|
গাজা থেকে কিউবাবিজয় প্রসাদ |
আমেরিকা যুদ্ধবিরতি এবং ইউএন প্রস্তাবিত রাজনৈতিক আলোচনা দুটো বিষয়কেই অগ্রাহ্য করছে। সেটা কেবল প্যালেস্তাইনের ক্ষেত্রেই করছে এমনটা নয়; আমেরিকা এবং তার সঙ্গে ন্যাটোর অন্যান্য সহযোগী সদস্যরা ইউক্রেনের ক্ষেত্রেও এই একই নীতি অবলম্বন করেছিল। নতুন করে মোট ১০৫ বিলিয়ন ডলারের একটি বিলের ৬১.৪ বিলিয়ন ধার্য হয়েছে ইউক্রেনের জন্য এবং ১৪.১ বিলিয়ন বরাদ্দ প্যালেস্টাইনে ইজরায়েল পরিচালিত গণহত্যার জন্য। |
গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রকের মুখপাত্র ডঃ আশরাফ আল-কিদরা সর্বশেষ যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন, সেই প্রতিবেদন অনুযায়ী ৭ই অক্টোবর থেকে এখনও পর্যন্ত প্রায় ১০০০০-এর চাইতেও বেশি প্যালেস্তিনীয়, ইজরায়েলের সামরিক বাহিনির দ্বারা নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে অর্ধেক শিশু। এছাড়া ২৫০০০-এর চাইতেও বেশি মানুষ এখন আহত। ভাঙাচোরা ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও চাপা পড়ে রয়েছে হাজার হাজার মানুষ। ইতিমধ্যেই ইজরায়েলের ট্যাংকগুলো গাজা শহরকে চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলতে শুরু করেছে। মাত্র এক মাস আগেও এই শহরে বসবাস করত ছয় লক্ষ মানুষ। আর এখন প্রায় অধিকাংশ অঞ্চল শুনশান, সবকটি পাড়া প্রায় জনবিহীন। এসব জায়গায় যারা থাকত তাদের একটা অংশ ঘরবাড়ি ছেড়ে গাজার দক্ষিণে শরণার্থী-শিবিরগুলোতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। তাছাড়া আবাসিক এলাকাগুলোতে নিজেদের বাড়ির মধ্যেই নিহত হয়েছেন হাজার হাজার বাসিন্দা। শহরটাকে এখন সামরিক বাহিনি সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে, শুরু হয়েছে অতর্কিত আক্রমণ আর সামরিক অভিযান। এই দখলদারির আতঙ্ক আর ভয় গাজার মাটি থেকে আকাশ পর্যন্ত ছড়িয়ে দিতে হবে বলে ইজরায়েলি বাহিনি প্রতিটি বাড়িতে হানা দিচ্ছে। যে ইজরায়েলি সৈন্যটি এক প্যালেস্তাইন অধিবাসীর বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে বন্ধ দরজা লাথি মেরে ভেঙে ফেলতে উদ্যত তার উদ্দেশ্যে মাহমুদ দারভিশ (১৯৪১-২০০৮) একটা কবিতা লিখেছিলেন। এখন প্রায় জনশূণ্য গাজা শহরে বাড়ির দরজা এঁটে হানাদার বাহিনির আক্রমণের অপেক্ষায় প্রহর গুনতে থাকা কোনও গৃহস্থ হয়ত সেইটাই ফিসফিস করে উচ্চারণ করবে – ওহে তুমি, যে দাঁড়িয়ে রয়েছ আমাদের দোরগোড়ায় যখন ইজরায়েলি সৈন্যবাহিনি প্রতিটি বাড়িতে হানা দিতে শুরু করবে তখন কফি খাওয়ার সময় তাদের হবে না। তার কারণ শুধু এই নয় যে কফি বা জল কিছুই আর অবশিষ্ট নেই, তার কারণ আসলে এই যে প্রতিটি ইজরায়েলি সৈনিককে বলে দেওয়া হয়েছে প্যালেস্তিনীয়রা মানুষ নয়। তাদের শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে প্যালেস্তিনীয়রা সন্ত্রাসবাদী, তারা আসলে জানোয়ার। দখলদার বাহিনির চোখে প্রতিটি প্যালেস্তিনীয় এমন এক জীব যাকে আক্রমণ করতে হবে, আঘাত করে, গুলি চালিয়ে একেবারে সমূলে নির্বংশ করে ফেলতে হবে। এছাড়া আর অন্য কোনও রকম আচরণ তাদের প্রাপ্য নয়। ইজরায়েলের উচ্চপদাধিকারী অফিসারদের বিবৃতিজুড়ে রয়েছে গণহত্যা আর জাতিগত শোধনের উগ্র খিদে এবং এই যুদ্ধে তাদের নৈতিক আচরণ, ব্যবহার, চালচলন তার দ্বারাই প্রভাবিত হয়েছে। যুদ্ধে হতাহত মানুষ, তাদের ক্ষয়ক্ষতি সংক্রান্ত যাবতীয় আলোচনা তাচ্ছিল্য সহকারে উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে যুদ্ধবিরতির ডাক। ইউনিসেফের (UNICEF) মুখপাত্র জেমস এল্ডার এই পরিস্থিতির কথা বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘গাজা হাজার হাজার শিশুর কবরস্থানে পরিণত হয়েছে। আর বাদবাকিদের জন্য জীবন্ত নরক।‘ এমনকি উচ্চপদস্থ আমেরিকান কর্মকর্তারা যখন একদিকে ‘মানবিক বিরতি’র কথা বলেন তখন অন্যদিকে তাঁরাই ইজরায়েলি সামরিক বাহিনির হাতে তুলে দেবার জন্য লক্ষ লক্ষ ডলার আর আরও বেশি করে অস্ত্রশস্ত্র জোগাড় করবার চেষ্টা চালিয়ে যান। ‘মানবিক বিরতি’ বা ‘Humanitarian pause’ একটা বানিয়ে তোলা আইনি বুলি, গাজার অধিবাসীরা বাঁচল কি মরল তার সঙ্গে এর কোনও সম্পর্কই নেই। বিরতি মানে খুব অল্প সময়ের জন্য, হয়ত বা মাত্র কয়েক ঘন্টার জন্য বোমাবর্ষণ বন্ধ হবে, ওই সময়ের মধ্যেই আহতদের সরিয়ে নিয়ে যেতে হবে, গাজা শহরের মধ্যে কিছু ত্রাণসামগ্রী ঢোকার অনুমতি দেওয়া হবে। বিরতি শেষ হলেই আবার সবুজ বাতি জ্বলে উঠবে যাতে ইজরায়েল আবারও প্রাণঘাতী বোমাবর্ষণ শুরু করতে পারে। এখনও পর্যন্ত ইজরায়েল গাজায় যত টন বোমা ফেলেছে তার মোট ওজন ১৯৪৫ সালে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে যে দুটো বোমা ফেলা হয়েছিল তাদের মোট ওজনের চাইতেও বেশি। আমেরিকা যুদ্ধবিরতি এবং ইউএন প্রস্তাবিত রাজনৈতিক আলোচনা দুটো বিষয়কেই অগ্রাহ্য করছে। সেটা কেবল প্যালেস্তাইনের ক্ষেত্রেই করছে এমনটা নয়; আমেরিকা এবং তার সঙ্গে ন্যাটোর অন্যান্য সহযোগী সদস্যরা ইউক্রেনের ক্ষেত্রেও এই একই নীতি অবলম্বন করেছিল। নতুন করে মোট ১০৫ বিলিয়ন ডলারের একটি বিলের ৬১.৪ বিলিয়ন ধার্য হয়েছে ইউক্রেনের জন্য এবং ১৪.১ বিলিয়ন বরাদ্দ প্যালেস্টাইনে ইজরায়েল পরিচালিত গণহত্যার জন্য। ইউক্রেনে রাশিয়ান বাহিনি ঢোকার কিছুদিন পরে বেলারুস এবং টার্কি দুই জায়গাতেই ইউক্রেনীয় ও রাশিয়ান কর্তৃপক্ষের মধ্যে শান্তি বিষয়ক আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছিল, কিন্তু ন্যাটো তড়িঘড়ি বিষয়টাকে বানচাল করে দেয় যার ফলে এমন এক যুদ্ধ-পরিস্থিতি তৈরি হল যার ফলে এখনও পর্যন্ত ১০০০০ সাধারণ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। তবে এক বছর আট মাস যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ইউক্রেনে মোট মৃতের সংখ্যাকে ইতিমধ্যেই অতিক্রম করে গেছে মাত্র চার সপ্তাহে প্যালেস্টাইনে মৃত মানুষের সংখ্যা। এই বছরের রাষ্ট্রসংঘের বার্ষিক সাধারণ অধিবেশনে কিউবায় ছয় দশক ধরে চলতে থাকা মার্কিন অবরোধ (যা কাগজকলমে শুরু করেছিলেন মার্কিন রাষ্ট্রপতি জন এফ কেনেডি তবে আসলে এর সূত্রপাত ঘটে ১৯৬০ সালে) তুলে দেওয়ার প্রস্তাবের পক্ষে মাত্র তিনটি দেশ ভোট দেয়নি। এটা মোটেও কাকতালীয় ঘটনা নয় যে, সেই তিনটি দেশ হল – আমেরিকা, ইউক্রেন এবং ইজরায়েল। আমেরিকা কেবল কিউবা দেশটির উপরে অবরোধ জারি করেনি, আসলে অবরোধ জারি করেছে কিউবান বিপ্লবের বিরুদ্ধে। ১৯৫৯ সালে যখন কিউবা খুব জোর দিয়ে ঘোষণা করল তারা কিউবার ভৌগলিক সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করবে এবং কিউবার মানুষের উন্নতিসাধন করার চেষ্টা করবে তখন আমেরিকা ভয় পেয়ে গেল। তারা মনে করল, এর ফলে শুধু কিউবা দ্বীপ সংক্রান্ত তাদের যাবতীয় দুরভিসন্ধি ভেস্তে যেতে পারে তাই নয়, বিশ্ব-রাজনীতিতে তাদের প্রভুত্ব বজায় রাখার ক্ষেত্রেও সমস্যা হতে পারে। মার্কিন অধিকৃত আন্তর্জাতিক কর্পোরেশনগুলোর দাবীদাওয়া না মেনে কিউবা যদি নিজের দেশের মানুষদের ভালোমন্দকে বেশি গুরুত্ব দেয় এবং অন্যান্য যে দেশগুলো তাই করতে চেয়ে লড়াই করছে তাদের দিকেও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে থাকে এবং এসব করেও কিউবা যদি পার পেয়ে যায় তবে হয়ত অন্য দেশগুলোও একইরকম আচরণ করতে শুরু করবে। এই কিউবা-ভীতির ফলশ্রুতি হল অবরোধের নীতি। অবরোধের কারণে ১৯৬০ সাল থেকে কিউবাকে প্রায় কয়েকশো বিলিয়ন ডলার ক্ষতি স্বীকার করতে হয়েছে কিন্তু বিপ্লবের ফলে কিউবার মানুষের যে সমষ্টিগত আত্মমর্যাদার বোধ গড়ে উঠেছে তাকে প্রতিহত করা যায়নি। যেমন ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্কের রিপোর্ট অনুযায়ী ২০২০ সালে অবরোধ ও কোভিড পরিস্থিতির মধ্যেও কিউবা GDP’র ১১.৫% শিক্ষাখাতে খরচ করেছে। আমেরিকা করেছে ৫.৪%। কিউবার শিশুরা যে কোনও স্কুলে বিনামূল্যে পড়াশোনা করতে পারে। শুধু তাই নয়, স্কুল থেকে তাদের সবাইকে খাবার দেওয়া হয়, ইউনিফর্ম দেওয়া হয়। কিউবায় চিকিৎসা বিজ্ঞান পড়া যায় বিনামূল্যে, যার ফলে প্রতি ১০০০ জন কিউবাবাসীর জন্য ৮.৪ সংখ্যক চিকিৎসক ও ৭.১ সংখ্যক নার্স পরিষেবা দিতে পারেন। রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ অধিবেশনে কিউবার বিদেশ মন্ত্রী রডরিগেজ পারিলা বলেছেন, “কিউবা সরকারের কাছে সব সময় অগ্রাধিকার পেয়েছে কিউবার মানুষের স্বার্থ এবং ভবিষ্যতেও তাই হবে।“ তিনি জানিয়েছেন, এই অবরোধ একটা ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ হতে পারে কিন্তু কিউবার বিপ্লব বহু দশক ধরে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। কোনও পরিস্থিতিতেই বিপ্লব পিছু হঠবে না। এই অবরোধের চরিত্র কতটা নির্মম হতে পারে তার সামান্য উদাহরণ দিয়েছেন বিদেশমন্ত্রী রডরিগেজ পারিলা। যেমন, ফুসফুসের অসুখে রোগীদের জন্য যে ভেন্টিলেটর এবং অক্সিজেন প্রয়োজন হয় কিউবায় তার আমদানি বন্ধ করে দিয়েছিল মার্কিন সরকার (অন্যান্য লাতিন আমেরিকান দেশগুলি থেকেও)। তখন কিউবার বিজ্ঞানী আর ইঞ্জিনীয়ররা নিজেরাই ভেন্টিলেটর বানাতে শুরু করলেন। ঠিক যেভাবে কিউবা নিজেদের জন্য কোভিড ১৯ প্রতিষেধকও বানিয়েছিল। রডরিগেজ পারিলা জানিয়েছেন প্যান্ডেমিক পরিস্থিতিতে মার্কিন সরকার মানবিকতার খাতিরে অন্যান্য দেশগুলোকে ছাড় দিয়েছিল, কিন্তু কিউবা সেই তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। তিনি বলেছেন, “বাস্তবে সুযোগসন্ধানী মার্কিন সরকার তাদের কিউবাবিরোধী পরিকল্পনায় কোভিড-১৯ কে একটা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে।“ ইজরায়েলি সৈন্যবাহিনির কাছে দারভিশ জানতে চেয়েছেন, তারা প্যালেস্তিনীয়দের মানুষ বলে মনে করতে সক্ষম কিনা। মার্কিন সরকারের যে হর্তাকর্তারা কিউবার বিরুদ্ধে অবরোধ চালিয়ে যেতে চান এবং যাচ্ছেন তাঁদের কাছেও একই প্রশ্ন রাখা যেতে পারে : তাঁরা কি কিউবার অধিবাসীদের মানুষ বলে মনে করতে সক্ষম? চলতি বছরের জুন মাসে প্যারিস পোয়েট্রি মার্কেট অনারারি প্রেসিডেন্ট হিসেবে কিউবার কবি ন্যান্সি মোরেহন-কে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। অনুষ্ঠানের ঠিক আগে কবিতা উৎসবের আয়োজকরা এই আমন্ত্রণ প্রত্যাহার করে নেন। কারণ দর্শাতে গিয়ে তাঁরা কিছু ‘বাধ্যবাধকতা’, ‘গুজব’ ইত্যাদির কথা বলেছিলেন। কিউবার বিদেশ মন্ত্রক এই প্রত্যাহারের সমালোচনা করেছিল। তারা বলেছিল এও আরেক রকমের অবরোধ। ‘কিউবার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদী ঘৃণার অবরোধ’ – এর এটা একটা উদাহরণ। এখানে ন্যান্সি মোরেহনের রেকুয়েম পারা লা মানো ইজকিয়েরদা (Requiem for the Left Hand) কবিতাটা আমরা উদ্ধৃত করলাম। এই কবিতাটা যেন দারভিশের কবিতার মানবতা আর কিউবার সঙ্গীত শিল্পী মার্তা ভালদেজের (যার উদ্দেশ্যে এই কবিতা নিবেদিত) গানের ছন্দ – এই দুইয়ের সঙ্গে একটি কথোপকথন : মানুষ মানচিত্রে যে সমস্ত রেখা এঁকেছে তোমার কল্পনায়, মার্তা, আছে কিন্তু আজ আমার সন্দেহ হয়
প্রকাশের তারিখ: ২৬-নভেম্বর-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |