|
||||||||||
মুক্ত করো প্যালেস্তাইনসমন্বয় রাহা |
||||||||||
সেই প্রথম ১৯৯৩-এর ১৩ সেপ্টেম্বর পিএলও নেতা আরাফত এবং ইজরায়েল প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে চুক্তি হয়। ইজরায়েল প্রশাসন প্যালেস্তিনীয়দের মুখপাত্র হিসেবে পিএলও-কে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। ওয়েস্ট ব্যাংক, গাজা অঞ্চলে স্বাধীন প্রশাসন চালানোর স্বাধীনতা আদায় করে পিএলও। প্যালেস্তিনীয়দের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান এবং করকাঠামো তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়। চুক্তি অনুযায়ী গাজা, ওয়েস্ট ব্যাংক অঞ্চল থেকে ইজরায়েল তার সেনা প্রত্যাহার করবে, ঠিক হয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে এই অসলো চুক্তি ছিল একটি বিপর্যয়কর সিদ্ধান্ত। |
||||||||||
১৯৯০-এর ২৮ মার্চের সকাল। দমদম এয়ারপোর্টে থিকথিকে ভীড় জমেছে। সকাল ৮টা নাগাদ মাথা থেকে ঘাড় অব্দি ঝোলানো ‘কেফিয়া’ পরে এরোপ্লেন থেকে বেড়িয়ে এলেন ৫ ফুট উচ্চতার এক মানুষ। কোমড়ে ঝোলানো পিস্তল। মুখের কোণে লেগে আছে হাসি। গোটা কলকাতা মুগ্ধ। একজন যোদ্ধার আবির্ভাব হয়েছে যেন! এমন এক যোদ্ধা যিনি নিজের মাতৃভূমি রক্ষার লড়াই করে চলেছেন। কখন যে একটা মিসাইল এসে শেষ করে দেবে তাঁকে, নিজেও জানেন না। তখন এ-রাজ্যে বামফ্রন্ট সরকার। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু। গোটা কলকাতা উপচে পড়েছে। অভ্যর্থনা জানালো এই বাংলা সেই যোদ্ধাকে।৫ ফুটের কেফিয়া চড়ানো সেই যোদ্ধা প্যালেস্তাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের সর্বাধিনায়ক ইয়াশের আরাফত। এই ছিল আমাদের দেশ, রাজ্যের রাজনীতি। চিরকাল দুনিয়ার মুক্তিকামী মানুষ যাঁরা স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছেন, তাঁদের পক্ষে থাকতো আমার দেশ। প্যালেস্তাইনের প্রশ্নেও কোনও ব্যতিক্রম ছিল হয়নি। প্যালেস্তাইনের লড়াই এবং সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনকে অনুভব করতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন দুনিয়ায়। তখনকার সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলোর অবস্থান, আমাদের বিবেচনার মধ্যে রাখতে হবে। বেলফোর ঘোষণা তৎকালীন সময়ে ঔপনিবেশিক-সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ব্রিটেন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অন্যতম উপনিবেশ ছিল ভারতীয় উপমহাদেশ। যার মাধ্যমে এশিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব অংশে সে তার নিজস্ব বাজার প্রতিষ্ঠিত করেছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য তখনও তার সরাসরি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ছিল না। এমতাবস্থায় ব্রিটিশ শাসকেরা মধ্য প্রাচ্যে নিজের জমি তৈরির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। সে-সময়ে অসংখ্য ইহুদির সমর্থন আদায়ের জন্য তারা সচেষ্ট হয়। ১৯১৭-এর ২ নভেম্বর ব্রিটিশ বিদেশ সচিব আর্থার ব্যলফোর চিঠি দেন লর্ড রথশিল্ডকে। চিঠির মূল বক্তব্যই ছিল ইহুদিদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র তৈরি করতে হবে। এবং এই রাষ্ট্র তৈরি হবে প্যালেস্তাইন ভূখণ্ডে। যে-প্রকল্প পরবর্তীকালে পরিচিত হয় ‘বেলফোর ডিক্লারেশন’ নামে। যে-প্রকল্প প্রতিষ্ঠা দেয় ধর্মের ভিত্তিতে জমি ভাগ করে রাষ্ট্র তৈরির ভাবনাকে। এবং উৎসাহ জোগায় উগ্র জায়নবাদী মতাদর্শকে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ভারত উপমহাদেশে ঠিক যে-ভাবে দেশভাগের মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতের জন্ম দিয়েছিল। ঠিক তেমনভাবেই প্যালেস্তাইন ভূখণ্ডে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতের জন্ম দেয়, যার থেকে আজও রক্তপাত হয়ে চলেছে। ইহুদি অনুপ্রবেশ বিভিন্ন সময়ে পরিকল্পনা করে, সংগঠিতভাবে প্যালেস্তাইন ভূখণ্ডে ইহুদি অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে ধর্মীয় উন্মাদনা তৈরির কাজ হয়েছে। আমরা যদি ১৯১৭ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল অব্দি ইহুদি জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার শতাংশের বিচারে দেখি তাহলে খানিক বুঝতে সুবিধা হতে পারে।
সূত্র- হান্ড্রেড ইয়ার্স ওয়ার অন প্যালেস্তাইন, রাশিদ খালিদি। সেটলার কলোনি ভেবে দেখুন মাত্র তিন দশক আগে যখন ব্যলফোর ঘোষণা হচ্ছে, তখন যে ইহুদি জনসংখ্যা প্যালেস্তাইন ভূখণ্ডের মূল জনসংখ্যার ৬% ছিল, সেই সংখ্যাই ১৯৪৭ সালে ইজরায়েল প্রস্তাবের সময় ৩৩%-তে পৌঁছায়। এখান থেকেই পরিষ্কার ওই ভূখণ্ডে সুপরিকল্পিতভাবে এবং সংগঠিতভাবেই ইহুদি অনুপ্রবেশ ঘটানো হয়েছিল। যত আগ্রাসন বাড়ানো যাবে, তত বেশি ভূখণ্ড দখল করা যাবে, এই হল মনোভাব। যার ফলস্বরূপ বর্তমানে প্যালেস্তাইন ভূখণ্ড পৃথিবীর একমাত্র ‘সেটলার কলোনি’তে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ যে-কলোনি তৈরির কাজ প্রতি মুহূর্তে বর্তমান। যে কলোনির আয়তন প্রতি মুহূর্তে বাড়ছে। প্যালেস্তাইন এবং মহাত্মা গান্ধী আমাদের দেশে স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে যুক্ত নেতারা প্রথম থেকেই এই আগ্রাসনের বিরোধিতা করে এসেছে। স্বাধীনতা আন্দোলন চলাকালীন কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি একাধিকবার প্যালেস্তাইনে ব্রিটিশ আগ্রাসনের বিরোধিতা করেছে। এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য মহাত্মা গান্ধীর বক্তব্য। ১৯৩৬ সালের ২৬ নভেম্বর হরিজন পত্রিকায় ‘দ্য জিউজ ইন প্যালেস্তাইন’ প্রবন্ধ লেখেন। তিনি পরিষ্কার করে বলেন দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকার সময় তাঁর বহু ইহুদির সাথে পরিচয় হয়েছিল। তার মধ্যে অনেকেই তাঁর আজীবনের বন্ধুও হয়ে উঠেছেন। তিনি সেই প্রবন্ধে জার্মানী তে হিটলারের তীব্র ইহুদি বিদ্বেষ এবং তাদের হত্যার ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান। আবার একই সাথে তিনি জানান, যেমন ফ্রান্স ফরাসিদের, ইংল্যান্ড ইংরেজদের, ঠিক তেমনই প্যালেস্তাইন আরবদের। ১৯৪৭ প্যালেস্তাইন ভাগ প্রস্তাব ১৯৪৭ সালের ২৯ নভেম্বর প্যালেস্তাইনকে ভাঙার প্রস্তাব নেওয়া হয়েছিল ইউএনও-তে। অপর দিকে এই প্রথম আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র তৈরির প্রস্তাব নেওয়া হয়। সদ্যোজাত স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ভারত ইউএনও-তে, প্যালেস্তাইন ভাগ প্রস্তাবের সরাসরি বিরোধিতা করে। ১৯৪৮ নাকবা ১৯৪৭ সালের শেষের দিকে প্যালেস্তাইন ভূখণ্ড ভাঙার প্রস্তাব ইউএনও-তে নেওয়ার পরে শুরু হয় ব্যাপক আগ্রসন। এই সময়কালে সাম্রাজ্যবাদী নির্মম আগ্রাসন নেমে এসেছে গোটা আরব ভূখণ্ডে। ১৯৪৮ সালে আরব ইজরায়েল যুদ্ধের সময় ৭ লক্ষ ৫০ হাজারেরও বেশি প্যালেস্তিনীয় নিজের ঘর-বাড়ি থেকে থেকে বিতাড়িত হন। প্রায় ৫০০-র বেশি গ্রাম ধ্বংস হয়। এই বছরই ১৪ মে ইজরায়েল নিজেকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করলে, ঠিক তার পরেরদিন ১৫ মে ‘নাকবা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেন লক্ষ লক্ষ প্যালেস্তিনীয় । ‘নাকবা’ একটি আরবি শব্দ। যার বাংলা মানে বিপর্যয়। ওখানকার মানুষ এই আগ্রসনের ফলাফলকে বিপর্যয় হিসেবে মনে রেখেছে। ১৯৬৭-র যুদ্ধ ১৯৬৭ সালে ইজরায়েল আরব ভূখণ্ডে মিসাইল আক্রমণ শুরু করে। যে-যুদ্ধ প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চলেছিল। এই যুদ্ধকালীন সময়ে শুরু হয় আরও আগ্রাসন। এই সময়কালে ওয়েস্ট ব্যাংক, গাজা স্ট্রিপ এবং পূর্ব জেরুজালেম দখল করে ইজরায়েল। এযাবৎ কালে এরকম বৃহৎ আকারের আগ্রাসন প্রথম। পিএলও গঠন ১৯৬৭-র যুদ্ধের পরই আরব রাষ্ট্রগুলোর যৌথ সক্রিয়তায় তৈরি হয় প্যালেস্তাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও)। যার মূল উদ্দেশ্য ছিল ‘মুক্ত প্যালেস্তাইন’। ফতাহ্ নামের প্যালেস্তিনীয়দের গোষ্ঠী ১৯৬৭-র যুদ্ধের সময়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল, যার নেতা ছিলেন আরাফত। ১৯৬৯ সালে আরাফত এই সংগঠনের প্রধান হয়ে ওঠেন। তখন থেকে এই সংগঠন আরও তীব্রভাবে মুক্ত প্যালেস্তাইন ভূখণ্ডের দাবিতে লড়াই শুরু করে। সংগঠন আসতে আসতে গেরিলা কায়দায় লড়াই শুরু করে। পরবর্তীকালে ১৯৭৪ সালে আন্তর্জাতিক মহলে পিএলও স্বীকৃতি অর্জন করে। আসতে আসতে গেরিলা কায়দার সাথে সাথে কুটনৈতিক রাজনীতির পথও গ্রহণ করেন আরাফত। এই সময়কালে তিনি ইউএনও-তে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরেন। ১৯৭৪-এর ১৩ নভেম্বর ইউএনও-র সেই বিখ্যাত ভাষণে তিনি তুলে ধরেন প্যালেস্তিনীয়দের মাতৃভূমির অধিকারের কথা। প্যালেস্তাইনের সার্বভৌমত্বের কথা। পশ্চিমি দুনিয়া যখন তাঁদের লড়াইকে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ হিসেবে ব্যাখ্যা করতে ব্যস্ত! তখন তিনি বলেন এই লড়াই নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই। তাই তাঁরা হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছেন। উগ্র জায়নবাদী রাজনীতির তীব্র বিরোধিতা করে, স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবি তুলে ধরেন। এই বক্তৃতার মাঝেই তাঁর বিখ্যাত উক্তি, ‘I have come bearing an olive branch and a freedom fighter’s gun. Do not let the olive branch fall from my hand.’ এই লড়াইকে তিনি হো-চি-মিন, নেলসন ম্যান্ডেলা-র লড়াইয়ের সাথে সম্পৃক্ত করে দেখান। এরপরই ইউএনও প্যালেস্তিনীয়দের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়। এই লড়াই একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের লড়াই থেকে আন্তর্জাতিক চরিত্র লাভ করে। গড়ে ওঠে আন্তর্জাতিক সংহতি। ৮০-র দশকের সময় জুড়ে আরাফতের নেতৃত্বেই গড়ে ওঠে শক্তিশালী আন্দোলন। যাকে আরব দুনিয়া ‘ইন্তিফাদা’ অর্থাৎ বিদ্রোহ হিসেবে চিহ্নিত করে এসেছে। অসলো চুক্তি প্যালেস্তিনীয়দের মধ্যে যখন মুক্তি সংগ্রামের জোর ক্রমবর্ধমান। যখন ঝাঁঝ বাড়ছে তাদের লড়াইয়ের। সেই সময় ইজরায়েল মূলত মার্কিন মুলুকের সহযোগিতায় আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়। সেই প্রথম ১৯৯৩-এর ১৩ সেপ্টেম্বর পিএলও নেতা আরাফত এবং ইজরায়েল প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে চুক্তি হয়। ইজরায়েল প্রশাসন প্যালেস্তিনীয়দের মুখপাত্র হিসেবে পিএলও-কে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। ওয়েস্ট ব্যাংক, গাজা অঞ্চলে স্বাধীন প্রশাসন চালানোর স্বাধীনতা আদায় করে পিএলও। প্যালেস্তিনীয়দের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান এবং করকাঠামো তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়। চুক্তি অনুযায়ী গাজা, ওয়েস্ট ব্যাংক অঞ্চল থেকে ইজরায়েল তার সেনা প্রত্যাহার করবে, ঠিক হয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে এই অসলো চুক্তি ছিল একটি বিপর্যয়কর সিদ্ধান্ত। যার ফলে ইজরায়েল প্যালেস্তাইন ভূখণ্ডে সরকারিভাবে কর্তৃত্ব ফলানোর জায়গা পায়। এরপরেও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মদতে থাকা ইজরায়েল প্রশাসন তার আগ্রাসন কমায়নি, বরং আরও উত্তরোত্তর বেড়েছে সেই আগ্রাসন। হামাসের শক্তিবৃদ্ধি ১৯৮৭র ডিসেম্বর মাসে খাতায় কলমে হামাসের সৃষ্টি। তারা প্রাথমিকভাবে পিএলও-র রাজনীতি থেকে আলাদা ছিল। শুরুর দিকে তারা পিএলও-র ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির বিরোধিতাই করত। ৮৮-র হামাস চার্টারে সেরকমই মনোভাব ফুটে উঠেছে। তারা ভরসা রাখত শুধুমাত্র মুসলিম জিহাদের উপরে। অসলো চুক্তির পরবর্তী সময়ে ইজরায়েলীয় আগ্রাসনকে পিএলও আটকাতে না-পারায় হামাসের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। তাদের শক্তি বৃদ্ধি পায় গাজা অঞ্চলে। বহু প্যালেস্তিনীয় তাদের সাথে যুক্ত হয়। একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে অপারেশন ‘ডিফেন্সিভ শিল্ড’ নামে ইজরায়েলি আগ্রাসনের সময়ে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। যা দ্বিতীয় ইন্তিফাদা নামে পরিচিত। এই সময়ে হামাস ব্যাপক জনভিত্তি গড়ে তোলে প্যালেস্তিনীয়দের মধ্যে। ২০০৬-র নির্বাচনে হামাস সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। পরবর্তীকাল থেকে গাজার প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করছে হামাস। ২০১৭ সাল নাগাদ হামাস নিজের রাজনীতিতে পরিবর্তন আনে। তারা প্রাথমিকভাবে যে-রকম ইসলামিক জিহাদে বিশ্বাস করত। অন্য ধর্মের প্রতি তাদের যে দৃষ্টিভঙ্গি ছিল প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে তারও পরিবর্তন ঘটে। হামাস বর্তমানে ঘোষিতভাবে মুসলিম রাষ্ট্র তৈরির পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক লগ্নি পুঁজি নিয়ন্ত্রিত কর্পোরেট মিডিয়া হামাসকে তবুও ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদী হিসেবে প্রচার করলেও, আদতে তা সত্য নয়। জায়নবাদ এবং হিন্দুত্ব ইহুদি এবং খ্রিস্ট ধর্মের মধ্যে দ্বন্দ্ব অনেক পুরোনো। খ্রিস্ট ধর্ম মতে ইহুদিদের হাতেই জেরুজালেমে খুন হয়েছিলেন যিশু খ্রিস্ট। এই মনোভাবকে কেন্দ্র করে ইওরোপে বিভিন্ন সময়ে ইহুদিদের প্রতি বিদ্বেষমূলক আচরণ এবং প্রচার সংঘটিত হয়েছে। যা উলটো দিকে ইহুদি জাতীয়তাবাদী মনোভাব তৈরিতে সাহায্য করে। যা পরবর্তীতে জায়নবাদী মতাদর্শ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে ১৮৯৭ সালে অস্ট্রো-হাঙ্গেরির ইহুদি সাংবাদিক থিওডর হার্জল সুইজারল্যান্ডের বাসেল শহরে জায়নিস্ট কংগ্রেসের ডাক দেন। তিনিই প্রথম ‘জায়নিজম’ শব্দটি ব্যবহার করেন। পরবর্তী কালে নিজের বই The Jewish State-এ ইহুদিদের জন্য পৃথক রাষ্ট্রের দাবি জানিয়ে, প্যালেস্তাইন ভূখণ্ডেই পৃথক ইহুদি রাষ্ট্র গড়ে তোলার ডাক দেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের কারণ হিসেবে ইহুদি সমাজকে দায়ী করে জার্মান প্রশাসন। তাদের বক্তব্য ছিল জার্মানির ইহুদি সেনাবাহিনীর বিশ্বাসঘাতকতার কারণে জার্মানি পরাজিত হয়েছে। ইওরোপের বিভিন্ন প্রদেশে আগে থেকেই যে ইহুদি বিরোধী ঘৃণা প্রাচার চালু ছিল, তা আরও বাড়তে থাকে এই সময়ে। ফলত জায়নবাদী মতাদর্শ আরও জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই প্রেক্ষাপটেই আসে ‘বেলফোর ডিক্লারেশন’। ইহুদি উগ্র জাতীয়তাবাদী মতাদর্শকে নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে সাম্রাজ্যাবাদ। অথচ ইহুদি ধর্মের সাথে এই জায়নবাদী মতাদর্শের বিন্দুমাত্র যোগসূত্র নেই। অটোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্গত জেরুজালেমে ইসলাম, ইহুদি, খৃষ্টান ধর্মের বহু বছরের সহাবস্থানের ইতিহাস পাওয়া যায়। ঠিক যেমন ভাবে ভারতবর্ষেও বহুবছরের হিন্দু-মুসলিম সহাবস্থানের ইতিহাস রয়েছে। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের ঐতিহ্য রয়েছে। অথচ আরএসএস এবং বিজেপির প্রচারে মিলেমিশে যায় হিন্দু এবং হিন্দুত্ব। হিন্দু ধর্মের সাথে হিন্দুত্বের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই। আসলে হিন্দু শব্দটাই এদেশীয় শব্দ নয়। এটি একটি ফারসি-আরবি শব্দ। দ্বাদশ, ত্রয়োদশ শতাব্দীর আগে এই শব্দ পরিচিত ছিল না। হিন্দু শব্দটি এসেছে প্রাচীন ইরানীয় শব্দ ‘সিন্ধু’ থেকে। যা আসলে সিন্ধু নদের নাম। পরবর্তীকালে হিউ-এন-সাং যখন আসেন, তখন তিনি ইন্দু বা ইন্ত শব্দটি ব্যবহার করতেন। অথচ তিনি লক্ষ করেন এই নামে স্থানীয় মানুষেরা তাদের দেশকে চেনেই না। প্রাচীন সিন্ধু নদের কাছে যারা থাকত তাদেরই হিন্দু হিসেবে বোঝানো হত। রাজনীতির আঙিনায় হিন্দুত্বের ধারণা অনেক নতুন। সাভারকারের লেখা বই Essential of Hindutva এবং পরবর্তীকালে এই বই থেকেই তৈরি হওয়া প্রচার পুস্তিকা হিন্দুত্ব: কে হিন্দু-তে রাজনৈতিক ধারণার সাথে হিন্দু শব্দের ব্যবহার করা হয়। যা আরএসএস-এর রাজনীতির ভিত্তি রচনা করে। হিন্দুত্বের ধারণা অনেক বেশি বর্জনমূলক। এই মতাদর্শ টিকেই আছে এক জাতি, এক ধর্ম, এক ভাষা, এই ধারণার মাধ্যমে। যে ধারণা বৈচিত্রের সহাবস্থানকে অস্বীকার করে। এই একই রকম রাজনীতি হল জায়নবাদী রাজনীতি। যে-রাজনীতি হাজার বছর ধরে চলে আসা ইসলাম, ইহুদি ধর্মের সহাবস্থানকে অস্বীকার করে প্যালেস্তাইন ভূখণ্ডে। তৈরি করতে চায় বৃহত্তর ইজরায়েল। ধোঁয়াশাময় বিদেশনীতি স্বাভাবিকভাবেই তাই পরিবর্তন হয়েছে ভারতের বিদেশনীতির। যে-রাষ্ট্র চিরকাল মুক্ত কণ্ঠে প্যালেস্তাইনকে সমর্থন করেছে। প্রধানমন্ত্রী নেহেরু থেকে যে-ধারা অব্যাহত ছিল। এখন ভারতের প্রতিরক্ষা ক্ষেত্র থেকে শুরু করে ভারতের বাজার সবই উন্মুক্ত সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির কাছে। ইজরায়েলের সাথে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে ভারতের। আদানির কারখানায় তৈরি ড্রোন ব্যবহৃত হচ্ছে প্যালেস্তিনিয় যোদ্ধাদের হত্যার জন্য। ইজরায়েলের হাইফা বন্দরের মালিক এখন আদানি। বর্তমান পুঁজিপতিদের স্বার্থের সাথে মিলে যাচ্ছে আর.এস.এস বিজেপির ও ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক স্বার্থ। তাই বর্তমানে ভারত অনেক বেশি নীরব প্যালেস্তাইনের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে। কিন্তু বর্তমান শাসক শ্রেণি ভুলে যাচ্ছেন রাষ্ট্র আর দেশের মধ্যে পার্থক্য আছে। যারা এই দেশ তৈরি করেছে দেশের শ্রমিক-কৃষক সর্বোপরি হাজার-হাজার মুক্তিকামী মানুষ আজও চায় প্যালেস্তাইনের স্বাধীনতা। সেই নীতি অপরিবর্তনীয়। আন্তর্জাতিক অবস্থা, সংহতি মাসখানেক আগেই ইরানে আক্রমণ চালিয়েছিল ইজরায়েল। ইরান পালটা জবাব দিয়েছে। এই ঘটনা মধ্য প্রাচ্যে আবার নতুন করে অশান্তি শুরু করেছিল। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর লক্ষ্য সেখানের বিপুল খনিজ তেলের ভাণ্ডার। এখন বোঝা যাচ্ছে সিরিয়ায় বাশার আল আসাদের সরকার ফেলা হয়েছিল কারণ সিরিয়ার আকাশ ব্যবহার করে আক্রমণ করা যাবে পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে। যার মাধ্যমে এই ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নিতে চায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। ২০১০ পরবর্তী সময়কাল থেকে বিগত ১৫ বছরে আরও তীব্র হয়েছে আগ্রাসন। খাদ্যের সংকট ভয়াবহ। পুষ্টির অভাবে ভুগছে গোটা ভূখণ্ড। লক্ষ লক্ষ নারী, শিশু মুছে গেছে। একের পর এক মিসাইল এসে ধ্বংস করেছে গাজার স্কুল, হাসপাতাল, বাজার মহল্লা। ব্যবহৃত হয়েছে রাসায়নিক অস্ত্র। যার ফলে নির্মূল হয়েছে অসংখ্য পরিবার। এই কয়েকদিন আগে ইজরায়েলের মিসাইল ধ্বংস করেছে গাজার একমাত্র ডায়ালিসিস করার হাসপাতাল। ঈদে নামাজ পড়তে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছে মানুষ। ফাঁকা নেই একটাও কবরস্থান। মৃত শিশুর শরীর নিয়ে বুক-ফাটা কান্নায় তার বাবা। এ তো প্রতিদিনের চিত্র। প্যালেস্তিনীয় যোদ্ধারা শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করে মৃত্যুকেই তাদের প্রধান অস্ত্র হিসেবে যেন বেছে নিয়েছেন। একই সময়ে গড়ে উঠছে তাদের জন্য আন্তর্জাতিক সংহতি। লক্ষ লক্ষ মানুষ গোটা বিশ্ব জুড়ে একত্রিত হচ্ছেন এই লড়াইয়ের সংহতিতে। লন্ডনের টেমসের পাড় থেকে আমস্টারডাম শহর, জার্মানির বার্লিন থেকে শুরু করে ইতালির রোম। স্পেনের মাদ্রিদ থেকে শুরু করে ফ্রান্সের প্যারিস। সর্বত্র প্রগতিশীল মানুষ একত্রিত হচ্ছেন। এ-সময়কালে ফ্রিডম ফ্লোটিল্লা কোয়ালিশনের মাদলীন জাহাজে করে পরিবেশ আন্দোলনের কর্মী থুনবার্গ, ফ্রান্সের বামপন্থী আন্দোলনের নেতা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রিমা হাসান, ব্রাজিলের থিয়াগো আলভিয়া সহ আরও কয়েকজন গাজার জন্য ত্রাণ নিয়ে এগোচ্ছিলেন। সেই জাহাজ আটক করে ইজরায়েলি সেনারা। গ্রেপ্তার করা হয় তাঁদের। পরবর্তীকালে থুনবার্গ সহ কিছু জন ফিরে গেলেও। ফেরেননি রিমা হাসান, থিয়াগোরা। প্রতিবাদে অনসনে বসেছিলেন তাঁরা। ওদিকে আফ্রিকার প্রান্তও উত্তাল হয়েছে প্যালেস্তাইনের জন্য। ফ্রিডম ফ্লোটিল্লা কোয়ালিশন আবার জুন মাসের ১৩ তারিখ ‘মিশন হান্দালা’র ঘোষণা করেছিল। হান্দালা হচ্ছে একটি কার্টুন চরিত্র, একজন দশ বছরের শিশু। প্যালেস্তাইনের প্রতিরোধের প্রতীক। সেই হান্দালা নামক জাহাজে করে সংহতি আন্দোলনকারীরা পৌঁছোন গাজা সীমান্তে। সেই জাহজে ছিলেন আমাজন লেবার ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা ক্রিশ্চিয়ান স্মলস। ছিলেন ফ্রান্সের বামপন্থী আন্দোলনের নেতৃত্ব এমা সহ আরও অনেকে। হান্দালা শেষ অব্দি ত্রাণ তুলে দিতে পারেনি প্যালেস্তাইনের শিশু, মহিলাদের মুখে। তবে সংহতি আন্দোলনের তীব্রতা বেড়েছে কয়েকগুণ। কিউবা সহ লাতিন আমেরিকার বহু রাষ্ট্র প্রকাশ্যে প্রতিবাদ জানিয়েছে এই আগ্রাসনের। একরত্তি গাজা স্ট্রিপ ইউরোপের রাজনৈতিক ভারসাম্যের পরিবর্তন করে দিয়েছে। ফ্রান্স থেকে শুরু করে ব্রিটেন, স্পেন সহ একের পর এক রাষ্ট্র প্যালেস্তাইনকে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। সামনের সেপ্টেম্বরেই বসবে ইউএনও-র সভা। সেখানেই তীব্র হবে প্যালেস্তাইনের স্বীকৃতির দাবি, সার্বভৌমত্বের দাবি। এমনকি আমেরিকার ওয়াশিংটন, লস এঞ্জেলসের রাস্তা বারংবার জানান দিয়েছে প্যালেস্তাইনের প্রতি সংহতি। আওয়াজ উঠেছে কেম্ব্রিজ থেকে হাভার্ড। গ্যারি লিনেকারের মতন প্রাক্তন ফুটবলার, পিংক ফ্লয়েড খ্যাত রজার ওয়াটারসের মতন মানুষেরা ইদানিং সময়ে বারংবার এই গণহত্যার বিরোধিতা করেছেন। লিভারপুল ফুটবল ক্লাবের হাজার হাজার সমর্থক ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ জয়ের বিজয় মিছিলে হেঁটেছেন প্যালেস্তাইনের পতাকা হাতে। সাম্রাজ্যাবাদী আগ্রাসন বিরোধী এই সংহতির দৃষ্টান্ত নতুন আশা জাগিয়েছে। আপাতত গোটা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের পথ গাজার দিকে। হবে মিছিল। কোনও মিছিল যাবে গাজার প্রান্ত অব্দিই। কোনও মিছিল হবে দিল্লি, মুম্বাই, কলকাতার পথে-ঘাটে, কিন্তু উদ্দেশ্য একটাই মুক্ত করো প্যালেস্তাইন। প্রকাশের তারিখ: ৩০-আগস্ট-২০২৫ |
||||||||||
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |