মোদী সরকারের নির্লজ্জতার মুখোশ খুলে দিয়েছে গাজা

প্রকাশ কারাত
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতিটি আন্তর্জাতিক সংস্থা যারা সেখানে মানবিক ত্রাণের কাজ করছে এবং রাষ্ট্রসঙ্ঘ বারে বারে সতর্ক করে আসছে যে, গাজা গণ-অনাহারের শিকার এবং সেখানে দুর্ভিক্ষের ছায়া ঘনাচ্ছে। এমনকী পশ্চিমী মিডিয়া, যারা সাধারণত ইজরায়েলের দিকে ঝুঁকে কথা বলে, তারাও গত এক পক্ষকাল ধরে সংবাদের শিরোনামে নিয়ে আসছে গাজায় কী বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। বিবিসি, সিএনএন এবং ইউরোপিয়ান টেলিভিশন নেটওয়ার্ক তুলে ধরছে কঙ্কালসার সব কোলের শিশু এবং মুমূর্ষু বাচ্চাদের ছবি।

মোদী সরকারের লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যাওয়া উচিত। অবশ্য লজ্জা বলে এই সরকারের কোনও বোধ আদৌ যদি এখনও থেকে থাকে। সারা বিশ্বের চোখের সামনে উন্মোচিত হচ্ছে ভয়ংকর ও সহ্যের অতীত এক দৃশ্য। গাজায় হাজার হাজার মানুষ অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন। অপুষ্টি ও ক্ষুধায় শেষ হয়ে যাচ্ছে কোলের শিশু আর বাচ্চারা। এরা সবাই দল বেঁধে মৃত্যুর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে রয়েছে।

ইজরায়েলের ২১ মাসের যুদ্ধ গাজাকে গণহত্যার বধ্যভূমিতে পরিণত করেছে। সেই গণহত্যা করা হচ্ছে গাজাকে নিরন্ন, অভুক্ত রেখে। তাতেও বিজেপি শাসকদের বিন্দুমাত্র হেলদোল নেই। একটা গোটা জনগোষ্ঠীকে অনাহারে রেখে দেওয়ার যে ইজরায়েলি কৌশল, তা নিয়ে কোনও প্রতিবাদ কিংবা এই ঘটনার নিন্দা করে একটা বিবৃতি পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও তার ঘনিষ্ঠ পার্শ্বচরেরা ৯ মার্চ থেকে গাজা ভূখণ্ডে সবরকম খাদ্য ও জরুরি সরবরাহ বন্ধ করার মতো জঘন্য অপরাধের যে-পরিকল্পনা কার্যকর করছে, সেজন্য তাদের নিন্দা করার ভাষা পর্যন্ত নেই। গাজায় এক কণা খাবারের সন্ধানে ক্ষুধার্ত লোকেরা ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তারই মধ্যে ইজরায়েলি সেনারা সেখানকার অসামরিক মানুষের ওপর নির্বিচারে এবং নিষ্ঠুরভাবে ক্রমাগত বোমাবর্ষণ করে চলেছে। ইজরায়েল-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি করা চারটে লোক-দেখানো খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রে এক অবর্ণনীয় দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। হাজার হাজার ক্ষুধার্ত মানুষ এই কেন্দ্রগুলির গেটে জড়ো হচ্ছেন। এবং সেখানেই তাদের গুলি করে হত্যা করছে ইজরায়েলের সেনারা। এমনই ভয়ংকর দৃশ্যের অবতারণা হচ্ছে সেখানে। গাজার বাসিন্দাদের সামনে এখন খোলা আছে দুটো পথ– হয় অনাহারে মৃত্যু, নয়ত খাবারের সন্ধানে গিয়ে মৃত্যু।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতিটি আন্তর্জাতিক সংস্থা যারা সেখানে মানবিক ত্রাণের কাজ করছে এবং রাষ্ট্রসঙ্ঘ বারে বারে সতর্ক করে আসছে যে, গাজা গণ-অনাহারের শিকার এবং সেখানে দুর্ভিক্ষের ছায়া ঘনাচ্ছে। এমনকী পশ্চিমী মিডিয়া, যারা সাধারণত ইজরায়েলের দিকে ঝুঁকে কথা বলে, তারাও গত এক পক্ষকাল ধরে সংবাদের শিরোনামে নিয়ে আসছে গাজায় কী বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। বিবিসি, সিএনএন এবং ইউরোপিয়ান টেলিভিশন নেটওয়ার্ক তুলে ধরছে কঙ্কালসার সব কোলের শিশু এবং মুমূর্ষু বাচ্চাদের ছবি।

এমনকী ইউরোপে যারা ইজরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র, যারা এতদিন গাজায় ইজরায়েলের যুদ্ধকে সমর্থন করে আসছিল, তারাও গাজায় ইজরায়েলের খাদ্য ও জরুরি সরবরাহের পথ অবরুদ্ধ করে রাখার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। এর আগে স্পেন, আয়ার্ল্যান্ড ও বেলজিয়াম গাজায় নিরবচ্ছিন্নভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার বিরোধিতা করেছে দৃঢ়ভাবে। এবং ইজরায়েলের যুদ্ধ উদ্যোগ থেকে নিজেদের দূরত্ব বাড়ানোর লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কিন্তু গাজায় মানবিক বিপর্যয়ের পর এবং জনমত ক্রমাগত ইজরালের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠায়– যে-ত্রিশক্তি এতদিন ইজরায়েলের প্রধান সমর্থক ছিল– সেই ব্রিটেন, জার্মানি ও ফ্রান্স– তারাও ইজরায়েলের যুদ্ধের নামে গণহত্যা চালানোর নীতি থেকে, বিশেষ করে খাদ্য সরবরাহ এবং মানবিক সরবরাহ পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত থেকে দূরত্ব তৈরি করার লক্ষ্যে সীমাবদ্ধ কিছু পদক্ষেপ করতে শুরু করেছে। 

২৫ জুলাই ফ্রান্স, জার্মানি এবং ব্রিটেনের নেতারা অনলাইনে একটা জরুরি বৈঠক করেন এবং গাজায় অবিলম্বে খাদ্য ও অত্যাবশ্যকীয় পণ্য সরবরাহ চালু করার কথা বলেন। তাঁদের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘অসামরিক জনগণের জন্য অত্যাবশ্যকীয় মানবিক সহযোগিতা আটকে রাখাকে মেনে নেওয়া যায় না।’ রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য ফ্রান্স প্রথম ইউরোপীয় দেশ, যারা প্যালেস্তিনীয় রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই ঘোষণা কার্যকর হবে সেপ্টেম্বর থেকে। ব্রিটেনের কিয়ের স্টারমার সরকার এখন একই পথে হেঁটে একথা ঘোষণা করেছে যে সেপ্টেম্বরে তারাও প্যালেস্তিনীয় রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেবে, যদি ইজরায়েল যুদ্ধবিরতি চুক্তি এবং দুই রাষ্ট্রের সমাধান সূত্র না-মানে। লেবার পার্টির সরকার এমন অবস্থান নিতে বাধ্য হয়েছে বিপুল জনমতের চাপে এবং দলের ২৫০ জনের বেশি এমপি দাবি করেছেন যে প্যালেস্তিনীয় রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিতে হবে। এখন ইজরায়েল গাজায় আকাশ থেকে খাদ্য ফেলার বিষয়টি মেনে নিয়েছে এবং তার জেরে বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ– যার মধ্যে পড়ছে স্পেন, জার্মানি এবং ফ্রান্স– তারা আকাশপথে খাদ্য পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে। এগুলো একেবারেই প্রতীকি পদক্ষেপ। কারণ ইউনাইটেড নেশনস রিলিফ অ্যান্ড ওয়ার্ক এজেন্সি (ইউএনআরডব্লিউএ) জানিয়েছে, আকাশ থেকে খাদ্য ফেলা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সাহায্য পাঠানোর খুবই অদক্ষ একটা উপায়। স্থলপথে স্থায়ী ও অনেক দিন পর্যন্ত জারি থাকতে পারে সরবরাহের এমন রাস্তাই সবচেয়ে ভালো, যা একমাত্র নিশ্চিত করা যেতে পারে যুদ্ধবিরতি মারফৎ। সেটা না-হলে আকাশপথে খাদ্য সরবরাহ মানে স্রেফ নজর ঘোরানোর চেষ্টা। 

যুদ্ধের নামে ইজরায়েল গাজায় যে-গণহত্যা চালাচ্ছে সে-বিষয়ে পশ্চিমী দেশগুলি তাদের মনোভাব এখন বদলাতে বাধ্য হচ্ছে। বিপরীতে ভারতের অবস্থান একেবারে স্তম্ভিত করার মতো। গত এক পক্ষকালে গাজায় মানবিক সংকট যখন আরও তীব্র হয়েছে, তখনও মোদী সরকারের তরফে কোনও সাড়াশব্দ নেই। ইজরায়েল যে-অমানবিক অবরোধের নীতি নিয়ে চলেছে তার সমালোচনা কিংবা নিন্দা করে বিদেশমন্ত্রক একটা বিবৃতিও দেয়নি। প্রধানমন্ত্রী মোদী তাঁর বন্ধু নেতানিয়াহুকে ফোনে এটুকুও অনুরোধ করেননি যাতে গাজায় বিনা বাধায় সব কিছু সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয় এবং যাতে অন্তত মানুষের জীবন বাঁচে। আমরা যা পেয়েছি তা রাষ্ট্রসঙ্ঘের ফোরামে কিছু গৎবাঁধা বিবৃতি। গত সপ্তাহের আলোচনায়, রাষ্ট্রসঙ্ঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি শুধু বলেছেন মানবিক সহায়তা গাজায় পৌঁছনো উচিত। প্যালেস্তাইন প্রশ্নের শান্তিপূর্ণ সমাধান বিষয়ে উচ্চ-পর্যায়ের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ২৯ জুলাই ভারতের রাষ্ট্রদূত হরিশ পি জোর দিয়ে বলেছেন, ‘গাজায় প্যালেস্তিনীয়দের অবশ্যই বিনা বাধায় খাদ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদাগুলি পাওয়ার সুযোগ থাকতে হবে।’ অথচ, এটা খুবই স্পষ্ট যে, মোদী সরকার এই বার্তা ইজরায়েলের সরকারের কাছে পৌঁছে দেয়নি। একথাও স্মরণে রাখা উচিত যে, ১৩ জুন সাধারণ পরিষদে গাজায় আশু ও নিঃশর্ত যুদ্ধবিরতি ঘোষণার আহ্বানে সাড়া দিয়ে এই সমস্যা সমাধানের পক্ষে ভারত ভোটদানে অস্বীকার করেছে।

মানবিকতার এই অভাব ও নৈতিক দেউলিয়াপনা থেকে যে কথা বোঝা যায় তা হল, গাজায় ইজরায়েল যে যুদ্ধ চালাচ্ছে মোদী সরকার তার সঙ্গেই আছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ইজরায়েল যে আগ্রাসন শুরু করেছে একবারও তার নিন্দা করেনি এই সরকার। শুধু এই আবেদন জানিয়ে গেছে যে, নির্বিচারে অসামরিক জনগণ যেন হামলার শিকার না-হন। গোটা যুদ্ধের পর্ব জুড়ে, ভারত ইজরায়েলে অস্ত্র ও বিস্ফোরক রপ্তানি করে গেছে। দেশের মধ্যে, বিজেপি ও আরএসএসের নেতৃত্বে হিন্দুত্ববাদী শক্তিগুলি গাজার জনগণের বিরুদ্ধে ইজরায়েলের যুদ্ধকে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে, বিশেষত ‘মুসলিম সন্ত্রাসবাদ’-এর বিরুদ্ধে লড়াই হিসাবে চিত্রিত করে গেছে। হিন্দুত্ববাদীদের কাছে, ইজরায়েল হল অনুকরণ করার মতো মডেল। মতাদর্শগত ভাবে জায়নবাদ ও হিন্দুত্ববাদ হল হরিহর আত্মা। ইজরায়েলকে সমর্থন করে মোদী সরকারের অবস্থান নানা স্তরে প্রতিফলিত হয়েছে। কর্পোরেট মালিকানাধীন ইংরেজি ও হিন্দি টেলিভিশন চ্যানেলগুলি গাজার মানুষদের অনাহারে থাকা এবং যন্ত্রণার দৃশ্যগুলি একেবার আড়াল করে রেখেছে যা অত্যন্ত অপমানজনক। অথচ একই ছবি ভালোভাবে তুলে ধরছে পশ্চিমী মিডিয়াগুলি। 

এমনকী বিচার ব্যবস্থার উচ্চস্তরের একটি অংশ সেই একই মনোভাব দেখাচ্ছে। গাজায় প্যালেস্তিনীয় জনগণের সমর্থনে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অনুমতি দেয়নি পুলিশ। বোম্বে হাইকোর্টের রায় পুলিশি সিদ্ধান্তের পক্ষে গেছে। এর সঙ্গে ওই বেঞ্চের প্রধান বিচারপতি যা বলেছেন তা স্তম্ভিত করার মতো এবং বিপজ্জনক। ওই বিচারপতি বলেছেন যে আবেদনকারী সিপিআই(এম)-এর দেশপ্রেমী হওয়া উচিত এবং দেশের নাগরিক সমস্যাগুলি নিয়ে কাজ করা উচিত এবং আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে সিপিআই(এম)এর মাথা ঘামানোর দরকার নেই। তাঁর কথা হল, বিদেশ নীতির ভার কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত এবং প্যালেস্তাইন কিংবা ইজরায়েল কারোরই পক্ষ নেওয়া উচিত নয়। 

এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা যে, হিন্দুত্ববাদী দক্ষিণপন্থী শক্তিগুলির ইজরায়েলপন্থী এবং মুসলিম-বিরোধী লবজ একাংশ মানুষের মধ্যে প্রভাব ফেলেছে। এখন আমরা দেখছি সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী এবং উপনিবেশবাদ-বিরোধী ঐতিহ্যের উল্টোরথ যাত্রা। এটাই মোদী সরকার ও হিন্দুত্ববাদী শাসকদের সবচেয়ে বড়ো বিশ্বাসঘাতকতা। প্যালেস্তিনীয় জনগণের সংগ্রাম এবং গাজা রক্ষার লড়াইকে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির যূপকাষ্ঠে বলি দেওয়া যায় না।

ঋণ: পিপলস ডেমোক্রেসি
ভাষান্তর: সুচিক্কণ দাস


প্রকাশের তারিখ: ০৩-আগস্ট-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org