|
গ্রামীণ উন্নয়নে পঞ্চায়েত – ১ম পর্বজ্যোতি বসু |
গ্রামাঞ্চলে সাধারণ গরিব মানুষের স্বার্থে এই অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে যে পরিকল্পনার প্রচেষ্টা, এর রচনা ও রূপায়ণের মূল দায়িত্ব কাদের নিতে হবে? নিতে হবে গরিব মানুষদের নিজেদেরই এবং সংগঠনের মাধ্যমে। এমন সংগঠনের মাধ্যমে যা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত এবং যথেষ্ট বিকেন্দ্রীকরণের ভেতর দিয়ে স্থানীয় সমস্যার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। এ প্রসঙ্গেই ত্রিস্তর পঞ্চায়েত ব্যবস্থার— জেলাস্তরে জেলা পরিষদ (মোট সংখ্যা ১৫), ব্লক স্তরে পঞ্চায়েত সমিতি (মোট সংখ্যা ৩৩৯) এবং অঞ্চল স্তরে গ্রাম পঞ্চায়েত (মোট সংখ্যা ৩৩০৫)-র যৌক্তিকতা ওঠে। |
রাজ্যস্তরে সীমিত ক্ষমতার মধ্যে দাঁড়িয়ে যে কোনো উন্নয়ন উদ্যোগের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সমস্যার কিছুটা প্রশমন মাত্রই হতে পারে, এই সাধারণ ধারণা সামনে রেখেই গত প্রায় আট বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গে গ্রামাঞ্চলে উন্নয়নের কতগুলি নির্দিষ্ট প্রচেষ্টা আমরা গ্রহণ করেছি। অভিজ্ঞতায় দেখেছি যে, সঠিক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে প্রচেষ্টাগুলি গ্রহণ করলে এবং তার সঙ্গে সাধারণ মানুষকে সংগঠিতভাবে যুক্ত করতে পারলে, এই সীমিত প্রচেষ্টাগুলিও রাজনৈতিকভাবে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এই অভিজ্ঞতাগুলি কিছুটা একত্রিত করাই এই আলোচনার উদ্দেশ্য। তুলনা করার সুবিধার জন্য, বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসার আগে এ-রাজ্যে গ্রামোন্নয়ন উদ্যোগ হিসাবে যে-ব্যবস্থা চালু ছিল, তার সংক্ষিপ্ত উল্লেখ করে আলোচনা শুরু হবে। তারপর, বামফ্রন্ট সরকার আসার পর এই ব্যবস্থার ক্ষেত্রে যে দিক-পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়েছে তার বর্ণনা থাকবে। অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আমরা বুঝেছি, এই প্রচেষ্টাগুলির ক্ষেত্রেও উন্নতি দরকার, সংযোজন করা দরকার। ইদানীংকালে তাই যে নতুন পদক্ষেপগুলি নেওয়া হচ্ছে, তার উল্লেখ করে আলোচনা শেষ হবে। বামফ্রন্ট সরকার আসার আগে এ রাজ্যের গ্রামাঞ্চলে কিছু পরিকাঠামো (যথা সেচ, রাস্তা ইত্যাদি) নির্মাণের চেষ্টা হয়েছিল এবং এর ফলে কৃষি উৎপাদন কিছুটা বৃদ্ধি পায়। কিন্তু এই উদ্যোগগুলির মূল উদ্দিষ্ট শ্রেণী হিসেবে গ্রামের গরিব মানুষরা ছিলেন না এবং তাই সাধারণভাবে এর সুফল তাঁদের কাছে পৌঁছায়নি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এই সময়ের বড়ো সেচ প্রকল্পগুলির ক্ষেত্রে প্রায়শই সেচ প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট কেবলমাত্র মূল নালাটি কাটা হয়েছে এবং তার আশেপাশের জমি বড়ো চাষীরা নিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু, সেই মূল নালাটি থেকে ছোটো ছোটো মাঠ-নালাগুলি আর কাটা হয়নি এবং তার ফলে অপেক্ষাকৃত দূরে অবস্থিত গরিব চাষীদের জমিতে জল পৌঁছায়নি। এই ধরনের পরিকল্পনার একটি ফলশ্রুতি হিসেবে দেখা গেছে যে, পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চলে গরিব চাষীরা অতি দ্রুত হারে জমি হারিয়েছেন এবং ফলে ভূমিহীন ক্ষেত মজুরের সংখ্যা ১৯৬১ সালে ১৮ লক্ষ থেকে প্রায় ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৯৭১ সালে ৩২ লক্ষে এসে দাঁড়িয়েছে। এই পরিকল্পনার আরেকটি দিক হলো যেহেতু এর উদ্দিষ্ট শ্রেণী গ্রামে গরিব মানুষরা ছিলেন না, তাই এর প্রকল্প রচনা ও রূপায়ণের ক্ষেত্রে গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষকে যুক্ত করার কোনো চেষ্টা হয়নি। ১৯৭৭ সালে রাজ্যস্তরে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরিকল্পনার ক্ষেত্রে উদ্দিষ্ট শ্রেণী এবং প্রকল্প রচনা ও রূপায়ণে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ— এই দু'টি বিষয়েই রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি সামনে রেখে আমরা এক দিক পরিবর্তনের চেষ্টা করেছি। আমরা বলছি, গ্রামাঞ্চলের উন্নয়ন আসবে প্রধানত গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষেরই মাধ্যমে এবং এই উন্নয়নের জন্য পরিকল্পনা রচনা ও রূপায়ণ করার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে সংগঠিত করে যুক্ত করতে হবে। গ্রামাঞ্চলে সাধারণ মানুষ বলতে এখানে বোঝানো হচ্ছে ভূমিহীন ক্ষেতমজুর, বর্গাদার, ছোটো চাষী ও সাধারণ চাষী যিনি কায়িক শ্রমে চাষ করেন এবং গরিব গ্রামীণ কারিগর। পশ্চিমবঙ্গে গ্রামাঞ্চলে মোট পরিবার সংখ্যার শতকরা ৯০ ভাগেরও বেশি এঁদেরই অন্তর্ভুক্ত। আমরা মনে করি, গ্রামীণ উন্নয়ন প্রচেষ্টার অর্থ হলো রাজ্যস্তরে যা সীমিত ক্ষমতা আছে তা ব্যবহার করে গ্রামাঞ্চলে, প্রধানত এই সাধারণ গরিব মানুষদের জমি অন্যান্য উপকরণ দিয়ে কৃষি ও কৃষি-সংক্রান্ত ক্ষেত্রে এবং গ্রামীণ শিল্পের ক্ষেত্রে উৎপাদন বৃদ্ধি করা এবং যতদূর সম্ভব, কৃষি ও গ্রামীণ শিল্পের এই উৎপাদন বৃদ্ধির মধ্যে একটি সমন্বয় রক্ষা করা। এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, কেন প্রধানত গ্রামের এই সাধারণ গরিব মানুষদের মাধ্যমে এই উন্নতির কথা ভাবা হচ্ছে। এর মূল উত্তর হলো, আমরা মনে করি এবং অভিজ্ঞতা ও তথ্যের মাধ্যমে জেনেছি, যে কৃষকরা নিজের শ্রম ব্যবহার করে চাষ করছেন, চাষের জমি যদি তাঁদের হয় তা হলেই একর প্রতি উৎপাদন সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়। এ এক আনন্দজনক বিস্ময়! ধনী চাষীদের তুলনায় এই গরিব সাধারণ চাষীদের মূলধনের দারুণ অভাব। কিন্তু সেই অভাব গরিব চাষীরা অনেক বেশি পূরণ করে নেন নিজেদের শ্রম ব্যবহার করে, যার ফলে তাঁদের জমিতেই একর প্রতি উৎপাদনের রেকর্ড সবচেয়ে বেশি হয়। সুতরাং যদি ধনী চাষীদের উদ্বৃত্ত জমি সাধারণ গরিব চাষীদের দেওয়া যায় এবং একই সঙ্গে তাঁদের উৎপাদনের অন্যান্য উপকরণও সুলভে দেওয়ার ব্যবস্থা করা যায়, তা হলে কৃষিতে উৎপাদন সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পাবে। তাই বামফ্রন্ট সরকারের গ্রামীণ উন্নয়ন পরিকল্পনা যাত্রা শুরু হয়েছে ভূমিসংস্কারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে। গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ঊর্ধ্বসীমা বহির্ভূত জমি উদ্ধার করা ও গরিব চাষীদের মধ্যে বণ্টন করার ওপর। সেই সঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বর্গাদারের নাম রেকর্ড করার ওপর, তাদের কাজের স্থায়িত্ব ও ভাগের নিশ্চয়তা আনার জন্য। গরিব চাষীকে শুধু জমি এবং বর্গাদারের নাম রেকর্ড করানো যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে জমি ছাড়া অন্যান্য উপকরণ, যথা সেচের জল, সার ইত্যাদি ক্ষেত্রেও তাদের সহায়তা করা প্রয়োজন। এই প্রতিটি উৎপাদন উপকরণের যোগানের ক্ষেত্রেই উৎপাদন প্রণালীর সঠিক নির্বাচনের যথেষ্ট গুরুত্ব আছে। দরিদ্র কৃষকের স্বার্থে এই প্রণালী যতদূর সম্ভব শ্রম-নিবিড় ও স্থানীয় সম্পদ নির্ভর হওয়া বাঞ্ছনীয়। আবার শুধুমাত্র কৃষি উৎপাদনের ওপর জোর দিলেই চলবে না। এর সঙ্গে পশুপালন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয় হিসেবে পশু খাদ্য ও চিকিৎসার ওপরও জোর গুরুত্ব দিতে হবে। গুরুত্ব দিতে হবে আমাদের রাজ্যের অসংখ্য জলাশয় এবং কাছের সমুদ্র ব্যবহার করে মৎস্যচাষের ওপর। বিশেষ করে চিন্তা করতে হবে বনসৃজনের কথা এবং নির্দিষ্টভাবে সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণীয় সামাজিক বনসৃজনের কথা। আমরা মনে করি, আমাদের রাজ্যের জেলাগুলিতে এবং গ্রামাঞ্চলে ছোটো শিল্পের যথেষ্ট সম্ভাবনা, আছে। এই সম্ভাবনা কার্যকর করার জন্য শিল্পগুলির স্থানীয় প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করা প্রয়োজন এবং স্থানীয় কৃষি সংক্রান্ত উৎপাদনের সঙ্গে উৎপাদন-উপকরণের যোগান দেওয়া অথবা উৎপন্ন ফসল ইত্যাদিকে শিল্পজাত করার মাধ্যমে সংযুক্ত হওয়া প্রয়োজন। এই প্রসঙ্গেই কৃষি ও কৃষি সংক্রান্ত উৎপাদন এবং স্থানীয় উৎপাদনের সমন্বয়ের কথা আসে, যার উল্লেখ আগে করা হয়েছে। এই স্থানীয় সমন্বয় হলো জেলা ও গ্রামাঞ্চলে ছোটো শিল্প- সম্ভাবনার একটি দিক। এ ছাড়া, জেলা ও গ্রামাঞ্চলে ছোটো শিল্প সম্ভাবনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ওই জেলার বা নিকটবর্তী জেলার বড়ো বা মাঝারি শিল্পের “সংশ্লিষ্ট শিল্প” হিসাবে গড়ে ওঠার সুযোগ নেওয়া। আগামী দিনে এই ধরনের সুযোগের দরজা কিছুটা খুলবে বলে আমরা আশা করি। সাধারণ উৎপাদক এবং সাধারণ ক্রেতার স্বার্থে কৃষি, কৃষিসংক্রান্ত বিষয় শিল্প — প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিপণন ব্যবস্থাকে সংগঠিত করা বিশেষ প্রয়োজন। এবং এই বিপণন ও অন্যান্য সামাজিক প্রয়োজন সামনে রেখে গ্রামাঞ্চলে রাস্তা ও পরিবহণ পরিকল্পনার কথা চিন্তা করতে হবে। এ ছাড়া গ্রামাঞ্চলে শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্যের বিশেষ ভূমিকা আছে। সাধারণ মানুষকে কেন্দ্র করে যে উৎপাদন প্রচেষ্টার কথা আমরা আলোচনা করলাম, শিক্ষার বিষয়বস্তুর সঙ্গে তার যেন নির্দিষ্ট সংযোগ থাকে এবং বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার মধ্যে যতদূর সম্ভব যেন একটা সমন্বয় থাকে। জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে আবার সাধারণ মানুষের স্বার্থে নিবারণমূলক ব্যবস্থার আরও প্রসারের প্রয়োজন আছে এবং প্রয়োজন আছে এই ব্যবস্থার সঙ্গে নিরাময়মূলক ব্যবস্থার সুষ্ঠু সমন্বয়ের। গ্রামাঞ্চলে সাধারণ গরিব মানুষের স্বার্থে এই অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে যে পরিকল্পনার প্রচেষ্টা, এর রচনা ও রূপায়ণের মূল দায়িত্ব কাদের নিতে হবে? নিতে হবে গরিব মানুষদের নিজেদেরই এবং সংগঠনের মাধ্যমে। এমন সংগঠনের মাধ্যমে যা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত এবং যথেষ্ট বিকেন্দ্রীকরণের ভেতর দিয়ে স্থানীয় সমস্যার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। এ প্রসঙ্গেই ত্রিস্তর পঞ্চায়েত ব্যবস্থার— জেলাস্তরে জেলা পরিষদ (মোট সংখ্যা ১৫), ব্লক স্তরে পঞ্চায়েত সমিতি (মোট সংখ্যা ৩৩৯) এবং অঞ্চল স্তরে গ্রাম পঞ্চায়েত (মোট সংখ্যা ৩৩০৫)-র যৌক্তিকতা ওঠে। এখানে বলা প্রয়োজন যে, বামফ্রন্ট সরকার আসার আগে পনেরো বছরেরও ওপর এই পঞ্চায়েতগুলিতে কোনো নির্বাচন করা হয়নি এবং পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে মৃতপ্রায় অবস্থাতেই রাখা হয়েছিল। বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১৯৭৮ সালে প্রথম এই ত্রিস্তর পঞ্চায়েতগুলিতে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয় এবং পাঁচ বছর পর ১৯৮৩ সালে আবার পঞ্চায়েত নির্বাচন হয়। বলা প্রাসঙ্গিক, পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চায়েত নির্বাচনের ওপর ভারত সরকারের গ্রামীণ উন্নয়নের জাতীয় সংস্থা (National Institute of Rural Development) একটি বিশেষ সমীক্ষা করেছে। এই সমীক্ষায় তারা বিশ্লেষণ করে দেখেছে যে, পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চায়েত নির্বাচনে ফলাফলের ওপর জাত-পাতের কোনো প্রভাব পড়েনি, ফলাফল নির্ধারিত হয়েছে গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক- অর্থনৈতিক সচেতনতার ভিত্তিতে। বলাবাহুল্য, এই দু'টি নির্বাচনেই বামপন্থী প্রার্থীরা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জয়ী হয়েছেন। প্রথম পঞ্চায়েত নির্বাচনের পর রাজ্য সরকারের উন্নয়ন বিভাগ গ্রাম পঞ্চায়েতের ওপর একটি নমুনা সমীক্ষা করে। এই সমীক্ষার তথ্য থেকে আরও দেখা যায় যে, এই পঞ্চায়েতগুলির নির্বাচিত সদস্যদের শতকরা ৮০ জনের বেশি এসেছেন ভূমিহীন ক্ষেতমজুর, বর্গাদার, গ্রামীণ কারিগর, বেকার, শিক্ষক ও নিজের জমি চাষ করেন এমন কৃষক - এঁদের মধ্যে থেকে। নিজের জমি চাষ করেন এমন কৃষকদের মধ্যেও শতকরা ৭১ জনের বেশি এসেছেন ছোটো ও প্রান্তিক কৃষকদের থেকে। অর্থাৎ এই তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায় এবং যা আমরা নিজেদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে অবশ্যই জানি যে, এই পঞ্চায়েতের সদস্যরা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি। এই সংখ্যাতত্ত্বের বাইরে যা আরও গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, এই পঞ্চায়েতগুলি কোনো বিচ্ছিন্ন সংগঠন নয়। এরা বামপন্থী রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত। এ রাজ্যের বামপন্থী আন্দোলনের যে সুদীর্ঘ গর্বিত ইতিহাস, আজকের পঞ্চায়েত তারই একটি বিশেষ প্রকাশ। পঞ্চায়েতের এই শ্রেণীচরিত্র এবং এই রাজনৈতিক সাংগঠনিক সংযোগ মনে রেখে গ্রামীণ উন্নয়নের যে বিশেষ অগ্রাধিকার ভিত্তিক পরিকল্পনার প্রচেষ্টা গত প্রায় আট বছর ধরে এরাজ্যে চলেছে, তার রচনা ও রূপায়ণের মূল দায়িত্ব ধাপে ধাপে এই পঞ্চায়েতগুলির ওপর দেওয়া হয়েছে। তার সঙ্গে এও বলা হয়েছে যে, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পঞ্চায়েত সদস্যরা এবং বিভিন্ন স্তরের সরকারী কর্মচারীরা পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করবেন। আগেই আলোচনা করা হয়েছে যে, এই পরিকল্পনা প্রচেষ্টার অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ভূমিসংস্কার। ভূমিসংস্কারের রূপায়ণে— ঊর্ধ্বসীমা বহির্ভূত জমি উদ্ধার ও বণ্টন এবং বর্গাদারের নাম রেকর্ড করা— এই দুই ক্ষেত্রেই পঞ্চায়েতগুলিকে যুক্ত করা হয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত এরাজ্যে প্রায় সাড়ে বারো লক্ষ একর কৃষিযোগ্য জমি সরকারের হাতে ন্যস্ত হয়েছে এবং তার বণ্টন থেকে উপকৃত হয়েছেন প্রায় ১৬ লক্ষ দরিদ্র কৃষক পরিবার। পশ্চিমবঙ্গে ভূমিহীন এবং আধ একরের কম জমি আছে এমন পরিবারের সংখ্যা প্রায় ২৫ লক্ষ। সুতরাং ভূমিবণ্টন থেকে এঁদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কিছু উপকার পেয়েছেন। এ ছাড়াও আনুমানিক ১৫ লক্ষ থেকে ২০ লক্ষ মোট বর্গাদারের (নির্দিষ্ট সংখ্যা কিছুটা অনিশ্চিত) মধ্যে প্রায় ১৩ লক্ষ বর্গাদারের নাম রেকর্ডভুক্ত হয়েছে। ভূমিসংস্কারের ক্ষেত্রে সারা দেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের চিত্র তুলনা করা উচিত। ভারতবর্ষে সামগ্রিকভাবে এখনো পর্যন্ত মাত্র শতকরা ১ ভাগের মতন কৃষিযোগ্য জমি বণ্টনের জন্য সরকারে ন্যস্ত করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গে মোট কৃষিযোগ্য জমির প্রায় ১০ শতাংশ সরকারে ন্যস্ত করা সম্ভব হয়েছে। ভূমিসংস্কারের ক্ষেত্রে সারা দেশে পশ্চিমবঙ্গের স্থান শুধু প্রথম তাই নয়, এর ধারে কাছে আর কোনো রাজ্য নেই। সি পি আই (এম) পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সাপ্তাহিক মুখপত্র ‘দেশহিতৈষী’ -র ১৯৮৫ শারদ সংখ্যায় (পৃষ্ঠাঃ ২৯ – ৩৪) এই প্রবন্ধ প্রকাশ হয়েছিল। মূল শিরোনাম ছিল ‘পশ্চিমবঙ্গে গ্রামীণ উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রয়াস ও পঞ্চায়েত ব্যবস্থা’। প্রকাশের তারিখ: ২৫-আগস্ট-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |