|
শ্রমিকের স্বীকৃতি থেকে সামাজিক সুরক্ষা: গিগ অর্থনীতির ন্যায্য ভিত্তি গড়ার দাবিসৌম্যজিৎ রজক |
|
রাজ্যের রাজনৈতিক ভারসাম্যে গুনগত পরিবর্তন ঘটার পর থেকেই শ্রমজীবী মানুষের ওপর প্রত্যক্ষ হামলা বেড়েছে। ক্যাবিনেট গঠন করার আগেই বুলডোজার চালিয়ে হকার উচ্ছেদ শুরু করে দেওয়া হয়েছিলো, সকলেই দেখেছেন। দুই মাস অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই রাজ্যের বিজেপি সরকার তার শ্রমিক বিরোধী চেহারাটা বেআব্রু করে ফেলেছে নিজেই। এহেন শ্রমিক বিরোধী সরকার তার প্রথম রাজ্য বাজেট পেশ করেছে ক'দিন আগেই। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী গিগ ও প্ল্যাটফর্ম কর্মীদের জন্য একটি ওয়েলফেয়ার বোর্ড গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। এটি নিঃসন্দেহে বহুকাঙ্খিত এক ঘোষণা। কিন্তু এই ঘোষণা আদতে বাস্তবের মাটিতে নামবে না-কি কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ হয়েই থেকে যাবে, সেই সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। বিজেপি সরকার যে 'কর্পোরেট-বান্ধব' শ্রম নীতি অনুসরণ করছে, তার প্রেক্ষাপটে শ্রমিকদের পক্ষে এদের কোনো মৌখিক ঘোষণায় আস্থা রাখা আর সম্ভবই নয়। গিগ অর্থনীতি: শোষণের নয়া কৌশল যারা প্রথাগত শ্রমিক-মালিক সম্পর্কের বাইরে রয়েছেন, তারাই মূলত গিগ কর্মী। প্ল্যাটফর্ম কর্মী বলতে বোঝায়, ডিজিটাল অ্যাপের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কাজের ভিত্তিতে যাঁরা অর্থ উপার্জন করেন, তাঁদের। গিগ ও প্ল্যাটফর্ম কর্মীদের দস্তুর হল, যত কাজ তত টাকা, কাজ নেই টাকা নেই। ডেলিভারি কর্মী, রাইড-শেয়ারিং ড্রাইভার, ই-মার্কেটের পরিষেবাদাতা, স্বাস্থ্যসেবা, কনটেন্ট ও মিডিয়াসেবা—এরাই গিগ কর্মী। পুঁজিবাদ এই নয়া কাঠামোয় শ্রমিকদের 'পার্টনার' বা 'মাইক্রো-এন্টারপ্রেনিয়র' বলে চালিয়ে দিতে চায়, অথচ বাস্তবে এঁরা সবচেয়ে অনিশ্চিত ও শোষিত শ্রমিক। এই অংশের শ্রমিকরাই আজকের দুনিয়ায় শ্রমিকশ্রেণির সবচাইতে অনিরাপদ, অরক্ষিত বাহিনী। স্থায়ী কাজের বদলে চুক্তিভিত্তিক, খণ্ডকালীন এই কাজের ধরন বাড়ছে সারা বিশ্বে। বাড়ছে ফুরনের কাজ। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ২০২৪ সালে প্ল্যাটফর্ম ওয়ার্ক নির্দেশিকা গ্রহণ করেছে, যেখানে প্ল্যাটফর্মগুলিকে কর্মীদের 'কর্মচারী' হিসেবে ধরে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা তাদের সামাজিক সুরক্ষা ও যৌথ দরকষাকষির অধিকার নিশ্চিত করে। কানাডাতেও গিগ কর্মীদের শ্রম অধিকার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ভারতের প্রেক্ষাপটে সেই স্বীকৃতি আজও অনিশ্চিত। শ্রমিকবিরোধী শ্রমকোড ও কর্পোরেট বান্ধব নীতি বিজেপি সরকার প্রচলিত ২৯টি শ্রম আইনের জায়গায় চারটি শ্রমকোড এনেছে—'ব্যবসা করা সহজ' করার নামে। কিন্তু এই কোডগুলোর মূল উদ্দেশ্য হল শ্রমিকদের আইনী রক্ষাকবচগুলো সরিয়ে ফেলা। যেমন—১৮,০০০ টাকার বেশি মজুরি পেলে 'শ্রমিক' সংজ্ঞার বাইরে, ১০ জনের কম কর্মী থাকলে 'প্রতিষ্ঠান' নয়, ১০০ জনের কম হলে ক্যান্টিন ও ক্রেশের প্রয়োজন নেই, ৫০ জনের কম শ্রমিক নিয়োগ করলে ঠিকাদারের লাইসেন্সের প্রয়োজন নেই, ইত্যাদি। এই কোডগুলো বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে সারাদেশে শ্রমিক সংগঠনগুলি প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। সম্প্রতি প্রায় তিন কোটি শ্রমিক ধর্মঘটে যোগ দিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ— শ্রমকোডগুলো শ্রমিকদের দাস-শ্রমিকে পরিণত করবে। তীব্র শ্রেণিআন্দোলনের চাপে দীর্ঘদিন কোডগুলি লাগু করতে পারেনি সরকার। যদিও সম্প্রতি বাংলা সহ পাঁচ রাজ্যের নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর কোডগুলি লাগু করা হয়েছে। রাজ্য বাজেটে অর্থমন্ত্রীর ওয়েলফেয়ার বোর্ডের প্রস্তাবটিকে এই প্রেক্ষাপটেই দেখতে হবে আমাদের। আমাদের দাবি ও প্রস্তাবিত ওয়েলফেয়ার বোর্ডের গঠন-কার্যপ্রণালী বহুদিন ধরে সিআইটিইউ-অনুমোদিত ‘অল ইন্ডিয়া গিগ ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন’ এবং নবগঠিত ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল গিগ ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন’ আগাগোড়া এই ওয়েলফেয়ার বোর্ড গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে। ধারাবাহিক আন্দোলন ও ডেপুটেশনের পর এবারের বাজেটের প্রস্তাব আমাদের দাবির ন্যায্যতারই স্বীকৃতি। কিন্তু প্রশ্ন— এই প্রস্তাব কি আবারও শুধু ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকবে? শ্রমিকদের এই আশঙ্কা সঙ্গত, কারণ কেন্দ্রে কর্পোরেট স্বার্থে শ্রমিকদের অর্জিত অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে, রাজ্য সরকারও সেই একই তালে কোমর নাচাচ্ছে। মৌখিক আশ্বাসের বদলে সত্যিই যদি কাজের কাজ করতে হয় তাহলে অবিলম্বে বিধানসভায় 'দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল গিগ অ্যান্ড প্ল্যাটফর্ম ওয়ার্কার্স (রেগুলেশন, এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার) বিল' পাস করানো প্রয়োজন। সেই আইনের ভিত্তি ব্যাতিরেকে বোর্ড গঠন মুখের কথাতেই আটকে থাকবে। ফলে আইনী ভিতেই গড়তে হবে ওয়েলফেয়ার বোর্ড। তার গঠন ও কার্যপ্রণালী সম্পর্কে বিস্তারিত প্রস্তাব নিম্নরূপ: প্রথম পর্যায়: আইনি সংজ্ঞা ও নিবন্ধন ১. কর্মী চিহ্নিতকরণ: আইনে স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে কারা গিগ কর্মী হিসেবে চিহ্নিত হবেন। পরিবহণ (বাইক, অটো, ক্যাব), ফুড অ্যান্ড গ্রোসারি ডেলিভারি, ই-মার্কেট পরিষেবা, প্রফেশনাল সার্ভিসেস, স্বাস্থ্যসেবা, কনটেন্ট ও মিডিয়া— এই সকল ক্ষেত্রের কর্মীদের সিডিউলে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ভবিষ্যতে নতুন যে কোনো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম-ভিত্তিক কাজও যেন সংজ্ঞার আওতায় আসে, তার বিধান রাখতে হবে। ২. নিয়োগকর্তাদের নিবন্ধন: রাজ্যে ব্যবসা করছে এমন সমস্ত এগ্রিগেটার বা প্রিন্সিপাল এমপ্লয়ার এবং থার্ড-পার্টি নিয়োগকর্তাদের বোর্ডের ডেটাবেসে বাধ্যতামূলক নিবন্ধন করতে হবে। প্রতিটি কোম্পানি, এজেন্সি ও মালিকের নাম, ঠিকানা, কার্যক্ষেত্র, কর্মীসংখ্যা ইত্যাদি তথ্য নথিভুক্ত করতে হবে। এই নিবন্ধন ব্যতীত কেউ রাজ্যে গিগ পরিষেবা পরিচালনা করতে পারবেন না, এমন আইনি বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে। ৩. কর্মীদের নিবন্ধন: বোর্ডে সমস্ত গিগ কর্মীর বাধ্যতামূলক নিবন্ধন করতে হবে। নিবন্ধনে কর্মীর নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর, আধার, কাজের ধরন, এক বা একাধিক নিয়োগকর্তার নাম, কাজ শুরুর তারিখ ইত্যাদি উল্লেখ রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে 'ন্যূনতম কতদিন কাজ করছেন'—এমন কোনো শর্ত রাখা যাবে না। নিবন্ধনের জন্য কোনো ফি ধার্য না করারই সঙ্গত। ৪. পরিচয়পত্র: নিবন্ধন সম্পন্ন হওয়ার পর বোর্ডের পক্ষ থেকে প্রতিটি কর্মীকে সচিত্র পরিচয়পত্র দিতে হবে। সেইসঙ্গে নিয়োগকর্তাদেরও কর্মীদের যথাযথ নিয়োগপত্র ও সচিত্র পরিচয়পত্র দেওয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে। দ্বিতীয় পর্যায়: বোর্ডের গঠন ৫. সদস্য গঠন: # রেজিস্ট্রার্ড ট্রেড ইউনিয়নের ৫ জন প্রতিনিধি (ট্রেড ইউনিয়নগুলির দ্বারাই মনোনীত) # নিয়োগকর্তাদের ৫ জন প্রতিনিধি (এগ্রিগেটার, প্রিন্সিপাল ও থার্ড-পার্টি এমপ্লয়ারদের মধ্য থেকে) # সচিব (শ্রম দপ্তর) — এক্স-অফিসিও সদস্য # সচিব (আইন বিভাগ) — এক্স-অফিসিও সদস্য # সচিব (অর্থ বিভাগ) — এক্স-অফিসিও সদস্য # মাননীয় শ্রমমন্ত্রী — এক্স-অফিসিও চেয়ারম্যান ৬. সভা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ: প্রতি চার মাসে অন্তত একবার বোর্ডের সভা করতে হবে। প্রয়োজনে জরুরি সভা আহ্বানের বিধান রাখতে হবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে চলবে, এবং কোনো বিষয়ে মতভেদ থাকলে তা লেবার কমিশনারেটে প্রেরণ করতে হবে। সেখানেও মীমাংসা না হলে শিল্প ট্রাইবুনালে পাঠানোর আইনি ব্যবস্থা থাকতে হবে। তৃতীয় পর্যায়: আর্থিক কাঠামো ও কল্যাণ তহবিল ৭. তহবিল গঠন: 'পশ্চিমবঙ্গ গিগ ও প্ল্যাটফর্ম কর্মী সামাজিক সুরক্ষা ও কল্যাণ তহবিল' তৈরি করতে হবে। তহবিলের উৎস— # রাজ্যে ব্যবসা করা সব নিয়োগকর্তার থেকে নির্দিষ্ট হারে গৃহীত সেস লেভি (বার্ষিক আয়ের একটি নির্দিষ্ট শতাংশ) # নিবন্ধিত কর্মীদের মাসিক ৫০ টাকা (স্বল্প আয়ের কর্মীদের জন্য ছাড়ের বিধান রাখতে হবে) # রাজ্য সরকারের বরাদ্দ # দান, অনুদান, উপহার ইত্যাদি ৮. তহবিলের ব্যবহার: এই তহবিল থেকে নিম্নলিখিত সুবিধা দেওয়া হবে— # মহিলা কর্মীদের মাতৃত্বকালীন সুবিধা (প্রসবপূর্ব ৫,০০০ ও প্রসবোত্তর ৫,০০০ টাকা) # দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুতে ৩ লক্ষ টাকা # সম্পূর্ণ অঙ্গহানিতে ২ লক্ষ টাকা # আংশিক অঙ্গহানিতে ১ লক্ষ টাকা # বাইক মেইনটেন্যান্সের জন্য বার্ষিক ১০,০০০ টাকা # সন্তানের শিক্ষাভাতা (সর্বোচ্চ দুটি সন্তানের জন্য শ্রেণি ১ থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত) # কমপক্ষে ৫ বছর নিবন্ধিত থাকলে হাউস লোনের সুবিধা # অন্যান্য জরুরি চিকিৎসা বা বিপর্যয় সহায়তা চতুর্থ পর্যায়: শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার ৯. সামাজিক সুরক্ষা: সমস্ত কর্মীকে EPF ও ESI-এর আওতায় আনার উদ্যোগ নিতে হবে। প্রচলিত EPF & MP Act ১৯৫২, ESI Act ১৯৪৮ ও Maternity Benefit Act ১৯৬১-এর নির্দেশনা অটুট রাখতে হবে। ১০. মৌলিক অধিকার: # গিগ কর্মীদের 'শ্রমিক' হিসেবে আইনি স্বীকৃতি দিতে হবে # ৮ ঘণ্টা কাজের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে # ৮ ঘণ্টা কাজের সাপেক্ষে আইনানুগ ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করতে হবে # কাজের সময়সীমা ও ওভারটাইমের স্পষ্ট বিধি তৈরি করতে হবে # একতরফা আইডি ব্লক বন্ধ করতে হবে, নির্দিষ্ট নোটিশ পিরিয়ড ও পেআউট নিয়ম তৈরি করতে হবে পঞ্চম পর্যায়: প্রশাসনিক কাঠামো ও স্বচ্ছতা ১১. কর্মী নিয়োগ: বোর্ডের কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য নিজস্ব অফিসার ও কর্মী নিয়োগ করতে হবে। তাঁদের বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুবিধার জন্য রাজ্য সরকারকে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ করতে হবে। ১২. অডিট ও জবাবদিহিতা: বোর্ডের হিসাব পরীক্ষা ও অডিট প্রতি বছর অডিটর জেনারেলের কার্যালয় দিয়ে করাতে হবে। বোর্ডের বার্ষিক প্রতিবেদন বিধানসভায় পেশ করতে হবে। ১৩. ইউনিয়নের সঙ্গে পরামর্শ: গিগ কর্মীদের নিবন্ধিত ইউনিয়নগুলির সঙ্গে বোর্ডকে নিয়মিত পরামর্শ করতে হবে। কোনো নীতি বা নিয়ম পরিবর্তনের আগে ইউনিয়নের মতামত নেওয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে। মোদ্দা কথাটা হল, ভাষণে রেশন মিলবে না। দীর্ঘ বাজেট বক্তৃতায় তিন লাইন উল্লেখ করলেই যে চিঁড়ে ভেজে না, একথা সরকার বাহাদুরও বিলক্ষণ জানেন। তবুও সম্পূর্ণ অসহায় মানুষ যেভাবে খড়কুটো ধরেই বেঁচে থাকতে চান, সেইভাবে এটুকুতেই ভরসা রাখতে চান রাজ্যের গিগ ও প্ল্যাটফর্ম কর্মীরা। সরকারকে সেই ভরসা জোগাতে হবে, অর্থমন্ত্রীর কথার দাম আছে কি-না সরকারকে প্রমান করতে হবে এবার। প্রকাশের তারিখ: ০৭-জুলাই-২০২৬ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |