ফুটবল পুঁজিবাদ

শান্তনু দে
ফুটবলেও এখন জি-৮। এরা এখন আর শুধু ক্লাব নয়। লিমিটেড কোম্পানি। যেমন ম্যান ইউ। নাচে শেয়ার বাজারের ছন্দে। ক্লাবের কর্তা নিছক ক্লাব কর্তা নন। চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার। সি ই ও। তাঁরা কথা বলেন ব্যালেন্সশিট, শেয়ার দরের ভাষায়। ক্লাবকে দেখেন ব্র্যান্ড হিসেবে। খেলোয়াড়দের সম্পত্তি হিসেবে। ব্র্যান্ড প্রোমোটার হিসেবে। সমর্থকদের দেখেন ক্রেতা হিসেবে।

‘ব্রাজিলিয়ানরা খেলে, যেমনভাবে তারা নাচে।

জার্মানরা খেলে, যেমনভাবে তারা গাড়ি তৈরি করে, যেখানে কারিগরি দক্ষতা প্রচুর, চিন্তা-কল্পনাশক্তি থাকে সামান্য।

ব্রিটিশরা সারাক্ষণই ছুটছে, কারণ হতে পারে তাদের আবহাওয়া।

স্প্যানিশরা খেলে আঞ্চলিক লোকশিল্পের ছন্দে, যা এখনও বহু স্রোতে মিশে জাতীয় চরিত্র পায়নি।

এবং ইতালিয়ানরা, এক আশ্চর্য স্ববিরোধী দল, অন্য যেকোনও ক্ষেত্রে যারা সারা বিশ্বকে অপরূপ ভঙ্গি ও সুক্ষতা রপ্তানি করেছে, তারাই সমষ্টিগত ভাবনা আমদানি করে খুন করেছে শিল্প নৈপুন্যকে।’

— জর্জ ভালদানো, দ্য ইকনমিস্ট


ফুটবল জয় করেছে বিশ্বকে। বিশ্বায়ন বদলে দিচ্ছে ফুটবলকে।

হচ্ছে ফুটবলের বি-জাতীয়করণ। হারিয়ে যাচ্ছে জাতীয় স্বাতন্ত্র্য। ভাঙন ধরছে জাতীয় ক্রীড়া শৈলীর বৈচিত্র্যে।

১৯৮৬-র বিশ্বকাপ জয়ী আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের খেলোয়াড় ‘ফুটবল-দার্শনিক’ ভালদানো তাই উদ্বিগ্ন। তাঁর আক্ষেপ, তিরিশ বছর আগেও ‘অনায়াসে বলা যেত প্রতিভা আর দক্ষতার যুগলবন্দী হল লাতিন আমেরিকার ফুটবল। সংগঠন, গতি আর লড়াকু মানসিকতার মিশেল ছিল ইউরোপীয় ফুটবলে। টেলিভিশন এবং খেলোয়াড়দের সীমান্তপার যাতায়াত এই দুই ঘরানাকে আজ নিয়ে এসেছে এক জায়গায়’।

বিশ্ব ফুটবলে এখন কসমোপলিটন (বিশ্বজনীন) চরিত্রের দাপট।

‘আজকের ফুটবলের অর্থনীতিকে কোনওভাবেই স্থানীয় বা জাতীয় পরিচিতিতে চিহ্নিত করা যায় না।’ বলেছেন মার্কসবাদী ইতিহাসবিদ এরিক হবসবম। তখন নব্বইয়ের তরুণ তিনি। ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড, রিয়াল মাদ্রিদের মতো কিছু ‘পুঁজিবাদী সংস্থার সাম্রাজ্যবাদ’ যেভাবে ফুটবলকে বিশ্বায়িত ব্যবসায় পরিণত করেছে, তাতে তিনি দৃশ্যতই হতবাক। লন্ডনের দ্য টাইমস পত্রিকার একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে বলেছেন, ‘বিশ্বায়নের পর্বে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলির ধনী ক্লাবগুলির কনসোর্টিয়াম নিজেদেরকে বিশ্বায়িত ব্র্যান্ডে পরিণত করতে পেরেছে, যাদের সামান্যই যোগাযোগ রয়েছে স্থানীয় মূল শিকড়ের সঙ্গে, যারা গোটা বিশ্ব থেকে খেলোয়াড় ভাড়া করে বেরাচ্ছে।’ যোগ করেছেন, ‘টি-শার্টের মতো পণ্যসামগ্রী বিক্রি করে, টেলিভিশন থেকে (সরাসরি) খেলা দেখিয়ে তারা টাকা করছে।’

ফুটবল কী? লাতিন আমেরিকার রক্তাক্ত ইতিহাস ওপেন ভেইনস অব লাতিন আমেরিকা-র লেখক এদুয়ার্দো গালেয়ানোর কথায়, ‘আমি খেলি, তাই আমি বাঁচি— খেলার শৈলী আসলে একেকটি জনগোষ্ঠীর অভিনব পরিচিতিসত্তার প্রতিফলন, পৃথক হবার অধিকারের ঘোষণা’। উরুগুয়ের এই কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক শুধু লাতিনের রক্তাক্ত ইতিহাসই লেখেননি। লিখেছেন সকার ইন দি সান অ্যান্ড শ্যাডো। যা অনুদিত হয়েছে কুড়িটির বেশি ভাষায়। তারও আগে ১৯৬৮-তে, হিস ম্যাজেস্টি দি ফুটবল। মারাদোনাকে ফুটবল পড়তে শিখিয়েছিলেন তিনি।

গালেয়ানোর কথায়, ‘আমাদের জীবন, আমাদের রক্তে মিশে আছে ফুটবল। আমাদের প্রতিদিনের কথা, আমাদের ভাষা, আমাদের মনোভাবে, অনুভূতি প্রকাশে শুধুই ফুটবল। যেমন কেউ যদি বলি: কে তোমার দায়িত্বকে বয়ে নিয়ে যায়— উত্তর একটাই: ফুটবল। দায়িত্ব থেকে মুক্ত হতে চাও— তাহলে ফেলে দাও ফুটবল। সংকটের মুখোমুখি হতে চাও— খেলা বন্ধ করে দাও, হাতে তুলে নাও ফুটবল। কেউ কিছু ভালো করেছে— নিশ্চিত, একটা দুরন্ত গোল। কেউ দিয়েছে সঠিক জবাব— তাহলে অবধারিত একটা দুর্দান্ত পাস। প্রতারক স্বামীকে গলাধাক্কা দিতে চাও— সোজা দেখাও লালকার্ড।’— আসলে ‘ফুটবলই জীবন। ফুটবলেই আমাদের আসা-যাওয়া। জীবনের প্রতিটি অণুমুহূর্ত।’

আর জীবনের এই ‘প্রতিটি অণুমুহূর্ত’ই আজ কর্পোরেটের গ্রাসে।

ফুটবলেও এখন মুক্ত বাজার। খেলার গুণমান বাড়ছে, তবে সেই গুণমান কিনতে পারছে একমাত্র কিছু ধনী ক্লাব। সম্পদের এরকম প্রকট বৈষম্য অতীতে কখনও দেখা যায়নি।

ডারবি, নটিংহাম ফরেস্টের মতো দলগুলির লিগ জয়ের স্বপ্ন এখন ভেঙে চুরমার। এখন শুধুই চেলসি, ম্যান ইউ-র একচেটিয়া দাপট। কতজন ফুটবলপ্রেমী এখন ব্রাজিলের স্যান্টোস, সাও পাওলো, ফ্ল্যামেঙ্গো’র খবর রাখেন? কিংবা আর্জেন্টিনার বোকা জুনিয়র্স, রিভারপ্লেটের? অথচ ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ, লা লিগা, সেরি আ থেকে জার্মান বুন্দেশলিগা— বিশ্বের সেরা লিগগুলোয় ইউরোপের পাশাপাশি লাতিন আমেরিকার ফুটবলারদের দাপটই বেশি।

২০১৩। লন্ডনের ওয়েম্বলির স্টেডিয়ামে এফএ কাপের ফাইনাল। রূদ্ধশ্বাস ম্যাচ। প্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমের দু’টি ক্লাব। ম্যাঞ্চেস্টার সিটি আর উইগান। ডেভিড বনাম গোলিয়াথের দ্বৈরথ। চূড়ান্ত মুহূর্তে এক গোলে জিতে যায় উইগান। হারিয়ে দেয় ম্যাঞ্চেস্টার সিটিকে, যার দুজন স্ট্রাইকারের দাম উইগানের পুরো টিমের চেয়ে চার-গুণের বেশি! এই সেই মুহূর্ত, যা প্রমাণ করে দেয় ফুটবল এখনও ছুড়ে ফেলতে পারে পুঁজির শক্তিকে। যদিও, তিনবছর পর প্রিমিয়ার লিগে আর জায়গা পায় না উইগান। তারপর থেকে আর কখনোই না।

ফুটবলে আজ একদিকে বৈভবের প্রাচুর্য, অন্যদিকে চরম দারিদ্র্য। ‘সব কিছু আছে’ আর ‘কিছুই নেই’-এর মুখোমুখি আজ ফুটবল সমাজও।

উনিশ শতকের মাঝামাঝি ব্রিটিশ উপনিবেশবাদকে ধরে ফুটবল দুনিয়ার বিস্তারের সূচনা। দ্রুতই ফুটবলকে আপন করে নেয় ভিনদেশী সমাজ। বাড়তে থাকে জনপ্রিয়তা— তার সহজ সাদাসিধেভাব এবং সমবেত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণে। দরকার শুধু একটা বল। খেলা যায় যে কোনও মাঠে। একসঙ্গে বাইশজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থেকে সুতাকলের শ্রমিক। শুরুতে খেলোয়াড়দের ছিল আর পাঁচটা কাজ। ফুটবল তাঁকে টাকা দিত না। পরে স্টেডিয়াম হল। ফুটবল পরিণত হল বিনোদনে। পরে, বহু পরে পুঁজিবাদের বিকাশে ফুটবল পরিণত হলো সীমান্তপার ব্যবসায়িক লেনদেনে।

টেলিকমিউনিকেশনের তাক লাগিয়ে দেওয়া অগ্রগতির সদ্ব্যবহার, ইউরোপে বসম্যান আইনের প্রয়োগ, ক্লাবগুলির পেশাদার পরিচালন ব্যবস্থা— এসবই ফুটবলের বিশ্বায়নকে গতি দিতে বাহারি আয়োজন।

মুক্ত বাজার, বিশ্বজোড়া টেলিভিশান নেটওয়ার্ক— ফুটবলকে এখন দেখা যায় বিশ্বের যে কোনও প্রান্তে বসে। লাইভ। সরাসরি। উয়েফা চাম্পিয়ানস্‌ লিগ, কোপা আমেরিকা কাপ, ব্রিটিশ প্রিমিয়র লিগ, স্প্যানিশ লিগ, ইতালির সিরি-এ কাপের দর্শক এখন বিশ্বের সর্বত্র। বিশ্বায়িত ফুটবলে ইদানীংয়ের দর্শক শুধু মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গলেরই ভক্ত নয়, একইসঙ্গে ম্যান ইউ, রিয়াল মাদ্রিদের ঘোর সমর্থক।

ফুটবলের বিপণনে এখন টেলিভিশন রাইটস। মাঠের টিকিট বিক্রির তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ টেলিভিশন রাইটস। বাজার মানে স্টেডিয়ামের এক লক্ষ দর্শক নয়, তার বাইরে টেলিভিশনের কোটি কোটি দর্শক।

আমাদের প্রিয় ফুটবল মার্কিনীদের কাছে ‘সকার’। অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় এই সকার শব্দটিই ঢুকে পড়েছে বিশ্ব ফুটবলের ময়দানে। খোলা বাজার অর্থনীতিতে বিশ্বের জনপ্রিয় খেলাটি আজ ‘সকার ইন্ডাস্ট্রি’তে পরিণত। পরিণত বিনোদন শিল্পের লাভজনক পণ্যে।

ফিফা-র সদস্য-দেশের সংখ্যা এখন ২০৯। রাষ্ট্রসংঘের (১৯৩) চেয়েও বেশি। যেমন, প্যালেস্তিনীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে অনুমোদন করেছে ফিফা। কিন্তু রাষ্ট্রসংঘ এখনও পর্যন্ত প্যালেস্তাইনকে পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। ২০০৬ সালের ফিফার হিসেব বলছে, নিয়মিত ও অনিয়মিত খেলোয়াড়ের সংখ্যা ৩০ কোটি।

দুনিয়া শুধু ফুটবল খেলে না। খেলা দেখে। খেলা নিয়ে বাজি ধরে। চায়ের পেয়ালায় তুফান তোলে। কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢালে। এই বিশ্বকাপে ৫০০ কোটি মানুষ কোনও না কোনও ম্যাচ দেখবেন বলে মনে করছে ফিফা (ফোর্বস)। ফিফার দাবি, গত বিশ্বকাপের শুধু ফাইনাল ম্যাচ ঘরে বসে টেলিভিশনে দেখেছিলেন ৮৮ কোটি ৪৪ লক্ষ জন। আর ২৩ কোটি ২০ লক্ষ জন দেখেছিলেন ডিজিটাল মাধ্যমে। মানে ১১১ কোটির বেশি মানুষ দেখেছিলেন বিশ্বকাপের ফাইনাল। এই পৃথিবীর প্রতি সাতজনে একজন!

এক ইংলিশ প্রিমিয়র লিগ (ইপিএল) সম্প্রচারিত হয় ১৮৮টি দেশে। ৮০ কোটি ঘরে। দেখেন ৩২০ কোটি মানুষ। প্রিমিয়র লিগ এখন রীতিমতো আন্তর্জাতিক পণ্য। অনায়াসে বলা যেতে পারে ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’! ২০২০-তে কোভিড সত্ত্বেও ব্রিটিশ অর্থনীতিতে প্রিমিয়র লিগের অবদান ছিল ৭৬০ কোটি পাউন্ড।

ব্র্যান্ড ফ্রান্সের হিসেবে, সবচেয়ে মহার্ঘ ব্র্যান্ড রিয়াল মাদ্রিদ। বায়ার্ন মিউনিখকে হটিয়ে টানা চারবছর ধরে শীর্ষে রিয়াল মাদ্রিদ। রিয়ালের ব্র্যান্ডের দাম ১৫০ কোটি ইউরো। গতবছরের তুলনায় ১৯ শতাংশ বেশি! ২০২১-‘২২ মরসুমে দুনিয়ার সবচেয়ে দামি ২০-টি ক্লাবের মিলিত আয়ের পরিমাণ ১০৩০ কোটি ইউরো।
ফুটবল শুধু বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাই নয়, খুব সম্ভবত এই পৃথিবীর সবচেয়ে বিশ্বায়িত পেশা। ব্রাজিল, ক্যামারুন অথবা জাপানের ডাক্তার, কম্পিউটার বিজ্ঞানী, ব্লু-কলার শ্রমিক, কিংবা ব্যাঙ্ক কর্মচারীদের তুলনায় অনেক সহজে, অনায়াসে এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাতায়াত করেন সে-দেশের প্রতিভাবান ফুটবল খেলোয়াড়রা। প্রিমিয়র লিগের সমর্থক-অনুরাগীরা এতদিন যে সন্দেহ করছিলেন, ফুটবলের মুক্তবাজার নিয়ে অর্থনীতিবিদ ব্র্যাঙ্কো মিলানোভিচের গভীর সমীক্ষা তাকেই নিশ্চিত করেছে— বিদেশি তারকাদের ঢালাও অনুপ্রবেশ দক্ষতার স্তরকে বাড়িয়েছে ঠিকই, তবে তা অভিজাত ক্লাবগুলি ও বাকিদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের মূল্যে।

১৯৯৫, বসম্যান আইন। ফুটবলের বিশ্বায়নে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক অনন্য অবদান।

কদিন আগেও কোনও ক্লাব একটি খেলায় দুজনের বেশি বিদেশি খেলোয়াড় নামাতে পারত না। আটের দশকে মাঝামাঝি এটাই ছিল দস্তুর। পরে তা বাড়িয়ে ‘তিন’ করা হয়। কিন্তু বসম্যান আইন সব ভেঙে দেয়। অবসান ঘটে ঊর্ধ্বসীমার। এক সকালেই ইউরোপের ধনী অভিজাত ক্লাবগুলির কাছে চলে আসে দুনিয়ার সবচেয়ে সেরা খেলোয়াড়দের কেনার মহার্ঘ সুযোগ। তা সে দুনিয়ার যেখানেই তাদের দেখা যাক না কেন! ব্রিটেনে পেশাদার ফুটবল ক্লাবে খেলতে বস্তুতই নেই কোনও বাধা। ইউরোপের বাইরের খেলোয়াড়দের জন্য এখন দরকার শুধু একটা ‘ওয়ার্ক পারমিট’।

অভিজ্ঞতা কী?

১৯৯২-’৯৩তে নতুন করে যখন প্রিমিয়ার লিগ শুরু হয়, তখন বিদেশি খেলোয়াড়ের সংখ্যা ছিল মেরেকেটে ১৭৬। আর এখন, ৫৯টি দেশ থেকে আসা বিদেশী খেলোয়াড়ের সংখ্যা ৩৭১।

ব্রেন ড্রেন-র মতোই ‘লেগ-ড্রেন’। মস্তিস্ক পাচারের মতোই এখন পা-পাচার।

যেমন ফুটবলার রপ্তানির দেশগুলিতে তিন-নম্বরে আর্জেন্টিনা। এই মুহূর্তে বিদেশে খেলছে ৮১৫ জন। সরকারি হিসেবে, ফুটবলার রপ্তানি করে গত দশ বছরে আর্জেন্টিনা আয় করেছে ১৫১ কোটি ৫০ লক্ষ ডলার। যেখানে আমদানির জন্য গুনতে হয়েছে মেরেকেটে ৬৭ কোটি ৫০ লক্ষ ডলার। বাণিজ্যে ঘাটতি নয়, রীতিমতো উদ্বৃত্ত। এক নম্বরে যথারীতি ব্রাজিল। বিদেশে খেলছে ১১২৯ জন। দ্বিতীয় ফ্রান্স, ৯৭৮ জন।

‘সোনার ডিম’! বুয়েনস আর্য়াস থেকে প্রকাশিত দাপুটে দৈনিকে এই নভেম্বরে পাতা জোড়া শিরোনাম! স্বাভাবিক। মেসি নয়, আজ সবচেয়ে দামি মার্তিনেজ। লাউতারো মার্তিনেজ। দলবদলের বাজারে সবচেয়ে দামি এই তারকা স্ট্রাইকার। আর্জেন্টিনার রেসিং ক্লাব ছেড়ে ২০১৭-তে ইতালির ইন্টার মিলানে, বিক্রি হয়েছেন আড়াই কোটি ইউরোতে। কোচ লিয়োনেল স্কালোনির স্কোয়াডের বাকি তিন সদস্য— মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজ, এজকিয়েল পালাসিয়োস এবং স্ট্রাইকার জুলিয়ান আলভারেস— তিনজনই খেলেন বিদেশে। এবং কী আশ্চর্য এই তিনজনই একসময়ে খেলতেন আর্জেন্টিনার রিভার প্লেটে। ফার্নান্দেজ এবছর যোগ দিয়েছেন পর্তুগালের বেফিকা ক্লাবে, ১ কোটি ৮০ লক্ষ ইউরোর বিনিময়ে। পালাসিয়োস এখন খেলছেন জার্মান বহুজাতিক সংস্থা বেয়ারের ক্লাব বেয়ার লেভারকুসেনে। ২০১৯ সালে তিনি রিভার প্লেট ছাড়েন। ট্রান্সফার ফি ছিল ১ কোটি ৭০ লক্ষ ইউরো। আর আলভারেস এখন খেলছেন ম্যানচেস্টার সিটি-তে। ট্রান্সফার ফি ছিল ১ কোটি ৭০ লক্ষ ইউরো।

ফুটবলেও এখন আগ্রাসী পুঁজিবাদ। ঘুরছে ‘পর্ণোগ্রাফির অঙ্কের অর্থ’।

ফুটবলেও এখন জি-৮। এরা এখন আর শুধু ক্লাব নয়। লিমিটেড কোম্পানি। যেমন ম্যান ইউ। নাচে শেয়ার বাজারের ছন্দে। ক্লাবের কর্তা নিছক ক্লাব কর্তা নন। চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার। সি ই ও। তাঁরা কথা বলেন ব্যালেন্সশিট, শেয়ার দরের ভাষায়। ক্লাবকে দেখেন ব্র্যান্ড হিসেবে। খেলোয়াড়দের সম্পত্তি হিসেবে। ব্র্যান্ড প্রোমোটার হিসেবে। সমর্থকদের দেখেন ক্রেতা হিসেবে। এদের সামনে এখন বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের কেনার মহার্ঘ সুযোগ।

সোজা সরল ভাষায়, কেন্দ্রীভবন। মিলানোভিচের তত্ত্বায়ণ, ‘যেখানে বিশ্বায়ন ও পূর্ণ বাণিজ্যিকীকরণের আধিপত্য, সেখানেই নির্ভুলভাবে হয়েছে সাফল্য ও গুণমাণের এই কেন্দ্রীভবণ।’

কীরকম?

ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ানস লিগের শীর্ষ আটে ওঠার ক্ষেত্রে ক্লাবগুলির যোগ্যতার কথাই ধরুন। আমরা যদি পাঁচ বছরকে একটি পর্যায় ধরি— তবে, ১৯৬৭ এবং ১৯৮৬’র মধ্যে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছে এমন টিমের সংখ্যা ছিল ২৮ ও ৩০। পরবর্তী দু’টি পাঁচ বছরে এই সংখ্যাটা কমে হয়েছে ২৬। আর সম্প্রতি তা আরও কমে হয়েছে ২১। প্রবণতা স্পষ্ট। অল্প, একেবারেই অল্প কিছু ক্লাব ঢুকতে পারছে ইউরোপের অভিজাত ক্লাবগুলির মধ্যে। বাকিরা হারিয়ে যাচ্ছে অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায়।

কেউ কেউ যুক্তি দিচ্ছেন, বেশ তো, এতে তো খেলার গুণমাণই বাড়ছে। অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, পাওয়া যাচ্ছে আরও ভালো ‘রিটার্ন’। এটা ঠিক, সেরা খেলোয়াড়রা যখন একসঙ্গে খেলেন, তখন তাদের প্রত্যেকের দক্ষতার যোগফলে সামগ্রিকভাবে দলের দক্ষতা মারাত্মকভাবে বেড়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। যখন রোনাল্ডিনহো ও মেসি, অথবা কাকা ও শেভচেঙ্কো একসঙ্গে খেলেন, তখন তাঁদের সম্মিলিত ‘আউটপুট’ (এখানে গোলের সংখ্যা), যদি তাঁরা আলাদা আলাদা ক্লাবে অনেক কম দক্ষ খেলোয়াড়দের সঙ্গে খেলতেন, তার তুলনায় স্বভাবতই অনেক বেশি হয়ে যায়।

কিন্তু আবার এও ঠিক, রোনাল্ডিনহো, মেসি, অথবা কাকা, শেভচেঙ্কোর মতো গুণমানকে কিনতে পারছে একমাত্র ধনী ক্লাবগুলি। হচ্ছে তাই সাফল্য ও গুণমানের কেন্দ্রীভবন।

‘বর্বর পশ্চিমী ধাঁচের পুঁজিবাদ’ গলা টিপে হত্যা করছে এই খেলাকে। বলেছেন খোদ ফিফা’র প্রাক্তন সভাপতি সেপ ব্লাটার। লন্ডন থেকে প্রকাশিত ফিনান্সিয়াল টাইমস পত্রিকায় লেখা এক নিবন্ধে। ‘ফুটবল মানে এখন লক্ষ লক্ষ কোটি পাউন্ডের বিশ্বায়িত শিল্প। যে এলোমেলোভাবে অর্থের জোয়ার বইছে এই খেলায়, দুঃখজনক হলেও তা হয়ে থাকবে বর্বর পশ্চিমী ধাঁচের পুঁজিবাদের স্মারক। সময় এসেছে— এই খেলা যাতে তার শিকড়কে আগলে রাখতে পারে সুনিশ্চিত করতে হবে তাকে’।

ইউরোপীয় ফুটবলের এই ক্রমবর্ধমান ‘কসমোপলিটানিজম’র মূল চালিকা শক্তি গত আড়াই-তিন দশকের বেপরোয়া বাণিজ্যিকীকরণ। মিলানোভিচের বিশ্লেষণ: ‘যেখানে বিশ্বায়ন এবং পূর্ণ বাণিজ্যিকীকরণের আধিপত্য, সেখানেই নির্ভুলভাবে হয়েছে সাফল্য ও গুণমানের কেন্দ্রীভবন’। আর এই লাগামছাড়া বাণিজ্যিকীকরণের চারটি উপাদান হলো— বিপুল পরিমাণে টেলিভিশন-আয়বৃদ্ধি, বসমান আইন (বিদেশী খেলোয়াড়দের ঊর্ধ্বসীমার অবসান), স্পনসরশিপ ও ব্যবসার বিকাশ এবং ফুটবল পরিচালনায় চরম পেশাদারিত্বের বিকাশ।

সবকিছু দেখে বিরক্ত ব্লাটার। সখেদে বলেছেন, ‘ইউরোপের প্রথম সারির ক্লাবগুলি ক্রমশ বেশি বেশি করে নয়া-উপনিবেশবাদীদের মতো আচরণ করছে। ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি নিয়ে এদের কোনও মাথাব্যাথা নেই। এরা শুধু জানে উন্নয়নশীল দেশগুলি থেকে তাদের সেরা খেলোয়াড়দের ডাকাতি করে কীভাবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ধর্ষণ করতে হয়’। ফিনান্সিয়াল টাইমস পত্রিকায় তাঁর লেখার বিস্ফোরক শিরোনাম— ‘ফুটবলের অর্থলোলুপ নয়া-উপনিবেশবাদীরা’।

সম্বৎসর ইউরোপে খেলতে খেলতেই হারিয়ে যায় খেলোয়াড়দের স্বাতন্ত্র্য, নিজস্বতা। সেকারণেই বিশ্বকাপে আজ আর জাতীয় দলগুলিকে পৃথক করা যায় না।

আজকের ফুটবলে আর তেমন চোখে পড়ে না সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো তরঙ্গ তুলে আক্রমণ। রিয়ালের উইঙ্গার ব্রাজিলীয় ভিনিসিয়াস জুনিয়র, মেসি, নেইমার কিংবা বার্সেলোনার উসমান দেমবেলের মতো ব্যতিক্রম বাদে নেই সেই চোখ ধাঁধানো ড্রিবিল, দুর্দান্ত শুটিং, কিংবা ব্যক্তিগত নৈপুন্য। নেই ব্যাকরণের পরিধি ভেঙে বেরনোর চেষ্টা। উধাও ফুটবলের নান্দনিক সৌন্দর্য।

যে অনিন্দ্যসুন্দর ক্রীড়াশৈলীতে একদিন মুগ্ধ হতো তাবৎ বিশ্ব, মুক্ত বাজার অর্থনীতি হত্যা করেছে সেই অনুপম সৌন্দর্যকে। খোলা বাজার অর্থনীতি বোঝে একটাই কথা— হতে হবে চাম্পিয়ান। ফ্রি মার্কেট ইকনমির গোড়ার কথা হলো— উইনার টেকস ইট অল।

সিজার মিনোত্তি তাই দুঃখ করে বলেন, ‘বিশ্বকাপে এখন আর সৃজনশীলতা নেই। নেই ব্যক্তিগত দক্ষতা ও নৈপুণ্য। আছে শুধু স্পিড আর মার্কিং’।
বিশ্ব ফুটবলে স্কিলের বিবর্তন নয়, এসেছে গতির বিবর্তন। বিশেষজ্ঞরা বলছন, ১৯৭০ কিংবা ১৯৮২-তে ব্রাজিলের জাতীয় দল যখন মাঠে দৌড়ত, তখন একটা ম্যাচে একজন খেলোয়াড়কে সারা খেলায় গড়ে সাকুল্যে চার কিলোমিটার ছুটতে হতো। এখন তাকেই ছুটতে হয় চারের জায়গায় আট কিলোমিটার। ফলে স্কিল দেখানোর সময় ও জায়গা দুইই কমে যাচ্ছে।

এখন ‘আ লা ইউরোপীয়’ ঘরানার জমানা। পায়ে-পায়ে আচমকাই চিতাবাঘের ক্ষিপ্রতায় আক্রমণ আজ আর তেমন চোখে পড়ে না। ব্রাজিলের ফুটবল তারকা টোসটাও যেমন বলেছেন, ‘ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার ফুটবল স্কুলের মধ্যে যে ফারাকটা ছিল, সাতের দশক থেকেই সেই ব্যবধানটা কমতে শুরু করে। আজ লাতিন আমেরিকাও অন্ধভাবে অনুকরণ করছে ইউরোপীয় ফুটবলের কাঠিন্য, শারীরিক প্রশিক্ষণ, বাস্তবধর্মিতা ও ট্যাকটিকাল ডিসিপ্লিনকে’।
বিশ্বায়নের দাপটে ইউরোপের পাওয়ার ফুটবলের পাশবিক যান্ত্রিকতায় খুন হচ্ছে লাতিন আমেরিকার নিজস্ব শৈলী। সাম্বার মতোই এই বিশ্ব থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ফুটবলের অসমান্য সৌন্দর্যের লাতিন আমেরিকান ঘরানা।

প্রকাশের তারিখ: ২০-নভেম্বর-২০২২

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org