|
গান শেষের গানবিজন ভট্টাচার্য |
বুঝতাম জীবনটা যাপন করার ব্যাপারেই একটা সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। চিরায়ত সংকট। তবু যে যখন এই সংকটে পড়ে তার কাছে তখন এটা মহাসংকট। সংকট উভয়ত। প্রাণেরও, প্রাণীরও। তারপরই কলকাতার পথে-প্রান্তরে দেখি এক নচিকেতার বিশৃঙ্খল অবিসংবাদী পদযাত্রা। অমৃতের সন্ধানে চূড়ান্ত আত্মপীড়ন। এবং সেই হনন প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নিজেকে বস্তুর এলিমেন্টাল অধিষ্ঠানে ফিরে পাওয়া। যুগসন্ধির এই সংক্রান্তি তিথিতে এই কাপালিকব্রতও মিথ্যার সত্য। ঈপ্সিত যখন সোনার পাথুরে বাটি, তখন সবটাই অংকের হিশেবে আসতে বাধ্য। কালের হিশেবে সবটাই ঘটনা। |
[ঋত্বিক ঘটকের শতবর্ষ উপলক্ষ্যে গতবছর মার্কসবাদী পথের ইউটিউব চ্যানেলে দুটি সাক্ষাৎকার সম্প্রচারিত হয়েছিল। কথা বলেছিলেন চলচ্চিত্র বিদ্যার দুই অধ্যাপক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় ও মানস ঘোষ। এ-বছরে আমরা তিনটি লেখা পুনর্মুদ্রিত করছি। প্রথম লেখাটি বিজন ভট্টাচার্যের। দ্বিতীয় লেখাটি রণেশ দাশগুপ্তের। এ-দুটি লেখাকে পরিপূরক বলা চলে এক অর্থে। একদা সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন ঋত্বিকের মধ্যে হলিউডের প্রভাব নেই, এবং তিনি প্রকৃত অর্থে বাঙালি। আর ঋত্বিকও আজীবন রত থেকেছেন ভারতীয় চলচ্চিত্র-ভাষা সৃষ্টিতে। যদিও তাঁর আরেক কমরেড মৃণাল সেন এ-প্রসঙ্গে ভিন্ন মতই পোষণ করতেন; তাঁর কাছে চলচ্চিত্রের ভাষা আন্তর্জাতিক। ঋত্বিকের মতো বিজন ভট্টাচার্যও ভারতীয় নাটকের ফর্ম খুঁজে বেরিয়েছেন। ফলে তাঁদের শিল্প-ভাবনার মধ্যে সখ্য রয়েছে। রণেশ দাশগুপ্ত তাঁদের সৃষ্টিতে ‘গ্রেট মাদার আর্কেটাইপ’-র ব্যবহার বিষয়ে আলোচনা করেছেন। রণেশ দাশগুপ্তের অভিমত নিয়ে কেউ ভিন্ন মত পোষণ করতে-ই পারেন; সে-বিষয়ে বিতর্ক ঋত্বিক ও বিজন চর্চাকেই সমৃদ্ধ করবে। ঋত্বিক বিষয়ে কতকগুলো কথা ভেসে বেড়ায়, সেগুলিকে ছানবিন করেছেন বাসব দাশগুপ্ত, এবং তাঁর অ-জনপ্রিয় অভিমত স্বাভাবিকভাবেই উসকে দেবে বিতর্কের সম্ভাবনা। পরের অংশে বাসব দাশগুপ্ত অভিনিবেশ দিয়েছেন মার্কস এবং ইয়ুং বিষয়ে ঋত্বিকের অভিমত নিয়ে। সত্যি-ই কি ইয়ুং এবং মার্কসকে মেলানো যায়? এ-নিয়েও বাসব দাশগুপ্ত তাঁর অভিমত জানিয়েছেন। সামগ্রিকভাবে ঋত্বিককে তাঁরা কীভাবে দেখেছেন, পড়েছেন, তর্ক করেছেন সেটিকেই তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। –মার্কসবাদী পথ] ঋত্বিক সম্পর্কে শিল্পগত এইসব কথা আজ সে নেই বলেই অবান্তর নয়। কেন-না তার শিল্পকর্ম তত্ত্বগতভাবে এইসব অনুসন্ধানের অপেক্ষা রাখে। ব্যাকরণগত ভুলভাল বাদ দিলে তার ছবির একটা দিক আছে যেটাকে সত্যজিৎবাবু বলেন, anthropomorphism (মানুষই ভগবান)। সেটা শিল্পগতভাবে আমাদের দেশে Romance of Film Art-এর বিষয়গত হতে পারে । অযান্ত্রিক ছবিটির কথাই বলি। ধুলোর ঝড় ও জলের ছড়া— ফিল্ম তৈরির একটি সুচারু প্রতীকের মাধ্যমে সামনের পথের নিদারুণ বিপত্তির আভাস দিয়ে বিমলের জগদ্দল তো রওনা হয়ে গেল। ভাঙা সানকিতে পাগলের এক সাংকেতিক তবলা লহরা শুনলাম আমরা। জীবনের চড়াই-উৎরাই ধরে বিমলেরা যেমন শোনে। চমৎকৃত হলাম আমরা। কিন্তু পরে সেই জগদ্দলকেই দেখি এক জায়গায় পাহাড়িয়া পথ ধরে খাড়াই থেকে ‘ব্যাক’ করে, ‘কোমা’য় আচ্ছন্নপ্রায়, দুর্বার গতিতে নিচে নেমে আসছে। ড্রাইভার বিমল তখনও স্টিয়ারিঙে ঘর্মাক্ত কলেবর। কিন্তু অবরোহণ অনিবার্য হল। আমি কিন্তু দেখলাম আর-এক অপরাহত বিমল, ঋত্বিককে; জগদ্দলের দুদিকে তার লম্বা ঠ্যাং ফাঁক করে দাঁড়িয়ে দুর্বার গতিতে জনতার মধ্যে নেমে আসছে। An ascent in the great fall. If at all to crash, crash into the consciousness of the people. Dialectically conscious perspective. যন্ত্রেরই জয়গান। কিন্তু কৃষিভিত্তিক জনক রাজার দেশে যন্ত্রের নোটেশন এখানে অবরোহণের পর্দায় বিধৃত। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে যন্ত্র ও যন্ত্রী, দুজনেরই মঙ্গল। তথা আরোহণপর্বে তাই আমাদের সকলেরই প্রায় অল্পবিস্তর বিমলের দশা। শিল্পের সত্যি কিন্তু বিমল ও জগদ্দল— দুটোকেই অতিক্রম করে। দ্বান্দ্বিক দৃষ্টিকোণ কি শুধু আরোহণের পর্দা জুড়ে? না, আরোহণ-অবরোহণ দুটোকেই সমানভাবে গণ্য করে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত সেই সত্য মানুষের সজ্ঞান চৈতন্যের অধিষ্ঠানে? ঋত্বিকের ছবি সম্পর্কে শিল্পগত মতামত আমার খানিকটা এই ধরনের। A conscious perspective, rooted in the collective unconscious. Anthropomorphism, myth, symbol, archetypal slant, juxtaposed images— সবই এই দৃষ্টিকোণ থেকেই শিল্পসঙ্গতভাবে কম-বেশি সব ছবিতেই ছড়ানো-ছিটানো। আমার সঙ্গে তার ছিল একটা ভালোবাসার সম্পর্ক। শিল্পসম্মত আলোচনা করেছি, এমন একটি রাতের কথাও আমার মনে পড়ে না। যা হয়েছে সবই কথার কাটুমকুটুম। অমনটি আর জমবে না ঠিকই। কিন্তু অমন জমানো অনেকেই জমায়। হাতে হয় তো কিছুই থাকে না। দুঃখ যা, তা এই হাতে-শূন্যের গ্লানিতেই। তবু জানি, ভালোবাসা বেঁচে থাকবে। ঋত্বিকের ছবিতেই বেঁচে থাকবে। প্রজাপতির ডানায় ভালোবাসা যতদিন কাঁপবে। প্রথম প্রকাশ- চিত্রভাষ, জানুয়ারি-মার্চ ১৯৭৬ প্রকাশের তারিখ: ০২-নভেম্বর-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |