|
ফ্যাসিস্টদের কাছে মুক্ত পরিসর বিপজ্জনকআয়ূষ রায় |
এই মুহূর্তে নিরপেক্ষ থাকা মানে ফ্যাসিস্টদের হাতে ক্যামেরা তুলে দেওয়া, কারণ যে ছাত্র আজ সরে দাঁড়াবে, কাল তার ছবির বিষয়, ভাষা আর দর্শকও ফ্যাসিস্টরাই ঠিক করে দেবে। তাই পক্ষ নেওয়ার সময় এখনই: এসআরএফটিআই-এর ক্যাম্পাসে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার জবাব পর্দায় নয়, আগে রাস্তায়, মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে দিতে হবে। |
এক সপ্তাহের মধ্যে দু-বার ক্যাম্পাস এর ভেতর আরএসএস-এর গেরুয়া বাহিনীর দ্বারা আক্রান্ত হল এসআরএফটিআই-র ছাত্র-ছাত্রীরা। প্রথম ঘটনাটি ঘটে ২৭ সেপ্টেম্বর। সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট-এর প্রেক্ষাগৃহে RSS ঘনিষ্ঠ অখিল ভারতীয় গ্রাহক পরিষদ-এর এক সভা চলাকালীন কিছু ছাত্র প্রতিবাদ জানায় এবং সভাস্থলে আরএসএস বিরোধী পোস্টারিং করা হয়। ছাত্রদের দাবি ছিল যে ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষ নিয়মমাফিক ছাত্র ইউনিয়নকে না-জানিয়ে একটি রাজনৈতিক সংগঠনকে ক্যাম্পাস এর ভেতর সভা আয়োজন করার অনুমতি কেন দেয়। প্রথমে বচসা দিয়ে শুরু হলেও খানিক্ষণের মধ্যে সভায় উপস্থিত পরিষদের সদস্যরা ছাত্রদের উপর চড়াও হয়ে বেলাগাম মারধর শুরু করে এবং ‘জয় শ্রী রাম’ ও ‘ভারত মাতার জয়’ ধ্বনি শোনা যেতে থাকে। লাথি, চড়, ঘুষির পাশাপাশি ছুরিও চালানো হয়। এতে বেশ কিছু ছাত্র আহত হয়। ঘটনাটি জানাজানি হতেই বাকি ছাত্র, শিক্ষক, শিক্ষাকর্মীর দল ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন এবং পুলিশ ডাকা হয়। অপরপক্ষে ক্যাম্পাসের মেইন গেটের বাইরে গেরুয়া বাহিনীও বহুসংখ্যায় একত্রিত হয়ে ছাত্রদের উদ্দেশ্যে ‘দেশবিরোধী’, ‘বাংলাদেশি’, ‘আরবান নক্সাল’ জাতীয় হিংসাত্মক মন্তব্য করতে থাকে এবং পুলিশের সামনেই পাথর, ইট ছুড়তে থাকে। এতে কিছু ছাত্র আরও গুরুতর আহত হয় এবং তাদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। রাত অবদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না-এলেও ক্যাম্পাস চত্বরে এক ভয়ের আবহের সৃষ্টি হয়। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে দেশজুড়ে প্রতিবাদ হলেও কিছুদিন বাদেই আবার গেরুয়া বাহিনী ক্যাম্পাস এর বাইরে মিছিল করে এসে জড়ো হয় এবং গেট ভেঙে ঢোকার চেষ্টা করে। আবারও অভিযোগ ওঠে পুলিশের সামনেই ছাত্রদের উদ্দেশ্যে পাথর, জলের বোতল ও উসকানিমূলক মন্তব্য ছোড়ার। বর্তমানে ইনস্টিটিউটের পঠন-পাঠন স্থগিত। প্রশ্ন উঠেছে ভাইস চ্যান্সেলরের ভূমিকা নিয়ে। ঘটনার পর তিনি ছাত্রদের প্রতি সহানুভূতিশীল অবস্থান নিতে অস্বীকার করেন এবং অভিযোগ ওঠে প্রতিবাদী ছাত্র, শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করার। এই মুহূর্তে ছাত্ররা ক্যাম্পাসের ভেতর মঞ্চ বেঁধে ধর্ণায় সামিল রয়েছে। তাদের দাবি উপাচার্যের পদত্যাগ এবং কর্তৃপক্ষ যতক্ষণ না পর্যন্ত এই ঘটনার দায় স্বীকার করে ক্যাম্পাসের ভেতরে ছাত্র-ছাত্রীদের সুরক্ষার জন্য সদর্থক ব্যবস্থা নেবে ততক্ষণ তারা এই আন্দোলন চালিয়ে যাবে। SRFTI ভারতবর্ষের অন্যতম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছাত্র-ছাত্রীরা চলচ্চিত্রনির্মাণের পাঠ নিতে আসে। সিনেমা এমন একটি মাধ্যম যা একাধারে প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং শৈল্পিক অভিব্যক্তির মেলবন্ধন ঘটায়। তাই ফিল্ম স্কুলের পাঠ্যক্রমে স্বাভাবিকভাবেই কারিগরি বিদ্যার পাশাপাশি বৌদ্ধিক, নান্দনিক এবং মানসিক বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় রসদ মজুত থাকে। দেশ-বিদেশের সিনেমা ছাড়াও এখানে সাহিত্য, গান, শিল্প, দর্শন, সমাজ, রাজনীতির এক বহুমাত্রিক চর্চা, ক্লাসরুমে ও ক্লাসরুমের বাইরে রোজ হয়েই থাকে। ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের বিবিধধর্মী মতবাদ নিয়ে তর্ক-আলোচনার মধ্যে দিয়ে নিজেদের জীবন ও সিনেমা-দর্শনকে গড়ে পিঠে নেয়। সেখানে বামপন্থা, উদারতাবাদ, নারীবাদ, আম্বেদকরবাদ; এমনকি ক্ষমতাসীন দক্ষিণপন্থী মতধারাও সমান অধিকারে নিজের জায়গা করে নয়। আর এই মুক্তচিন্তা, মুক্তচর্চার পরিসরকেই সব থেকে বেশি ভয় পায় ফ্যাসিস্ট শক্তি। সে সবার আগে যায় সেই জায়গায়, যেখানে মানুষ নির্ভয়ে কথা বলতে পারে, প্রশ্ন করতে পারে, ভিন্নমত নিয়ে মুখোমুখি বসতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়, থিয়েটার, গণমাধ্যম, ফিল্ম স্কুল, পাড়ার ক্লাব— এই জায়গাগুলোই মুক্ত পরিসর, আর এগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করাই ফ্যাসিস্ট রাজনীতির কেন্দ্রীয় কাজ। গ্রামশির ব্যাখ্যায় আধিপত্য টিকে থাকে সিভিল সোসাইটির সম্মতির ওপর। যে জায়গায় সম্মতি তৈরি হয়, সেখানেই তা ভাঙতেও পারে। তাই ফ্যাসিস্ট শক্তির কাছে মুক্ত পরিসর শুধু বিরক্তিকর নয়, বিপজ্জনকও বটে। এই পরিসরেই মানুষ জানতে পারে, তার সন্দেহের সঙ্গী আরও অনেকে। এখানেই বিকল্প ভাবনার জন্ম নেয়। হান্না আরেন্ট একই দিকে আলো ফেলেছিলেন অন্য পথে। তাঁর মতে সর্বগ্রাসী শাসন মানুষের মধ্যে সেই জায়গাটুকু নষ্ট করে দিতে চায়, যেখানে স্বাধীন বিচার ও যৌথ উদ্যোগ জন্মায়। একা, বিচ্ছিন্ন মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ, আর যেখানে বহু মানুষ মুখোমুখি হয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করে, সেখানে তা কঠিন। অর্থাৎ মুক্ত স্থান দখল করা মানে শুধু একটি ভৌগোলিক অঞ্চল বা প্রাতিস্থানিক কেন্দ্র নয়, মানুষে মানুষের অন্তর্সম্পর্কের ভীতটাকেই দুর্বল করে তোলা। তবে ফ্যাসিবাদের প্রথম আক্রমণ সাধারণত রাস্তায় নয়, হয় এক গল্পের মাধ্যমে। এমন এক গল্প যা জনমানসে একবার ঢুকিয়ে দিতে পারলে, ফ্যাসিস্ট উৎপীড়নের দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রযন্ত্রের কাজ সহজ হয়ে যায়। ফ্যাসিস্ট গল্পের কাঠামোর মূলত তিনটে দিক। প্রথমত, এক গৌরবময় অতীত, যা হারিয়ে গেছে বা চুরি হয়েছে; ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে যার ব্যাখ্যায় বলা হয় ‘হিন্দু খাতরে মে হ্যায়’। দ্বিতীয়ত, এক অভ্যন্তরীণ শত্রু: শিক্ষিত, শহুরে, ভিন্নমতাবলম্বী, সংখ্যালঘু, সবাই যাকে ‘দেশবিরোধী’, ‘দিমাগি নক্সাল’ বা ‘টুকড়ে টুকড়ে গ্যাং’ আখ্যা দেয়। তৃতীয়ত, এক ত্রাতা বা সংগঠন, যে একাই দেশকে বাঁচাতে পারে; অর্থাৎ ‘আরএসএস’ তথা হিন্দুত্ববাদ। এই কাঠামোয় ভিন্নমত আর কেবল ভিন্নমত থাকে না, বিশ্বাসঘাতকতা হয়ে যায়। সরকারের কাজের সমালোচনা করলেও তাঁকে দেশবিরোধী বলে দেওয়া যায়। আর যাঁকে আগে ‘দেশবিরোধী’ তকমা দেওয়া গেছে, তাঁর ওপর আক্রমণ তখন আর অন্যায় লাগে না, মনে হয় আত্মরক্ষা। এভাবে আখ্যান তৈরি করে হিংসার প্রথম ধাপ লেখা হয়। সেই আখ্যান নির্মাণের কাজে গত শতকের সব থেকে বড়ো অবদান সিনেমা বা সামগ্রিকভাবে অডিও-ভিজ্যুয়াল মিডিয়া। সিনেমা বোঝার জন্য প্রথাগত শিক্ষার প্রয়োজন হয় না, তাই আপামর জনতার মননে চলচ্চিত্রের ভাষা এক নির্বাধ সংযোগ স্থাপন করে। মূলধারার ভাবাদর্শকে জনমানসের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজে চলচ্চিত্র হয়ে ওঠে বিংশ শতাব্দীর ফ্যাসিস্ট ও একনায়কতন্ত্রী শাসকগোষ্ঠীর অন্যতম হাতিয়ার। সিনেমা সেই মাধ্যম, যার মধ্য দিয়ে একটি জাতি নিজেকে দেখে। ফ্যাসিস্ট শাসকেরা তা শুরুতেই বুঝেছিলেন। জার্মানিতে নাৎসিরা ক্ষমতায় আসার পর প্রোপাগান্ডা মন্ত্রী গোয়েবলস এর তত্ত্বাবধানে তৈরি হয় জার্মান ফিল্ম একাডেমি বেবেলসবার্গ যার উদ্দেশ্য ছিল গোটা ইউরোপে নাৎসিবাদের প্রচার ও সম্প্রসারণ। একইভাবে ইতালির ফ্যাসিস্ট শাসনকালে গড়ে তোলা হয় Centro Sperimentale di Cinematografia এবং চলচ্চিত্রচর্চাকে সরাসরি ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের অধীনে নিয়ে আসার উদ্যোগ নেওয়া হয়। যাঁরা সমাজের মনকে গড়তে চান, তাঁরা পর্দার ওপর নিয়ন্ত্রণ চান। ফিল্ম স্কুল সেই নিয়ন্ত্রণের উৎস। সেখানে ঠিক হয় আগামী দিনে কোন গল্প বলা হবে, কার মুখ পর্দায় আসবে, কোন ইতিহাস বৈধ বলে গণ্য হবে। সেই কারণেই একক জাতীয় আখ্যান নির্মাণের পক্ষে এমন প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে প্রভাবশালী। প্রশাসনিক উপায়ে বা বল প্রয়োগ করে; যেভাবেই হোক রাষ্ট্র চায় সেই ফিল্ম স্কুলগুলিকে দখল করতে। তারই পরিণতি ২০১৫ সালে এফটিআইআই-তে গজেন্দ্র চৌহানের নিয়োগ বা ২০২৬-এ এসআরএফটিতে গেরুয়া গুন্ডাদের তাণ্ডব। ফ্যাসিস্ট শক্তি যখন প্রতিষ্ঠানের ভেতরের মুক্ত পরিসর দখল করে নেয়, তখন প্রতিরোধের জায়গা সরে আসে রাস্তায়। দেশজুড়ে আজ ছাত্র-যুবরা রাস্তায় নেমে এসছে, রাষ্ট্রযন্ত্রের চক্রান্ত্রের বিরুদ্ধে সত্য নিজের জায়গা করে নিচ্ছে। গত বারো বছর ধরে চলা ‘ওয়াটস্যাপ ইউনিভার্সিটি’-র সিলেবাসকে খণ্ডন করে তৈরি হচ্ছে জেন-জি দের নতুন আখ্যান; যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে রিলস আর মিমের মাধ্যমে। এই প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার প্রযুক্তির দৌলতে চলচ্চিত্রশিক্ষা আজ আর ফিল্মস্কুলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আজ রাস্তায় দাড়িয়ে মোবাইল ক্যামেরা ব্যবহার করে যেকোনো মানুষ তার নিজের গল্পটা বলতে পারে এবং তা সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে পৌঁছে যেতে পরে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে। ফলে গণমাধ্যম হিসেবে সিনেমা এবং ফিল্ম স্কুল দুইই তার গুরুত্ব হারাচ্ছে। এই অবস্থায় ফিল্মস্কুলের ছাত্র তথা ভবিষ্যতের চলচ্চিত্রকারদের কাছে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করার সময় এসেছে। তারা কি নয়া-উদারপন্থার হাত ধরে নিরাপদ ছবি বানিয়ে ফ্যাসিস্ট অচলাবস্থার জন্য সহানুভূতির জোগান দিয়ে যাবে? নাকি অপরপক্ষে দাঁড়ানো বৃহত্তর আন্দোলনের সঙ্গে নিজের সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণ ভাগ করে নিয়ে আন্দোলনকারীদের সুযোগ করে দেবে আগামীর চলচ্চিত্রের রূপরেখা তৈরি করার? এই মুহূর্তে নিরপেক্ষ থাকা মানে ফ্যাসিস্টদের হাতে ক্যামেরা তুলে দেওয়া, কারণ যে ছাত্র আজ সরে দাঁড়াবে, কাল তার ছবির বিষয়, ভাষা আর দর্শকও ফ্যাসিস্টরাই ঠিক করে দেবে। তাই পক্ষ নেওয়ার সময় এখনই: এসআরএফটিআই-এর ক্যাম্পাসে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার জবাব পর্দায় নয়, আগে রাস্তায়, মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে দিতে হবে। প্রকাশের তারিখ: ১৫-অক্টোবর-২০২৬ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |