|
ভারতের প্রথম শ্রমিক কেন্দ্র ও শ্রমিক শ্রেণির মতাদর্শসুদীপ দত্ত |
শিকাগো শহরের হে মার্কেটে আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে ধর্মঘটের চব্বিশ বছর আগে হাওড়া স্টেশনে একই দাবিতে ধর্মঘট। পরে আরও প্রতিবাদ-ধর্মঘটের পথ বেয়ে ১৯২০র ৩১ অক্টোবর। ভারতের শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রামের প্রথম রাজনৈতিক কেন্দ্র। অল ইন্ডিয়া ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস (এআইটিইউসি)-র প্রতিষ্ঠা। ১০০ বছর অতিক্রান্ত। এআইটিইউসি গঠন ও এর ক্রমবিভাজনের ইতিহাস আসলে শ্রমিকশ্রেণির মতাদর্শগত সংগ্রামের পথ চলার ইতিহাস। এর উত্তরাধিকার বহন করার যোগ্য হয়ে ওঠার দায়িত্ব আজ আমাদের কাঁধে তুলে নিতে হবে। আমাদের মতাদর্শ হলো শ্রেণিবিভক্ত সমাজে শ্রেণি সংগ্রামের মতাদর্শ, তার বাইরে এক পা ও নয়। আমাদের ঐক্য হলো সংগ্রামের ঐক্য, তা ছাড়া আর কোনও আকাঙ্ক্ষা যেন আমাদের না ছুঁয়ে যায়। সব সংগ্রাম ধাবিত হোক শ্রেণি ঐক্যের দিকে, শ্রেণি ঐক্য নিয়ে আসুক শোষণের অবসান- পবিত্রতম স্বপ্নের যাপন সত্য হয়ে উঠুক। |
ভারতের শ্রমিক শ্রেণি ও তার সংগ্রামের মূল ধারার জন্ম পুঁজিবাদের ঔপনিবেশিকতা পর্যায়ের গর্ভে। পুঁজির আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও জাতিভিত্তিক কেন্দ্রের সহাবস্থান এই সময়ের বৈশিষ্ট্য। এই দ্বন্দ্বের সরাসরি অভিক্ষেপ ফুটে ওঠে উৎপাদন প্রক্রিয়া ও উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের ভৌগোলিক বৈষম্যময় বিবর্তনের মধ্যে। ব্রিটিশ পুঁজির পরিকল্পনায় ভারতে যে শিল্প ও পরিকাঠামোর বিকাশের নতুন পর্যায় শুরু হয়েছিল, তা দ্রুততার সাথে ভারতে আধুনিক শ্রমিকশ্রেণির আত্মপ্রকাশ ঘটায়। যত দ্রুত গতিতে এই আধুনিক শ্রমশক্তি নিজেকে শ্রেণি হিসেবে চিনতে জানতে শেখে ততই সাম্রাজ্যবাদী শোষণমূলক ব্যবস্থার মূল কাঠামোগত অর্থনৈতিক অবধারণা পলেস্তারা খসিয়ে বেড়িয়ে পড়তে থাকে। ভারত আধুনিক শিল্প বিকশিত ইউরোপের জ্বালানিঘর আর বাজারে পরিণত হতে থাকে। আর ভারতের শ্রমিকশ্রেণি নিজেদের প্রাথমিক অর্থনৈতিক লড়াইয়ের চেতনা নিয়েই দেশি-বিদেশি শাসকদের বিরুদ্ধে সংগঠিত ভাবে সংগ্রামের পথে নামা শুরু করে। এই যুগ পুরনো সময়ের অবসান না হওয়া আর নতুন সময়ের আত্মপ্রকাশের টানাপড়েন জীর্ণ অথচ অপার বৈপ্লবিক সম্ভাবনার সূচনার যুগ হিসেবে ভারতের সমাজ বিকাশের ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ১৮৫০ থেকেই আর ১৮৫৭ এর মহাবিদ্রোহের পর থেকে আরও দ্রুততার সাথে ভারতে রেল ব্যবস্থার সম্প্রসারণ শুরু হয় । সাথে চা ও কয়লা শিল্পের পত্তন হয় এইসময় ভারতে। কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলায় চট কারখানা ও মহারাষ্ট্র – গুজরাটে কাপড়ের মিল পত্তন শুরু হয়। ওই শতাব্দীর শেষ দিকে বোম্বে, কলকাতা, হাওড়া, কানপুর, লাহোর, মাদ্রাজ বা নাগপুরের মতো শহরে আরও বেশ কিছু নতুন শিল্পের কারখানা জন্ম নিতে থাকে আর সাথে সাথে জন্ম নিতে থাকে আধুনিক ভারতের শ্রমিকশ্রেণি। লক্ষ্য করলে খুঁজে পাওয়া যাবে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের আপোষবিরোধী ধারায় এই শহরগুলোর শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বকারী ভূমিকা থেকেছে । পুরনো সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার দীর্ঘ যন্ত্রণাদায়ক স্থিতাবস্থা, ঔপনিবেশিক পুঁজিবাদের দীর্ঘসূত্রী বিকাশ এবং জাত-ধর্ম-ভাষা-জাতির বিশাল বৈচিত্র ও সম্ভারের এই ভারত সমাজে আধুনিক একধারার শ্রমিক শ্রেণির গড়ে ওঠা অসম্ভব ছিল এবং তা হয়ও নি। কিন্তু বারুদ আর আগুন – শোষণ আর শ্রমশক্তি একসাথে থাকলে বিস্ফোরণ অনিবার্য। ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে ভারতের প্রথম শ্রমিক ধর্মঘট হয় ১৮৬২ সালে হাওড়া রেল স্টেশনে । ১৫ বছর পরে ভারতের অন্য প্রান্তে নাগপুরে এম্প্রেস মিলে হয় দ্বিতীয় সংগঠিত ধর্মঘট আর তারপর বোম্বে, কলকাতা, কানপুর, মাদ্রাজ, লাহোরে একের পর এক ধর্মঘটের ঝড় ওঠে। সবচেয়ে জঙ্গিআন্দোলন গড়ে ওঠে রেল শ্রমিকদের মধ্যে থেকে। কিন্তু এক সুনির্দিষ্ট সমন্বয় কেন্দ্রের অভাবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের এই আন্দোলন সংগঠিত ভাবে সংযোজিত হতে পারে নি। ১৮৮৫ সালে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের জন্ম হয়। জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্ব শ্রমিকদের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে ব্যবহার করতে যতটা উৎসাহী ছিলেন, ততটাই অনুৎসাহী ছিলেন শ্রমিকদের শ্রেণিগত সমস্যার বিষয়ে। ব্রিটিশ মালিকদের কারখানায় তারা যদিওবা শ্রমিকদের সংগঠিত করতে কাজ করতেন, নতুন ভাবে গজিয়ে উঠতে থাকা দেশীয় বুর্জোয়াদের যোগ্য প্রতিনিধি হিসেবে দেশি মালিকদের কারখানায় তারা শ্রমিক আন্দোলন সম্পূর্ণভাবে নিরস্ত করার দায়িত্ব নিয়ে ফেলেছিলেন। এদিকে স্বদেশী আন্দোলনের রাজনৈতিক আহবানে দেশে দেশীয় শিল্পেরও ধীরে ধীরে বিস্তার শুরু হয়ে গেছে এসময়। ১৯০৮ সালে বোম্বেতে শ্রমিকদের সংগঠিত করার অপরাধে তিলক গ্রেপ্তার হন, ৬ বছরের কারাবাস হয় । এই সময় ভারতে রাজ্য বা অঞ্চল ভিত্তিক কোনও শ্রমিক কেন্দ্র গড়ে ওঠে নি যা বিভিন্ন ট্রেডের শ্রমিকদের একলপ্তে কোনও লড়াইতে আহ্বান করতে পারে। কিন্তু ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের বস্তুগত প্রয়োজনের ভিত্তি তৈরি হয়ে গেছিল। বিভিন্ন পেশার শ্রমিকরা একজোট হয়ে রাস্তায় নেমে আসেন, সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেন। পুলিশ বাহিনীর আক্রমণে বহু ধর্মঘটী শহিদ হন। কার্যত এই সময় থেকেই ভারতের শ্রমজীবী মানুষ শ্রেণি হিসেবে, নিজের অর্থনৈতিক দাবীর উর্দ্ধে রাজনৈতিক নেতৃত্ব হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার কাজ শুরু করে দিয়েছিলেন। এই প্রসঙ্গে দুটো ঘটনার উল্লেখ না করলেই নয়। ১৯৩০ সালে গান্ধীজি গ্রেপ্তার হলে শোলাপুরের টেক্সটাইল শ্রমিকেরা সশস্ত্র বিদ্রোহে নেমে আসেন ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে আর শোলাপুরকে স্বাধীন বলে ঘোষণা করেন। ৭ দিন ধরে ধর্মঘটি শ্রমিকদের পরিচালনাধীন স্বাধীন শোলাপুরকে উদ্ধার করতে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী সর্বশক্তি দিয়ে গণহত্যা চালায়। শোলাপুর পরাস্ত হয়, কিন্তু ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বের রাজনৈতিক গুরুত্ব ও সম্ভাবনা চিরকালীন ভাবে লেখা হয়ে যায়। আর ১৯৪৬ সালের নৌ বিদ্রোহ, যার সমর্থনে লাখে লাখে বোম্বের শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে আসেন। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সাথে মুখোমুখি সঙ্ঘর্ষে বহু শ্রমিক শহিদ হন। ভারতের বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রকাশ্য বিরোধিতা না থাকলে এই আন্দোলন ভারতের স্বাধীনতার অনেক অপূর্ণতা মিটিয়ে ফেলার পথ দেখাতে পারতো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে পরে গোটা দুনিয়া জুড়েই শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলনের ঝড় ওঠে। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে যুদ্ধ সংক্রান্ত শিল্প শ্রমিকদের ব্যপক ছাঁটাই শুরু হয় আর তার সাথে সাথেই বাড়তে থাকে শ্রমিক আন্দোলনের ঢেউ। দেশে শ্রেণি সংগ্রাম তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। গান্ধীজি শ্রেণিসংগ্রামের বিরোধিতা করে মজুর-মহাজনের শ্রেণি সমঝোতার তত্ত্ব নিয়ে নিজে নেমে পড়েন আমেদাবাদের টেক্সটাইল শ্রমিকদের সংগঠিত করতে। ১৯১৭ সালে পৃথিবীর শ্রমজীবী মানুষের স্বপ্নের সৌধ সোভিয়েতের সূচনা হয় কমরেড লেনিনের নেতৃত্বে। শ্রেণীবিভক্ত সমাজ শোষক আর শোষিতের লড়াইয়ের রঙ্গমঞ্চ হিসেবে যতই স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হতে থাকে, তত শাসকেরা শ্রেণি দ্বন্দ্বকে ঢেকে রাখার নানা পাঁয়তারা কষে চলে। বিশ্বজোড়া শ্রমিক বিক্ষোভকে ঠেকিয়ে রাখতে ১৯১৯ সালে লিগ অব নেশনের আদেশক্রমে ইন্টারন্যাশনাল লেবার অরগানাইজেশন স্থাপিত হয় । এই চরম শ্রমিক অসন্তোষ, শ্রেণি দ্বন্দ্ব, সংগ্রাম-সমঝোতার টানা পোড়েন, শ্রমিকশ্রেণির শ্রেণি হিসেবে আত্মপ্রকাশের তীব্র আকাঙ্ক্ষা আর ভারত-সমাজের ঔপনিবেশিকতা বিরোধী সংগ্রামের রাজনৈতিক নেতৃত্ব হাতে তুলে নেওয়ার যোগ্যতা অর্জনের এই পর্বে ১৯২০ সালে ভারতের শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রামের প্রথম রাজনৈতিক কেন্দ্র অল ইন্ডিয়া ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের জন্ম হয় । তিলক এই কেন্দ্র গড়ে তুলতে যথেষ্ট রাজনৈতিক সাংঠনিক দায়িত্ব নিয়েছিলেন, কিন্তু এআইটিইউসি – এর পত্তনের সময় তিনি আর বেঁচে ছিলেন না । লালা লাজপত রায়, যিনি তৎকালীন কংগ্রেসেরও সভাপতি ছিলেন তিনি এআইটিইউসি – এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হন আর দেওয়ান চমন লাল নির্বাচিত হন প্রথম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে । কিন্তু কংগ্রেসের নেতৃত্বের উপস্থিতিতে এআইটিইউসি–র গঠন আর ভারতের শ্রমিক আন্দোলনের চাহিদার নির্যাসের মধ্যে দ্বন্দ্ব ক্রমশ বাড়ছিল । তরুণ কমিউনিস্ট কর্মী যারা এআইটিইউসি–র মধ্যে নিবিড়ভাবে কাজ করছিলেন তাদের সাথে শ্রেণি সমঝোতাবাদী নেতৃত্বের মতাদর্শগত সংগ্রাম শুরু হয়। ভারতের শ্রমিক আন্দোলন অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক স্তর পেরিয়ে মতাদর্শগত স্তরে প্রবেশ করতে শুরু করে। ১৯২৪ সালের মধ্যেই এই বিভাজন প্রকট হয়ে ওঠে। ভারতের শ্রমিক আন্দোলনের সমাজতান্ত্রিক ধারা ক্রমশ আত্মপ্রকাশ করা শুরু করে। ১৯২৯ সালে এআইটিইউসি– এর নাগপুর অধিবেশনে যখন বিপ্লবী সংগ্রামী অংশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী প্রস্তাব আনেন, ভি ভি গিরি, এন এম জোশীর মতো প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্ব অধিবেশন ছেড়ে বেড়িয়ে যান। তারা ইন্ডিয়ান ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন নামে এক নতুন কেন্দ্র তৈরি করার চেষ্টা করেন। কিন্তু এআইটিইউসি–র বিপ্লবী অংশের শ্রমিক শ্রেণির ওপরে প্রভাবের আঁচ পেয়ে জওহরলাল নেহেরু এআইটিইউসি– তেই থেকে যান। ১৯৩১ সালে সুভাষ চন্দ্র বোসের নেতৃত্বে চলা এআইটিইউসি– র কলকাতা অধিবেশনে কমিউনিষ্ট আর কট্টর জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে আবার লড়াই বাধে এবং কমিউনিস্টদের একটি অংশ এআইটিইউসি ছেড়ে বেড়িয়ে যান । পরবর্তীতে ১৯৩৫ সালে তারা আবার এআইটিইউসি–তে যোগ দেন। স্বাধীনতার ঠিক প্রাক মুহুর্তে যখন দেশের জাতীয় বুর্জোয়ারা ক্ষমতা পাওয়ার আঁচ পেতে শুরু করেছে, সেই ১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কংগ্রেস দেশীয় পুঁজিপতিদের শ্রেণিস্বার্থ রক্ষা নিশ্চিত করতে কমিউনিস্ট প্রভাবিত এআইটিইউসি থেকে বেড়িয়ে এসে আইএনটিইউসি গঠন করে। এর পরের ইতিহাস এআইটিইউসি-র মধ্যে ও বাইরে এক বিস্তৃত রাজনৈতিক- মতাদর্শগত সংগ্রামের অধ্যায়। দ্বন্দ্বের অনিষ্পত্তিযোগ্য চূড়ান্ত পর্যায়ে ভারতের শ্রমিকশ্রেণির সংগ্রামের প্রতি সৎ দায়বদ্ধতার কারণেই বিচ্ছেদ অনিবার্য হয়ে উঠেছিল, যা এই পরিসরে আলোচনার অবকাশ আমাদের কাছে নেই। ১৯৭০ সালে এআইটিইউসি থেকে বেরিয়ে এসে ভারতের শ্রমিক আন্দোলনের শ্রেণি সংগ্রামী ধারার মতাদর্শগত সেনানী হিসেবে সিআইটিইউ- এর জন্ম হয়। জন্মলগ্ন থেকে সিআইটিইউ ঐক্য ও সংগ্রামের স্লোগান কে সংগঠনের কেন্দ্রে রেখে পথ চলা শুরু করে। এই ঐক্য ও সংগ্রামের স্লোগান কোনো মনগড়া ভাবনা থেকে আসে নি। শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির লড়াইতে মতাদর্শগত সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা ততদিনে পৃথিবীর বুকে ঐতিহাসিক ভাবে প্রমাণিত হয়ে গেছে। শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রামে সব চেয়ে ঘৃণ্য আক্রমণ- বিশ্বাসঘাতকতাগুলো যে পুঁজিপতিদের দালাল শ্রমজীবী জনতার তথাকথিত নেতার পক্ষ থেকেই আসে, দুনিয়ার শ্রমিক আন্দোলন এ কথা ততদিনে আত্মস্থ করে নিয়েছে। ফলে এই মতাদর্শগত সংগ্রামের অনিবার্য প্রয়োজনীয়তার কথা নতুন সমাজ গঠনের স্বপ্ন ও পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জন্ম নিয়েছিল। কিন্তু ঐক্যের স্লোগান এসেছে আরও গভীর থেকে, এসেছে খাস বস্তুগত পুঁজিবাদী উৎপাদন প্রক্রিয়ার মূল বৈশিষ্ট্য অর্থাৎ পুঁজির কেন্দ্রিভবন ও শ্রমবিভাজনের উপাখ্যান হিসেবে। যে বৈশিষ্ট্যকে পুঁজিবাদী উৎপাদনের মূল কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য হিসেবে মার্কস চিহ্নিত করেছিলেন এবং এর ফলে শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে যে এলিয়েনশন তৈরি হয় তাকেই দায়ী করেছিলেন শোষণমূলক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার গোপন চাবিকাঠি হিসেবে। শ্রম ব্যবস্থায় খণ্ডিত বিভাজিত শ্রমিক নিজের দৈনন্দিন লড়াইয়ের বাইরে তার ঐতিহাসিক দায়িত্ব দেখতে পান না। তাই প্রয়োজন পড়ে ঐক্যেকেন্দ্রের, যে ঐক্যকেন্দ্র মতাদর্শগত সংগ্রামের মাধ্যমে শোষণহীন সমাজ গঠনের লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ হবে। এআইটিইউসি গঠনের ১০০ বছর পেরিয়ে গেছে। গোটা পৃথিবীর উৎপাদন ব্যবস্থায় যুগান্তকারী দ্রুততার সাথে পরিবর্তন ঘটে চলেছে। নয়া উদারবাদী ব্যবস্থার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবে উঠে আসছে উৎপাদন ব্যবস্থার অগুনিত বিভাজন ও বিকেন্দ্রিকরণ। এক গাড়ির ইঞ্জিন তৈরি হতে যে ৪৫০-৫০০ কম্পোনেন্ট লাগে তা আজ তৈরি করে আলাদা আলাদা ছোট বড় ৫০০ কোম্পানি। এরা গাড়ির ব্র্যান্ড কোম্পানির কাছে তাদের কম্পোনেন্ট বিক্রি করতে বাধ্য। গাড়ি কোম্পানি কার্যতঃ শুধু এসেম্বেল করার টেকনোলজি আর বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। এই ৫০০ অ্যানসিলিয়ারি কোম্পানির শ্রমিকদের ঐক্য আর তার সাথে ব্র্যান্ড গাড়ি কোম্পানির শ্রমিকদের যৌথ লড়াইয়ের পরিকল্পনা ছাড়া এক পা ও কার্যকরী ভাবে এগনো যাবে না। আবার গাড়ির কম্পোনেন্ট তৈরির প্রথম স্তরের কাঁচামাল আসে হাজার হাজার অন্য কারখানা থেকে। লড়াইকে টিকিয়ে রাখতে গেলে তাদের জুড়তে হবে গাড়ি কারখানার শ্রমিকদের লড়াইয়ের সাথে। কাজেই উৎপাদন প্রক্রিয়ার মুহুর্মুহু বিকেন্দ্রিকরণ শ্রমিকশ্রেণির ঐক্যের প্রয়োজনকে ইতিহাসের সবচেয়ে জ্বলজ্যান্ত দাবি হিসেবে আজ আমাদের সামনে পেশ করেছে। ঐক্য গড়ার লড়াইয়ের সাথেই গড়ে উঠেছে ঐক্য দূর্বল করার সম্ভাবনা আর তাকে ঘিরে পুঁজিবাদী ষড়যন্ত্র। শ্রমজীবী জনগণের বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক নিপীড়নের প্রতি শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনের জ্ঞান-অজ্ঞানতার অবহেলা থেকে পরিচিতি সত্তার রাজনীতির জন্ম হয়েছে। এই রাজনীতি ও তার থেকে উদ্ভুত সামাজিক শক্তিকে সিংহভাগ ক্ষেত্রে শাসকশ্রেণি ব্যবহার করে চলেছে ব্যবস্থা পরিবর্তনের লড়াইকে দুর্বল করার জন্য। শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনও নতুন করে নিজের ডিসকোর্সে এই সমস্যাগুলোকে সংযোজিত করার চেষ্টা করে চলেছে। এআইটিইউসি গঠন ও এর ক্রমবিভাজনের ইতিহাস আসলে শ্রমিকশ্রেণির মতাদর্শগত সংগ্রামের পথ চলার ইতিহাস। এর উত্তরাধিকার বহন করার যোগ্য হয়ে ওঠার দায়িত্ব আজ আমাদের কাঁধে তুলে নিতে হবে। অর্থনৈতিক রাজনৈতিক সংগ্রামের চালিকাশক্তি মতাদর্শগত সংগ্রাম, যা শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার পথ দেখাবে, সেই সংগ্রামের দায়িত্বের বোঝা নিয়েই আজকের শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলনে ঐক্য ও কেন্দ্রের গুরুত্বকে আমাদের উপলব্ধি করতে হবে। আমাদের মতাদর্শ হলো শ্রেণিবিভক্ত সমাজে শ্রেণি সংগ্রামের মতাদর্শ, তার বাইরে এক পা ও নয়। আমাদের ঐক্য হলো সংগ্রামের ঐক্য, তা ছাড়া আর কোনও আকাঙ্ক্ষা যেন আমাদের না ছুঁয়ে যায়। সব সংগ্রাম ধাবিত হোক শ্রেণি ঐক্যের দিকে, শ্রেণি ঐক্য নিয়ে আসুক শোষণের অবসান - পবিত্রতম স্বপ্নের যাপন সত্য হয়ে উঠুক। প্রকাশের তারিখ: ৩০-অক্টোবর-২০২২ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |