বিদেশ নীতির জলাঞ্জলি

প্রকাশ কারাত
বিদেশ নীতির এই অধিকতর দক্ষিণমুখী যাত্রা মূলত রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পকে তোষামোদ করার অভিপ্রায়ে। এবং তাঁর সমস্ত সর্বনাশা দাবিগুলি মেনে নেওয়ার লক্ষ্যে।... অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বই হোক, বা বিদেশ নীতি, কিংবা স্ট্র্যাটেজিক স্বতন্ত্রতা– এই সবকিছুতে এটাই স্পষ্ট– ভারতের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলিতে ঘটছে আত্মসমর্পণের ঘটনা।

সাম্প্রতিক সময়ে মোদী সরকারের বিদেশ নীতি যে দুর্নাম কুড়িয়েছে তাকে স্বল্পকথায় এড়িয়ে যাওয়ার কোনও জো নেই। গত ১৩ জুন স্পেনের উত্থাপিত একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদে। যেখানে অবিলম্বে গাজায় বিনা শর্তে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রস্তাবে ‘সাধারণ নাগরিকের উপর অনাহার চাপিয়ে দেওয়াকে যুদ্ধকৌশল’ হিসেবে ব্যবহার করার জন্যে ইজরায়েলকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। ১৯৩টি সদস্য-দেশের মধ্যে ১৪৯টি দেশ এই প্রস্তাব সমর্থন করেছে। ১২টি দেশ বিরোধিতা করেছে। এবং ভোটদানে বিরত থেকেছে ১৯টি দেশ। ভারত এই প্রস্তাবে ভোট দেয়নি। বিরত থেকেছে।

গাজায় চলমান গণহত্যা এবং ২০ লক্ষ জনসাধারণকে অনাহারে বাধ্য করার ইজরায়েলী যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই অবস্থানটি নির্লজ্জতার একটি চূড়ান্ত উদাহরণ। ভারতের বিরত থাকার বিষয়ে কুযুক্তিটি হল ‘দীর্ঘস্থায়ী শান্তি আসতে পারে একমাত্র সরাসরি আলাপ আলোচনার মাধ্যমেই’। এটা স্পষ্টতই চাতুরি। কারণ ইজরায়েলই সর্বশেষ যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ করে গাজায় তেল সরবরাহের উপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা চাপিয়েছে। ছ’মাস আগে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে যে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়, তখন ভারত যে অবস্থান নিয়েছিল, এটা তার সম্পূর্ণ বিপরীত। এবার এশিয়া থেকে একমাত্র ভারত ও পূর্ব তিমোরই ভোটদানে বিরত থেকেছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কট্টর বন্ধুদেশ-সহ এশিয়ার আর সমস্ত দেশই এই প্রস্তাবের সমর্থনে ভোট দিয়েছে।

প্যালেস্তাইনকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার নেতানিয়াহুর পরিকল্পনায় মার্কিন রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের পূর্ণ সমর্থনের প্রেক্ষিতে মোদী সরকার এখন আরো স্পষ্টভাবে ইজরায়েল-ঘেঁষা ভূমিকা গ্রহণ করেছে। ট্রাম্প প্রশাসন বুঝিয়ে দিয়েছে তারা আর দু’টি রাষ্ট্র গঠনের সমাধান-সূত্রকে সমর্থন করে না। যে কোনও মূল্যে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গী হওয়ার দাসসুলভ মনোভাব– প্যালেস্তাইন প্রশ্নে ভারতের নীতিগত অবস্থানের সম্পূর্ণ জলাঞ্জলি ঘটিয়ে তাকে ইজরায়েলী জমানার গণহত্যার ঔপনিবেশিক নীতির দোসরে পরিণত করেছে।

বিদেশ নীতি যে মার্কিন-ইজরায়েল অক্ষশক্তির কাছে বন্ধক রাখা হয়েছে, সেটা আরো একবার স্পষ্ট হয়েছে যখন ইরানের ওপর ইজরায়েলের সামরিক আগ্রাসনকে আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রসঙ্ঘের সনদের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করা সাঙহাই সহযোগিতা সংগঠন (এসসিও)-র ১৪ জুনের ঘোষণাপত্র থেকে ভারত নিজেকে সরিয়ে নেয়। উলটে সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য করে বসে যে বিবৃতি ঘোষণার সময় ভারতের সঙ্গে কোনও পরামর্শ করা হয়নি। আগ্রাসনের কবলে পড়া দেশ ইরান যে সাঙহাই সহযোগিতা সংগঠনেরই অন্যতম সদস্য-রাষ্ট্র, সেই সত্যটিও ভারতের কাছে কোনও মূল্য বহন করেনি। নিজেদের দিক থেকে দেখলে, ইরান কৌশলগত সহযোগিতায় আবদ্ধ ভারতের বন্ধুরাষ্ট্র। এই সত্যকে ধর্তব্যে নিয়েও ইরানের উপর ইজরায়েলের সামরিক হামলার নিন্দা করল না ভারত। এর বিপরীতে দেখা যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ও কোয়াড জোটের অংশ হওয়া সত্ত্বেও জাপানের অবস্থানকে। ইরানের ওপর ইজরায়েলের আক্রমণকে আন্তর্জাতিক আইন ও ইরানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন হিসেবে বর্ণিত করে কঠোর ভাষায় নিন্দা জানিয়েছে জাপান।

সমস্ত আন্তর্জাতিক আইন কানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে ২২ জুন যখন ইরানের তিনটি পরমাণু কেন্দ্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বোমা হামলা চালায়, ভারত তখনও চুপ করে থেকেছে। পরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ইরানের রাষ্ট্রপতিকে ফোনে উদ্বেগ প্রকাশ করে উত্তেজনা প্রশমনের আবেদন রেখেছেন। এই পরামর্শ দেওয়া হয়েছে আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে, যাতে তারা আত্মরক্ষায় কোনও পদক্ষেপ না নেয়!

রিও ডি জেনেরো-তে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে, মোদী তার বক্তৃতায় ইরানের ওপর ইজরায়েলের হামলা ও সেখানকার পরমাণু কেন্দ্রে মার্কিনী বোমা নিক্ষেপের কোনও সমালোচনাই করেননি। কিন্তু সেই সম্মেলন থেকে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে ইরানের ওপর হামলার তীব্র নিন্দা করা হয়েছে। বোঝাই গিয়েছে, অবশিষ্ট ১০টি সদস্য দেশ ভারতের সঙ্গে এই বিষয়ে একমত নয়।

বিদেশ নীতির এই অধিকতর দক্ষিণমুখী যাত্রা মূলত রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পকে তোষামোদ করার অভিপ্রায়ে। এবং তার সমস্ত সর্বনাশা দাবিগুলি মেনে নেওয়ার লক্ষ্যে। ১ জুলাই ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত কোয়াড-ভুক্ত দেশগুলির বিদেশ মন্ত্রীদের সম্মেলন চীনকে নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে। চীনের বর্ধিত অর্থনৈতিক শক্তি মোকাবিলার বিষয়ে দৃষ্টিনিবদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ভারত এখন উঠে পড়ে লেগেছে যাতে এবছরের শেষে দিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য কোয়াড সম্মেলনে ট্রাম্প যোগ দেন।

ভারতকে শুল্ক ও বাণিজ্য নিয়েও ট্রাম্পের দাবি নিয়ে নিষ্পত্তি করতে হবে। এই বিষয়েও মোদী সরকার কোনও ধরনের দৃঢ় অবস্থান নিতে পারেনি। ঘটনাপ্রবাহ এটাই ইঙ্গিত করছে, ভারত বড় আকারে ছাড় দিয়ে ৯ জুলাই-এর ৯০ দিনের পরিপূরক শুল্ক আরোপ স্থগিত রাখার সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই অন্তর্বর্তীকালীন বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করবে। যদিও এখন পর্যন্ত হওয়া আলাপ-আলোচনা থেকে কোনও সন্তোষজনক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়নি। ‘অপারেশন সিন্দুর’-উত্তর সময়পর্বেই বোঝা গিয়েছে ভারতের বিদেশ নীতির বিপর্যয় ঘটে গিয়েছে। ট্রাম্প ভারত আর পাকিস্তানকে এক বন্ধনীর মধ্যে জুড়তে সমর্থ হয়ে নিজেকে ভারত-পাক সম্পর্কের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে জাহির করেছেন।

এই বিপর্যয়ের মূলে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ছোট শরিক হিসেবে নিজেদের আসন পাকা করার লক্ষ্যে মোদী সরকারের মরিয়া পদক্ষেপগুলি। মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্তার সঙ্গে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের পরবর্তী সাক্ষাতেই দশ বছরের জন্যে পুনর্নবীকৃত প্রতিরক্ষা বিষয়ক চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা। গত ফেব্রুয়ারি মাসে মোদীর ওয়াশিংটন সফরের সময়ে ভারত সম্মতি জানিয়েছে বৃহৎ আকারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বৃহদায়তন সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের। মার্কিন বাণিজ্য সচিব হাওয়ার্ড লুটনিক রাশিয়া থেকে ভারতের সমরাস্ত্র ক্রয়ের বিষয়ে অসন্তোষ ব্যক্ত করেও গুরুত্ব দিয়ে এটাও যোগ করেছেন এই বিষয়ে তাদের উদ্বেগগুলির নিষ্পত্তি হয়েছে এবং ‘ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের দিকেই অগ্রসর হচ্ছে।’

অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বই হোক, বা বিদেশ নীতি, কিংবা স্ট্র্যাটেজিক স্বতন্ত্রতা– এই সবকিছুতে এটাই স্পষ্ট– ভারতের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলিতে ঘটছে আত্মসমর্পণের ঘটনা।

ভাষান্তর: শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার


প্রকাশের তারিখ: ১৩-জুলাই-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org