|
গিগ অর্থনীতি, মার্কস এবং উদ্বৃত্ত মূল্যঅর্ক রাজপন্ডিত |
মার্কস কি কখনও লন্ডনের রাস্তায় উবের চেপেছেন? কিংবা মার্কস কি কখনও চুরুট আনিয়েছেন ফ্লিপকার্টে অর্ডার করে? অথবা এঙ্গেলসকে কোনও বই উপহার দিয়েছেন অ্যামাজনে অর্ডার করে? তাহলে কীভাবে লিখে ফেলতে পারলেন পিস ওয়েজ (টুকরো মজুরি, নির্দিষ্ট একটিই কাজের ভিত্তিতে মজুরি) হল টাইম ওয়েজ (সময় মজুরি)-রই পরিবর্তিত রূপ। আর সময় মজুরি হল শ্রমশক্তির মূল্যের পরিবর্তিত রূপ। |
মোদী সরকারের নীতি নির্ধারক সংস্থা ২০২২ সালের জুন মাসে ‘গিগ অর্থনীতি’ নিয়ে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করে, যেখানে একে প্রাণবন্ত ও উচ্চগতিতে বিকাশমান ঘটনা বলে বর্ণনা করা হয়। ‘ইন্ডিয়া’জ বুমিং গিগ ইকনমি অ্যান্ড প্ল্যাটফর্ম ইকনমি: পার্সপেকটিভ অ্যান্ড রেকমেন্ডশনস অন ফিউচার ওয়ার্ক’ শীর্ষক গবেষণাপত্রে গিগ মজুরদের সামাজিক সুরক্ষার গালভরা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। আদপে এই গবেষণাপত্রটি গিগ অর্থনীতি বা প্ল্যাটফর্ম অর্থনীতিকে একেবারে প্রাতিষ্ঠানিক চেহারা দেওয়ার উদ্যোগ। নীতি আয়োগের গবেষণাপত্র অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবর্ষে গিগ অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত মজুরদের সংখ্যা ৭৭ লক্ষ, ২০২৯-৩০ অর্থবর্ষে সেই সংখ্যা পৌঁছবে ২.৩৫ কোটিতে। গিগ মজদুরদের ৪৭ শতাংশই মোটামুটি দক্ষ, ২২ শতাংশ দক্ষ এবং ৩১ শতাংশ অদক্ষ শ্রমিক। গিগ অর্থনীতির চালচলনের প্রবণতা থেকে বোঝা যাচ্ছে, উচ্চশিক্ষিত দক্ষ শ্রমিকদের ভিড় যেমন একদিকে বাড়ছে কাজের সন্ধানে, তেমনি কমছে মোটামুটি দক্ষ শ্রমিকদের সংখ্যা। নীতি আয়োগের গবেষণাপত্র, তার সুপারিশ এবং প্রভাব বুঝতে হলে আমাদের গিগ অর্থনীতি নিয়ে একটি সুচিন্তিত রাজনৈতিক অর্থনৈতিক বোঝাপড়া প্রয়োজন। অনিশ্চিত কাজ, শ্রমিকদের বিকেন্দ্রীকরণ: একটি আন্তর্জাতিক চেহারা গত একদশক ধরে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি দুনিয়াজোড়া পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের দৈত্যাকার বিকাশ এবং বিকেন্দ্রীভূত, অপ্রত্যক্ষ অনিশ্চিত কাজের ধরনের বিন্যাস। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও তার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত পদ্ধতির সাধারণ চরিত্র হচ্ছে, কাজের সময় বৃদ্ধি, কাজের দিন বৃদ্ধি, কম মজুরি, শ্রম আইনের অনুপস্থিতি এবং শ্রম পদ্ধতির উপর পুঁজির পরোক্ষ দখলদারি। স্থায়ী কাজের বদলে ক্রমশ বাড়ছে আউটসোর্সিং, সাময়িক চুক্তিভিত্তিক কাজ— যা কাজের সময় এমনকী নিয়োগ সম্পর্ককেও অনিশ্চিত, ভঙ্গুর এবং অনিয়মিত চেহারা দিচ্ছে। শ্রমিকদের এক অংশ আছেন, যাঁদের কাজ পুরোটাই অস্থায়ী চরিত্রের, যেমন গিগ অর্থনীতিতে যাঁরা কাজ করেন, যাঁরা ওলা, উবের, অ্যামাজনের মতো সংস্থার কর্মী। আজকের পুঁজিবাদে বিনিয়োগ, উদ্ভাবন, সরাসরি নিয়োগ সম্পর্ক পুঁজিবাদীদের কাছে আর লাভজনক নয়। চূড়ান্ত স্বল্পমেয়াদী প্রবণতা পুঁজিবাদী বোঝাপড়ায় নিয়োগ-কর্তৃপক্ষ ও তার উত্থান-পতন, বাজারের অনিশ্চয়তাকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম পণ্য ও পরিষেবার বাজার-বিনিময়ে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে মধ্যস্বত্বভোগীর কাজ করছে। প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতি এই ধরণের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলিকে দূরবর্তী বাজার তৈরিতে সক্ষম করছে। ডিজিটাল অর্থনীতিতে মূলত তিনটি বৈশিষ্ট্য আমরা দেখতে পাই। প্রথমটি শ্রমিক ও শ্রম সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত, স্থায়ী কাজের পরিবর্তে গিগ অর্থনীতিতে মজুরি নির্ভর করে কেবলমাত্র কতগুলি খণ্ড কাজ (পিস ওয়ার্ক)-এর উপর, তাঁরা খণ্ড কাজের ভিত্তিতে খণ্ড মজুরি (পিস ওয়েজ) পান। দ্বিতীয়ত, গ্রাহকের খরচ, ডিজিটাল মাধ্যমে ক্রেতা-উপভোক্তারা বিপুল পণ্য ও পরিষেবা কেনার সুযোগ পাচ্ছেন। তৃতীয়ত, ডিজিটাল পদ্ধতিতে কীভাবে মধ্যস্বত্বভোগী সংস্থা, কার্যত যারা ব্রোকার, উৎপাদক ও উপভোক্তার মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করছে। যেমন অ্যামাজন ময়দা তৈরি করে না, বই ছাপায় না, বা মোগলাই পরোটা তৈরি করে না, অ্যামাজন শুধু মাত্র মোগলাই বা বই বা ময়দা গ্রাহকের কাছে পৌঁছনোর জন্য একজন মজুর নিয়োগ করে দালালির কাজ করে। ‘মুক্ত মজুররা’ সবচেয়ে শোষিত পুঁজিবাদী শ্রেণি গিগ অর্থনীতির সাফল্য গাইতে গিয়ে প্রায়শই বলে থাকে, গিগ অর্থনীতি যেমন খুশি তেমন কাজ, যেমন খুশি তেমন মজুরির সুযোগ এনে দিয়েছে, শ্রমিকদের করেছে মুক্ত বিহঙ্গ— এই গালভরা মিথ্যার আড়ালে চাপা পড়ে যায় কীভাবে এই নয়া ব্যবস্থায় পুঁজিবাদ তার আসল লক্ষ্য গোপন করছে। যতদূর সম্ভব শ্রমিকদের থেকে শ্রম নিংড়ে নাও, মুনাফার পাহাড় বানাও। পুঁজিবাদীরা বলে থাকে, গিগ নতুন প্রজন্মের শ্রমজীবীদের দশটা-পাঁচটার চাকরি জীবন থেকে মুক্তি দিয়েছে, নতুন প্রজন্মের শ্রমজীবীরা চায় ‘স্বাধীনতা’, এই ‘স্বাধীন মজুর’রাই গিগ অর্থনীতির চালিকা শক্তি, পুঁজিবাদীদের ভাষ্যে ‘মাইক্রো এন্টারপ্রেনিওর’! বাস্তবে এই ‘মুক্ত মজুর’রা পুঁজিবাদের বল্গাহীন শোষণের শিকার। ‘কোনও স্থায়ী কাজ নেই’ প্রবণতার সামনে দাঁড়িয়ে এই পিস ওয়েজ মজুররা বাধ্য হচ্ছেন গিগ অর্থনীতির শরিক হতে, তাঁরা চকচকে ‘এন্টারপ্রেনিওর’ নন, বরং তার ঠিক বিপরীতে শ্রমিকশ্রেণির সবচেয়ে অনিশ্চিত অংশ, কেবলমাত্র তাঁর একমাত্র পুঁজি— শ্রম বিক্রি করতে বাধ্য। পুঁজিবাদ সব সময়েই শ্রমিককে বাড়তি খাটিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করে। গিগের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়, ধরা যাক উবের চালককে রাইড পিছু ৫০ শতাংশ কমিশন দেওয়া হয়, এর অর্থ হল বাকি ৫০ শতাংশের কোনও মজুরিই সে পায় না। কেউ যদি দিনে বারো ঘন্টা গাড়ি চালায়, কমিশন বাবদ তার মোট শ্রম সময়ের অর্ধেক সে পায়, তাই দিয়েই তাকে জ্বালানি ভরতে হয়, গাড়ি সারাতে হয়, এসির গ্যাস ভরতে হয়, পরিবারের যাবতীয় খরচ চালাতে হয়। অন্যদিকে, আমরা দেখছি যন্ত্রের বিরুদ্ধে দৌড়, শ্রমিকরা সম্মুখীন হচ্ছেন ‘প্রযুক্তির কারণে বেকারি’র, তথ্য প্রযুক্তি ও অটোমেশনের বাড়বাড়ন্তে। শ্রমিক ও প্রযুক্তির মধ্যেকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াও শ্রমিকশ্রেণির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চূড়ান্ত আকার নিয়েছে। স্বল্প মেয়াদে কাজের বাজার থেকে কেউ ছিটকে যাচ্ছেন সঙ্কটকালে খরচ কমানোর অজুহাতের ছাঁটাইতে, দীর্ঘমেয়াদে কেউ ছিটকে যাচ্ছেন অটোমেশনের সঙ্গে দৌড়ে হেরে গিয়ে। স্বনির্ভরতার নামে অনিশ্চয়তা, খণ্ড কাজের খণ্ড মজুরিই আজকের পুঁজিবাদের আসল বৈশিষ্ট্য। খণ্ড কাজ (পিস ওয়ার্ক) এবং মার্কস মার্কস কি কখনও লন্ডনের রাস্তায় উবের চেপেছেন? কিংবা মার্কস কি কখনও চুরুট আনিয়েছেন ফ্লিপকার্টে অর্ডার করে? অথবা এঙ্গেলসকে কোনও বই উপহার দিয়েছেন অ্যামাজনে অর্ডার করে? তাহলে কীভাবে লিখে ফেলতে পারলেন পিস ওয়েজ (টুকরো মজুরি, নির্দিষ্ট একটিই কাজের ভিত্তিতে মজুরি) হল টাইম ওয়েজ (সময় মজুরি)-রই পরিবর্তিত রূপ। আর সময় মজুরি হল শ্রমশক্তির মূল্যের পরিবর্তিত রূপ। দেড়শো বছরেরও বেশি সময় আগে লেখা ক্যাপিটাল এর প্রথম খণ্ডের ২১ নম্বর অধ্যায়ে মার্কস ঠিক এই লেখা দিয়েই শুরু করেছেন! পিস ওয়েজ থিওরিতে মার্কস লিখেছেন, একই শিল্পে পিস ওয়েজ অর্থাৎ টুকরো মজুরি আর টাইম ওয়েজ বা সময় মজুরি, এই দুই ধরনের মজুরিই সমান্তরালে চলতে পারে। মার্কস উদাহরণ দিয়েছেন লণ্ডনের একটি ঘোড়ার জিনের সরঞ্জামের দোকানে দেখা যাবে ব্রিটিশ মজুরদের পিস ওয়েজ দেওয়া হচ্ছে আবার ফরাসি মজুরদের টাইম ওয়েজ দেওয়া হচ্ছে। ‘পিস ওয়েজ' থিওরি নির্মাণে দেড়শো বছর আগে মার্কস লিখে গেছেন ক্যাপিটালে 'পিস ওয়েজ সিস্টেম শ্রমিক শ্রেণীর জন্য নতুন যুগ চিত্রিত করেছে'। কলকাতার রাস্তায় ধরাযাক নবমীর রাতে উবের ক্যাবের চড়া চাহিদা, ভাড়া বেশি। উবের চালক ধরাযাক তাঁর মালিকের থেকে গাড়ি ভাড়া নিয়েছেন, তিনি দেখলেন যে এই বর্ধিত উবের রাইডের চাহিদা ও বর্ধিত ভাড়ার কারণে তিনি কমিশনও খানিক বাড়তি পাবেন, টানা সারারাত গাড়ি চালালেন বাড়তি আয়ের জন্য। এই প্রবণতা নতুন নয়, আজ যা দেখছি দেড়শো বছরেরও বেশি আগে লিখে গেছেন মার্কস ‘পিস ওয়েজ’ থিওরিতে। মার্কস লিখছেন, পিস ওয়েজ ওয়ার্কারদের প্রবণতা হল অতিরিক্ত কাজ করা, অতিরিক্ত সময় কাজ করা, যাতে তারা বাড়তি মজুরি পেতে পারে। গিগের মতো ‘পিস ওয়েজ’ কাজে শ্রমিকদের স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে বাড়তি মজুরির জন্য বাড়তি শ্রম দেওয়া। টানা হয়তো কুড়ি ঘণ্টা উবের চালানো, বা সকাল থেকে সন্ধ্যা টানা ডেলিভারি করে যাওয়া। পুঁজিপতিরাও এইসব পিস ওয়ার্ক-এর জন্য পিস মজুরি দেওয়ার আগে সারাক্ষণ মজুরদের নজরদারিতে রাখে। কে কখন গাড়ি চালাচ্ছে, কে কটা ডেলিভারী দিল, রাস্তায় বাইকের টায়ার হয়তো পাংচার হল, তাই ডেলিভারি দিতে দেরি হল, সবই দেখা যায়, নিয়ন্ত্রণ করা যায় অ্যাপের মাধ্যমে। টায়ার পাংচারের জন্য সারাইও করতে হবে শ্রমিককে, আবার দেরির জন্য তারই মজুরিতেও কোপ বসবে! মার্কস লিখেছেন ‘এই ধরনের কাজের মান ও মাত্রা যেহেতু এহেন পিস ওয়েজ-এর টুকরো কাজ নিয়ন্ত্রণ করে, পুঁজিপতিদের শ্রমের ওপর নজরদারি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যা অতিরিক্ত অবাঞ্ছিত’। একই সঙ্গে গিগ অর্থনীতি জন্ম দিচ্ছে পুঁজিবাদের অনিবার্যতায় পরজীবী মুনাফাখোরদের। উৎপাদক আর গ্রাহকদের মধ্যে যেমন পরজীবী দালাল অ্যামাজন, ওলা, উবের, তেমনি উবের আর চালকের মধ্যেও জন্ম নিচ্ছে দালালরা, যারা উবের চালানোর গাড়ি বা বাইক পর্যন্ত ভাড়ায় ধার দেয়! মার্কস লিখেছেন ‘পুঁজিপতি ও শ্রমিকদের মাঝে প্যারাসাইটদের প্রবেশ আরো সহজ করে দেয় পিস ওয়েজ, ফলত পুঁজিপতিদের যেমন মুনাফা আরো বাড়ে, শ্রমিকের শোষণ আরও বাড়ে’। নীতি আয়োগের সুপারিশ: শ্রমিকদের সঙ্গে নির্লজ্জ প্রতারণা নীতি আয়োগের গবেষণাপত্র ও সুপারিশ শ্রমিকদের সঙ্গে নির্লজ্জ শঠতা ছাড়া কিছুই নয়। শ্রমিকদের অধিকারের নামে নীতি আয়োগ আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদী মডেলের লাইনে প্রতিষ্ঠিত উৎপাদন ও পরিষেবা ক্ষেত্রেও ব্যাপক অনিশ্চিত কাজ চালু করছে। ‘স্কিল ইন্ডিয়া ইনিশিয়েটিভ’, ‘প্ল্যাটফর্ম ইন্ডিয়া ইনিশিয়েটিভ’র মতো নীতি আয়োগ চায় নিয়োগকর্তা-শ্রমিক সম্পর্ক তুলে দিয়ে অস্থায়ী অনিশ্চিত মজুরি বাড়াতে। এই গবেষণাপত্রেই, নীতি আয়োগ জানিয়েছে, তা গিগ অর্থনীতিকে ‘ফর্মালাইজ’ করতে চায় অর্থাৎ আনুষ্ঠানিকভাবে পিস ওয়েজ কাজের মডেল চালু করতে চায়। এই আনুষ্ঠানিকতা স্থায়ী কাজ কেড়ে অস্থায়ী ভঙ্গুর অনিশ্চিত কাজের জমানাকে বৈধতা দেওয়ারই পদক্ষেপ। শাসকশ্রেণির আসল উদ্দেশ্য হল, দেশের উৎপাদক, শ্রমিকশ্রেণি, অস্থায়ী খণ্ড মজুরির শ্রমিক বাহিনীতে পরিণত করা। পুঁজিবাদীদের আরো মুনাফা লোটার উদ্দেশ্যে শাসকশ্রেণি সংগঠিত শ্রমিকশ্রেণিকে আরো বিচ্ছিন্ন করতে, শ্রমিকদের দর কষাকষির যাবতীয় অধিকার কেড়ে নিতে, সর্বত্র অস্থায়ী ও চুক্তি নিয়োগকে ব্যাপক রূপ দিতে এই পদক্ষেপ তারা নিতে চলেছে। শিল্পক্ষেত্রের সব ধরণের কাজকেই ‘মরশুমি কাজ’ করতে চায় পুঁজিবাদী শ্রেণি, মোদী সরকার ‘ফিক্সড টার্ম এমপ্লয়মেন্ট’ অর্থাৎ নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য নিয়োগ, শ্রম কোড এনেছে একই লক্ষ্যে, শ্রমিকদের আরো বিকেন্দ্রীকরণের জন্য। গিগ মজুর যাঁরা নিজেরা ব্যবসা করে ‘উদ্যোগপতি’ হতে চান, নীতি আয়োগ সুপারিশ করেছে তাঁদের স্বল্প সুদে ঋণ প্রকল্প চালু করার কথা, এটিও একটি ভাঁওতাবাজি, অর্থনীতিতে যখন চাহিদার যোগান কম থাকে, তখন স্বল্প সুদের ঋণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে পারে না। চাহিদার যোগান না বাড়লে ব্যক্তি শ্রমিককে ঋণ প্রদান কখনোই কার্যকরি হয় না, যখন ছোট ব্যবসায়ীর উৎপাদিত পণ্য বা পরিষেবার চাহিদা বেশি থাকবে তখনই সে ঋণ নিতে চাইবে মূলধন হিসাবে ব্যবহার করতে। আমেরিকা, ব্রিটেনের মতো উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলির উদাহরণ দিয়ে নীতি আয়োগ গিগ মজুদুরদের সামাজিক সুরক্ষা, বীমা এমনকী পেনশন পর্যন্ত দেওয়ার সুপারিশ করেছে। সামাজিক সুরক্ষার সুপারিশ আরও একটি নগ্ন মিথ্যাচার, মোদী সরকারের নয়া সামাজিক সুরক্ষার কোডে স্বল্প সময়ের শ্রমিক, স্বনির্ভর শ্রমিক এমনকী খেতমজুরদের সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে একটিও কথা নেই। গিগ মজুরদের ন্যূনতম মজুরি, প্রভিডেন্ট ফান্ডের বিষয়ে নীতি আয়োগ সম্পূর্ণ নীরব! কীভাবে গিগ শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা দেওয়া হবে, কীভাবে চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া হবে— সে ব্যাপারেও নীতি আয়োগ চুপ। সামাজিক সুরক্ষা কোডে এমন কোনও বিধি নেই যা গিগ শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা, পেনশন বা ইএসআই সুবিধা দিতে পারে। সামাজিক সুরক্ষার গালভরা প্রতিশ্রুতি আসলে একটি প্রতারণা যার আড়ালে লুকিয়ে আছে শ্রম সম্পর্ক, নিয়োগ সম্পর্কে আরও অস্থায়ী, অনিশ্চিত চেহারা দেয়ার অ্যাজেন্ডা। গিগ মজদুরদের নিয়ে নীতি আয়োগের এই অশ্লীল তামাশাকে শ্রমিকদের সামনে নগ্ন করে, নীতির আড়ালে থাকা রাজনীতিকে সামনে আনাই আজকের চ্যালেঞ্জ। প্রকাশের তারিখ: ২৮-অক্টোবর-২০২২ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |