করে পরিচালিত বিশ্ব-পুঁজিবাদ, অতীতে এবং এখনও, সাম্রাজ্যবাদের মধ্য দিয়ে তৃতীয় বিশ্বের সঙ্গে পরগাছা-সদৃশ সংযুক্ত। সাম্রাজ্যবাদ তার অন্তর্নিহিত চরিত্র অনুযায়ী টাকাসর্বস্ব, এবং ফলত সাধারণভাবে ভব্য মানুষকেও অনৈতিকতার দানবে পরিণত করে। এতকিছুর পরও তারা তাদের আন্তর্জাতিক প্রকল্পে বুদ্ধিদীপ্ত ভারতীয়দের অন্তর্ভুক্ত করতে সমর্থ হয়। বাংলার দুর্ভিক্ষের প্রকৃত্য সত্য নিরূপণের আরো ব্যাপকতর চর্চা প্রয়োজন। এবং এই ‘মানুষের তৈরি দুর্ভিক্ষ’ কখনোই বিস্মৃত হওয়াও উচিত নয়। কারণ নয়া সাম্রাজ্যবাদীরা এখনও ভারতে মানুষের জীবনে সংহারকের ভূমিকা পালন করে চলেছে। শিল্পপ্রধান উন্নত বিশ্বের সরকার ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলি এমন ভান করছে যেন তাদের চাপে মুক্ত বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক নয়া উপনিবেশিকরণে ভারত ও অন্যান্য অনুন্নত দেশকে ‘খুলে দিতে’ বাধ্য করার সাথে ১৯৯০ সাল থেকে ৩.৫ লক্ষ ঋণ-জর্জরিত মানুষের আত্মহত্যার কোনও সম্পর্ক নেই।
ভাষান্তর: শুভ প্রসাদ নন্দী মজুমদার দ্য ম্যান মেড ফেমিন– মূল পুস্তিকাটি ব্রিটিশ লাইব্রেরির সংগ্রহ থেকে সুচিন্তন দাশের সৌজন্যে প্রাপ্ত প্রকাশের তারিখ: ২৬-আগস্ট-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |