|
হ্যারি বেলাফন্টেঃ জীবন, যাপন ও শিল্পের রাজনীতিশবনম সুরিতা |
জামাইকা থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ঘর বাঁধা অভিবাসী পরিবারের সন্তান হ্যারি। তার জীবনজুড়ে শ্রমজীবী মানুষ, নিপীড়িতদের পাশে দাঁড়ানোর উদাহরণ। রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতার আবেশ ভুলে সিভিল রাইটস বা নাগরিক অধিকার আন্দোলনকে গান দিয়ে নিয়ে গেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ দেশবিদেশের বহু মানুষের কাছে। কিন্তু তবুও তিনি 'নিশ', অ্যামেরিকায় জোয়ান বায়েজ বা আমাদের বাংলার মৌসুমী ভৌমিকের মতো। |
তখন ১৯৯৭ বা ১৯৯৮ হবে। আমার বয়েস ওই পাঁচ কি ছয়। ছাইরঙা ফিলিপসের ক্যাসেট প্লেয়ার। তখনও বুঝিনা ক্রিসমাস ক্যারল কী জিনিস, ক্যালিপ্সো খায় না মাথায় দেয় তাই জানিনা। কিন্তু বাবা-মায়ের হ্যারি বেলাফন্টের ক্যাসেট গোগ্রাসে গিলি। অত জড়ানো, মোড়ানো ইংরেজি বুঝিনা, কিন্তু গানের শেষে হঠাৎ করে হ্যারির ‘এভরিবাডি, মাটিলডা!’ বলে ওঠার সাথে গলা মেলাই। ক্যাসেট আটকে যায় মাঝেমাঝে। পেনসিল ঢুকিয়ে প্যাঁচানো রিল সারিয়ে আবার বাজাই। আবার গলা মেলাই। ‘এভরিবাডি মাটিলডা!’
কী দারুণ লাগতো সেই গান। কিন্তু ওই আনন্দ, মুগ্ধতা সব কেমন যেন ছিল আমার একার। আমার বন্ধুদের সাথে তা ভাগ করে নেওয়া যেত না। ওদের বাড়িতে বাবা-মায়েরা হ্যারি বেলাফন্টের ক্যাসেট রাখেনা। তাই বাড়িতে পাড়ার বন্ধুরা খেলতে আসলে লজ্জায় বন্ধ করে দিতাম এই গান। কারণ তখন আমি নব্বইয়ের দশকের আসামের শিলচরে থাকতাম। সেই সময় আমার পারিপার্শ্বিক যা রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল, তাতে করে বন্ধুদের সামনে পিট সিগার, জোয়ান বায়েজ থেকে নেহাত হাতের কাছে শুভেন্দু মাইতি ইত্যাদি নাম বললে বন্ধুরা অবাক চোখে তাকাত। এইসব নাম তাদের কাছে খুব নতুন এবং হয়তো কিছুটা অনভিপ্রেতও। পরে কলকাতায় যখন এলাম, সেখানেও বিষয়টা যে খুব একটা বদলাল, তা কিন্তু নয়। কলকাতাতেও আমার যে সব বন্ধুরা নিজে বা বাবা-মা-কাকা-জ্যাঠার সুবাদে বামপন্থী বা বামমনস্ক গানবাজনার সংস্পর্শে এসেছে, তারা ছাড়া আর কেউ হ্যারি বেলাফন্টের গান গাওয়া না গাওয়া, বেঁচে থাকা বা না থাকা নিয়ে ভাবিত নয়। এখনও আমার এই যৎসামান্য একত্রিশ বছর বয়েসের জীবনে যদি সব ভারতীয় বন্ধুদের হিসেব করি, তাদের মধ্যে কেবল হাতেগোনা কয়েকজনই হ্যারি বেলাফন্টের নাম শুনেছেন, বা গান শুনেছেন। কেউ কেউ হয়তো কলেজ-স্কুল ফেস্ট ইত্যাদিতে ‘জামাইকা ফেয়ারওয়েল’ বাংলা অনুবাদে বা ইংরেজিতেই শুনেছেন, কিন্তু সেটাও নেহাতই কাকতালীয়। ওই একটি মাত্র গান বাদ দিলে হ্যারি বেলাফন্টে যে সাংগীতিক ধারার প্রতীক, সেই ধারার সাথে বর্তমান ভারত বা বাংলার শুধু একটি যারপরনাই ক্ষুদ্র অংশ পরিচিত। ইংরেজিতে যাকে বলে ‘নিশ অডিয়েন্স’। কিন্তু কথাটা তো এমন ছিল না। জামাইকা থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ঘর বাঁধা অভিবাসী পরিবারের সন্তান হ্যারি। তার জীবনজুড়ে শ্রমজীবী মানুষ, নিপীড়িতদের পাশে দাঁড়ানোর উদাহরণ। রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতার আবেশ ভুলে সিভিল রাইটস বা নাগরিক অধিকার আন্দোলনকে গান দিয়ে নিয়ে গেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ দেশবিদেশের বহু মানুষের কাছে। কিন্তু তবুও তিনি ‘নিশ’, অ্যামেরিকায় জোয়ান বায়েজ বা আমাদের বাংলার মৌসুমী ভৌমিকের মতো। যার একটিই গান বাজার ও রাষ্ট্র মেনে নিতে পেরেছে বলে ছড়িয়ে দিয়েছে। যেভাবে জামাইকা ফেয়ারওয়েল গানটি বাংলা অনুবাদে সপাটে ভুলে যায় এই গানের বক্তাকে। যে কিংস্টন বন্দরের সৌন্দর্য্যের পাশাপাশি দীর্ঘশ্বাস ফেলে জাহাজের খালাসিদের জন্য, যাদের প্রতিনিয়ত বিভিন্ন বন্দরে নোঙর ফেলা ও তারপর সেই বাস্তবতা পেছনে ফেলে এগিয়ে চলাই কাজ। গানটি গায় মূলত খালাসিদেরই একজন। হ্যারি তার কন্ঠমাত্র। বাংলায় সেই গান কোনো প্রবাসী বাঙালি শ্রমিকের ভাষ্য পায়না। সেকারণেই হয়তো হ্যারি বেলাফন্টে বিষয়ক আলোচনা থেকে হারিয়ে যায় তার গানের পেছনে রাজনীতি বিষয়ক গভীর আলোচনা। বিশেষ করে যদি আমরা বেলাফন্টের জনপ্রিয় গানের তালিকার দিকে তাকাই, তাহলে স্বাভাবিকভাবে তার শিল্পের একটা বিস্তৃত রাজনৈতিক পরিধি চোখে পড়া উচিত। কারণ এই সম্ভারের অনেকটা জুড়ে একদিকে যেমন আছে ক্যারিবীয় ক্যালিপ্সো ঢঙে রচিত শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাপনের খণ্ডচিত্র, অন্যদিকে আছে হিব্রু ভাষায় উৎসবের গান ‘হাভা নাগিলা’। আছে ‘মেরিজ বয় চাইল্ড জিসাস ক্রাইস্ট’-এর মতো পরিচিত ক্রিসমাস ক্যারল। এবং গান তার কাছে কেবল সাধের, শখের বা পেশার যন্ত্র ছিল না। নানা ধরনের, বার্তার, সুরের গান গেয়ে তিনি তুলে ধরতেন কন্ঠহীন জনতার পক্ষ। ধরে নেওয়া যাক তার বিখ্যাত গান ‘মামা লুক আ বুবু’ গানের কথা। ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত এই গানের কথার দিকে নজর না দিতে পারলে ওপর ওপর শুনে মনে হবে এ নিছক মজার গান। ক্যালিপ্সো সংগীতের চলনই এমন। দুলকি চালে, তালের বৈচিত্র্যের ছলনায় খুব সহজেই বলে ফেলা যায় ‘এই রাজা, তোর কাপড় কোথায়’-এর মতন কঠিন কথা। গানটি ত্রিনিদাদের এক মনভাঙা কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের ভাষ্যে লেখা। যার নিজের রক্তমাংসের সন্তান তার কৃষ্ণাঙ্গ গড়নকে চরম অসুন্দর ভাবে, লজ্জায় পড়ে যায় তাদের মা। গানের গল্প এখান থেকে বেরিয়ে কখন বর্ণবাদের পরিচিত সামাজিক কাঠামোকে প্রশ্ন করে, ক্যালিপ্সোর ছন্দ তা আপনাকে হুট করে ধরতে দেবে না। এটাই হ্যারি বেলাফন্টের সবচেয়ে বড় ‘ইউএসপি’ বা ইউনিক সেলিং পয়েন্ট ছিল। তাই অনায়াসে মিছিলের জনস্রোত থেকে কারনেগি হলের মঞ্চ কোথাও একমুখী করে বেঁধে রাখা যায়নি তাকে। তিনি নিজেকে, নিজের গানের চয়নকে, গানের পাশাপাশি অভিনয়ের মাধ্যমকে বারবার ভেঙেছেন, ছড়িয়ে দিয়েছেন, যাতে আরো বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়। কিন্তু আমাদের ঘরে, যেখানে এখনও হ্যারি বেলাফন্টে কেবল কিছু মানুষের স্মৃতিচারণের মুহূর্ত, সেখানে কীভাবে জায়গা হবে বেলাফন্টের ‘মামা লুক আ বুবু’ গানের? বাঙালির শিল্প চর্চার পরিসরে বেলাফন্টের গানের অরাজনৈতিকীকরণ অনেকটাই সম্পন্ন হয়েছে, ঠিক যেমনটা হয়েছে সফদর হাশমির নাটকের সাথে। রাজনীতিবিমুখ শিল্পচর্চার পরিসরগুলিও তাই সহজে কো-অপ্ট করতে পারছে। দুম করে মনে পড়ে যায় যাদবপুরে পড়ার দিনগুলির কথা। আমাদের ক্যাম্পাসে ঘোর বামবিরোধী, তথাকথিত অরাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনও সফদর স্মরণে পথনাটক করত, আমরা দেখতাম। তাদের ফ্রেশার্সের অনুষ্ঠানেও গাওয়া হতো জামাইকা ফেয়ারওয়েল। পাশে বামপন্থী সংগঠনের অনুষ্ঠানেও সহজ প্রবেশাধিকার পেতো জামাইকা ফেয়ারওয়েল। ওই যে বললাম মৌসুমী ভৌমিক? তৃণমূল থেকে যাদবপুরের ফ্যাস, প্রেসিডেন্সির আইসি থেকে এসএফআই হয়ে একেবারে বাংলা পক্ষ, যে কোনো পক্ষের পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে যেতে পারে জামাইকা ফেয়ারওয়েল। কারণ এই গানগুলির, বা গায়কের জীবনী ছাড়াও যে তার যাপন ও শিল্পের অন্যান্য অঙ্গ থেকে একটা সম্পূর্ণ ভিন্ন বা গভীরতর রাজনীতির পাঠ নেওয়া যায়, তা আমাদের কেউ শেখায়নি। অথচ এই প্রশ্নই রাজনৈতিক শিল্পের, শিল্পের রাজনীতির সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্ন। ফর্ম ও কন্টেন্টের দ্ব্যর্থক ব্যাখ্যার বাইরে আজ শিল্পকে আরো নানাভাবে ভেঙে বোঝার মান রয়েছে। বহু দিন ধরেই প্রশ্ন উঠছে, একটি শিল্পের রাজনীতি কি শুধুই তার অন্তর্গত ফর্ম ও কন্টেন্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ? শিল্পীর ব্যক্তিসত্ত্বা ও তার যাপন তারই নিজস্ব শিল্পের সাথে কীভাবে মিশছে? কোথাও কি পথ ভাগ হয়ে যাচ্ছে তাদের? না কি দুই মিলেই একটা রাজনীতিরই আরেকটু বিস্তৃত প্রতিচ্ছবি?
বেলাফন্টে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন নিউ ইয়র্কের ‘আপার ওয়েস্ট সাইড’ পাড়ায় নিজের বাড়িতে। ৯৬ বছরের সম্পূর্ণ জীবন ছিল তার। মৃত্যুর পরও তার পরিবারের মানুষেরা চালিয়ে যাবেন হ্যারি বেলাফন্টে ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে শিল্পীর কাজ। অথচ আমরা বেলাফন্টে বিষয়ক আলোচনায় বারবার শুধু তার ফর্ম ও কন্টেন্ট নিয়েই আলোচনা করি। তার ‘লিভড অ্যাক্টিভিজম’ বা সক্রিয় যাপনের দিকে সেভাবে তাকাইনা। তার মৃত্যুতে তার গানকে স্মরণ করি ঠিকই, কিন্তু তার মতো কিছুটা হলেও নিজেদের আন্তরিক রাজনীতিকে শিল্পের বহিঃপ্রকাশে পরিণত হতে দিই না। বা দিতে পারিনা। ১৯৯৮ সালে আমি বড্ড ছোট ছিলাম, ‘মামা লুক আ বুবু’ শুনে ভাবতাম সন্তানের দুষ্টুমিকে শায়েস্তা করার গান সেটা। হয়তো আরো আগেই ধরে ফেলতে পারতাম গানের স্তবকের আড়ালের রাজনীতিকে। পারিনি। অবুঝ আমি স্রেফ গলা মিলিয়েছি, ‘এভরিবাডি মাটিলডা!’ প্রকাশের তারিখ: ৩০-এপ্রিল-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |