|
গান্ধীজির রাম নেই রামমন্দিরেসুদর্শন আয়েঙ্গার |
|
১৯৪৮ সালে গান্ধীজি যখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তখন তিনি উচ্চারণ করেছিলেন ‘হে রাম’। একেবারে ছেলেবেলা থেকেই মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর ওপর প্রভাব ছিল প্রভু রামের। মহাত্মা তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, জন্মসূত্রেই যেহেতু তিনি ছিলেন বৈষ্ণবমতে বিশ্বাসী, সেকারণে রাম ও কৃষ্ণমন্দির দর্শন করা ছিল তাঁর অভ্যাস। কিন্তু মন্দির দর্শন বালক গান্ধীর মধ্যে বিশ্বাসের বীজ বপন করতে পারেনি। তিনি লিখেছেন, ‘আমি মন্দিরে যা পাইনি, তা আমি পেয়েছিলাম আমার ধাত্রীর কাছ থেকে, বাড়ির পুরনো ভৃত্য… রম্ভা, ওটাই ছিল তার নাম। রম্ভা বলেছিল ভয় তাড়াতে হলে বার বার রাম-নাম (রামের নাম) উচ্চারণ করতে হবে।’ তাঁর বাকি জীবনে এটাই হয়ে উঠেছিল একেবারে অব্যর্থ ঔষধ। তবে এখানে যে রাম-নামের কথা গান্ধীজি বলছেন সেটা আদৌ মন্দিরে অবস্থানকারী কোনও মূর্তি নয়, কিংবা ধর্মীয় আচার বা প্রথা হিসাবে রাম-নাম জপ করা নয়। বরং, এটা ছিল এমন একটা অনুভূতি যার স্থান ছিল তাঁর হৃদয়ের গভীরে। শিকড় আধ্যাত্মিকতায় গান্ধীজি ধর্মকে রাজনীতিতে নিয়ে এসেছিলেন। তবে তাঁর ধর্মের শিকড় প্রসারিত ছিল আধ্যাত্মিকতায়। তাঁর দ্য মরাল অ্যান্ড পলিটিক্যাল থট অফ মহাত্মা গান্ধী বইয়ে গান্ধী-বিষয়ে বিশেষজ্ঞ রাঘবন আয়ার লিখেছেন, গান্ধীজি চেয়েছিলেন রাজনীতিকে ধর্মীয়ভাবাপন্ন করে তুলতে এবং ধর্মকে ব্যবহারিক (প্র্যাকটিক্যাল) করে তুলতে। এই প্রয়াসে তিনি ভারতীয় ঐতিহ্যের একটি অবহেলিত সূত্রকে ভিত্তি করেছিলেন– সেটি হল কর্মযোগের পথ, বা সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক উপলব্ধির পথ। এটা ছিল এমন কর্মকাণ্ড যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন রাম এবং জনকের মতো চিরায়ত নায়কেরা। আধুনিক ভারতে এই শক্তিকেই পুনঃসঞ্জীবিত করেছিলেন বিবেকানন্দ ও অরবিন্দ। গান্ধীজির কাজের লক্ষ্য ছিল রাজনীতিকে পরিশুদ্ধ করা। আনুষ্ঠানিক ধর্মেরও সংস্কার করতে চেয়েছিলেন তিনি। তাঁর ভাবনা ও আলোচনায় তিনি রাম, রাম-নাম, রামরাজ্য শব্দগুলিতে নতুন অর্থ সংযোজিত করেছিলেন। প্রার্থনার আদলে তাঁর অন্তরের গভীর অন্তস্থল থেকে রাম-নাম আবৃত্তির মধ্যে দিয়ে ক্রমাগত আত্ম-শুদ্ধি করা, এটাই ছিল তাঁর নিজের পথ চলা। . ১৯৩৩ সালের ১৮ মার্চের হরিজন পত্রিকায় গান্ধীজি ‘প্রচলিত ধর্মে অবিশ্বাসী একজন স্কুলশিক্ষকের’ তোলা তিনটি প্রশ্নের উল্লেখ করেন এবং সেগুলির উত্তরও দেন। প্রথম প্রশ্নটি ছিল: শ্রী রামচন্দ্রের জীবনকে অনুসরণ করে একজন হিন্দুর পক্ষে মন্দিরে গিয়ে তাঁর মূর্তি দর্শন কি খুব প্রয়োজন? কর্মের তুলনায় দর্শন কি বেশি ভাল কাজ? দ্বিতীয় প্রশ্ন: ‘যখন কোনও জীবিত ব্যক্তির সামনে আমরা মাথা নত করি কিংবা হাত জোড় করি, তখন তিনি প্রত্যুত্তর দেন। কিন্তু দেবমূর্তি কোনও উত্তর দেয় না। তাহলে মূর্তির সামনে মাথা নোয়ানো কিংবা হাত জোড় করে লাভ কী? যিনি কখনই কোনও উত্তর দেন না তাঁকে চিঠি লেখার দরকারই বা কী’? তৃতীয় প্রশ্ন: ‘একজন ব্যক্তি, যাঁর মূর্তি হিন্দুদের কাছে আদরণীয়, তিনি তাঁর জীবনকালে কিছু ভুল করে ফেলতেও পারেন। সেই ভুলগুলির যদি অনুকরণ করা হয়, বিশেষত যিনি সেই ব্যক্তির মূর্তি পূজা করেন তাঁর পক্ষে ভুলগুলিও অনুকরণ করার সম্ভাবনা প্রবল। সেক্ষেত্রে মূর্তি যাঁর কাছে আদরণীয় তাঁরও ক্ষতি হবে না কি’? (দ্য কালেক্টেড ওয়ার্কস অফ মহাত্মা গান্ধী, ভল্যুম ৫৪, পৃষ্ঠা ১১১-১১২, আর্ট. ১২৫-পোসারস)। গান্ধীজি মনে করতেন, রামের স্থান হওয়া উচিত নিজের অন্তরে, এবং মূর্তির মধ্যে খুঁজে বেড়ানোটা দুঃখজনক। তবুও সেই ‘সরল বিশ্বাস’, যা রামকে দেখেছে অন্তরে নয়, শুধুমাত্র মন্দিরে, তাঁকে গান্ধীজি কোনওভাবেই বাধা দেবেন না। এক্ষেত্রে গান্ধীর প্রতিক্রিয়া এরকম: ‘রামচন্দ্রের (মূর্তি) পুজো করার জন্য কোনও হিন্দুর পক্ষে মন্দিরে যাওয়াটা প্রয়োজনীয় নয়। কিন্তু মন্দিরে গিয়ে রামচন্দ্রের মূর্তি না দেখলে যিনি তাঁর রামকে ভাবনাতেই আনতে পারেন না, তিনি মন্দিরে যেতে পারেন। এই ব্যাপারটা হতে পারে দুঃখজনক, কিন্তু এটা তো সত্যি যে ওই ব্যক্তির রাম অবস্থান করেন ওই মন্দিরেই এবং আর অন্য কোথাও নন। এই সরল বিশ্বাসে আমি বাধা দেব না।’ তবে দর্শনের চেয়ে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল কর্ম বা কাজ। নিঃশব্দে পূজা করা মানে ঈশ্বরের কাছে চিঠি লেখা। ঈশ্বর শুধুই মন্দিরে নেই। গান্ধী লিখেছিলেন যে, মন্দির, মসজিদ এবং গির্জার মধ্যে তিনি কোনও ফারাক করেননি। তৃতীয় প্রশ্নের উত্তরে তিনি লিখেছিলেন, ‘যদিও আমার যুক্তিবোধ এবং অন্তর দিয়ে অনেক আগেই আমি উপলব্ধি করেছিলাম যে, ঈশ্বরের সর্বোচ্চ গুণাবলি এবং নামই হল সত্য, তাহলেও আমি সত্যকে চিনি রামের নামেই। আমার জীবনের পরীক্ষার সবচেয়ে অন্ধকার পর্বেও , ওই একটাই নাম আমাকে রক্ষা করেছে এবং এখনও রক্ষা করে চলেছে’। (দ্য কালেক্টেড ওয়ার্কস অফ মহাত্মা গান্ধী, ভল্যুম ৫৪, পৃঃ ১১২)। গান্ধীজির সব বক্তৃতা, লেখা নিবন্ধ ও চিঠিতে, রাম, রাম-নাম, এবং তুলসিদাসের রামচরতিমানস (রামায়ণ)-এর উল্লেখ রয়েছে, এনিয়ে মন্তব্য রয়েছে এবং হাজার বার সাহায্য চেয়ে তিনি রামের কাছ আর্তি জানিয়েছেন । গান্ধীজির রাম গান্ধীজির রাম কে? তিনি কি হিন্দুদের দেবতা? বেশ কয়েকবার তিনি এই বিষয়টির স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন। দিল্লির বিড়লা হাউজে ১৯৪৬ সালের ৪ এপ্রিল প্রার্থনার জন্য মিলিত হয়ে তিনি এই কথাগুলি বলেছিলেন। ‘যখন কেউ বলেন যে রাম কিংবা রামনাম সুর করে গাওয়াটা শুধুমাত্র হিন্দুদের জন্য, এবং মুসলমানরা (মুসলিম) কী করে এতে অংশ নিতে পারেন, তখন মনে মনে আমি হাসি। তাহলে কি মুসলমানদের একজন আলাদা ঈশ্বর, হিন্দুদের, খ্রিস্টানদের, পার্সিদের সব আলাদা আলাদা ঈশ্বর? না। ঈশ্বর একজনই। তিনি সর্বশক্তিমান এবং সর্বত্র বিরাজমান। ঈশ্বরের একাধিক নাম,আমরা সবাই তাঁকে সেই নামেই মনে রাখি তাঁর যে নামটা আমাদের কাছে সুপরিচিত। আমার রাম, আমাদের প্রার্থনার রাম, তিনি অযোধ্যার রাজা দশরথের পুত্র ঐতিহাসিক রাম নন। আমার রাম শ্বাশত, তিনি অজাত, তিনি একমেবাদ্বিতীয়ম। একমাত্র সেই রামকেই আমি পূজা করি, একমাত্র তাঁর সাহায্যই আমি কামনা করি, এবং আপনাদেরও তা করি উচিত। তাই আমি এর কোনও কারণ দেখি না যে, কেন একজন মুসলমান, কিংবা অন্য কেউ তাঁর নাম নিলে আপত্তি করতে হবে। আবার এরও কোনও বাধ্যতা নেই যে, তাঁকে ঈশ্বরকে রামনামেই চিনতে হবে। কেউ একজন মনে মনে উচ্চারণ করতে পারেন আল্লা বা খুদা। শুধু দেখতে হবে যাতে শব্দের সুরসঙ্গতির বিকৃতি না ঘটে। (দ্য কালেক্টেড ওয়ার্কস অপ মহাত্মা গান্ধী, ভল্যুম ৮৩, পৃঃ ৩৬৪)। ভারতে যেখানে বহু ধর্মে বিশ্বাসী মানুষজন বাস করেন এবং যেখানে হিন্দু-মুসলিম সংঘর্ষ শতাধিক বছরের পুরনো, এবং এই বিভেদকে ব্রিটিশ যেখানে পরিকল্পিত উপায়ে গভীরতর করে করে তুলেছে, সেই রকম পরিস্থিতিতে রামকে রোল মডেল হিসাবে তুলে ধরা এবং ভারতের সব দুর্ভোগের অবসান হবে রামনামে– একথা বলার যে গভীর ও গুরুতর তাৎপর্য রয়েছে গান্ধীজি সেটা বিলক্ষণ জানতেন। তাই তিনি সর্বদা সতর্ক থেকে মন্দির, মসজিদ বা গির্জায় যেতেন না। তবে হিন্দু ঐতিহ্যের এবং যে ধর্মে তাঁর জন্ম হয়েছিল সেই ধর্মের প্রতীক তিনি ব্যবহার করতেন। ভোপালে ১৯২৭ সালের এক জনসভায় তিনি বলেছিলেন, ‘আমি যে রামরাজ্য শব্দটা ব্যবহার করছি সে বিষয়ে আমার মুসলমান বন্ধুরা যাতে ভুল না বোঝেন সে বিষয়ে আমি তাঁদের সতর্ক করে দিচ্ছি। আমি হিন্দু রাজের কথা বোঝাতে চাইছি না। রামরাজ্য কথাটার মধ্যে দিয়ে আমি বোঝাতে চাইছি একটা স্বর্গীয় রাজ্য, ঈশ্বরের রাজ্য। আমার কাছে রাম এবং রহিম এক এবং অভিন্ন দেবতা। আমি অন্য কোনও ঈশ্বরকে মানি না, মানি শুধু সেই এক অখণ্ড ঈশ্বরকে যিনি সত্য ও ন্যায়পরায়ণতার ঈশ্বর।’ রাজনীতিতে এবং জনজীবনে এটাই ছিল গান্ধীজির ধর্ম। গান্ধী আরও লিখেছিলেন, ‘আমার কল্পনায় যে রাম আছেন তিনি কোনওদিন কখনও এই জগতে বাস করেছিলেন কী করেননি জানি না, তবে রামরাজ্যের প্রাচীন যে আদর্শ নিঃসন্দেহে তা একটা সত্যিকারের গণতন্ত্র। সেই গণতন্ত্রে এমনকি দরিদ্রতম নাগরিকও এবিষয়ে নিশ্চিত থাকতে পারেন যে,একটা বহু বিস্তৃত এবং বিপুল খরচ সাপেক্ষ পদ্ধতি ব্যতিরেকেই তিনি দ্রুত ন্যায়বিচার পাবেন। এমনকী কবি একথারও বর্ণনা দিয়েছেন যে, একটা কুকুরও রামরাজ্যে ন্যায়বিচার পেয়েছিল।’ আজকের পরিস্থিতি আজকের পরিপ্রেক্ষিতে গান্ধীজির রাম, রামনাম এবং রামরাজ্যকে স্মরণ করা খুবই দরকার। গান্ধীজি যে আদর্শের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, ঠিক তার বিপরীত বিষয়টি হল ধর্মের রাজনীতিকরণ। এটা আমাদের দেশের পক্ষে মোটেই ভাল নয়। যে দেশটা সংবিধানসম্মতভাবে ধর্মনিরপেক্ষ, সেদেশে যখন সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ভিত্তিতে রামমন্দির স্থাপন করা হচ্ছে, তখন সেদেশের প্রধানমন্ত্রীর উচিত ছিল প্রচুর শুভেচ্ছাবার্তা পাঠানো। ভারত নিজেকে বহুধর্মের এবং বহু সংস্কৃতির দেশ বলে দাবি করে। সেদেশে প্রধানমন্ত্রী যদি একটামাত্র ধর্মের পক্ষে দাঁড়ান, তাঁর নিজের ধর্ম, বিশ্বাস এবং নিষ্ঠা যাই হোক না কেন, তখন তাতে আদৌ কোনও স্বাস্থ্যকর বার্তা যায় না। এটা এমন এক জায়গায় উৎসব পালন যেখানে সম্ভবত গান্ধীজির রামকে খুঁজে পাওয়া যাবে না।
সূত্র: দ্য হিন্দু, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ লেখক গান্ধী বিশেষজ্ঞ এবং আমেদাবাদের গুজরাট বিদ্যাপীঠের প্রাক্তন সহ উপাচার্য। ১৯২০ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থাপন করেছিলেন মহাত্মা গান্ধী। এছাড়া অন্যদের সঙ্গে মিলে ‘অ্যাবান্ডান্ট লাভ’ নামে একটি বইও লিখেছেন তিনি। বইটা হল ব্রিটেনের স্যুমাখার কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সতীশ কুমারের সঙ্গে একটা দীর্ঘ কথপোকথন। ভাষান্তর: সুচিক্কণ দাস প্রকাশের তারিখ: ০৩-মার্চ-২০২৪ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |