|
গুজরাট মডেল ও ভারতে দক্ষিণপন্থী রাজনীতিসুচিক্কণ দাস |
একদিকে পুঁজির লাগাম ছাড়া শোষণ, অন্যদিকে সীমাহীন বঞ্চনা এভাবে চললে সহজেই তো ভোটে হারার কথা বিজেপির। কিন্তু তা না হয়ে ২৭ বছর ধরে গুজরাটে কীভাবে টিকে রয়েছে বিজেপি সরকার এখানেই গুরুত্বপূর্ণ ভমিকা রয়েছে ভ্রান্ত জনচেতনার। এবং সেই চেতনায় জারিত করার কাজটিই সুকৌশলে করে চলেছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী গুজরাটের জনসংখ্যায় হিন্দুরা ৮৮.৫৭ শতাংশ এবং মুসলিমরা ৯.৬৭ শতাংশ। এত স্বল্প সংখ্যক সংখ্যালঘুদের দিক থেকে আশঙ্কা করার কিছু নেই। তাহলে কেন গোধরা? |
১। গুজরাট মডেলের তিনটি উৎস গুজরাট মডেল কোনও একমাত্রিক বিষয় নয়। বলা চলে এই মডেলের তিনটি উৎস।
এক, এই মডেলের অর্থনৈতিক শক্তির উৎস হল আন্তর্জাতিক লগ্নি পুঁজি এবং দেশি-বিদেশি ক্রোনি পুঁজির জোট।
দুই, এই মডেলের মতাদর্শগত শক্তির উৎস হল একমাত্রিক হিন্দুত্ববাদ যা বহুমাত্রিক ভারতকে ধ্বংস করে নিজেকে নির্মাণ করতে চাইছে এবং এই মতাদর্শের বাহক রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ ও তাদের শাখা প্রশাখা। এই একমাত্রিকতার লক্ষ্য হল উপনিবেশবাদ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্যে থেকে উঠে আসা বহুত্ববাদী আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া-কে পুরোপুরি বর্জন করা। কারণ ভারতের বহুমাত্রিকতা ধ্বংস করতে পারলেই একমাত্র গোটা দেশজুড়ে লগ্নি তথা ক্রোনি পুঁজির অবাধ বাজার তৈরি হতে পারবে। জিএসটি, অভিন্ন ভাষানীতি, অভিন্ন জাতীয় শিক্ষা নীতি– এগুলি সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের হাতিয়ার। এক ধর্ম, এক ভাষা ইত্যাদি চালু করার লক্ষ্য হল ভারতের বিভিন্ন আঞ্চলিক বুর্জোয়া ও তাদের সহযোগী রাজনৈতিক শক্তিগুলিকে, আঞ্চলিক পরিচিতি সত্তাগুলিকে যার মধ্যে অন্তর্লীন রয়েছে বহুত্ববাদী ভারত, সেগুলিকে ধ্বংস করে গোটা দেশের বাজারকে যে কোনও মূল্যে লগ্নি ও ক্রোনির পুঁজির নিয়ন্ত্রণে এনে ফেলা। পুঁজির বিশ্বব্যাপী সঙ্কটের পর্বে মুনাফার হার ধরে রাখা ও নিট মুনাফা অপরিবর্তিত রাখার এটাই পুঁজি নির্দেশিত পথ।
সুতরাং, ধর্মীয় মোড়কটুকু ছাড়িয়ে নিলে যা উঠে আসে তা হল, আরএসএস-এর মতাদর্শ আসলে লগ্নিপুঁজির স্বার্থে দেশজুড়ে অবাধ, অভিন্ন একটা বাজার গড়ে তোলার হাতিয়ার। সেই হিসাবে এই সংগঠনটি ও তাদের মতাদর্শ একচেটিয়া লগ্নি পুঁজিরই ধারক ও বাহক, যা নিজেকে প্রকাশ করে হিন্দুত্ববাদী হিসাবে।
তিন, গুজরাট মডেলের রাজনৈতিক শক্তির উৎস হল বিজেপি নামক দলটি, যারা লগ্নি পুঁজির টাকার থলি ও আরএসএসের মতাদর্শকে হাতিয়ার করে এদেশের রাষ্ট্রীয়, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রগুলিকে কাঙ্ক্ষিত ভাবনার ছাঁচে স্থায়ী ভাবে বদলে দেওয়ার প্রয়াস চালায় এবং গোটা দেশজুড়ে পুঁজির অবাধ লুন্ঠনের একচ্ছত্র অধিকার কায়েম করতে চায়।
লগ্নি ও ক্রোনি পুঁজির টাকার থলি, আরএসএসের হিন্দুত্ববাদী একমাত্রিক মতাদর্শ এবং এই দুইয়ের যোগসূত্র হিসাবে রাজনৈতিক বিজেপি– পুঁজি, মতাদর্শ ও প্রত্যক্ষ রাজনীতি– এই তিনটি শক্তির সমন্বয়ই হল গুজরাট মডেল। এর কোনও একটা দিককে বিচ্ছিন্নভাবে বিচার করলে মডেলটির শক্তির উৎসকে পুরোপুরি চিহ্নিত করা যাবে না।
এখন দেখা যাচ্ছে, গুজরাটে সফল ভাবে প্রয়োগের পর এই মডেলের পরীক্ষানিরীক্ষা করা হয়েছে উত্তরপ্রদেশে। এবং সেখানে যোগী আদিত্যনাথকে সামনে রেখে এই মডেলটিকে সার-জল দিয়ে লালন করা হয়েছে। তাতে কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক সাফল্যও এসেছে। এরপরের গুরুত্বপূ্র্ণ পরীক্ষা ক্ষেত্র হল কর্ণাটক। ভাষা ও দক্ষিণী সংস্কৃতির বাধা পেরিয়ে দক্ষিণ ভারতকে কীভাবে আনা যায় একচেটিয়া পুঁজির বাজারের আওতায়, তার পরীক্ষানিরীক্ষা চলছে কর্ণাটকে। সেটা সফল হলে কর্ণাটক থেকে বেরোতে পারে বিজেপির দক্ষিণ ভারত জয়ের অশ্বমেধের ঘোড়া। ওপরের আলোচনা থেকে একই সঙ্গে এটাও স্পষ্ট যে, লগ্নি ও ক্রোনি পুঁজি, আরএসএসের একমাত্রিক মতাদর্শ এবং এ দুয়ের অনুসারী বিজেপির রাজনৈতিক তৎপরতা– সম্মিলিতভাবে এই ত্রিশক্তির মোকাবিলা করতে না পারলে দক্ষিণপন্থার বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা যাবে না। অর্থনীতিতে আন্তর্জাতিক লগ্নি ও ক্রোনি পুঁজির আধিপত্য মেনে নিয়ে আলাদাভাবে বিজেপি–আরএসএস বিরোধী কোনও লড়াই–ই কোনও সফল পরিণতিতে পৌঁছতে পারে না। ২। গুজরাট মডেলের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য ক) পুঁজির কেন্দ্রীভবন ও ক্রোনির উত্থান প্রথমত, এই মডেল দেয় দেশি-বিদেশি লগ্নি ও ক্রোনি পুঁজিকে একেবারে অবাধে মুনাফা লুঠের সুযোগ। এই শতকের শুরু সময়ে নয়া উদারবাদী পুঁজির হামলার জেরে এদেশে শিল্পক্ষেত্র থেকে সরতে শুরু করে রাষ্ট্র। এবং সেই পরিসর দখলে এগিয়ে আসে একচেটিয়া লগ্নি পুঁজি ও তার দোসর দেশি পুঁজি। এই সুযোগটাই সেই সময় কাজে লাগিয়েছিলেন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু কীভাবে? উত্তরটা দিয়েছেন নয়া উদারবাদের অন্যতম প্রবক্তা বিবেক দেবরায় নিজেই। তিনি লিখেছেন, গুজরাট মডেল কি? এ হল বেসরকারি উদ্যোগ ও প্রতিষ্ঠানের জন্য জায়গা তৈরি করে দেওয়া এবং রাষ্ট্রের দ্বারা একটা বেশ কাজে লাগানোর মতো অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা। বলা যায় বাজার-বান্ধব নীতি নয়, ব্যবসা-বান্ধব নীতির আধিক্য। এর মানে বিনিয়োগের জন্য সরকার শিল্পপতিদের ডেকে এনে দেবে সস্তাদরে জমি, জল, বিদ্যুৎ, পরিবহণ, পরিকাঠামো ইত্যাদি। এগুলো বাজারের নিয়মে প্রতিযোগিতা মারফৎ না দিয়ে পছন্দের ব্যবসায়িক গোষ্ঠীকে দেওয়া হবে বাজার দরের চেয়ে কম দামে এবং শ্রম আইন এমন ভাবে সংস্কার করা হবে যাতে কম মজুরি দিয়ে বেশি খাটিয়ে বিনিয়োগকারীরা মুনাফা লুঠতে পারে মাত্রাতিরিক্ত হারে। একদিকে শিল্পের উপকরণ ও পরিকাঠামোর ব্যবস্থা করা হল বাজার দরের চেয়ে কম দামে। অন্যদিকে শ্রমিক শোষণের ঢালাও ব্যবস্থা করল রাষ্ট্র। এতে মুনাফার হার বেড়ে যাবে কয়েকগুণ। যে সরকার বা যে সরকারের নেতারা এই বিশেষ সুযোগ পছন্দের পুঁজিপতি বা পুঁজিপতিদের দেবেন, তিনি পুঁজিপতিদের বিশেষ আস্থা অর্জন করবেন। এভাবে তৈরি হবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রাজনীতিকদের বিশেষ আস্থাভাজন পুঁজিপতি গোষ্ঠী, যাদের অবাধ লুঠের বিশেষ সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এরাই হল পোশাকি ভাষায় ক্রোনি, যার উৎপত্তি প্রতিযোগিতামূলক পুঁজিকে এড়িয়ে, তার ভূমিকাকে খর্ব করে। এটা পুঁজির একটা বিকৃত বিকাশ। নরেন্দ্র মোদি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন পর্বে, বিশেষত ২০০২ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে গুজরাটে এই ক্রোনিরাই ক্রমশ প্রভাবশালী হয়ে উঠে মোদির আস্থাভাজনে পরিণত হন। এবং এই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়েই ক্রমশ আম্বানি, আদানিদের মতো মোদি–ঘনিষ্ঠ ক্রোনিদের আত্মপ্রকাশ। এই হল বিজেনেস ফ্রেন্ডলি অর্থনীতি যেখানে রাজনীতিবিদ–পছন্দের পুঁজিপতি–আমলাদের একটা ঘনিষ্ঠ চক্র হাত ধরাধরি করে সম্পদ লুঠ করে একচেটিয়ায় পরিণত হয়। ঠিক এই কথাটাই বলেছিলেন অধ্যাপক জয়তী ঘোষ। তাঁর কথায়, গুজরাট মডেলে যে উঁচু হারে অর্থনীতির সম্প্রসারণ হয় তার মূলে রয়েছে কর্পোরেটদের বিপুল ছাড়। শুধু জমি ও খনিজ সম্পদের দামে ছাড় নয়, মোদি সরকার শিল্পপতিদের দিয়েছে আর্থিক ভরতুকিও। এর থেকে গরিবদের উপকার হয়নি কারণ মজুরি রয়ে গেছে তলানিতে। তিনি বলেছেন, গুজরাট আগেও বিজনেস ফ্রেন্ডলি রাজ্য ছিল। কিন্তু তখন রাজ্য সরকারের তোফাগুলি পেত আমেদাবাদের সূতোকল মালিকেরা এবং রাজ্যের এমএসএমইগুলি। এরা ছিল আঞ্চলিক পুঁজির প্রতিভূ। কিন্তু নয়া উদারবাদের পর্বে গুজরাটে এই মডেলটাকেই বদলে দিয়েছেন মোদি। রাজ্যের প্রথাগত শিল্পকে বিসর্জন দিয়ে তিনি মদত দিলেন একচেটিয়া লগ্নি পুঁজিকে। এর পরিণতিতে একদিকে ক্রোনিরা ফুলে ফেঁপে উঠল। অন্যদিকে সর্বনাশ হয়ে গেল রাজ্যের ক্ষুদ্র, মাঝারি ও ছোট শিল্পের। ২০১৭ সালে সুরাটের বস্ত্রশিল্পে উৎপাদকের সংখ্যা ছিল ৭০ হাজার। এখন তা কমে এসেছে ৪৫ হাজারে। বাকিরা টিকতে না পেরে ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছেন। আর এই পর্বে শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছেন ৩৫ হাজার জন। গুজরাটের আরেকটি প্রথাগত শিল্প লবণের উৎপাদন। গত তিন বছরে এই শিল্পে ধারাবাহিক ভাবে উৎপাদন কমেছে। কমেছে মজুরি। অথচ এখানে সরকারি হস্তক্ষেপের প্রয়োজন মনে করেনি গুজরাট সরকার।
যদি আমরা গুজরাটের প্রতিটি শিল্পক্ষেত্র ধরে আলোচনা করি তাহলে, ওপরে আলোচিত এই দুই বিপরীত প্রবণতা আমরা দেখতে পাব নরেন্দ্র মোদির মুখ্যমন্ত্রিত্বের পুরো কালপর্ব জুড়ে এবং তারপরেও। একদিকে বিপুল ক্ষমতা সম্পন্ন ক্রোনিদের উত্থান এবং এর বিপরীতে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি আঞ্চলিক শিল্পের ধারাবাহিক বিনাশ। এটাই মোদির গুজরাট মডেলের মূল অর্থনৈতিক কাঠামো। খ) চাঁদের উল্টো পিঠে গুজরাট মডেলের অন্য ছবিটা শ্রমজীবীদের বঞ্চনা ও অধিকার হরণ। এই রাজ্যে কৃষি মজুরদের মজুরির হার দেশের মধ্যে সবচেয়ে কম। শিল্পশ্রমিকদের ন্যূনতম বেতনও কম। এর সঙ্গে রয়েছে অসহনীয় কাজের পরিস্থিতি ও চাকরির নিরাপত্তাহীনতা। দেখা যাচ্ছে, ২০০৪ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে গুজরাটের অর্থনীতির বৃদ্ধির হার ছিল সর্বোচ্চ। একই সময় পর্বে দারিদ্র্য দূরীকরণে দেশের রাজ্যগুলির মধ্যে গুজরাটের স্থান ৭ থেকে নেমে আসে ৯ নম্বরে। এর মানে অর্থনীতির বৃদ্ধি হলেও দারিদ্র্য কমছে না। এক্ষেত্রে দক্ষিণপন্থা শাসিত গুজরাট এবং বামশাসিত কেরলের কতগুলি সামাজিক উন্নয়নের সূচকের তুলনা করলে বিষয়টা বুঝতে সুবিধে হতে পারে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রীর অন্তর্ভুক্তির গড় অনুপাতে কেরলের তুলনায় পিছিয়ে গুজরাট। উচ্চ মধ্যশিক্ষা ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তির ফারাকটা কেরল ও গুজরাটের মধ্যে যথাক্রমে ৮০ ও ৫৯। গড় আয়ু কেরালায় ৭৫ বছর, গুজরাটে ৭১.৫ বছর। প্রতি হাজার জনে ১ বছরের কম বয়সী শিশুর মৃত্যু কেরালায় ৩, গুজরাটে ২৩। ৬ থেকে ২০ মাস বয়সী শিশুদের ২৩.৫ শতাংশ সঠিক পুষ্টি পায় কেরলায়। গুজরাটে এটা মাত্র ৬ শতাংশ। গুজরাটে নারী শিক্ষার হার ৭০.৫ শতাংশ, কেরালায় তা ৯৭.৪ শতাংশ। কেরালায় ৯৯ শতাংশ বাড়িতেই উন্নত পয়ঃপ্রণালী রয়েছে, গুজরাটে এই হার ৫৯ শতাংশ। (সূত্র– ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির ওয়েবডেস্ক)। দেখা যাচ্ছে, গুজরাট এমনই অর্থনৈতিক মডেল যেখানে দারিদ্র্য কমে না। এবং মানব উন্নয়নর সূচকের বিচারে গুজরাট কেরলের চেয়ে সব বিষয়েই পিছিয়ে। এর মানে কেরলের উন্নয়নের মডেল ইনক্লুসিভ, যেখানে সাধারণ মানুষের জায়গা আছে। গুজরাটের মডেল এক্সক্লুসিভ, মানে এখানে উন্নয়নে সাধারণ মানুষ বাদ, বাড়বে শুধুই পুঁজি। এটাই মডেলই ক্রোনি পুঁজিপতিদের বিশেষ পছন্দের। গ) সঙ্কটে কৃষিও গুজরাটের কৃষি ক্ষেত্রও সঙ্কটে। হার্দিক প্যাটেলের নেতৃত্বে গুজরাটে ২০১৭ সালে পতিদারদের যে বিপুল বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছিল, তার পিছনে ছিল গুজরাটের কৃষিতে প্রভাবশালী প্যাটেল গোষ্ঠীর সামাজিক উন্নয়নের সিঁড়িতে আরও একধাপ উঠে আসার তাগিদ। গুজরাটের উন্নয়ন মূলত শহর ভিত্তিক, তাই নয়া উদারবাদী আমলে বঞ্চিক কৃষকেরা চেয়েছিলেন সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণের সুবিধা আদায় করে গুজরাট মডেলের উন্নয়নের শরিক হতে। কারণ কৃষিতে উপকরণের ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধি ও ফসলের পড়তি দাম ক্রমশ কৃষকদের নিঃস্ব করে তুলছিল। সকারণে সেবার পতিদারেরা উন্নয়নের ভাগ পেতে বিজেপির বিরুদ্ধে সমাবেশিত হয়েছিলেন। এবার ভোটের আগে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে সেই ক্ষোভ কিছুটা চাপা দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। চাষের কাজে অপ্রতুল বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে ক্ষোভ, খরা অঞ্চলগুলিতে জলপ্রকল্পে সরকারি ভরতুকির অভাব, লবণ শিল্পে ৫ লক্ষ মানুষের জীবনজীবিকার সঙ্কট, কৃষি শ্রমিকের জঘন্য মজুরির হার– এসবই গুজরাটের কৃষি সঙ্কটের লক্ষণ। সব মিলিয়ে গুজরাট মডেল এমন এক অর্থনৈতিক মডেল যা গোটা সমাজে বৈষম্য ক্রমে বাড়িয়ে চলে। বৈষম্যকে আড়াল করতে হিন্দুত্বের ভ্রান্ত চেতনা একদিকে পুঁজির লাগাম ছাড়া শোষণ, অন্যদিকে সীমাহীন বঞ্চনা– এভাবে চললে সহজেই তো ভোটে হারার কথা বিজেপির। কিন্তু তা না হয়ে ২৭ বছর ধরে গুজরাটে কীভাবে টিকে রয়েছে বিজেপি সরকার। এখানেই গুরুত্বপূর্ণ ভমিকা রয়েছে ভ্রান্ত জনচেতনার এবং সেই চেতনায় জারিত করার কাজটিই সুকৌশলে করে চলেছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী গুজরাটের জনসংখ্যায় হিন্দুরা ৮৮.৫৭ শতাংশ এবং মুসলিমরা ৯.৬৭ শতাংশ। এত স্বল্প সংখ্যক সংখ্যালঘুদের দিক থেকে আশঙ্কা করার কিছু নেই। তাহলে কেন গোধরা? আসলে যদি অর্থনৈতিক বঞ্চনার দিকে থেকে যদি বঞ্চিতদের নজর ঘোরাতে হয়, তাহলে লাগে এমন এক শত্রু যার বিরুদ্ধে অর্থনীতির স্তর-নিরপেক্ষভাবে সবাইকে এক জায়গায় জড়ো করাটা অপেক্ষাকৃত ভাবে সহজ। উত্তরপ্রদেশ ও বিহারে এটা জাতপাত। হরিয়ানায় খাপ পঞ্চায়েত। জাতপাত বা খাপ পঞ্চায়েতের চেতনা শ্রেণি চেতনাকে সাময়িক ভাবে হলেও ঝাপসা করে দিতে পারে, ভারতীয় রাজনীতিতে এর প্রমাণ আমরা বার বার পেয়েছি। গুজরাটে আরএসএসের সেই হাতিয়ার হল হিন্দুত্ব। প্রথমে সংখ্যালঘু বিরোধী জিগির তুলে বর্ণহিন্দুদের এককাট্টা করো। এরপর কৌশলে দলিত, আদিবাসী সমাজকে হিন্দুত্বের ধারনার আওতায় এনে ফেলো। এভাবে সংখ্যালঘু নিধনের নামে ধর্মীয় পরিচিতিসত্তাকে কাজে লাগিয়ে গড়ে তোলো সংখ্যালঘু বিরোধী এক প্রসারিত জোট। যদি সেই জোটের সাহায্যে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোট নিশ্চিত করা যায়, তাহলেই একমাত্র ক্রোনি পুঁজির শাসন টেকানো যেতে পারে এবং দীর্ঘায়ত করা যেতে পারে। দরকার মতো, বিশেষ করে ভোটের আগে এই বিভাজনের চেতনাকে উস্কে দিয়ে ক্রোনি পুঁজির তল্পিবাহক শক্তিকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখা যেতে পারে। মনে রাখা দরকার, ২০১১ সালের হিসাব বলছে গুজরাটের ৪৩ শতাংশ বাসিন্দাই শহরে থাকেন। গত ১০ বছরে অনুপাত নিশ্চয়ই আরও বেড়েছে। শহরের বাসিন্দাদের একটা বড় অংশই মধ্যবিত্ত। এই মধ্যবিত্তরা শুধুই বর্ণহিন্দু নন। গুজরাটের বিশিষ্ট লেখক অচ্যুৎ যাজ্ঞিক দেখিয়েছেন, কীভাবে বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্রভাবে ও সাম্প্রদায়িক হিংসার কারণে গুজরাটে হিন্দুত্বের প্রতিভূরা শক্তিসঞ্চয় করেছে। গোড়ার দিকে গুজরাটি হিন্দু সমাজ বিভক্ত ছিল ৮৪টি কাস্ট বা জাতপাতে। শিল্পের বিকাশের মধ্যে দিয়ে নগরায়নের ফলে বেড়েছে মধ্যবিত্তের সংখ্যা। এই মধ্যবিত্তই তার জাতপাতের সত্তা ত্যাগ করে বৃহত্তর হিন্দু আইডেনটিটিকে আঁকড়ে ধরেছে। এই মধ্যবিত্তের মধ্যে শুধু বর্ণহিন্দুরাই নেই। রয়েছে আদিবাসীরাও। বরোদার শাসক সয়াজিরাও গায়কোয়াড় এক সময়ে নিজের রাজ্যের সব লোককে শিক্ষিত করতে উঠে পড়ে লাগেন। তিনি আদিবাসীদের পড়ানোর ব্যবস্থা করলে ব্রাহ্মণেরা পড়াতে অস্বীকার করে। তখন মুসলিম শিক্ষক নিয়োগ করে আদিবাসীদের শিক্ষিত করে তোলার ব্যবস্থা করেন সয়াজিরাও। এদেরই একাংশ শহরে গিয়ে চাকরি খুঁজে নিয়ে ব্রাহ্মণ, বানিয়া ও পতিদারদের মতো প্রভাবশালী সামাজিক গোষ্ঠীর সঙ্গে জায়গা করে নেয়। মধ্যবিত্তের গড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় দেখা দেয়ে নতুন সংমিশ্রণ। গুজরাটে জাতপাতের বদলে এই সব সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে হিন্দুত্বের চেতনা সঞ্চারিত করার কাজে বড় ভূমিকা রয়েছে স্বামীনারায়ণ ধর্মীয় গোষ্ঠীর বিভিন্ন অংশ, স্বাধ্যায় পরিবার ও আশ্রম আশ্রমের মতো সংগঠনগুলি। এগুলির সঙ্গে আরএসএসের দৃষ্টিভঙ্গীর যথেষ্ট মিল রয়েছে। এভাবে শহরভিত্তিক গুজরাটি মধ্যবিত্তের মধ্যে জাতপাতের পরিচিতি সত্তার বদলে ক্রমশ জোরালো হয়ে ওঠে হিন্দুত্বের আইডেন্টিটি। এরপর যখন সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা ঘটে তখন ছাঁচটা সম্পূর্ণ হয়, ইংরেজিতে যাকে বলে ডাই ইজ কাস্ট। গুজরাটি মধ্যবিত্তের হিন্দুত্ব অভিমুখী এই যাত্রা ত্বরান্বিত করেছে আরএসএস তাদের বিস্তৃত সাংগঠনিক আধারের সাহায্যে। এর আগে এই রাজ্যে কংগ্রেসের নির্বাচনী জয়ের ফর্মুলা ছিল KHAM বা ক্ষত্রিয়, হরিজন, আদিবাসী, মুসলিম। এই সমীকরণের বদলে আরএসএস ও বিজেপি তৈরি করল পাল্টা হিন্দুত্বের আইডেনটিটি, যা একদিকে শ্রেণি নির্বিশেষে হিন্দু সমাজকে এককাট্টা করবে হিন্দু গৌরবের কথা বলে, সংখ্যালঘু নিধনের মধ্যে দিয়ে তাদের হিন্দুত্বের চেতনা ও ভোট সংহত করা হবে এবং এভাবে তৈরি করা হিন্দুত্বের চেতনার আড়ালে অবদমিত রাখা হবে পুঁজির শোষণ বিরোধী ও বঞ্চনাজনিত শ্রেণি চেতনাকে। এটাও গুজরাট মডেলের আরেক গুরুত্বপূর্ণ দিক যা এই মডেলের অর্থনৈতিক শোষণের দিকটিকে ভ্রান্ত চেতনা দিয়ে ঢেকে রাখে। এবং কখনই অর্থনৈতিক ইস্যুগুলিকে সামনে আসতে না দিয়ে গোমাংস ভক্ষণ, গোরক্ষা, লাভ জিহাদ, হিজাব জাতীয় ইস্যুকে সদাসর্বদা সামনে এনে ফেলার চেষ্টা করে। গুজরাটে একবার এই মডেল সফল হওয়ার পর ২০১৪ সালে খুব সম্ভবত একচেটিয়া লগ্নি পুঁজি ও ক্রোনিদের পরিকল্পনা মাফিক ভারত বিজয়ে বেরোয় বিজেপি। সামনে রাখা হয় গুজরাটের তথাকথিত উন্নয়নের মডেলকে। এই পর্বেই অর্থনীতি, রাজনীতি ও মতাদর্শের নতুনতর সব উপাদানের সক্রিয়তায় বাজপেয়ী-আডবাণীর বিজেপি থেকে আলাদা হয়ে যায় মোদি-শাহের বিজেপি। একচেটিয়া লগ্নি পুঁজি-বিজেপি-আরএসএস– এই ত্রিশক্তি প্রথমে তাদের ফর্মুলায় ঢেলে সাজায় উত্তরপ্রদেশকে। তার পর থেকে ক্রমশ প্রসারিত হচ্ছে এক ও অভিন্ন ভারত গড়ার লক্ষ্যে তাদের অভিযান, যার আসল লক্ষ্য গোটা ভারতকে পুঁজির এক অভিন্ন বাজার হিসাবে গড়ে তোলা। এই ভারতে থাকবে না আঞ্চলিক পুঁজি, আঞ্চলিকতাবাদী শক্তি, থাকবে না বামেরা, থাকবে না বহুত্ববাদী ভারত, থাকবে না আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া। লগ্নি ও ক্রোনি পুঁজির এএক বৃহৎ প্রকল্প যা আবহমান কালের ভারতকে পুরোপুরি বদলে দিতে চায়। এবার জনতার পালা এতক্ষণ গুজরাট মডেলের যে স্বরূপ উন্মোচনের চেষ্টা চলেছে, তার বাইরেও রয়ে গেছে আরও বহু দিক। তবে মোটা দাগে মডেলটিকে চিহ্নিত করার চেষ্টা হয়েছে। মনে রাখা দরকার শেষ পর্যন্ত মানুষ হল ইকনমিক ম্যান। এটাই তার মৌলিক সত্তা। রুটিরুজির সমস্যা মিটিয়েই মানুষ তার অন্য আইডেনটিটি খোঁজার বা নির্মাণের চেষ্টা করে। গুজরাটে হিন্দুত্ব নির্মাণের সিকি শতাব্দী কেটে গেছে। এবার ভ্রান্ত চেতনার মোড়ক খুলে বেরিয়ে আসছে অর্থনীতির চাপাপড়া প্রশ্নগুলি। অতিমারি, মুদ্রাস্ফীতি, মূল্যবৃদ্ধি, বেকারি, কৃষিসঙ্কট, খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা, বিশ্বব্যাপী মন্দার সূচনা– এসবই হিন্দুত্বের নির্মাণে বড় বড় খোঁদল তৈরি করে দিয়েছে। তারই ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে আসছে সেই আদি অকৃত্রিম ইকনমিক ম্যান। ইতিহাসের নিয়মেই এই ইকনমিক ম্যানই বেঁচে থাকা ও টিকে থাকার তাগিদে একদিন উঠে দাঁড়িয়ে লগ্নি ও ক্রোনি পুঁজির তথা হিন্দুত্বের পরিসমাপ্তি ঘোষণা করবে। এবারের গুজরাট বিধানসভা ভোটের ফল যাই হোক না কেন, বাহারি মোড়কের আড়ালে গুজরাট মডেলের আসল চেহারা ক্রমশ জনমানসে প্রতীয়মান হচ্ছে। তাই মোদি আর শাহকে ভোটে জিততে ফের যেতে হচ্ছে গুজরাটের মানুষের দুয়ারে দুয়ারে। তাঁরা ফের সূচনাপর্বে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন কারণ তাঁরা দেওয়ালের লিখন পড়তে পারছেন। কিন্তু মানুষের চেতনার নির্মাণ হয় অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে। সিকি শতাব্দীর গুজরাট মডেলেকে চিনে ফেলেছেন গুজরাটের বঞ্চিত ইকনমিক ম্যানেরা। এখন শুধু সেই অভিজ্ঞতা জারিত চেতনাকে বস্তুগত শক্তিতে রূপান্তরিত করার পালা। কালের যাত্রাপথে সেই প্রক্রিয়াকে কোনও মোদি-শাহ জুটিই ঠেকাতে পারবে না। প্রকাশের তারিখ: ২৫-নভেম্বর-২০২২ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |