বিরাট নির্বাচনী জালিয়াতি

ওয়েব ডেস্ক মার্কসবাদী পথ

এসআইআর নামকরণটাই পরিকল্পিততভাবে তৈরি করা। এই সংশোধনী নিবিড়-ও নয়, সংক্ষিপ্ত-ও নয়। আসলে এই নামকরণের আড়ালে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়াই লক্ষ্য। অথচ একেবারে গোড়া থেকেই এবিষয়ে যে বুনিয়াদি নীতি অনুসরণ করা হয়েছে তা হল,  নাগরিকত্বের প্রমাণ দেওয়ার দায় কখনই ভোটারদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়নি। অথচ নির্বাচন কমিশনের এখনকার দৃ্ষ্টিভঙ্গি একেবারে তার বিপরীত। এসআইআর নাগরিকত্ব প্রমাণের দায় ঠেলে দিয়েছে ভোটারদের ওপর।

নির্বাচন কমিশন যেভাবে সম্প্রতি বিজ্ঞাপনের ঝটিকা আক্রমণ নামিয়ে আনছে, তাকে ভণ্ডামির পাঠ্যবই ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। কমিশন প্রমাণ করতে চাইছে যে আসন্ন বিহার বিধানসভা নির্বাচনের জন্য ভোটার তালিকার যে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) চলছে তা সবাইকে নিয়েই করা হচ্ছে। এবং বিজ্ঞাপনে বলা হচ্ছে যে এই সংশোধন করা হচ্ছে সব রাজনৈতিক দলকে সঙ্গে নিয়ে। এতদিন পর্যন্ত এদেশে রাজনৈতিক দলগুলির পরামর্শ নিয়ে সব নির্বাচনী সংস্কার করা করেছে নির্বাচন কমিশন। এমনকী আদর্শ আচরণ বিধিও চালু হয়েছে সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে। আদর্শ আচরণ বিধি কোনও সংবিধি দ্বারা নির্ধারিত নয়।  তবুও এই প্রক্রিয়ার শক্তি  ও গ্রহণযোগ্যতার ফলে, এই ব্যবস্থাটি চালু করার ফলে যে চ্যালেঞ্জ সামনে এসেছিল সফলভাবে তার মোকাবিলা করেছিল। 

অথচ এসআইআরের বেলায় ঘটেছে ঠিক এর বিপরীত। বিহারে এসআইআর চালু করার আগে যদিও এ নিয়ে জাতীয় দলগুলির নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে কথা হয়েছিল, তবুও আসন্ন তালিকা সংশোধন যে এত বিপুল হারে করা হবে তার কোনও আভাসই দেওয়া হয়নি। ফলে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কমিশন যা দাবি করছে তাকে পুরোপুরি সত্যের অপলাপ ছাড়া কিছুই বলা যায় না।

তবে এসআইআর-এর প্রথম পর্বেই যা সামনে এসেছে তাতেই বোঝা যাচ্ছে এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য অত্যন্ত সন্দেহজনক এবং বিষয়টি খুবই উদ্বেগের।এটা মূলত কোনও সংশোধনই নয়। বরং এ হল একেবারে নতুন করে ভোটার তালিকা তৈরি করা। ভারতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার একেবারে বুনিয়াদি দৃষ্টিভঙ্গী ছিল, একটা আদর্শ সংসদীয় ব্যবস্থা গড়ে তোলা যার ভিত্তি হবে প্রাপ্তবয়স্কের সর্বজনীন ভোটাধিকার। দেশের প্রথম নির্বাচন কমিশনার একে বাস্তবায়িত করেছিলেন দুটি মূল মানদণ্ডের ভিত্তিতে: ভোটাধিকার হবে সর্বজনীন এবং ভোটার তালিকা তৈরির দায় নির্বাচন কমিশনের, ব্যক্তি ভোটারের নয়। সংবিধানের ৩২৬ ধারা অনুযায়ী এমনটাই হওয়ার কথা। কারণ ওই ধারাতেই নির্দেশ দেওয়া ছিল প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারের বিষয়টি কীভাবে বাস্তবায়িত করতে হবে। সেই নির্দেশ ছিল সুস্পষ্ট।

নাগরিকত্বের প্রমাণ দেওয়ার দায় কখনই ভোটারদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়নি। যদি সংবিধানের ৩২৬ ধারাকে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করা হয় তাহলে স্পষ্ট দেখা যাবে যে এক্ষেত্রে জোর দেওয়া হয়েছে ভোটাধিকারের সর্বজনীনতার ওপর, নাগরিকত্বের ওপর নয়। ভোটার তালিকা সংশোধন একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া যার ফলে সময়ান্তরে এই তালিকার সংশোধন নিশ্চিত হয়। এমনকী ২০০৩ সালের যে সংশোধনীকে এখনকার নির্বাচন কমিশনার অলঙ্ঘনীয় বলে মেনে নিয়েছে, তাতেও ভোটারদের কাছ থেকে স্পষ্টভাবে নাগরিকত্বের প্রমাণ দাবি করা হয়নি। মহাফেজখানায় রাখা নথি এবং ওই সময়ের সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট থেকেও এই বিষয়টি স্পষ্ট। এসআইআর নামকরণটাই পরিকল্পিততভাবে তৈরি করা। এই সংশোধনী নিবিড়ও নয়, সংক্ষিপ্তও নয়। আসলে এই নামকরণের আড়ালে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়াই লক্ষ্য। এসআইআর নাগরিকত্ব প্রমাণের দায় ঠেলে দিয়েছে ভোটারদের ওপর। অথচ একেবারে গোড়া থেকেই এবিষয়ে যে বুনিয়াদি নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে কমিশনের এখনকার দৃ্ষ্টিভঙ্গি একেবারে তার বিপরীত। 

ভারতের নির্বাচন কমিশন ২৭ জুলাই যে প্রেস বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে তাতে দেখা যাচ্ছে এপর্যন্ত ৭ কোটি ২৪ লক্ষ এনুমারেশন ফর্ম সংগ্রহ করা হয়েছে। এখন খসড়া ভোটার তালিকায় শুধু এই নামগুলিই থাকবে। অথচ ২০২৫ সালের ২৪ জুন রাজ্যের ভোটার তালিকায় নাম ছিল ৭ কোটি ৮৯ লক্ষের। এবং ওই দিনেই এসআইআর চালু করা হয়। নির্বাচন কমিশন দাবি করছে, বাকিদের মধ্যে (২২ লক্ষ) মৃত, স্থায়ীভাবে অন্যত্র চলে গেছেন কিংবা খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না (৩৬ লক্ষ), কিংবা একাধিক জায়গায় ভোটার তালিকায় নাম রয়েছে (৭ লক্ষের) কিংবা একাংশ ‘কোনও কারণে নির্বাচকদের তালিকায় তাঁদের নাম তুলতে আগ্রহী নন’ (এমন লোকের সংখ্যা দেওয়া হয়নি)। এসআইআরের আদেশ অনুযায়ী, খসড়া ভোটার তালিকায় (ডিইআর) এই ৬৫ লক্ষ লোকের নাম থাকবে না। 

বাদ পড়াদের এই সংখ্যা খুবই উদ্বেগজনক। ২০২০ সালে বিহারে বিধানসভা নির্বাচন হয়েছিল। তখন ভোটারের সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৩৬ লক্ষ।  এবার ২০২৫ এর বিধানসভা নির্বাচনে ভোটারদের সংখ্যা কমবে। অতীতের রেকর্ড যদি দেখা হয়, তাহলে বোঝা যাবে এই বিষয়টি পুরোপুরি অস্বাভাবিক। এর থেকে নানা প্রশ্ন উঠে আসে। কোনও ব্যক্তি ‘স্থায়ীভাবে রাজ্য ছেড়ে চলে গেছেন’— এবিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রতিটি ক্ষেত্রে কি বিশদে তদন্ত হওয়া উচিত নয়? কীভাবে মাত্র ৩০ দিনের মধ্যে ৩৭ লক্ষ লোকের বিষয়ে এমন তদন্ত শেষ হতে পারে? বিহারের পরিযায়ী শ্রমিকদের মধ্যে সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে তাঁদের ৯০ শতাংশই জানেন না এসআইআর কী, এজন্য দরকারি ফর্ম জমা দেওয়ার কথা জানা তো দূরের কথা।

যে বিপুল সংখ্যক ভোটারদের মৃত বলে ঘোষণা করা হয়েছে, যেহেতু ২০২৫ এর জানুয়ারির সামারি রিভিশনে তাদের কোনও উল্লেখ ছিল না, তাই কী ভাবে এই সংখ্যায় পৌঁছন হয়েছে তাও স্পষ্ট নয়। বিধানসভা কেন্দ্র ভিত্তিক যখন পুরো খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে, তখনই এটা স্পষ্ট বোঝা যাবে। নাম বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনও প্যাটার্ন অনুসরণ করা হয়েছে কিনা যার ফলে বিধানসভা কেন্দ্রগুলির মৃত ভোটার তালিকায় বিরাট পার্থক্য থাকছে,এই বিষয়টাও তখনই বোঝা যাবে। 

বিহারের ভোটার তালিকার তুলনামূলক গুণমান পর্যালোচনা করার জন্য বিশিষ্ট ভোট বিশ্লেষক যোগেন্দ্র যাদব তৈরি করেছেন জনসংখ্যার নিরিখে নির্বাচকদের অনুপাত (ইপি)। জুলাই মাসের একাধিক বিরোধী দলের নেতাদের প্রতিনিধিদের  কাছে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার দাবি করেছিলেন, যে বিহারের ভোটার তালিকায় যত নাম আছে তার ২০ শতাংশই ভুয়ো এবং সেই সব নাম তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের সেই দাবির নিরিখেই যোগেন্দ্র যাদবের করা অঙ্কটির গুরুত্ব রয়েছে। এই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই ২০ শতাংশ নাম ভুয়ো—  এই ধরনের সিদ্ধান্তের ভিত্তি থেকে মনে হয় বিষয়টি পূর্বপরিকল্পতি ও পুরোপুরি মনগড়া।

কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রকের অধীন ন্যাশনাল কমিশন অন পপুলেশন প্রকাশ করেছিল রিপোর্ট অফ দ্য টেকনিক্যাল গ্রুপ অন পপুলেশন প্রোজেকশন (২০১৯)। তাতে জনগণনা ভিত্তিক (রাজ্যওয়াড়ি, বছর ভিত্তিক,বয়স ভিত্তিক) জনসংখ্যা কত বাড়তে পারে তার একটা হিসাব দেওয়া হয়েছিল। এখনও পর্যন্ত জনসংখ্যা সংক্রান্ত তথ্যের সেটাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সূত্র। এই সংখ্যাগুলিই ভারত সরকার তাদের কাজে ব্যবহার করেছে এবং নির্বাচন কমিশন নিজেরাও ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এই সংখ্যাতত্ত্বই কাজে লাগিয়েছে। যদি জনসংখ্যার নিরিখে নির্বাচকদের অনুপাত (ইপি) পেতে হয়, তাহলে খসড়া ভোটার তালিকায় যোগ্য ভোটারদের যে সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে তাকে সংশ্লিষ্ট বয়সগোষ্ঠী দিয়ে ভাগ করলেই তা পাওয়া যাবে।

যদি স্কোর ধরা হয় ১০০, তাহলে সেটা হবে একেবারে নিখুঁত মিলের একটা আদর্শ ছবি। এখানে দেখা যাচ্ছে ২০২৪ সালে সর্বভারতীয় ইপি অনুপাত ছিল ৯৯ শতাংশ। তার মানে ঘাটতি ছিল মাত্র ১ শতাংশ। যখন বিহারে ইপি ৯৭ শতাংশ, তখন সেটা জাতীয় গড়ের চেয়ে সামান্য কম। তার মানে বিহারে ভোটার তালিকা বাড়ানো ছিল না, বরং সামান্য কমই ছিল। এসআইআর প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে আরও নাম বাদ দেওয়ার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সরকারি বিবৃতিকে যদি হিসাবের মধ্যে ধরা না হয়, তাহলে ২৪ জুন যেদিন এসআইআর ঘোষণা হল, সেদিন বিহারে ইপির অনুপাত ছিল ৯৭ শতাংশ। বিহারে গত পাঁচটি নির্বাচনের তুলনায় এভাবে এবার ভোটারের সংখ্যা কমে যাওয়া থেকে বোঝা যায়, এটা হঠাৎ করে অনেক বেশি কমে যাওয়া। তাছাড়া, এর ফলে অন্য সব রাজ্যের তুলনায় বিহারের ইপি হবে অনেকটাই কম। 

নির্বাচন কমিশন গোলপোস্টটাকে মাঠের মাঝখানে নিয়ে চলে এসেছ। সেটা তখনই করা হয়েছে যখন  কমিশন প্রয়োজনীয় ১১টি নথির যে কোনও একটি দরকার বলে আগে ঘোষণা করা সত্ত্বেও সে বিষয়ে ছাড় দিেয়ছিল।  তালিক সংশোধনের কাজ শেষ হওয়ার ঠিক আগে সেকথা ঘোষণা করা হয়েছিল এবং জানিয়েছিল যে আবেদন ফর্ম ডুপ্লিকেট সহ জমা দিতে হবে। তবে এটা আদৌ স্পষ্ট নয় যে,আবেদন পত্রগুলির কপি  নির্বাচন কমিশন আদৌ জনসমক্ষে আনবে কিনা, এবং কেন নাম বাদ গেছে বলে  জানতে চাওয়া হয়ে থাকলে তার কোনও ব্যখ্যা দেবে কিনা। 

যে অস্পষ্টতার সঙ্গে এতদিন পর্যন্ত এসআইআর প্রক্রিয়াটি চালানো হয়েছে, এবং চালানো হয়েছে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ ছাড়াই, সেবিষয়ে ব্যাপক ভাবে খবর মিডিয়ায় প্রচারিত হয়েছে। এতটা স্বল্প সময়ের মধ্যে বিহারে এসআইআর যেভাবে তড়িঘড়ি এবং অস্বচ্ছতার সঙ্গে ঘোষণা করে করা হল, তাতে বিষয়টা জালিয়াতি বলেই ধরে নেওয়া হবে। ইতিমধ্যে ইসি একটা নতুন নামও তালিকায় যোগ করার কথা ঘোষণা করেনি, যেটা আসলে অবাস্তব ছাড়া কিছু নয়। শেষ কথা হল, এটি নিশ্চিতভাবেই, সুপ্রিম কোর্ট যেমন বলেছে, ‘গণহারে নাম বাদ দেওয়ার’ প্রক্রিয়া, ‘গণ হারে নাম অন্তর্ভুক্তির’ প্রক্রিয়া নয়। 

অতএব, বিহারে ‘ভোটদানের অধিকার’ রক্ষার লড়াইয়ে এগিয়ে যেতে হবে কারণ এটা আসলে সাংবিধানিক অধিকার। যদি সারা দেশে নির্বাচন কমিশন এসআইআর করার জন্য জোরাজুরি করে তাহলে লড়াই হবে দেশব্যাপী। 

সূত্র: পিপলস ডেমোক্রেসি, আগস্ট, ২০২৫


প্রকাশের তারিখ: ২৬-আগস্ট-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org