|
পার্টির প্রতিষ্ঠা দিবসসরোজ মুখোপাধ্যায় |
পার্টির প্রতিষ্ঠা দিবসে বিগত বছরগুলির কাজকর্ম ত্রুটি-বিচ্যুতি আলোচনা করে তার থেকে শিক্ষাগ্রহণ আমাদের করতে হবে ঠিকই, কিন্তু পার্টির বিগত দিনের বিরাট সাফল্য যেন আমরা কখনও ছোট করে না দেখি। পার্টির আন্দোলন-সংগ্রামের কোন কোন পর্যায়ে যে সব ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটেছে সেগুলি বর্ণনা ও পর্যালোচনা এমনভাবে পেশ করা উচিত নয়, যাতে মনে হতে পারে যে, আমরা অতীতে যা করেছি সবই ভুল ছিল। এ দৃষ্টিভঙ্গি মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গি নয়। |
এখন থেকে ৬২ বছর পূর্বে ১৯২০ সালের ১৭ই অক্টোবর সোভিয়েত ইউনিয়নের তাসখন্দ শহরের বুকে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা হয়। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র কেন্দ্রীয় কমিটি বিভিন্ন দলিলপত্র, ইতিহাসের বিবরণ অনুশীলন ও পর্যালোচনা করে ১৭ই অক্টোবর তারিখটি কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা দিবস হিসাবে ঘোষণা করেছে। অবশ্য ১৯২১ সালের নভেম্বর মাসে ভারতের অভ্যন্তরে কয়েকজন কমিউনিস্ট বিভিন্ন শহরে কাজ শুরু করেন এবং পরস্পরের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করেন। ভারতের মাটিতে শ্রমিকশ্রেণীর ভাবধারা প্রচার এবং কমিউনিস্ট আন্দোলনের কাজকর্ম শুরু হয় ১৯২১ সালের শেষভাগ থেকে। ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনের সময় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির একটি ইশতেহার প্রকাশিত হয়। এটাই পার্টির নামে প্রকাশিত প্রথম দলিল। বিদেশে থাকাকালে মানবেন্দ্রনাথ রায়ের উদ্যোগে এটি প্রকাশিত হয়। তারপর দশ বছর ধরে পার্টির নামে অনেক হ্যান্ডবিল ও বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে। দু'টি সম্মেলনে অনেক প্রস্তাব ও খসড়া কর্মসূচী আংশিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু ১৯২১ সালের পর ১৯৩৩ সালের ডিসেম্বরে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির কলকাতায় অনুষ্ঠিত সর্বভারতীয় গোপন সম্মেলন থেকেই একটি সুসংবদ্ধ, সুচিন্তিত রাজনৈতিক থিসিস ও কর্মসূচী প্রস্তুত হয়। এর আগে অবশ্য ১৯৩০ সালে পার্টির একটি খসড়া কর্মসূচী (ড্রাফট প্ল্যাটফর্ম অভ অ্যাকশন) ছেপে বিলি করা হয়। ১৯৩৩ সালে গৃহীত দলিলটি কমিউনিস্ট (তৃতীয়) আন্তর্জাতিকের অনুমোদনক্রমে ইনপ্রেকর (ইন্টারন্যাশনাল প্রেস করেসপন্ডেন্স) পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এই সময়েই গ্রেট ব্রিটেন, জার্মানি, চীন প্রভৃতি দেশের কমিউনিস্ট পার্টিগুলি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির উপরোক্ত রাজনৈতিক দলিলটি সম্পর্কে আগ্রহ প্রকাশ করে এবং একটি কেন্দ্রীভূত, সুসংগঠিত সর্বভারতীয় গোপন পার্টি গঠনের জন্য সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দেয়। ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে বিভিন্ন পার্টি সম্মেলনে ও কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে নির্দিষ্ট পরিস্হিতিতে বহু রাজনৈতিক প্রস্তাব ও কর্মধারা গৃহীত হয়েছে। কিন্তু পার্টির সুসংবদ্ধ কর্মসূচী সর্বভারতীয় প্রকাশ্য দ্বিতীয় কংগ্রেসের পরেই মাত্র দীর্ঘ ও বিস্তৃত আলোচনান্তে ১৯৫১ সালের বিশেষ পার্টি সম্মেলনে গৃহীত হয়। এই সময়েই পার্টির কর্মসূচী এবং কর্মনীতি সংক্রান্ত বিবৃতি গৃহীত ও প্রচারিত হয়। তার আরো এক দশক পরে দেশের রাজনৈতিক পরিস্হিতি বিশ্লেষণে ত্রুটি-বিচ্যুতি অতিক্রম করে, ভারতের রাষ্ট্রের চরিত্র সম্পর্কে ভুল বিশ্লেষণের সংশোধন করে এবং মার্কসবাদ-লেনিনবাদের গুরুতর বিচ্যুতিগুলি অতিক্রম করে ১৯৬৪ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত সপ্তম পার্টি কংগ্রেসে সঠিক একটি পার্টি কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়। দীর্ঘ চার দশকের আন্দোলন-সংগ্রাম ও সংগঠনের মূল্যবান অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়ে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি সঠিক মার্কসবাদী পথে যাত্রা শুরু করে। ৬২ বছরের দীর্ঘ শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনের রক্তাক্ত ময়দানে বিচিত্র অভিজ্ঞতা এবং দেশ-বিদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলন সংগ্রাম ও বিভিন্ন দেশের বিপ্লবের শিক্ষণ ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) কে একটি সর্বভারতীয় জাতীয় পার্টিতে পরিণত করেছে। রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) দেশের জনমনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে। মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিশুদ্ধতা রক্ষার সংগ্রামে আমাদের পার্টিকে অবতীর্ণ হতে হয়েছে বারে বারে। শ্রমিক কৃষক মৈত্রীর ভিত্তিতে আপসহীন বৈপ্লবিক সংগ্রামের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা, বুর্জোয়াদের হাত থেকে শ্রমিকশ্রেণীর হাতে ক্ষমতা ছিনিয়ে আনা, সর্বহারার একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্হা গড়ে তোলা, সর্বহারার আন্তর্জাতিকতাবাদে অটল থাকা এবং সর্বোপরি শ্রমিকশ্রেণীর বৈপ্লবিক পার্টি কমিউনিস্ট পার্টিকে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের ভিত্তিতে সুসংগঠিত করে তোলা – এই মূলনীতিগুলিকে নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে বাস্তবে প্রয়োগ করেই আমরা আজ এতদূর এগিয়ে আসতে পেরেছি। দুই পার্টির প্রতিষ্ঠা দিবসে বিগত বছরগুলির কাজকর্ম ত্রুটি-বিচ্যুতি আলোচনা করে তার থেকে শিক্ষাগ্রহণ আমাদের করতে হবে ঠিকই, কিন্তু পার্টির বিগত দিনের বিরাট সাফল্য যেন আমরা কখনও ছোট করে না দেখি। পার্টির আন্দোলন-সংগ্রামের কোন কোন পর্যায়ে যে সব ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটেছে সেগুলি বর্ণনা ও পর্যালোচনা এমনভাবে পেশ করা উচিত নয় যাতে মনে হতে পারে যে, আমরা অতীতে যা করেছি সবই ভুল ছিল। এ দৃষ্টিভঙ্গি মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গি নয়। ত্রুটি-বিচ্যুতির আলোচনা, সমালোচনা এবং সংশোধন সম্পর্কে, লেনিনবাদী নির্দেশগুলি আমাদের সবসময় মনে রাখতে হবে। এ সম্পর্কে কমরেড লেনিনের নির্দেশ হলো : "আমাদের কাজকর্মের নিয়মিত পর্যালোচনা ও সমালোচনা হওয়া প্রয়োজন। পার্টি কমিটি ও সভ্যদের কাজের সমালোচনা ও আত্মসমালোচনা আমাদের পার্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ত্রুটি-বিচ্যুতির সমালোচনা করতে হবে তীব্রভাষায়। বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ও বিষয় সম্পর্কে জনগণের সামনে প্রকাশ্যে সমালোচনা আত্মসমালোচনা করতে হবে। কিন্তু এই সমালোচনা, আত্মসমালোচনার উদ্দেশ্য নয় পার্টি ও আন্দোলনের অগ্রগতি সাফল্যগুলিকে আড়াল করা। এর উদ্দেশ্য হলো ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলিকে সংশোধন করে তাঁর থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও অগ্রগতি ও সাফল্যলাভের পথ উন্মুক্ত করা। বিশ ও ত্রিশের দশকে পার্টি যখন ছোট ছিল তখন কোন কোন ক্ষেত্রে সঙ্কীর্ণতাবাদী চিন্তাধারার প্রকাশ পায়। তারও কতকগুলি বাস্তব কারণ ছিল। তখন কর্মীর সংখ্যা খুবই কম ছিল। তদুপরি ব্রিটিশ শাসকদের নির্মম নিপীড়ন নীতির ফলে কর্মীদের প্রায় সকলকেই বারে বারে কারাবরণ করতে হয়েছে। বারে বারে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হয়েছে। সংগঠনগুলি বারে বারে নেতৃত্বহীন হয়ে পড়েছে। প্রকাশ্য কাজের সুযোগ খুবই কম ছিল। প্রায় সব কাজ গোপনেই করতে হত। তাছাড়া সে যুগের প্রাথমিক কাজ ছিল কমিউনিস্ট ভাবধারাকে ছড়িয়ে দেওয়া। মার্কসবাদী-লেনিনবাদী পুস্তক-পুস্তিকা ও ইশতেহার গোপনে গোপনে প্রচার করা। জাতীয় আন্দোলনের বুর্জোয়া জমিদার শ্রেণীর কর্মধারা ও বিপ্লববাদীদের কর্মধারা – এই দুই আন্দোলনের পাশাপাশি শ্রমিকশ্রেণীর আদর্শবাহী কর্মধারা প্রচার করা ও জনপ্রিয় করে তোলা পার্টির একটি প্রধান কাজ ছিল। তাছাড়া স্মরণ রাখতে হবে যে, শ্রেণীসংগ্রামের ভিত্তিতে শ্রমিক-কৃষকদের গণ-সংগঠন গড়ে তোলা এবং এই আদর্শে সংগ্রাম, আন্দোলন পরিচালনা করা খুবই কঠিন কাজ ছিল। আপসকামী সংস্কারবাদী ট্রেড ইউনিয়নগুলির স্বরূপ প্রকাশ করে দিয়ে সংগ্রামশীল ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন গড়ে তোলার কাজ দুরূহ হলেও তার প্রয়োজন ছিল সমধিক। এই কঠিন পরিস্থিতিতে আন্দোলনের মধ্যে কোথাও একটু সঙ্কীর্ণতাবাদ আবার কোথাও একটু সংস্কারবাদ প্রকট হওয়া স্বাভাবিক ছিল। নেতা ও কর্মীদের অভিজ্ঞতাও ছিল কম। এই সমস্ত বিষয় বিচার করলেই সঠিকভাবে ত্রুটি-বিচ্যুতির বাস্তব পর্যালোচনা করা সম্ভব। সামগ্রিক বিচারের অভাবেই ত্রুটি-বিচ্যুতির পর্যালোচনা একপেশে হয়ে থাকে। এই কারণেই কমরেড স্তালিন এই প্রসঙ্গে বলেছিলেন : "পার্টি ও আন্দোলনের ক্ষেত্রে কোন নির্দিষ্ট প্রশ্ন ও বিশেষ সময়ে খন্ড, আংশিক ও স্থানীয় পর্যালোচনায় যে ত্রুটি-বিচ্যুতি ধরা পড়ে তা অনেক সময় সত্য হয় না। কোন প্রশ্ন বা বিষয়ের পর্যালোচনা সামগ্রিক ও একটা সময়ের পর্যায়কালব্যাপী হওয়া উচিত। তা না হলে আমাদের পর্যালোচনা এবং সমালোচনা মার্কসবাদসম্মত ও বাস্তবানুগ হবে না। ঠিক তেমনি চল্লিশের দশকে পার্টির সংগঠন যখন সারা দেশে বিস্তার লাভ করে, আন্দোলন যখন দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে আমাদের পার্টি যখন সর্বভারতীয় জাতীয় পার্টিতে পরিণত হয় এবং জনগণের সমস্ত অংশের মধ্যে পার্টি ছড়িয়ে পড়ে, তখনই পার্টির মধ্যে সংস্কারবাদের বীজ প্রবেশ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। বাস্তবে আমরা দেখেছি । এই দশকেই পার্টির অভ্যন্তরে সংস্কারবাদী বিচ্যুতি প্রকট হয়। তাই বলে আমরা কোনদিনই বলি না। বলবো না যে, এই যুগে পার্টির সবকিছুই ভুল হয়েছে। বরং এই যুগের বিরাট সাফল্য ও অগ্রগতিকে ভিত্তি করেই পরবর্তী যুগে পার্টি আরও জোর কদমে এগিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। তিন এই প্রসঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা প্রয়োজন। ত্রিশ দশকের শেষে কয়েক হাজার ছাত্র-যুবক কমিউনিস্ট পার্টির নির্দেশে, বিশেষত কমরেড মুজফ্ফর আহমদের পরিচালনায় বাংলার ২৮টি জেলায় শ্রমিক-কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েন। বিপ্লববাদী হিসাবে এই যুবকেরা দীর্ঘদিন কারাগারে ছিলেন। সেখানেই মার্কসবাদ অধ্যয়ন করে তাঁরা কমিউনিস্ট আদর্শ গ্রহণ করেন। এখানে একটি কথা বলা প্রয়োজন যে, এই কয়েক হাজার ছাত্র-যুবকের কারামুক্তি সম্ভব হয়েছিল এ রাজ্যের ছাত্র সংগঠনের ব্যাপক ঐতিহাসিক বন্দীমুক্তি আন্দোলনের ফলে। ১৯৩৭-৩৮ সালে এই প্রদেশে ছাত্র ফেডারেশনের নেতৃত্বে বন্দীমুক্তি আন্দোলন এত ব্যাপক ও তীব্রতা লাভ করেছিল যে, গান্ধীজীকে বাংলায় এসে এ ব্যাপারে সাহায্য ও হস্তক্ষেপ করতে হয়। এই ঐতিহাসিক বন্দীমুক্তি আন্দোলনের ফলশ্রুতি হিসাবে বিনা বিচারে আটক হাজার হাজার যুবকের মুক্তি হয়। দণ্ডিত বন্দীদের আন্দামান থেকে বাংলার জেলে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত হলো। তদানীন্তন ছাত্র ফেডারেশন ছাত্র-যুব সমাজের একমাত্র সংগঠন হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিল। ছাত্র ফেডারেশন ছাড়া ছাত্র-ছাত্রী-যুবদের আর কোন সংগঠনই ছিল না। এদের বন্দীমুক্তি আন্দোলনের সাথে তদানীন্তন বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির বন্দীমুক্তি উপ-সমিতিও আন্তরিকভাবে একযোগে কাজ করেছে। কারামুনে যুব-ছাত্রদের মধ্যে প্রায় দেড় হাজার কর্মী সর্বক্ষণের কর্মী হিসাবে জেলায় জেলায় কমিউনিস্ট পার্টির শ্রমিক-কৃষকের আন্দোলন-সংগ্রামের কাজে নেমে পড়েন। এইভাবে সেই ১৯৩৮-১৯৩৯ সাল থেকেই বাংলাদেশে শ্রমিক-কৃষকের মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টির ভিত গড়ে ওঠে। এই বিষয়টির রাজনৈতিক তাৎপর্য ভুললে চলবে না। তাছাড়া আর একটি কথা হলো সে সময় থেকে কমিউনিস্ট পার্টির একটি কড়া নিয়ম ছিল, যে সব তরুণ কর্মী পার্টিতে আসতেন তাদের প্রত্যেককে ট্রেড ইউনিয়ন অথবা কৃষক সমিতির কোন না কোন সংগঠনের কাজ করতেই হতো প্রত্যেককে শ্রমিক-কৃষকদের সঙ্গে মিশে যেতে হতো। এই নিয়ম নিষ্ঠার সাথে পালিত হয়েছে বলেই বাংলাদেশের প্রত্যেক জেলায় কৃষক সমিতি এবং শিল্পাঞ্চলে বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে উঠেছে। অনেকগুলি বড় বড় কৃষক আন্দোলন এবং শ্রমিক আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে। আর একটি বৈশিষ্ট্য হলো : পার্টির তরুণ কর্মীরা ও গণসংগঠনগুলি প্রদেশের প্রত্যেকটি সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে। স্বাধীনতা আন্দোলনে আপোসহীন সংগ্রামী অংশের সাথে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছে। এককথায় প্রত্যেকটি গণ-আন্দোলন ও সংগ্রামের পুরোভাগে থেকেছে। সে যুগের কাজের তৃতীয় বৈশিষ্ট্য হলো : শ্রমিক-কৃষকদের সংগঠন ও আন্দোলন গড়ে তোলার সাথে সাথে সুপরিকল্পিতভাবে মধ্যবিত্ত কর্মচারীদের সংগঠন ও আন্দোলন গড়ে তোলা হয়েছে। তাছাড়া এই সময়েই শ্রমিক-কৃষক, ছাত্র-যুবদের গণসংগঠন গড়ে তোলার সাথে সাথে মহিলা, শিল্পী, বুদ্ধিজীবী প্রভৃতি সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সংগঠন গড়ে তোলা হয় এবং তাদের আন্দোলনে শামিল করা হয়। আমাদের রাজ্যে পার্টির কাজের এই বিশিষ্ট ধারাগুলি অব্যাহত থাকে। পার্টিকে মার্কসবাদ লেনিনবাদের মূলনীতিতে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত রাখার সংগ্রামের সাথে সাথে শ্রমিক-কৃষক ও অন্যান্য জনগণের আন্দোলন শক্তিশালী করার মৌলিক নীতিগুলি অনুসরণের ফলেই পরবর্তীকালে আমাদের পার্টির আরও অগ্রগতি ঘটেছে এবং এ রাজ্যে আমাদের বর্তমানের সাফল্য সম্ভব হয়েছে। চার বিগত ছয় দশক ধরে কমিউনিস্ট পার্টিকে বিভিন্ন পরিস্হিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে।পরিস্হিতির জটিলতার সামনে নানা রাজনৈতিক প্রশ্নে ও জনগণের জীবনসংগ্রামে অংশগ্রহণের জন্য সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। প্রথম দুই দশক পার্টিকে সম্পূর্ণ বে-আইনীভাবে কাজ করতে হয়েছে। পরবর্তী চার দশকে পার্টি আইনসম্মতভাবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছে। যদিও এরই মাঝে ১৯৪৮ সাল থেকে আবার আড়াই বছর কংগ্রেসী সরকার পার্টিকে বেআইনী করে রাখে। যাই হোক, সব সময়ই পার্টি গোপন কাজের সাথে প্রকাশ্য কাজের সমন্বয়সাধনের প্রচেষ্টা চালিয়ে এসেছে। স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর কেন্দ্রীয় কংগ্রেসী শাসনের আমলে কমিউনিস্ট ও শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনের উপর দমন-পীড়ন একইভাবে চলতে থাকে। এমন কী নিপীড়নের মাত্রা কোন কোন ক্ষেত্রে ও সময়ে ব্রিটিশ আমলের অত্যাচারকেও ছাড়িয়ে যায়। ইতিহাস প্রমাণ করে দিয়েছে, দমন-পীড়ন-নিপীড়ন ব্রিটিশ আমলেই হোক, আর কংগ্রেস আমলেই হোক ভারতে কমিউনিস্ট আন্দোলনের অগ্রগতি কেউ রুদ্ধ করতে পারে নি। এই ছয় দশকের প্রতিটি দশকেই কমিউনিস্ট পার্টির আন্দোলন ও সংগঠনের একটি করে বিশেষ সাফল্য অর্জিত হয়েছে – এই গুলি আমরা পার্টির প্রতিষ্ঠা দিবসে স্মরণ করতে চাই। প্রত্যেক দশকের ত্রুটি-বিচ্যুতি, শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনের অগ্রগতির বিবরণ অথবা বিভিন্ন সময়ের বড় বড় আন্দোলনগুলির প্রসঙ্গ তুলছি না। বিভিন্ন দশকের যে মূল সাফল্যটির উপর ভিত্তি করে পরবর্তী পর্যায়ের অগ্রগতি ও নতুন নতুন সাফল্য সম্ভব। হয়েছে সেগুলিরই এখানে উল্লেখ করা হচ্ছে। পার্টি গঠনের প্রথম দশকের অর্থাৎ বিশের দশকের বড় অবদান হলো : ভারতের অভ্যন্তরে বিভিন্ন প্রদেশের বিভিন্ন কমিউনিস্ট গ্রুপগুলি গঠন করা এবং তাদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করে সর্বভারতীয় একটি পার্টি গঠনের প্রয়াস চালিয়ে যাওয়া, বিভিন্ন প্রদেশে কমিউনিস্ট ভাবধারার প্রচার, কমিউনিস্টদের শ্রমিক কৃষক আন্দোলনে প্রবেশ, জাতীয় কংগ্রেসের আন্দোলনে পূর্ণ স্বাধীনতার আওয়াজ তোলা। কমিউনিস্ট ও গণসংগঠনগুলির প্রাথমিক সাংগঠনিক রূপ দেবার কাজে নিযুক্ত থাকার জন্য বারে বারে স্বল্পসংখ্যক নেতা ও কর্মীদের ব্রিটিশের কারাগারে নির্যাতন ভোগ করতে হয়। এই দশকের দিকচিহ্ন হলো, সারা ভারতের প্রান্তে প্রান্তে কমিউনিস্ট পার্টির প্রাণ প্রতিষ্ঠা। পার্টি প্রতিষ্ঠার দ্বিতীয় দশকে অর্থাৎ ত্রিশের দশকের দিকচিহ্ন হলো ভারতে একটি সর্বভারতীয় কেন্দ্রীভূত সুসংগঠিত ও গোপন কমিউনিষ্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা ও সুসংবদ্ধ কর্মসূচী ও রাজনৈতিক থিসিস গ্রহণ। এই দশকে বিভিন্ন প্রদেশে ট্রেড ইউনিয়ন, কৃষক ও ছাত্র সংগঠন গড়ে উঠেছে, জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে পার্টি ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করেছে, সোস্যালিস্ট ও বামপন্হীদের সাথে যুক্তফ্রন্ট গঠন করেছে (লেফট কনসোলিডেশন কমিটি) এবং বিভিন্ন প্রদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষত বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে উঠেছে। এই দশকেই কমিউনিস্টদের ব্যাপকভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং পার্টি ও গণ-সংগঠনগুলিকে বে-আইনী ঘোষণা করা হয়েছে। ব্রিটিশের অত্যাচার ও নিপীড়ন তুচ্ছ করে পার্টি কর্মীরা বে-আইনী ও গোপন অবস্থায় কাজ করার পদ্ধতি শিখেছেন। তাঁদের দীর্ঘদিনের এই কাজের ফলশ্রুতি হিসাবে ১৯৩৬-৩৯ সালে পার্টি সর্বত্র কেবল ছড়িয়ে পড়েছিল তাই নয়, এই সময়ে কেন্দ্রীয়ভাবে ‘ন্যাশনাল ফ্রন্ট’ সাপ্তাহিক প্রকাশিত হয়। গোপনে দি কমিউনিস্ট ছাড়াও প্রকাশ্যে ন্যাশনাল ফ্রন্ট সর্বভারতীয় পার্টিকে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল। পার্টি গঠনের তৃতীয় দশকের অর্থাৎ চল্লিশের দশকের প্রধান সাফল্য হলো, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিকে জনগণের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের গণসংগঠনগুলি গড়ে তোলা। এই যুগেই ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি একটি সর্বভারতীয় জাতীয় রাজনৈতিক সংগঠন হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করে। গোপন অবস্থা থেকে পার্টি প্রকাশ্যে বেরিয়ে আসে। বিভিন্ন স্তরের জনগণের মধ্যে আন্দোলন-সংগ্রাম দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এই দশকটি ছিল ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে অগ্নিগর্ভ দশক। নৌবাহিনীর বিদ্রোহ, বিভিন্ন স্তরে সশস্ত্র সংগ্রাম, ১৯৪৬-এর ২৯শে জুলাইয়ের সাধারণ ধর্মঘট, বাংলার রক্তাক্ত তেভাগা, সংগ্রাম ময়মনসিংয়ের টংক প্রথার বিরুদ্ধে অবিস্মরণীয় হাজং কৃষকের লড়াই, বিভিন্ন প্রদেশে দেশীয় নৃপতিদের বিরুদ্ধে রক্তাক্ত প্রজা আন্দোলন, মালাবারের কৃষক বিদ্রোহ ও কাইয়ুরের রক্তাক্ত সংগ্রাম, ভিয়েতনাম আই এন এ প্রভৃতি প্রশ্নে তরুণ যুবকদের মরণজয়ী সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী অভিযান নয়া উপনিবেশবাদ ও নতুন যুদ্ধ চক্রান্তের বিরুদ্ধে ব্যাপক সমাবেশ এবং এই দশকের শেষপ্রান্তে তেলেঙ্গানা কাকদ্বীপ প্রভৃতি স্থানে বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম এগুলিই এই দশকের সংগ্রামী দিক্চিহ্ন। এই অগ্নিগর্ভ পরিস্হিতির পাশাপাশি দেখা দিয়েছিল সাম্রাজ্যবাদী প্রতিক্রিয়াশীল বিভেদকামী চক্রান্তের পরিণতিতে বাংলা ও অন্যান্য প্রদেশে ভয়াবহ হিন্দু মুসলমান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। এর বিরুদ্ধে কলকাতা ও অন্যত্র দেশপ্রেমিক নরনারীরা গর্জে উঠেছিলেন। কলকাতার অবিস্মরণীয় শান্তি মিছিল বিভেদপন্থীদের চক্রান্ত পরাস্ত করেছিল। ব্রিটিশ সম্রাজ্যবাদ দেশকে দু'টুকরো করলো, কিন্তু ভারতের স্বাধীনতা ঠেকাতে পারেনি। ভারত সাম্রাজ্যবাদী শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হলো। কংগ্রেস হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা পাবার পর এই দশকের শেষে কমিউনিস্ট পার্টিকে বে-আইনী করল। এই দশকের শুরুতে কমিউনিস্টরা সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী ঝোঁকের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে শ্রমিকশ্রেণীর আন্তর্জাতিকতাবাদের পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছিল। পার্টি গঠনের চতুর্থ দশকে অর্থাৎ পঞ্চাশের দশকে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি পুনরায় প্রকাশ্যে চলে আসে এবং নতুন উদ্যমে নতুন কর্মসূচী নিয়ে কাজ শুরু করে। এই সময় কমরেড স্তালিন ও তার সহকর্মীরা গোপনে আমাদের পার্টির চারজন নেতৃস্থানীয় প্রতিনিধির সাথে দীর্ঘ রাজনৈতিক আলোচনা চালিয়ে আমাদের কাজকর্ম সম্পর্কে মূল্যবান পরামর্শ দিয়েছিলেন। এরপরই আমাদের পার্টির কর্মসূচী ও কৌশলগত লাইন তৈরি করে। তারই ভিত্তিতে কাজ চলে। পরবর্তীকালে অভিজ্ঞতার ফলে কর্মসূচীর কিছু কিছু বিষয় সংশোধন করা হয়। এই যুগে কংগ্রেস শাসনের জনবিরোধী নীতিগুলির বিরুদ্ধে শ্রমিক-কৃষক ও মেহনতী জনগণের বিভিন্ন অংশের সংগ্রাম দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে। সংগ্রাম ও আন্দোলনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে স্বাধীন ভারতে কংগ্রেস পরিচালিত রাষ্ট্রের চরিত্র পরিষ্কার হতে থাকে। এই যুগেই কংগ্রেসকে নির্বাচনে পরাস্ত করে কেরালায় কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে রাজা সরকারের প্রতিষ্ঠা হয়। রাষ্ট্রের চরিত্র ও বিপ্লবের স্তর সম্পর্কে পার্টির মধ্যে অভ্যন্তরীণ মতাদর্শগত সংগ্রাম শুরু হয়। আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের ক্ষেত্রে সংশোধনবাদ ও স্তালিন-বিরোধী অভিযান মাথা চাড়া দেয়। এই বিষয়েও পার্টির মধ্যে চলে তীব্র অভ্যন্তরীণ লড়াই। এই যুগের প্রথম থেকেই অর্থাৎ ১৯৫১ সাল থেকে আমাদের রাজ্যে যুক্তফ্রন্ট গঠনের কাজ শুরু হয়। এটা ছিল শোষণকারীদের স্বার্থবাহী কংগ্রেসী সরকারের বিরুদ্ধে জনস্বার্থবাহী গণতান্ত্রিক সংগঠনগুলির যুক্ত মোর্চা। এই যুক্তফ্রন্টের পরিচালনায় জনগণের বিভিন্ন জীবন-সমস্যা নিয়ে তীব্র সংগ্রাম চলেছে। কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে - জনগণের লাগাতার সংগ্রাম ও পার্টির মধ্যে মতাদর্শের লড়াই এ যুগের দিকচিহ্ন বহন করছে। পার্টি গঠনের পঞ্চম দশকে অর্থাৎ ষাটের দশকের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, বিগত দশকের মতাদর্শগত লড়াইয়ের পরিণতিতে পার্টির মধ্যে মার্কসবাদ ও লেনিনবাদের বিজয় পতাকা উড্ডীন করা। সংশোধনবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিজয়ী কমিউনিস্ট পার্টি মার্কসবাদী পার্টিরূপে আত্মপ্রকাশ করে। ভারতীয় রাষ্ট্রের সঠিক শ্রেণী চরিত্র ও বিপ্লবের স্তর সম্পর্কে বিশ্লেষণের ভিত্তিতে পার্টি নতুন কর্মসূচী গ্রহণ করে কাজে অগ্রসর হওয়াটাই এ যুগের প্রধান দিক্চিহ্ন। নতুন কর্মসূচীর ভিত্তিতে কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র মধ্যে নবজীবনের সঞ্চার হয়। দিকে দিকে আন্দোলন-সংগ্রাম ছড়িয়ে পড়ে। এই সমস্ত সংগ্রামের শীর্ষে প্রতিষ্ঠিত হয় এরাজ্যে যুক্তফ্রন্ট সরকার। অন্যান্য রাজ্যেও কংগ্রেসকে নির্বাচনে পরাজয় বরণ করতে হয় এবং কয়েকটি রাজ্যে অ-কংগ্রেসী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এই দশকেই আবার পার্টিকে লড়াই করতে হয় সঙ্কীর্ণতাবাদের বিরুদ্ধে। বিভিন্ন রাজ্যে নকশালপন্থীদের বিরুদ্ধে পার্টিকে সংগ্রাম চালাতে হয়। ১৯৬৮ সালে পুনরায় মতাদর্শগত সংগ্রাম চালিয়ে পার্টি প্লেনাম সঠিক মার্কসবাদী-লেনিনবাদী নীতি গ্রহণ করে। পার্টির শক্তিবৃদ্ধি ও অগ্রগতি অব্যাহত থাকে। পার্টি গঠনের ষষ্ঠ দশকে অর্থাৎ সত্তর দশকে সংশোধনবাদ ও সঙ্কীর্ণতাবাদী বিবৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং মার্কসবাদ ও লেনিনবাদের পতাকা উচ্চে তুলে ধরে কংগ্রেসী শাসকদের আধা-ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাস এবং নকশালপন্থী ও গ্রাম-শহরের কায়েমী স্বার্থবাদীদের সশস্ত্র আক্রমণের মোকাবিলা করতে হয় পার্টিকে। এদের আক্রমণের চরম প্রকাশ ঘটে আমাদের রাজ্যেই। কেরালা ও অন্ধ্র ও অন্যান্য রাজ্যেও আমাদের পার্টির অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে এই দশকে এগারো'শ জন কমরেডকে আমাদের হারাতে হয়েছে। হাজার হাজার পার্টি পরিবারকে অবর্ণনীয় অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে। কারা-লাঞ্ছনা, খুন নির্যাতনের এক ভয়াবহ আধা ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাসের সফল মোকাবিলার মধ্য দিয়ে এখানে পার্টির জনপ্রিয়তা শতগুণ বৃদ্ধি পায়। এই লড়াইয়ের তরঙ্গ শীর্ষে প্রতিষ্ঠিত হয় পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকার। আধা ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ লড়াই এবং বিধানসভা, পঞ্চায়েত ও মিউনিসিপ্যাল নির্বাচনের মাধ্যমে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন এই যুগের দিক্চিহ্ন। এই লড়াই ও অগ্রগতি অব্যাহত রয়েছে বর্তমান দশকেও। বাষট্টি বছরের এই সাফল্য ও অগ্রগতিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। সারা ভারতে আমাদের পার্টির অগ্রগতির সহায়ক শক্তি পশ্চিমবঙ্গের পার্টির অবদান ও কার্যকলাপ। সারা ভারতের জনগণকে প্রেরণা জোগাবার মত যোগ্যতা আমাদের অর্জন করতেই হবে। স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের লড়াইয়ে, সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ চক্রান্তের বিরুদ্ধে শান্তির অভিযানে, শ্রমিক-কৃষক-মেহনতী জনগণের জীবন-জীবিকার দাবির সংগ্রামে এ রাজ্যের পার্টিকে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। পশ্চিমবঙ্গের পার্টির উপর গুরুদায়িত্ব বর্তেছে। সরকারি প্রশাসন, পৌর প্রশাসন ও পঞ্চায়েতের কর্মতৎপরতা নিষ্ঠার সাথে সুষ্ঠুভাবে পালন করতে হবে। সীমাবদ্ধ ক্ষমতা সম্বল করে, আমলাতান্ত্রিক বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে সদা জাগ্রত থেকে মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ও কর্মীবাহিনীকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। এই এগিয়ে যাবার মধ্য দিয়েই দেশ ও জনগণের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ সৃষ্টি করতে হবে। এটাই হবে পার্টির প্রতিষ্ঠা দিবসের শপথ। সরোজ মুখার্জি, নির্বাচিত রচনা, ১ম খণ্ড, কোলকাতা: এন.বি.এ. প্রাঃ লিঃ, ১৯৯০ থেকে পুনর্মুদ্রিত প্রকাশের তারিখ: ১৭-অক্টোবর-২০২২ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |