"...আমিও বাঁচব। আমি বাঁচলুম।" এই চার শব্দ দিয়ে চিঠি শেষ করে ‘স্বামীর ঘর’ ছাড়লেন মেজো বউ ('স্ত্রীর পত্র’, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)। ‘স্ত্রীর পত্র’-এর এই যে নারী, মেজো বউ, তাঁর সংগ্রাম চলতে থাকে বিবাহ-পরবর্তী পরিবারের আল বেয়ে। তাহলে কি ঘরের বাইরের জমিতে জমিয়ে পা-রাখার জন্য নারীর যে অশেষ সংগ্রাম, তা আবর্তিত হয় ‘বিবাহ’ নামক সম্পর্ককে ঘিরেই? এ কি সকল নারীরই সংগ্রাম নয়?
বিবাহিত হন বা অবিবাহিত, আজীবন অভিভাবকময় এক আশ্চর্য জীবনযাপন করতে থাকা বিপুল সংখ্যক নারীদের বেঁচে থাকার কাহিনিগুলি খুঁটিয়ে পড়লে জানা যায়, কেমন করে পিতৃতান্ত্রিক পরিবারের তৈরি ‘ঘর’ নারীর জীবনের নানা পর্যায়ে নানা ধরনের অনুঘটক হিসাবে কাজ করেছে। এ-সমাজের গড়া কোন পরিসরে নারী স্থিত হবে, তা নিয়ে চিরায়ত দর কষাকষির আলোচনায় বারবার দেখা গেছে, ঘর এবং ঘরোয়া গণ্ডি তাঁর একান্ত ক্ষেত্র হিসাবে ধার্য। একশ বছরেরও বেশি সময় ধরে নারী ও গেরস্থালী নিয়ে চর্চা, তর্ক, বিসম্বাদ চলছে, তবু আজও এটি এক জটিল প্রসঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সমাজতত্ত্ব হোক বা অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞানের নানা শাখা এ-নিয়ে চর্চায় রয়েছে। আজ, আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবসে, নারীর ঘরে থাকা ও ঘরের বাইরে পা রাখা নিয়ে কিছু চর্চা জরুরি– লিঙ্গসাম্যের লক্ষ্যে, লিঙ্গগত বৈষম্যের বিরুদ্ধে।
সাধারণভাবে একেবারে বঞ্চিত যে পরিবারের সংখ্যা এ-দেশে সিংহভাগ, সেই পরিবারের মেয়েদের ইস্কুল-জীবনটা ঠিক কেমন? একাধিক সমীক্ষার রিপোর্ট ঘাঁটলে ও সরকারি শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বললে জানা যায় যে, ইস্কুলের মেয়ে ছাত্রদের মধ্যে অনুপস্থিতি মায় ইস্কুল ছুটের প্রবণতার অন্যতম কারণ হল, ঘরের কাজ– একেবারে প্রাথমিক স্তরের মেয়েরাও ইস্কুলে নিয়মিত আসতে পারে না তাদের চেয়ে ছোটো ভাইবোনদের দেখভাল করার জন্য। তাদের মা-বাবা দুজনেই যেহেতু জীবিকার প্রয়োজনে দীর্ঘ সময় ঘরের বাইরে থাকেন, সেহেতু ঘরের অন্য শিশুদের পরিচর্যার দায়িত্ব সামলাতে হয় বয়সে বড়ো মেয়ে শিশুদের। একইসঙ্গে যুক্ত হয় ঘরের অন্যান্য কাজের ভারও। এক্ষেত্রে স্পষ্টত ছাড় পায় পরিবারের ছেলেরা। মনে আছে বঙ্গীয় সাক্ষরতা প্রসার সমিতির বিদ্যাসাগর শিশু শিক্ষা সহায়ক কেন্দ্রে ২০২১ সালে যখন কোভিড অতিমারির সময়ে কলকাতার এক বস্তির শিশুরা আসছিল লেখাপড়া করতে, তখন এক বারো বছরের মেয়ে মাঝে মধ্যে অনুপস্থিত থাকত। সংগঠক-শিক্ষকেরা তার অনুপস্থিতির কারণ খোঁজ করে জানতে পারেন, কেন্দ্র যে-সময়ে চলে সে-সময়ে মেয়েটিকে ঘরে থাকতে হয় রাস্তার টাইমকলের জল ধরার জন্য; তার মা-বাবা দুজনেই হিসাবহীন কর্মঘণ্টার শ্রমিক এবং বহু ঘরের বস্তিটির জলের কল একটি। এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে শ্রমজীবী মানুষের বস্তির উন্নয়নের খামতি হোক বা পরিবারের প্রাপ্তবয়স্কের জীবিকার চাপ হোক– ভুক্তভোগী বারো বছরের মেয়েটি, যার জীবনের গণ্ডি বাঁধা পড়ে ঘরে, ঘরকন্নায়। উল্লেখ্য যে, এসব ক্ষেত্রে ছেলে সন্তানরা তাদের প্রাপ্য ছাড়টুকু পায়। জীবনের গোড়া থেকেই ‘ঘর’-কে নিজের চরাচর ভেবে ফেলতে শেখা এই মেয়েরা বড়ো হতে থাকে এমন এক সমাজ-রাজনৈতিক নির্মাণের লালনে, যেখানে ঘরের বাইরের জীবনটা আর আবশ্যিক হকের থাকে না। ফলে আজও এদেশের বিরাট সংখ্যক মেয়ে, উচ্চাকাঙ্ক্ষার তাগিদে, স্ব-বিকাশের তাগিদে, আর্থিক স্বাধীনতার তাগিদে, মনের আনন্দে কাজ করতে, উপার্জন করতে ঘর থেকে বেরোয় না। বেরোয়! অনটন, বাজারি প্রবঞ্চনা, বঞ্চনা যখন তাদের হিঁচড়ে ঘর থেকে বার করে, তখন তারা নিজেদের শ্রমশক্তির চূড়ান্ত অবমূল্যায়ন ঘটিয়ে, একই কাজ করে পুরুষের থেকে অনেক কম মজুরির চুক্তিতে বেরোয়। মেয়েদের এই ঘরোয়াকরণের পরিণাম কেবলই সামাজিক, এমনটা নয়। এর প্রভাব অত্যন্ত গুরুতর মাত্রায় অর্থনৈতিক। এদেশে ‘পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভে’ (পিএলএফএস) নামক একটি সমীক্ষার কাজ হয় ফি বছর। এই সমীক্ষায় উল্লেখিত—
কর্মীবাহিনীর (এমপ্লয়েড ওয়ার্কার) তিনটি রকম— ১) স্বনিযুক্ত (সেলফ এমপ্লয়েড), ২) অস্থায়ী শ্রমজীবী (‘ক্যাজুয়াল লেবার’), ৩) নিয়মিত মজুরি বা বেতনপ্রাপক কর্মী (‘রেগুলার ওয়েজ/ স্যালারি হোল্ডার’)। ‘স্বনিযুক্ত’ অর্থাৎ প্রথম বিভাগটির দুটি উপ-বিভাগ– ক) নিজ-মালিকানার আর্থিক উদ্যোগে যুক্ত কর্মী বা সেই উদ্যোগের নিয়োগকারী, খ) পারিবারিক আর্থিক উদ্যোগে উপার্জনহীন সহায়ক। এই দ্বিতীয় উপ-বিভাগের কর্মীরা পারিবারিক আর্থিক উদ্যোগে যুক্ত হয়ে পূর্ণ বা আংশিক সময় কাজ করেন, কিন্তু সেই কাজের বিনিময়ে কোনও বেতন বা মজুরি পান না।
দেখা যাচ্ছে, ভারতের গোটা নারী কর্মীবাহিনীর মধ্যে পারিবারিক উদ্যোগে যুক্ত উপার্জনহীন সহায়ক নারী-কর্মীরাই সবচেয়ে বেশি শতাংশ দখল করেছে। ২০১৭-১৮ সালে দেশে এঁরা ছিলেন গোটা নারী কর্মীবাহিনীর ৩১.৭%, ২০১৮-১৯ সালে ৩০.৯%, ২০১৯-২০ সালে ৩৫%, ২০২০-২১ সালে ৩৬.৬%, ২০২১-২২ সালে ৩৬.৭%, ২০২২-২৩ সালে ৩৭.৫% এবং ২০২৩-২৪ সালে ৩৬.৭%। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এই পরিসংখ্যান হল- ২০১৭-১৮ সালে ১৩.৮%, ২০১৮-১৯ সালে ১৫.৬%, ২০১৯-২০ সালে ১৭.৩%, ২০২০-২১ সালে ১৮.১%, ২০২১-২২ সালে ২০.২%, ২০২২-২৩ সালে ২৩.৩% এবং ২০২৩-২৪ সালে ২২.৯%। গত ৭ বছরের এই পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, কী বিরাট সংখ্যক নারীরা সরাসরি দেশের উৎপাদন বা আর্থিক কার্যকলাপের সঙ্গে কর্মী হিসাবে যুক্ত থেকেও ‘বেরোজগার’। এঁরা পারিবারিক উদ্যোগে স্বনিযুক্ত কর্মী হয়েও ‘মালিক’ নন, এঁদের নামে মালিকানা নেই বলে এই উদ্যোগগুলির মোট উপার্জন মোটেই এঁদের নয়, আবার পারিবারিক উদ্যোগে যুক্ত কর্মী হওয়ায় এঁরা ‘মজুর’-ও নন, তাই এঁদের কোনও মজুরি বা বেতন নেই– বাইরের কোনও কর্মী দিয়ে এঁদের কাজটি করাতে হলে কিন্তু বেতন বা মজুরি সেই কর্মীকে দিতে হত।
আজ, আন্তর্জাতিক নারী দিবস জুড়ে আমাদের সকলের উপরে লেখা এই মজুরিফাঁকির পরিসংখ্যানগুলি আবৃত্তি করা দরকার। এ-দেশের বাজারে গতর খাটিয়ে পণ্য উৎপাদন করা নারীদের সঙ্গে এই মজুরি ফাঁকি চলে আমাদের সুখী গৃহকোণে– যেখানে নারী হয় ‘ভগিনী’, অথবা ‘মাতা’, কিম্বা ‘কন্যা’, নতুবা ‘পুত্রবধূ’– মেজোবউ চিঠিতে জুড়ে দেন - “…আমার মধ্যে যা-কিছু তোমাদের মেজোবউকে ছাড়িয়ে রয়েছে, সে তোমরা পছন্দ করনি, চিনতেও পারনি” (‘স্ত্রীর পত্র’)– ঠিক যেমন উপরে লেখা সমীক্ষার প্রতিবেদনে ‘ভগিনী’, ‘মাতা’, ‘কন্যা’, ‘পুত্রবধূ’ ছাড়িয়ে রয়েছেন হাজার হাজার গতর খাটানো শ্রমিক, উৎপাদনে যাঁদের শ্রমশক্তি রয়েছে, কিন্তু তার স্বীকৃতি নাই। এক্ষেত্রে উল্লেখ করা জরুরি যে, বহু ক্ষেত্রে এই নারী শ্রমিকেরা নিজেরাও স্বতঃপ্রণোদিতভাবে বলে উঠতে পারেন না যে তাঁরা শ্রমিক। এঁরা এই পারিবারিক আর্থিক কার্যকলাপগুলিতে যোগদান করেও বলেন “কেবলই ঘরের কাজ করি”। তবে এই একই পরিবারের পুরুষেরা এই ভুল কখনও করেন না– পারিবারিক আর্থিক উৎপাদনে তাঁদের মালিকানার বোধ অনড়।
এই সবের সঙ্গে রয়েছে পাহাড়-সমান ঘরের কাজ, যা করতে হয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পরিবারের নারী সদস্যের। দ্য টাস্কস অফ দি ওয়ার্কিং উইমেন’স মুভমেন্ট ইন দ্য সোভিয়েত রিপাবলিক-এ লেনিন লিখছেন- “নারীদের যখন পূর্ণ অধিকারও নিশ্চিত হচ্ছে, তখনও তাঁরা শোষিত হচ্ছেন, কারণ যাবতীয় ঘরের কাজ তাঁদের জন্য বরাদ্দ থাকছে। নারীর সব কাজের মধ্যে ঘরের কাজ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সবচেয়ে অনুৎপাদনশীল, সবচেয়ে বর্বরোচিত ও সবচেয়ে কষ্টসাধ্য। এটি ব্যাতিক্রমী রকমের পেটি এবং নারীর বিকাশে সাহায্য করতে পারে, এমন কোনও উপাদান এতে সেভাবে থাকে না।” ভারতের স্টেটিস্টিক্স অ্যান্ড প্রোগ্র্যাম ইমপ্লিমেন্টেশন মন্ত্রকের ‘টাইম ইউজ সার্ভে ২০২৪’-এর রিপোর্ট অনুসারে, এদেশে নারীরা দৈনিক গড়ে ২৮৯ মিনিট ঘরের কাজে ব্যয় করেন, আর পুরুষেরা সে জায়গায় ব্যয় করেন ৮৮ মিনিট। ৪১% নারী পরিবারের শিশু, বয়স্ক, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের সেবাযত্নের কাজ যোগ দেন আর ওই একই কাজে ২১.৪% পুরুষ যোগ দেন। আর আর্থিক কার্যকলাপে (আয়যুক্ত বা আয়হীন) ৭৫% পুরুষ ও ২৫% নারী যোগদান করছেন। এই যে আর্থিক কাজে নারীদের যোগদান এত কম, এর কারণ হিসাবেও দেখা যাচ্ছে, কেবল কর্মসংকোচন বা বেকারত্বের সমস্যা নয়, অন্য ফ্যাক্টর যথেষ্ট ক্রিয়াশীল। এই নারীদের মধ্যে সিংহভাগ আসলে শ্রমবাহিনীর (লেবার ফোর্স) বাইরে রয়েছেন, অর্থাৎ এঁরা আয়যুক্ত কাজের সুযোগ পেলেও করবেন না, করতে পারবেন না সামাজিক কারণে। ঘরের বাইরে গিয়ে তো মোটেই না। একটি স্টাডি (জালোটা, হো, ২০২৩) জানাচ্ছে, এক্ষেত্রে প্রায় সব রকমের পরিকাঠামোগত বাধা (প্র্যাক্টিকাল কনসট্রেইন্স) দূর করে, সুবিধাজনক পরিস্থিতি তৈরি করেও যদি নারীদের চাকরির ব্যবস্থা করা হয়, তাহলেও বিপুল সংখ্যক নারী পরিবারের প্রথা-প্রচলন, রীতি সংক্রান্ত বাধার (ডোমেস্টিসিটি কনসট্রেইন্স) কারণে কাজ করতে পারছেন না। এভাবে তাঁরা দেশের কর্মীবাহিনীতে (ওয়ার্কার পপুলেশন) তো থাকছেনই না, এমনকি শ্রমবাহিনীরও বাইরে চলে যাচ্ছেন (আউট অফ লেবার ফোর্স)।
কালের নিয়মেও নারী ঘরের চৌকাঠ কি একেবারেই পেরোতে পারছে না? পারছে বই কী! আকাশে জাহাজ অবধি ওড়াতে পারছে। আবার মাটিতে পা দিলে দেখা যাচ্ছে, ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্কের ২০১৮ সালের প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ বলছে, নারীদের বিরুদ্ধে ঘটা হিংসা, এমন এক বিশ্ব অতিমারিতে (গ্লোবাল প্যানডেমিক) পরিণত হয়েছে, যা কেবল হিংসার শিকার নারীদের জন্যই বিপর্যয় সাধন করছে না, এই ধরনের হিংসার মারাত্মক প্রভাব রয়েছে সাধারণভাবে আর্থিক ক্ষেত্রেও। নারীবাদীরা সমাজ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যত বেশি যোগদান করছেন, তত বেশি নারীদের অধিকার বিষয়টি প্রাসঙ্গিক ও দৃশ্যমান হচ্ছে, এবং ধীরগতিতে হলেও, নীতিগ্রহণের প্রশ্নে সমাজের মায় রাষ্ট্রেরও পিতৃতন্ত্র থেকে সরে আসার বাধ্যবাধকতা তৈরি হচ্ছে। এতে করে পিতৃতন্ত্রের পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় নারীদের উপর হিংসা সংঘটিত করার প্রবণতা বাড়ছে- সমাজবিজ্ঞানের বোঝাপড়ায় একে ‘ব্যাকল্যাশ এফেক্ট’ বলে চিহ্নিত করছেন তাত্ত্বিকেরা। আর্থিক ক্ষেত্রে আগের থেকে নারীদের যোগদান বাড়ায়, পারিবারিক পরিসরে নারীর দর কষাকষির আপাত ‘ক্ষমতা’ বা নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা বেড়েছে। ফলত ‘ব্যাকল্যাশ এফেক্ট’-এ পিতৃতান্ত্রিক বাহিনীর গার্হস্থ্য হিংসা সংঘটিত করার ঝোঁক ও তাগিদও বাড়ছে বলে মনে করা হচ্ছে। আবার কর্মস্থল বা নানা প্রতিষ্ঠানগুলিও এই ‘ব্যাকল্যাশ এফেক্ট’-এর দ্বারা বিপন্ন। এমনকি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকাও সদর্থক হয় না বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। সদ্য কলকাতায় ঘটা আরজি কর হাসপাতালের ছাত্র-চিকিৎসক ধর্ষণ-খুনের ঘটনায় রাষ্ট্র ও সরকারের ভূমিকা লজ্জাজনক তো বটেই, উপরন্তু, কর্মক্ষেত্রে নারীকর্মীর সঙ্গে ঘটা এই অপরাধের ঠিক পরে পরেই পশ্চিমবঙ্গ সরকার ‘রাতের সাথী’ নামে এক নোটিশ জারি করে– সেখানে লেখা ছিল, এ-রাজ্যের নির্দিষ্ট পেশাক্ষেত্রের নারীরা রাতের ডিউটি করবেন না– নিজেদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তার স্বার্থে। অর্থাৎ কিনা পিতৃতন্ত্র, পুঁজি-তাড়িত রাষ্ট্রব্যবস্থা, দক্ষিণপন্থী শাসকদলের হিতাহিত বোধ চাইছে, মেয়েরা ঘরে আগল দিয়ে বাস করুক। এতে করে পিতৃতন্ত্রের চিরায়ত মূঢ় আত্মশ্লাঘা যেমন যা তুষ্ট হওয়ার, তা তো হয়ই, পুঁজিতন্ত্র হয় তার চেয়েও বেশি পুষ্ট– উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে থাকা শ্রমজীবী মানুষের প্রায় অর্ধেক শতাংশের স্রেফ লিঙ্গ-রাজনীতির কারণে ঘর থেকে বেরোনোর অভ্যাস প্রবণতা চাপা পড়ার এ যেন প্রাগায়োজন; ঘর-বিলাসী শ্রমজীবীর যেন গড়ে না-ওঠে সংগঠিত হওয়ার বোধ।
ঘরের আগল কেটে বাইরে বেরোনো মেয়েদের ধরনধারণ বহু ক্ষেত্রেই ভিন্ন। নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারার দক্ষতা তাকে বাড়তি সাহসী, বাড়তি লড়াকু, বাড়তি যুক্তিমুখী করে– সংগঠিত, অসংগঠিত ক্ষেত্রে, যোজনা-শ্রমিকদের মধ্যে, গিগ-শ্রমিকদের মধ্যেও নারী শ্রমিকেরা নিয়মিত লড়াই, সংগ্রাম, আন্দোলনের মধ্যে সক্রিয় ভূমিকা নেন, নেতৃত্ব দেন। মিড-ডে-মিল কর্মী, আশাকর্মী, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী থেকে শুরু করে, সংগঠিত ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ, ব্যাঙ্ক, বীমা ক্ষেত্রের নারী কর্মীরা একাধারে বেসরকারিকরণ ঠেকাতে, নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পেশাগত কর্তব্যপালন যেন ঠিক মতো হয় সেজন্যও লড়ছেন, অন্যদিকে নিজেদের অধিকার বুঝে নিতেও লড়ছেন নিরন্তর।
পরিসংখ্যান হোক, আর্থ-সামাজিক বিশ্লেষণ হোক বা রাজনৈতিক সূক্ষ্ম তত্ত্বের বিচার হোক, কোনও দৃষ্টিকোণ থেকেই এ-কথা উপেক্ষা করে নারীমুক্তির কথা ভাবার উপায় থাকছে না যে, এই সমাজকাঠামোয় ‘ঘর’ সততই প্রথাগত পিতৃতান্ত্রিক পরিবারের আধার, যার প্রতিটি উপাদান ব্যক্তিগত সম্পত্তির সুতোয় সংযুক্ত। অতঃপর এ-কথাও অস্বীকার করার উপায় নাই যে, এই জাতীয় পরিবারে উচ্চাবচ ক্ষমতাকাঠামোও থাকবে– পরিবারের সদস্যদের মধ্যে প্রেম, বাৎসল্য, যৌনতা, স্নেহ, মমত্ব, শ্রদ্ধা, সম্মান সবের বিকাশও হবে এই ক্ষমতাকাঠামোকে টিঁকিয়ে রেখেই। আবার এও এক দ্বান্দ্বিক সত্য যে, এই কাঠামোর মধ্যে থেকেও মানুষই পারে সুকুমার বৃত্তি, পরিশোধিত বুদ্ধি ও চৈতন্যের জোরে নিজেদের মধ্যে সম্মান, মর্যাদা আদানপ্রদান করতে। মানুষই পারে নিজের এবং অপরের অধিকার লঙ্ঘন ঠেকানোর জন্য অবিরাম চেষ্টা করে চলতে। সাম্যের অভিমুখে, খোলনলচে বদলের জন্য, বিপ্লবের জন্য যে-প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে আমরা, শ্রমজীবী মানুষেরা, চলেছি, সেই প্রক্রিয়ায় চাপানোতর যে থাকবেই, সে কথা জানা। তাই শুভাকাঙ্ক্ষী মানুষ হিসাবে এই সময়ে আমাদের কর্তব্য সম্ভবত প্রথাগত পরিবারের মধ্যে থেকেও তার লিঙ্গবৈষম্যমূলক, শোষণমূলক উপাদানগুলিকে নিকেশ করা। অন্যথায় ‘মেজোবউয়ের’ গৃহত্যাগ মেনে নেওয়া। কারণ যত দিন গড়াবে নারীমুক্তির খিদে বাড়বে, কমবে না এবং তা জায়েজ।
৮ মার্চ-এর ইতিহাস আমাদের জানা এবং তা পড়ে নেওয়ার সুযোগ যথেষ্ট। তাই সে-ইতিহাস নিয়ে আলোচনা এই নিবন্ধে করছি না। ৮ মার্চ মানুষের অন্যতম উত্তরণের দিন, সক্ষমতাপ্রাপ্তির দিন। শোষণের অনন্ত চাকা ভেঙে নিজের ও সর্বহারা সব মানুষের মুক্তি ঘটাতে যে শোষিত মানুষই পারেন, সেকথা ফিরে ফিরে প্রচারের দিন ৮ মার্চ। এই দিনটির শিক্ষায় চালিত হয়ে দুনিয়ার সকল শ্রমজীবী মানুষ বুঝে নিক নিজের, অপরের মর্যাদা, অধিকার।
আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবস দীর্ঘজীবী হোক।
সূত্র: - পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভে ২০১৭-১৮ থেকে ২০২৩-২৪ - জালোটা, সুহানি. হো লিসা. ২০২৩, হোয়াট ওয়ার্কস ফর হার? হাও ওয়ার্ক-ফ্রম-হোম জবস্ অ্যাফেক্ট ফিমেল লেবার ফোর্স পারটিসিপেশন ইন আরবান ইন্ডিয়া - লেনিন, ভি আই. ১৯১৯. দ্য টাস্কস অফ দি ওয়ার্কিং উইমেন’স মুভমেন্ট ইন দ্য সোভিয়েত রিপাবলিক - জোনস্, জেমস্ অ্যালান. বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবাশিস. সুন্দরম, আশা. নভেম্বর ৬, ২০২৪. ইকোনমিক ডেভলপমেন্ট অ্যান্ড ক্রাইম আগেইনস্ট উইমেন আইডিয়াস ফর ইন্ডিয়া - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘স্ত্রীর পত্র’
প্রকাশের তারিখ: ০৮-মার্চ-২০২৫ |