|
বিশ্বাস হারানো মানুষের কাছে দিতে হবে বিকল্পের সন্ধানজেরেমি করবিন |
বিভাজনের বার্তাগুলোকে আমাদের রুখে দিতে হবে ঐক্যের বার্তা ছড়িয়ে দিয়ে। যারা বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছেন তাদের এমন কিছু বিকল্পের সন্ধান আমাদের দিতে হবে যা খানিকটা অন্যরকম। এমন কিছু কর্মসূচির কথা আমাদের বলতে হবে যা মানুষকে জোটবদ্ধ করবে সব দুঃখ কষ্টের মূল যে বৈষম্য ও কর্পোরেট আগ্রাসন তার বিরুদ্ধে। বলেছেন ব্রিটেনে লেবার পার্টির প্রাক্তন নেতা জেরিমি করবিন। মার্কিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ঠিক আগে মার্কসবাদী পথ-এর হয়ে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ময়ূখ বিশ্বাস। |
ভারতের বামপন্থী নেতাদের সংস্পর্শে আসার ক্ষেত্রে আপনার সবচাইতে স্মরণীয় মুহূর্তগুলো সম্পর্কে বলুন। যেমন জ্যোতি বসু। ১৯৮৬ সালে আমি যখন কলকাতায় গিয়েছিলাম তখন অবশেষে জ্যোতি বসু’র সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হল। সেই ঘটনা আমার স্মৃতিতে এখনও উজ্জ্বল হয়ে আছে। তাছাড়া জ্যোতি বসু আর টনি বেনের সঙ্গে সংসদে চা খাওয়া এবং পরবর্তীতে আরও একবার দেখা হয়েছিল যখন ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে উনিশশো তিরিশের দশকে জ্যোতি বসু’র নামে যে পুলিশি রেকর্ডগুলো ছিল সেগুলো একত্রিত করে বাঁধিয়ে আমরা তাঁকে উপহার দিয়েছিলাম। ভারতের স্বাধীনতার দাবিতে অনেকগুলো মিছিলে তিনি যোগ দিয়েছিলেন পুলিশ তখন সেগুলি নোট করেছিল। তিনি ছিলেন অসম্ভব রকমের তথ্যসমৃদ্ধ একজন মানুষ। ওনার কাছ থেকে অনেক কিছুই আমি শিখেছি এবং জেনেছি। টনি বেন আর আমি অপেক্ষা করে থাকতাম তাঁর লন্ডন সফরের জন্য। ইওরোপে অতি দক্ষিণপন্থার উত্থানকে আপনি কীভাবে দেখছেন? ইওরোপ জুড়ে অতি-দক্ষিণপন্থার উত্থান ঘটছে— রাস্তাঘাটে এবং সংসদের ভেতরেও। প্রায়শই আমাদের মনোযোগ থাকে অতি-দক্ষিণপন্থী দলগুলির প্রতি কিন্তু যে তথাকথিত মূল ধারার রাজনৈতিক দলগুলি তাদের শক্তি যোগায় তাদের উপরেও নজর রাখা দরকার। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ব্রিটেনে সম্প্রতি যে অতি-দক্ষিণপন্থী হিংসামূলক ঘটনাগুলি ঘটেছে সেগুলি কিন্তু হঠাৎ করে অকারণে ঘটেনি। মূল ধারার রাজনীতিবিদ যাঁরা সব উদ্বাস্তুদের দুর্বৃত্ত হিসেবে প্রতিপন্ন করতে চান এবং অভিবাসন-বিরোধী ভাষ্য ও তার প্রচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে ব্যর্থ হন তাঁরাই এর জন্য দায়ী। তাঁরা যখন বলেন, উদ্বাস্তুদের ‘যেখান থেকে এসেছে সেখানে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হোক’ তখন অতি-দক্ষিণপন্থীরা সেই কথাগুলো শোনেন। যখন শরণার্থীদের কেন হোটেলে থাকতে দেওয়া হবে— এই প্রশ্ন তাঁরা তোলেন তখন অতি-দক্ষিণপন্থীরা সেই প্রশ্ন শুনতে পায়। আখেরে এই নীতিগুলো সাধারণ মানুষের মাথায় এই ধারণাটা ঢুকিয়ে দেয় যে উদ্বাস্তুরাই শত্রু। তারা শত্রু নয়- তারা আশাহত সাধারণ মানুষ যারা কেবল কোনও রকমে বেঁচে থাকার জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছে। অতি দক্ষিণপন্থার এই উত্থানকে কীভাবে প্রতিহত করা যায়? সাহসী ও সংকল্পে অটল বামপন্থীরাই কেবল অতি-দক্ষিণপন্থাকে পরাস্ত করতে পারেন। গত চল্লিশ বছর ধরে আমি দেখেছি সবকটা রাজনৈতিক দলের রাজনীতিবিদেরা কেবলই শ্রমিক আর উদ্বাস্তুদের পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়িয়ে দিচ্ছে। অনেকেই দাবি করেন যে তাঁরা শ্রমিক শ্রেণির পক্ষে কথা বলেন। তাহলে যে উদ্বাস্তুরা চরম দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করছে বা যে অভিবাসীরা খুব কম মাইনেতে নিরাপত্তাহীন নানান পেশায় যুক্ত হয়ে অনিশ্চিত জীবনযাপন করছে তাদের হয়ে তাঁরা কথা বলেন না কেন? একই রকমের আর্থিক অবস্থা যে সাদা চামড়ার মানুষদের তাদের এইসব উদ্বাস্তু পরিযায়ী মানুষদের বিরুদ্ধে লড়িয়ে দিলে কার লাভ হয়? এইসব বিভাজনমূলক রাজনীতির ফায়দা তোলে শুধু সেই লোকগুলো যারা দেশের মাথায় বসে রয়েছে। বিভাজনের বার্তাগুলোকে আমাদের রুখে দিতে হবে ঐক্যের বার্তা ছড়িয়ে দিয়ে। যারা বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছেন তাদের এমন কিছু বিকল্পের সন্ধান আমাদের দিতে হবে যা খানিকটা অন্যরকম। এমন কিছু কর্মসূচির কথা আমাদের বলতে হবে যা মানুষকে জোটবদ্ধ করবে সব দুঃখকষ্টের মূল যে বৈষম্য ও কর্পোরেট আগ্রাসন তার বিরুদ্ধে। আমরা প্রত্যেকে যে সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হচ্ছি— বাসস্থানের সংকট, এনএইচএস ভেঙে পড়া, বেসরকারিকরণের বিপর্যয় এই সবকিছুকে সামাল দিতে পারে এমন কোনও কর্মসূচি আর পদ্ধতির কথা আমাদের বলতে হবে। যাতে সব সম্প্রদায়ের মানুষকে এই আশা যোগানো যায় যে বর্তমান সমাজের চাইতে সুন্দর ও সুসঙ্গত একটি সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। ভয় ও বিভাজনের রাজনীতিকে আমরা পরাস্ত করতে পারি একমাত্র আশা জাগানোর রাজনীতি দিয়ে। ফ্রান্সে অতি দক্ষিণপন্থী সরকার নির্বাচিত হয়ে গিয়েছিল প্রায়। সেখানে বিপ্লবী দৃঢ় বামপন্থা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে একটা আশাপ্রদ বিকল্পের সন্ধান দিতে পেরেছিল। শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সের নির্বাচনের এই অত্যাশ্চর্য ফলাফল আমাদের শিখিয়েছে যারা বিভাজন ও ভয়ের বীজ বপন করে তাদের জমি ছেড়ে দেওয়া যাবে না। এই শিক্ষা এই মুহূর্তে খুব প্রয়োজনীয় ও মূল্যবান। বিকল্পের উৎস কী? সংসদে একটি স্বাধীন জোটের অংশ হতে পেরে আমি খুব গর্বিত— ঘৃণা ও বিভাজনের পাল্টা বিকল্পকে হাজির করার জন্য নির্বাচিত হতে পারা গর্বের। ২৬ অক্টোবর আমরা সবাই লন্ডনে একটি অতি দক্ষিণপন্থী মিছিলের বিরুদ্ধে একটি বিবৃতি প্রকাশ করে তাতে স্বাক্ষর করেছি। যে রাজনীতি প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলিকে আক্রমণের নিশানা করে তুলে আমাদের প্রাত্যহিক সমস্যাগুলোর সমাধানের পথে বাধা সৃষ্টি করে সেই রাজনীতিকে আমরা প্রত্যাখ্যান করি। মুসলমানদের আক্রমণ করলে, অভিবাসী মানুষদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দিলে আমাদের বাড়িঘর তৈরি হয়ে যাবে না, বাচ্চাদের পড়াশোনার সমস্যা মিটবে না, স্বাস্থ্য পরিষেবা বা জলবায়ু সংকটে ব্যয় বরাদ্দ বাড়বে না। আমরা সংসদে আছি এই বিকল্পের কথা বলব বলে যা সম্পদের পুনর্বন্টন নিশ্চিত করবে আর এমন একটা সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলবে যা প্রত্যেকটি মানুষের কথা ভাবে। এখানকার ভারতীয় সমাজের প্রগতিশীল অংশ কীভাবে বৃহত্তর গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শরিক হয়ে এখানকার নানান সমস্যা নিয়ে কাজ করছে? ইন্ডিয়ান ওয়ার্কার্স অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে কাজ করতে আমার সব সময়েই খুব ভালো লাগে। প্রথম তাদের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল ১৯৭১ সালে শ্রপশায়ারের টেলফোর্ডে। ইয়ং সোশ্যালিস্টদের সঙ্গে যৌথভাবে আমরা সেই সময়ে ক্যাম্পেন করেছিলাম অভিবাসন আইনের বিরুদ্ধে। আমরা ওয়েলিংটনে অনশন আন্দোলন সংগঠিত করেছিলাম অভিবাসন প্রস্তাবে যে পরিবারগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তাদের সংহতি জানিয়ে। এই অভিবাসন প্রস্তাব ছিল কৌশলগত ভাবে বর্ণবিদ্বেষী এবং এর ভিত্তি ছিল পুরুষকেন্দ্রিক বংশপরিচয়ের ধারা। এখনও পর্যন্ত আমরা তাদের সঙ্গে কাজ করছি। যেভাবে আইডব্লুএ বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়াই করছে, ব্রিটেনে সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর লড়াইয়ে যোগ দিতে তারা যেভাবে সদাপ্রস্তুত তার জন্য আমরা তাদের খুব শ্রদ্ধা করি। আমেরিকায় নির্বাচন হতে চলেছে। ট্রাম্প, রিপাবলিকানদের পরাজয় কি সম্ভব? প্যালেস্তাইনের বিষয়টা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বার্নি স্যান্ডার্স, ওকাসিও কোর্তেজরা কী বলছেন? ট্রাম্পের বিভাজনমূলক বিপদজনক রাজনীতিকে পরাস্ত করা অবশ্যই সম্ভব। এর সর্বশ্রেষ্ঠ উপায় হল মানুষকে অনুপ্রাণিত করা যাতে তারা এমন একটা বলিষ্ঠ, আশাবাদী বিকল্পকে নির্বাচন করে যার ভিত্তি অন্তর্ভুক্তি, গণতন্ত্র ও শান্তি। সবার আগে কমলা হ্যারিসের উচিত ইজরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহ করব না— এই প্রতিশ্রুতি দেওয়া। এটা কেবল সবচাইতে সুকৌশলী পদক্ষেপ নয়, এটাই নৈতিকভাবে সঠিক পদক্ষেপ। আমেরিকার সরকার প্যালেস্তাইনের গণহত্যার সঙ্গে সরাসরি জড়িত এবং সব মানুষের জীবনকে সমমূল্য দিতে তারা নারাজ, তাই সাধারণ মানুষ অত্যন্ত বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছে। প্যালেস্তাইন-কে সংহতি জানিয়ে কীভাবে বিশ্বব্যাপী আন্দোলন গড়ে তোলা যায়? প্যালেস্তাইনের সংহতিতে আমাদের আন্দোলন আজকের নয়। এই আন্দোলন যাদের কাঁধের উপর ভর দিয়ে গড়ে উঠেছে তারা জানেন জাতিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়াই করা কতটা কঠিন ও জরুরি। সংসদ থেকে দক্ষিণ আফ্রিকায় জাতি ও বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গেলে নিজেকে একা মনে হতে পারে। ইসলিংটনে তা কখনও মনে হয়নি। আমার মনে আছে উনিশশো আশির দশকে এএনসি পতাকা ওড়াবার জন্য ইসলিংটন কাউন্সিলকে সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। তারা সময়ের তুলনায় অনেকটা এগিয়ে ছিল। এসেক্স রোডের ইন্টারন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যান্ড এইড ফান্ড ফর সাউথ আফ্রিকাও তাই। তারা দক্ষিণ আফ্রিকার রাজনৈতিক বন্দীদের হয়ে আইনজীবী নিয়োগ করাবার জন্য আর্থিক সাহায্য করেছিল। আন্তর্জাতিক সংহতি ও সহযোগিতার গুরুত্ব কতখানি তা ভুলে গেলে চলবে না। আজকের দুনিয়ায় এর সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ হল ‘বয়কট, ডাইভেস্টমেন্ট, স্যাংশনস্‘ আন্দোলন। গোটা পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ মানুষ মানবাধিকার, পরিবেশ ও ন্যায়ের মত বিষয়গুলো নিয়ে গভীরভাবে ভাবনাচিন্তা করেন, মাথা ঘামান। বিডিএস আন্দোলন সেই সমস্ত সরকার, প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানিগুলোকে চাপে রাখে যাদের বিরুদ্ধে বৈষম্য ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ও প্রমাণ আছে। শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমাদের যে আন্দোলন তার অংশ সমস্ত সম্প্রদায়, ধর্মীয় বিশ্বাস ও সমস্ত ভাষাভাষী মানুষ। প্রান্তিক ও দখলদারির শিকার যে মানুষেরা তাদের পাশে দাঁড়াবার জন্য এত রকমের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। ভারতের সঙ্গে আপনার বন্ধুত্ব অনেকদিনের। ভারতে গণতান্ত্রিক ফেডারাল আন্দোলনগুলির বিষয়ে আপনার মতামত বা পর্যবেক্ষণ কী? ভারত একটা সুবৃহৎ দেশ। বহু সংস্কৃতি, ভাষা ও ঐতিহ্যের দেশ এবং বৈচিত্র্যময়। আবার এই দেশ ব্রিটিশ উপনিবেশ হিসেবে ঔপনিবেশিক যুগে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাক স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও জমায়েতের অধিকার এবং রাজনৈতিক শিক্ষার প্রসার বিশেষত অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের মধ্যে— গণতন্ত্র রক্ষার জন্য এইগুলো আবশ্যিক । গত বছর আমার ভারতে যাবার সুযোগ হয়েছিল। ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সপোর্ট ফেডারেশন-এর সঙ্গে আমি মুম্বই গিয়েছিলাম। সুযোগের সদ্ব্যবহার করে কিছু ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে মিটিং-ও করেছি, বিশেষ করে রেল শ্রমিকরা যারা শ্রমিকের অধিকার ও পেনশনের অধিকার রক্ষার স্বার্থে আন্দোলন ও প্রচার করছে। ভারতে শ্রমিক শ্রেণির ঐক্য ও সংহতি গড়ে তোলাটাই সবচাইতে জরুরি। ভারতের সবকটি ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা যাবে আমি এই আশা রাখি। ভাষান্তর: শিঞ্জিনী সরকার প্রকাশের তারিখ: ১৫-নভেম্বর-২০২৪ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |