গালিব এবং ১৮৫৭-র বিদ্রোহ

কে এম আশরফ
নিজগৃহে বসে নাগরিকদের সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে গালিব লিখছেন, "যদিও প্রবেশদ্বার (রাস্তায় যাওয়ার) রুদ্ধ ছিল, তথাপি এমন নির্ভীকতা (পরিবেশের মধ্যে) বজায় ছিল যে জনগণ বলপূর্বক দরজা খুলে, মুক্ত হাওয়ায় বেড়িয়ে তাদের প্রয়োজন মিটিয়ে নিয়ে আসতে পিছপা ছিল না।"

গোঁড়া ঐতিহাসিকরা হয়তো গালিবকে (মির্জা আসাদুল্লা খান) চেনেন একজন শ্রদ্ধেয় উর্দু কবি হিসাবে, কিন্তু একজন সমগোত্রীয় ঐতিহাসিক হিসাবে নয় যাঁকে স্বয়ং বাহাদুর শাহ মুঘল বংশের সরকারি ইতিহাস রচনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। যাই হোক, হয়তো অনেকেরই এই তথ্য অজানা যে এই মহান জাতীয় কবি শুধুমাত্র বিদ্রোহীদের শাসিত দিল্লিতেই থেকে যেতে মনস্থ করেননি, স্মরণীয় এই সময়ের দৈনিক ঘটনাবলী লিপিবদ্ধ করতে ফারসি ভাষায় এক ডায়েরি রচনা করেন যার নাম 'দস্তামবু'। ডায়েরির তথ্যভুক্তিকরণ শুরু হয়েছে ১৮৫৭-র ১১ই মে মীরাটে ভারতীয় সৈন্যদের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এবং চলেছে ২০শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যখন ব্রিটিশ বাহিনী দিল্লিতে জনশক্তির প্রবল প্রতিরোধকে অতিক্রম করতে সফল হয়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে, এই ডায়েরি লক্ষ্ণৌ-র পতন পর্যন্ত (জুলাই ১৮৫৮) ঘটনাক্রমের ওপরেও আলোকপাত করেছে।

ঠিক কোন বিষয়টি লেখককে এই অসাধারণ প্রামাণ্য দলিলটি রচনায় উজ্জীবিত করেছে তা পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে যাই হোক, দিল্লি শহর ব্রিটিশ বাহিনীর সম্পূর্ণ করায়ত্ত হওয়ার পরই এই রচনা দিনের আলো দেখেছিল— এতে কোনও সন্দেহ নেই এবং আমাদের এমন ধারণাও হয়তো খুব একটা ভ্রান্ত নয় যে, মূল রচনাটি পরিস্থিতি অনুযায়ী সংশোধিত হয়েছিল। এখন এ-কথা প্রতিষ্ঠিত যে, গালিবের ডায়েরিতে অন্তর্ভুক্ত ঘটনাবলী যথেষ্টই সংক্ষিপ্ত এবং এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের এখানে উল্লেখ নেই যা সাধারণ জ্ঞানের পর্যায়ভুক্ত। সমস্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার অগ্রগতির ব্যাখ্যায় এই ডায়েরি অসম্পূর্ণতা বহন করেছে। মনে হয়, যেন লেখকের হাতে তাঁর রচনা পুনর্লিখনের কোনও অবকাশই ছিল না এবং কিছু পরিচ্ছেদ কেটে বাদ দেওয়া ও সামান্য কিছু পরবর্তী ভাবনার অনুপ্রবেশ ঘটানোর মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রেখেছেন, অবশ্যই নিজের চামড়াকে বাঁচানোর জন্যে।

গল্পের শুরু খানিকটা উল্লাসের আবেগে, যখন জনগণ চতুর্দিকে বিদ্রোহী ভাবাপন্ন এবং সিপাহীরা দিল্লির দিকে অগ্রসরমান সীমান্তে ব্রিটিশ বাহিনীর মোকাবিলার জন্য। কিন্তু সংঘর্ষ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যা চার মাস এবং দশ দিন স্থায়ী হয়েছিল—লেখক ক্রমশ নিজেকে গুটিয়ে স্বল্পভাষী হয়ে পড়লেন এবং বিদ্রোহের সাধারণ প্রকৃতি বিষয়ে কিছু লাইন ব্যয় করে অপ্রত্যাশিতভাবে আমাদের জানাচ্ছেন যে, “কাশ্মীরী গেটে ব্রিটিশদের প্রবল আক্রমণের মুখে পড়ে ভারতীয় শক্তির পিছু হটে আসা ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না।" এরপর থেকে তিনি মূল প্রসঙ্গের বাইরে গিয়ে প্রধানত নিজের ঘরোয়া সমস্যা এবং পূর্ববর্তীকালে ব্রিটিশদের প্রতি তাঁর পরিবারের কর্তব্যপরায়ণতাকেই তুলে ধরেছেন। অবশ্য কতিপয় ক্ষেত্রে প্রতিরোধ আন্দোলন সংক্রান্ত কিছু বিচ্ছিন্ন প্রসঙ্গ এর ব্যতিক্রম।

বিদ্রোহের খুঁটিনাটি বিবরণের ক্ষেত্রে লেখকের মিতবাক প্রবণতা, একই সঙ্গে বিদেশী বিজেতাদের প্রতি তাঁর পরিকল্পিত আনুগত্যের পেশা খুব সহজেই অনুমেয় এবং প্রশংসার যোগ্য যদি আমরা সেদিনের নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে মাথায় রাখি। তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সঙ্গে যোগসাজশের বিন্দুমাত্র সন্দেহও তাঁকে ফাঁসিকাঠে নিক্ষেপের পক্ষে যথেষ্ট ছিল। তাছাড়া গালিব জীবনধারণের জন্য যে পেনশনের ওপর নির্ভর করতেন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তা টিকিয়ে রাখার আগে তাঁর নিজের আনুগত্য প্রমাণ জরুরি ছিল। এ সব কিছুই আরও প্রয়োজনীয় ছিল এমন একজনের ক্ষেত্রে যিনি অভিজাত মহলের সদস্য এবং দিল্লির মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহের শিক্ষক, সভাসদ ও একজন বন্ধু হিসাবেই পরিচিত, এবং যিনি, ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের আধুনিকতার প্রভাবে মুগ্ধ হলেও ব্রিটিশদের আক্রমণাত্মক নীতি, বিশেষত অযোধ্যার অন্তর্ভুক্তিকরণ কখনোই মেনে নিতে পারেননি। কিছুদিন পরে যখন সামরিক দণ্ডবিধি কিছুটা শিথিল হয় এবং শাস্তির পরিবেশ ফিরে আসে, গালিব ব্রিটিশ স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি সমালোচনায় সরব হলেন। তিনি এই ধরনের ভ্রান্ত ধারণাকে মেনে নিতে অস্বীকার করলেন যে নতুন শাসকরা সম্ভ্রান্ত জমিদার শ্রেণির সঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষমতা ভাগ করে নেবে।' তিনি খোলাখুলিভাবেই তাঁর বিদ্রোহী বন্ধুদের যন্ত্রণা ও পতনোন্মুখ অভিজাততন্ত্রের প্রতি সহানুভূতি আপন করেছেন।

যাই হোক, প্রকৃত সত্য এই যে, যখন ১৮৫৭-র সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে পরিস্থিতির ঢেউ তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, অন্যান্য অনেক মিত্রজনের ন্যায় তিনিও নিজের ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকেই সবার ঊর্দ্ধে স্থান দিয়েছিলেন। ফলে, কবি সতর্কভাবে আত্মপক্ষ সমর্থনের যে যুক্তি কর্তৃপক্ষের সামনে তুলে ধরেছিলেন, তাকে আমরা কখনোই দোষারোপ করতে পারি না। তাঁর আবেদন ছিল যে, তাঁর পরিবার ব্রিটিশদের প্রতি সর্বদাই অনুগত এবং সে কারণেই তিনি সারাজীবনের জন্য একটি পেনশন ভোগ করার অনুমতি পেয়েছেন; রাজতন্ত্রের সমর্থক এবং বিদ্রোহী উভয়ের থেকেই তিনি আপসহীনভাবে দূরে সরে থেকেছেন বিদ্রোহের দিনে এবং আসলে তিনি নিজেকে গৃহবন্দীই করে রেখেছিলেন; ব্রিটিশ সৈন্যের আগমনের পরেও তিনি শহরে থেকে যাওয়াই শ্রেয় মনে করেছেন, যখন অধিকাংশ সম্ভ্রান্ত এবং পেনশনভোগীরা পালিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি আত্মপক্ষ সমর্থনে ভারতবর্ষ ও ইংল্যান্ডের উচ্চতর কর্তৃপক্ষের কাছে তাঁর পার্সিয়ান ডায়েরি জমা দিয়েছিলেন। তাঁর এহেন আচরণের কারণ অন্বেষণ খুব একটা দুরূহ নয়। একজন অদ্ভুত, হেঁয়ালিপূর্ণ রচনাশৈলীর বিশেষজ্ঞ হিসাবে উনিশ শতকে মুঘল দরবারের লেখকদের নিকটজন হিসাবে তিনি দক্ষতার সঙ্গেই প্রকৃত অর্থকে আড়াল করে লিখতে পারতেন, এমনকি যখন তিনি তা উদ্ঘাটনে অঙ্গীকারবদ্ধ। গালিব তাঁর রচনাশৈলী এবং বিষয়বস্তুর দুর্বোধ্যতার পাশাপাশি এই পরিস্থিতির সম্পূর্ণ সদ্‌ব্যবহার করে পার্সিয়ান ভাষার বিশুদ্ধতার প্রতি তাঁর সর্বজনবিদিত প্রবণতাকেই গুরুত্ব দিয়েছেন। “এককথায়, তিনি যথেষ্ট যত্নবান ছিলেন যাতে তাঁর নিজের বিরুদ্ধে অথবা তাঁর সেই সমস্ত বন্ধুবর্গ, যাঁরা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত না-হয়।”

অবশ্য এ-সব কিছুই ঐতিহাসিক উপাদান হিসাবে ‘দস্তামবু'-র মূল্যকে এবং দিল্লির বিদ্রোহের কিছু বিশেষ ঘটনার প্রামাণ্য দলিল হিসাবে এর গ্রহণযোগ্যতাকে কোন অংশে খর্ব করতে পারে না। আমার এ-কথা জোর দিয়ে বলার বিশেষ কোনও প্রয়োজনই নেই যে, তাঁর অন্যান্য রচনার মত এক্ষেত্রেও নিরপেক্ষ সত্যের প্রতি লেখকের ভালোবাসা এবং মানবতাবাদের প্রতি তাঁর আবেগ এই রচনার মূল উপজীব্য। অবশ্য স্বাভাবিক কারণেই ডায়েরিতে ঘটনাবলীর বর্ণনা কিছুটা অস্পষ্ট এবং ব্যক্তিবিশেষ নিরপেক্ষ। তথাপি যেহেতু তিনি কতগুলি নাটকীয় ঘটনা এবং কিছু একক ব্যক্তির ভূমিকাকে মুছে দিতে চেয়েছিলেন, গালিব অকৌশলেই, এমনকি এই বিচ্ছিন্ন অংশেও, জাতীয় প্রতিরোধের এই মহান আন্দোলনের কিছু গতিময়তা এবং নবোধিত সামাজিক শক্তিগুলির ধারণা আমাদের মধ্যে প্রবাহিত করতে সক্ষম হয়েছেন। পার্সিয়ান ডায়েরির প্রাপ্ত সংস্করণে তাঁর আলোচনার কায়দায় যা-ই সীমাবদ্ধতা থাকুক না কেন, ১৮৫৭-র ঘটনাপ্রবাহ সংক্রান্ত বিষয়ের প্রতিটি বিবেকনিষ্ঠ ছাত্রের কাছেই এটি অবশ্যই একটি অমূল্য নথি বিশেষ। আমরা এখন পাঠকবর্গের সামনে 'দস্তামবু' থেকে কিছু নির্বাচিত অংশকে তুলে ধরব এই আশায় যে তারা নিজেরাই এর মূল্য বিচারে সক্ষম হবেন। বিদ্রোহে জনসাধারণ দৃশ্যের আরম্ভে কবি কিছুটা বিস্ময়বিদ্যুতায় আচ্ছন্ন ছিলেন: “জনগণ শাসকদের বিরুদ্ধে লড়ছে: সৈন্যরা (ব্রিটিশ) সেনাপতিদের রক্তপাত ঘটিয়ে তার ওপর উল্লাসে মত, এর পরবর্তী পরিণাম সম্পর্কে অসতর্ক" (কুমিয়ত, পৃষ্ঠা ৩৮০)

 

ব্রিটিশদের অনুগামীবৃন্দ পঙ্গুত্বপ্রাপ্তির দশায়

“যখন প্লাবনের গতিকে খড়কুটোর আনুকুলো রোধ করা সম্ভব হয়নি, প্রত্যেকে (ব্রিটিশপক্ষের সমর্থকদের মধ্যে) নিজেদের অসহায়রে অনুভব করেন এবং নিজগৃহে (নির্জনতায় বসে বিলাপরত (ঘটনাপ্রবাহের বাঁকে)। আমাকেও এই শোক- প্রকাশকদেরই একজন মনে করুন (ঐ, পৃষ্ঠা ৩৮২)।

মীরাট সওয়ারদের আগমনে সুস্বাগত

“কিছু বিদ্বেষপরায়ণ সওয়ার মীরাট থেকে শহরে প্রবেশ করল, তাদের প্রত্যেকেই স্থিরচিত্ত, অথচ সরব এবং প্রভুদের হত্যায় উদ্যত, ইংরেজদের রক্তের জন্য তৃষ্ণার্ত। শহরের সিংহদ্বারের রক্ষীরা যারা এই গোপন পরিকল্পনা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত (আক্ষরিক অর্থে "অঙ্গীকারবদ্ধ সঙ্গী হাম-সোগাছ) এই অনাহতদের অথবা (হয়তো নিমন্ত্রিত অতিথিদের স্বাগত জানায় ... (যাই হোক) সওয়াররা ...পাহারাদারদের আতিথেয়তার স্থান পেলো ” (ঐ দ্রষ্টব্য)।

বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ল

“শীঘ্রই দূরবর্তী শহরগুলি থেকেও খবর আসতে শুরু করল যে প্রতিটি সৈন্যাবাসের প্রত্যেক সৈন্যদলের হিতাহিতজ্ঞানশূন্য কিছু নেতা তাদের (ব্রিটিশ)) সেনানায়ককে হত্যা করেছে। এবং ঠিক যেভাবে একজন নৃত্যরত মেয়ে সংগীতের মূর্ছনায় উত্তেজিত হয়ে ওঠে, হাজার হাজার অকৃতজ্ঞ সৈন্য এবং কর্মচারীবৃন্দ হার্দিকভাবে (আক্ষরিকভাবেই "তাদের হৃদয়গুলি এক হয়ে গেল") যোগ দিল এবং সর্বত্র, এমনকি নিজেদের মধ্যে একটিও বাক্যব্যয় না করে, তারা নিজেদের দায়িত্বে মেতে উঠল...এই অপুরুষোচিত দক্ষ যোদ্ধাদের নিজেদের ভেতর সম্মানীসদৃশ সংহতির বাঁধন ছিল। এমনকি কোনও (সঠিক) অধিনায়কত্ব এবং সাধারণ অনুশীলন ছাড়াই তারা এগিয়েছিল এবং যুদ্ধে নেমেছিল” (ঐ প্রষ্টব্য)।

 

সামন্ততান্ত্রিক অভিজাততন্ত্র পিছিয়ে গেল "ওরা সেইসব ব্যক্তিদের সম্মান ও প্রাসাদকে ধুলোয় মিশিয়ে দিল (আক্ষরিকভাবে 'তাদের পথের ধুলো) যারা স্বনাম এবং পাণ্ডিত্যের জন্য বিখ্যাত; যারা ক্ষমতা বা অর্থবলের দিক থেকে উজ্জ্বলতর নয়... কল্পনা করুন। এই অযোগ্যের দল এখন প্রত্যেকের কাছে বশ্যতা দাবী করছে তাঁদের আদেশানুসারে ... (এ এক অশুভ দিন যখন) সাহসী মানুষরা নিজেদের ছায়াকেই ভয় পাচ্ছেন এবং নিছকই এক বাহিনী সবার ওপর রাজত্ব করছে (আক্ষরিক অর্থে 'রাজা এবং ভিখারীর ওপর) (ঐ দ্রষ্টব্য, পৃষ্ঠা, ৩৮৪-৮৫)।

 

গণবাহিনীর দিল্লিতে সমাবেশ

গালিব লিখছেন কীভাবে যখনই তারা দিল্লিতে পৌঁছাল, বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন সৈন্যদল প্রথমে তাদের অধিগৃহীত সমস্ত সোনা ও রূপো রাজকোষে তুলে দিল, তারপর লালকেল্লার দিকে অগ্রসর হল "বাদশাহের সামনে তাদের ললাট আনত করার জন্য” এবং পরে জঙ্গী হাওয়া উড়িয়ে শহরে ঘুরতে শুরু করল।

"এবং কী অদ্ভুত! প্রতিটি কোণ এবং আনাচকানাচ থেকে একজন করে সৈন্য, প্রত্যেক রাজপথে এক দঙ্গল বাহিনী এবং সমস্ত দিক থেকে সৈন্যদল উঠে আসছে জমিতে দাপিয়ে বেড়াতে... যারা বিজয়ী তাদের জন্য এ-এক সুসময়। ঠিক এই মুহূর্তে দিল্লি শহরের ভেতরে ও বাইরে প্রায় পঞ্চাশ হাজার পদাতিক ও অশ্বারোহী বাহিনী মিলিত হয়েছে” (ঐ দ্রষ্টব্য, পৃষ্ঠা, ৩৮৫)।

 

ভারতীয় শাসকবর্গের ওপর জনগণের চাপ

"ফরুখাবাদের বিখ্যাত (শাসক) তাফাজ্জল হুসেন খান তার কপাল বাদশাহের উপস্থিতিতে নত (বস্তুত 'রগড়ে দিলেন') করলেন, এমনকি যদিও কিছুটা দূরত্বে থেকেই এবং এইভাবে তার আনুগত্য নিশ্চিত করলেন। খান বাহাদুর খান (বেরিলি-র) বাদশাহী অস্তিত্বের কাছে একশত এক স্বর্ণমুদ্রা এবং একটি হাতি ও একটি রৌপ্য জিনসহ অশ্ব ভেট হিসাবে প্রেরণ করলেন... নবাব ইউসুফ আলি খান বাহাদুর (রামপুরের ... যিনি এতদিন পর্যন্ত ইংরেজ শাসকদের সঙ্গে সুসম্পর্কে স্থিরসংকল্প ছিলেন, বাধ্য হলেন (বাহাদুর শাহের প্রতি আনুগত্যের) আনুষ্ঠানিক বার্তা পাঠাতে এবং একই সঙ্গে তার (সমালোচক) প্রতিবেশীদের কণ্ঠও স্তব্ধ করলেন। লক্ষ্ণৌতে বিচক্ষণ মন্ত্রী (আক্ষরিক অর্থে “একজন যিনি তার দায়িত্ব জানেন") সরাফ-উদ-দ্দৌলা ওয়াজেদ আলি শাহের পুত্রদের মধ্য থেকে একজন দশ বছরের বালককে সিংহাসনে বসালেন ... এবং নিজেকে (তার) পেশকার ও উপদেষ্টা হিসাবে নিযুক্ত করলেন ... তিনি (দিল্লির) রাজসভায় চমৎকার উপহারসহ দূত পাঠালেন ... (সংক্ষেপে) বাদশাহের সৌভাগ্যের নক্ষত্র এতটাই উঁচুতে উঠেছিল যে ব্রিটিশদের মুখ (বস্তুত ‘থাকি পরিহিতদের’) তার থেকে আত্মগোপন করেছিল”। (ঐ দ্রষ্টব্য, পৃষ্ঠা ৩৮৭-৮৮)

 

ব্রিটিশদের সঙ্গে যুদ্ধ

“দিনের শুরু থেকে শেষে বাতাসে উভয়পক্ষের গোলাবারুদ পড়তে শুরু করল সাধারণ শিলাবৃষ্টির মত। মে এবং জুনের উত্তাপ ও সূর্যের প্রচণ্ড রোদের ঝলসানি ক্রমশ বাড়ছিল ... সূর্যোদয়ের পর (শহরের) সমস্ত প্রান্তের রাজকীয় বাহিনীর যোদ্ধারা একত্রিত হয়ে সিংহের ন্যায় লড়াইয়ে অগ্রসর হত.... এবং প্রত্যাবর্তন করত ঠিক সূর্যাস্তের পর।” (ঐ দ্রষ্টব্য, পৃষ্ঠা ৩৮৬)

 

হাকিম আসানুল্লাহ-র প্রাসাদ অগ্নিদগ্ধ

“ওরা ব্রিটিশদের সমর্থক হাকিম আসানুল্লাহ-র প্রাসাদ লুঠ করল (যিনি আক্ষরিকভাবেই ব্রিটিশদের জয়লাভের জন্য সক্রিয় ছিলেন) যা চিনা ছবির প্রদর্শনীকক্ষ সদৃশ ছিল এবং অতিথিগৃহের বহিকক্ষে আগুন ধরানো হল।” (ঐ দ্রষ্টব্য, পৃষ্ঠা ৩৮৭)

আক্রমণাত্মক ব্রিটিশবাহিনী এবং পিছু হটে যাওয়া ১৮৫৭-র ১৪ই সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ আক্রমণ ধেয়ে এল এবং এখন “কাশ্মীরী দ্বারে প্রবল ব্রিটিশ আক্রমণের মুখে ভারতীয় শক্তির (বস্তুত 'কালো চামড়ার সৈন্যের') পিছিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। (ঐ দ্রষ্টব্য, পৃষ্ঠা ৩৮৮)

 

শেষপর্যন্ত জনগণের প্রতিরোধ

যখন ব্রিটিশরা গণ-বাহিনীর হাত থেকে শহর অধিকার করল, সাধারণ মানুষ সৈন্যদের পক্ষে যোগ দিয়ে রাস্তায় মারপিটে জড়িয়ে পড়ল। “শহরের বেশ কিছু গুণ্ডা বা মাস্তানেরা নির্ভয়চিত্ত সৈন্যের পেশা বেছে নিল... দু-তিন দিন ধরে কাশ্মীরী গেট থেকে শহরের প্রতিটি আনাচকানাচ নিত্যদিনের যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হল এবং আজমের দরওয়াজা, তুর্কমান দরওয়াজা ও দিল্লি দরওয়াজা— তিনটি বহির্নির্গমন পথ সৈন্যদের (বিদ্রোহী) হাতেই রইল।” (ঐ দ্রষ্টব্য, ৩৮১)

পরিণতিতে যখন অবশেষে দিল্লি অধিগৃহীত হল “অনেক মানুষ... আপামর জনসাধারণের মধ্যে, যা সংখ্যায় গোনার অতীত, এই তিনটি দ্বার দিয়ে শহর ছেড়ে পালিয়ে গেল।” (ঐ দ্রষ্টব্য)

নিজগৃহে বসে নাগরিকদের সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে গালিব লিখছেন, "যদিও প্রবেশদ্বার (রাস্তায় যাওয়ার) রুদ্ধ ছিল, তথাপি এমন নির্ভীকতা (পরিবেশের মধ্যে) বজায় ছিল যে জনগণ বলপূর্বক দরজা খুলে, মুক্ত হাওয়ায় বেড়িয়ে তাদের প্রয়োজন মিটিয়ে নিয়ে আসতে পিছপা ছিল না।” (ঐ স্রষ্টব্য)

 

গ্রামাঞ্চলে ও দিল্লির পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে প্রতিরোধ

অবশেষে যখন ১৮৫৭-র ৭ই অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে দিল্লি ব্রিটিশদের হস্তগত হল, গ্রামাঞ্চলের প্রতিরোধ আন্দোলন কোনও উপায়ান্তর না-থাকায় তলিয়ে গেল। “এমনকি এখনও” লেখক লিখছেন, “বেরিলি, ফারুখাবাদ ও লক্ষ্ণৌ-এর অসংখ্য বিদ্রোহী সংগঠিত দল হিসাবে লড়তে এবং প্রতিটি একর জমির (মালিকানা) বিতর্কিত করে তুলতে (আক্ষরিক অর্থে ফার্সা থেকে ফার্সার্ড) বদ্ধপরিকর ছিল..." (দিল্লির প্রতিবেশী অঞ্চলে) মিও-র সোহারা এবং নুহরা (গুরগাঁও জেলায়) এমন গর্জে উঠেছিল যে তোমার মনে হবে যে উম্মাদেরা তাদের শিকল ভেঙে ফেলেছে। তুলা রাম... এখনও রেওয়ারিতে অবস্থানকারী এবং নিজের বাহিনীকে মিও দেবীর দলে যুক্ত করে তার অধীনে পরিচালিত করতে উদ্যত। ঐ সমস্ত পাহাড়ি ও বনাঞ্চল এলাকায় এই দলটির (ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার কিছু স্বাধীন পরিকল্পনা ছিল। এক কথায়, তুমি হয়তো প্রায় বলে ফেলবে যে ভারতের আদিম উপাদানগুলি ক্রমশ উত্তেজিত হয়ে উঠছিল।” (ঐ দ্রষ্টব্য, পৃষ্ঠা ৩৯৭)।

 

একটি ঘরোয়া দৃশ্য— বৃষ্টির জল সংগ্রহ

১৫ই সেপ্টেম্বরের পর সমস্ত শস্যের দোকান বন্ধ হয়ে গেল এবং ঝাড়ুদার, ধোপা নাপিত ও ফেরিয়ালারা শহর ত্যাগ করল। ফলে, প্রায় দু-দিন ও রাত্রি কোন খাদ্য ও পানীয় ছিল না। স্বভাবতই গালিব তাঁর রসিকতাবোধের শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছিলেন যখন “হঠাৎই মেঘ জমে বৃষ্টি নামল। আমরা (আমাদের বাড়িতে) একখণ্ড কাপড় ছড়িয়ে পেতে, তার তলায় একটি বড়ো পাত্র রেখে বৃষ্টির জল সংগ্রহ করলাম। ওরা বলে, সমুদ্র থেকে মেঘ জল সংগ্রহ করে ভূমিতে বর্ষণ করে; কিন্তু এক্ষেত্রে মূল্যবান মেঘ ফিনিকসের ন্যায় জীবনের স্রোত থেকে জল আনল। যাই হোক, আলেকজান্ডার তাঁর রাজত্বের দিনে নিষ্ফলভাবে যা প্রার্থনা করেছিলেন, এই (অতি সাধারণ) গলা শুকিয়ে যাওয়া, নোনতা জল পান করা মানুষরা এ দুর্দিনের সময়ে তা আবিষ্কার করল। 

 

লুঠতরাজ এবং বিধ্বংস

শহরে ব্রিটিশ অধিকার কায়েম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এক নতুন পর্ব শুরু হল যাকে লেখক “(আমাদের নতুন) প্রভুদের ক্রোধের আগুন" হিসাবে বর্ণনা করেছেন। “বিজয়ীর দল কাশ্মীরী গেটের সামনে বাজার যাওয়ার রাস্তা ধরে এগিয়ে পথের ওপর যাকে দেখেছে হত্যা করেছে। সম্ভ্রান্ত ও স্থিরবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষদের মধ্যে এমন কেউ ছিলেন না যিনি নিজের বাড়ির প্রবেশদ্বারে খিল লাগাননি।” (ঐ দ্রষ্টব্য, পৃষ্ঠা ৩৮৮-৮৯)। গালিব আকস্মিকভাবেই লক্ষ করেছিলেন যে “প্রতিটি দিকেই ফাঁসির মঞ্চ এবং পথঘাট অত্যন্ত ভীতিপ্রদ ......এখন কেউ আর বাইরে এসে আমাদের সঙ্গে কথা বলতে সাহস পাচ্ছে না, অথবা আমরাও আমাদের জন্য বাইরে বেরোনোর ঝুঁকি নিচ্ছি না.......। (ঐ দ্রষ্টব্য, ২৯১-৯২)

(শহরের লুঠতরাজ ও ধ্বংসলীলা প্রসঙ্গে) “সেনানায়ক বাহিনীকে সেই সব ব্যক্তিদের হত্যা না-করার নির্দেশ দিলেন যারা সঙ্গে সঙ্গে আত্মসমর্পণ করবে এবং তাদের সর্বস্ব অধিগ্রহণেরও আদেশ জারি হল; যদি কেউ প্রতিরোধের উদ্যোগ নেয়, তবে তারা তার প্রাণসহ সবকিছুই কেড়ে নেবে। যাই হোক, (সমস্ত শহর জুড়ে) অসংখ্য শবদেহের দিকে তাকিয়ে কেউ মনে করতেই পারে যে তাদের ওপর ঝড় বয়ে গেছে, যেহেতু তাদের গর্দানের ওপর মস্তক আর দৃশ্যমান নয়।” (ঐ দ্রষ্টব্য, পৃষ্ঠা ৩১৫)"

"রাজ্জর, বাহাদুরগড়, বল্লভগড়, লোহারু, ফারুখনগর, দুজানা এবং পাতৌদি, এই হল শহরের প্রতিবেশী সাতটি রাজ্য যাদের নেতারা দিল্লিতে ব্রিটিশ এজেন্সীর সঙ্গে যুক্ত। এদের মধ্যে পাঁচটি রাজ্যের শাসকদের কেল্লায় অপেক্ষায় রাখা হল (শাস্তিবিধানের জন্য) এবং অবশিষ্ট দুজনও তাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চিন্তিত হয়ে পড়ল। ওরা বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন দিনে ঝাজর, বল্লভগড় এবং ফারুখনগরের শাসকদের ফাঁসিকাঠে ঝুলিয়ে দিল।” (ঐ দ্রষ্টব্য, পৃষ্ঠা ৪০০-৪০১)

তারপর থেকে দিল্লি একটি বৃহৎ কারাগার সদৃশ হয়ে উঠল। আমাদের লেখকের ভাষায়: “এই শহরে নগর এলাকার বাইরে কারাগার অবস্থিত এবং ভেতরে পুলিশের জেলখানা ('বেদনার বাসস্থান')। ওরা এই দুই জায়গায় এত মানুষের ভীড় জমিয়ে দিল যে তোমায় প্রায় মনে হবে একজন মানুষ অন্যের মধ্যে বস্তাবন্দী। একমাত্র মৃত্যুর দেবদূতই জানেন ঐ দুই কারাগারগৃহের কত সংখ্যক মানুষ বিভিন্ন সময়ে ফাঁসিকাঠে মৃত্যুবরণ করেছে। শহরের মুসলমান বাসিন্দার সংখ্যা এখন এক হাজারও পেরোচ্ছে না, তারা হয় জেলবন্দীদের আত্মীয় অথবা অন্যকিছু, বার্ধক্যভাতাভোগী...”। (ঐ দ্রষ্টব্য, পৃষ্ঠা ৪০-08) ।

 

নৈরাশ্যের প্রহর এবং ভবিষ্যতের ছবি

স্বাভাবিকভাবেই এই “মৃতের শহর”-এর (শহর-ই-খামোসান) দৃশ্যে গালিবের হৃদয় বিদীর্ণ হয়েছিল যাকে তিনি বর্ণনা দিচ্ছেন এইভাবে, যেখানে কখনো হাজার হাজার মানুষের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন, প্রত্যেক বাড়িতে একজন করে সঙ্গী এবং প্রত্যেক গৃহে বা সংগঠনে অস্তত একজন করে বন্ধু ছিল তাঁর। তাঁর পক্ষে এ-কথা চিন্তা করা খুবই কষ্টকর যে “শহর মুসলমানশূন্য। রাত্রির অন্ধকারেও তাদের গৃহ আলোবিহীন এবং দিনেও তাদের দেওয়ালের চিমনিতে ধোঁয়া উঠছে না।” এই নিঃসঙ্গতা এবং নৈরাশ্যের দিনে কবি দেখছেন যে একটি সম্প্রদায় হিসাবে মুসলমানরা মৃত্যু এবং ক্ষুধা ব্যতীত আর কোনও কিছুরই মুখোমুখি নয় (ঐ দ্রষ্টব্য, পৃষ্ঠা ৪১০)। শীঘ্রই, অবশ্য, দিগন্তে একটি অস্পষ্ট দৃশ্য ফুটে উঠল এবং কবি এক প্রতীকী আশায় সিদ্ধান্ত টানলেন :

বীণাবাদক, যখন সে তারে ঝঙ্কার তোলে

দৃশ্যমান হয় কিসের পেছনে তার অন্বেষণ,

দুঃখের আবরণের অন্তরালে সুখ বিশ্রামরত,

বস্ত্রে রজকের প্রহার তার বিদ্বেষ নয়।"

 

গ্রন্থপঞ্জি

১. দস্তাম্বু গালিবের ফার্সি রচনার সংগ্রহে সংযুক্ত : কুমিয়াৎ-ই-গালিব, (লক্ষ্ণৌ ১৮৭২)। কুমিয়াৎ-ই-নাসের-ই-গালিব, (লক্ষ্ণৌ, ১৮৭১)।

২. গালিব কা রোজনামচা, (দিল্লি, ১৯২৪)।

৩. মাকাতিব-ই-গালিব, (রামপুর, ১৯৪৯)।

৪. নাদির খুতুত-ই-গালিব, (লক্ষ্ণৌ, ১৯৩৯)।

৫. উদ্-ই-হিন্দি, (আলিগড়, ১৯২৭)। ৬. উর্দু-ই-মুয়াল্লা, (লাহোর, ১৯২২)।


প্রকাশের তারিখ: ২৭-ডিসেম্বর-২০২২

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org