|
হাথরস, মনুবাদী অবিচারের প্রতিচ্ছবিবৃন্দা কারাত |
উত্তরপ্রদেশে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথের নিজ সম্প্রদায়ের ব্যক্তিরা আইনের দিক থেকে একটা বিশেষ ছাড় পেয়ে আসছে। এই ঘটনার বর্ণ বিষয়ক পরিচিতিগুলি যদি বিপরীত হত, অর্থাৎ নির্যাতিতা মেয়েটি যদি উচ্চবর্ণের হত এবং অভিযুক্তরা যদি নিম্ন বর্ণের অথবা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের হত, তাহলে কিন্তু সেই ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবে মেয়েটির মৃত্যুকালীন জবানবন্দিকে কোনো তর্ক ছাড়াই গ্রাহ্য করা হত এবং অভিযুক্তদের ফাঁসি না হলেও অন্তত যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতই। স্বাভাবিকভাবেই মৃত্যুকালীন জবানবন্দিকে সব সময়েই আদালতে বিশেষ প্রাধান্য দেওয়া হয়। কিন্তু হাথরসের ক্ষেত্রে এমনটা হল না। এই ক্ষেত্রে মেয়েটি বাল্মিকী সম্প্রদায়ের অর্থাৎ নিম্নবর্ণের, অপরদিকে মৃত্যুর আগে সে যে চার অভিযুক্তের নাম উচ্চারণ করেছে, তারা সবাই উচ্চবর্ণের। এদিকে মামলার রায় ঘোষণার পর থেকে মেয়েটির পরিবারের উপর আদালতের রায় মেনে নিতে প্রচণ্ড চাপ প্রয়োগ করা হতে থাকে। পরিবারটি আশা করেছিল সরকার হয়ত উচ্চতর আদালতে আপিল করবে। কিন্তু তেমনটা হল না। |
‘আসলে আমরাই জেলখানায় বন্দি হয়ে রয়েছি। যারা আমাদের বোনের উপর নৃশংস অত্যাচার করেছে, তাকে গণধর্ষণ করে তারপর মেরে ফেলেছে, তারা সবাই মুক্ত। তারা বুক ফুলিয়ে বীরপুরুষের মত গ্রামে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু আমরা ঘরের বাইরে বেরোতে পারছি না।’ কথাগুলি বলছিলেন তেত্রিশ বছরের তরুণ সতীন্দর কুমার। হাথরসের নির্যাতিত মেয়েটির বড় ভাই। গত ১৭ জানুয়ারি সুভাষিণী আলি এবং আমি হাথরসের নির্যাতিত বালিকাটির পরিবারের সঙ্গে কথা বলার জন্য তাদের গ্রাম বুল গঢ়ি-তে যাই। তখন আমাদের কাছে ঠিক এই ভাষাতেই নিজেদের চেপে রাখা যন্ত্রণার কথা প্রকাশ করলেন সতীন্দর। আমরা পরিবারটি ঠিক কী অবস্থায় রয়েছে তা দেখতে গিয়েছিলাম। গিয়ে আমরা যা দেখতে পেলাম, তা হল অন্যায় অবিচারের নির্লজ্জ দৃষ্টান্ত এবং বর্ণবাদের অকথ্য উদযাপন। আজকের উত্তরপ্রদেশে কোনও নির্যাতিত দলিত মানুষের সুবিচার পাওয়া যে কতখানি কঠিন, সেটা আরও একবার স্পষ্ট হয়ে গেল। বর্ণবাদী বৈষম্য ও নিপীড়ণ নিষিদ্ধ করার জন্য দেশের সংবিধানে আলাদা আইন রয়েছে। কিন্তু সেগুলিকে যে প্রহসনের পর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়েছে, তা আরেকবার স্পষ্ট হয়ে উঠল হাথরসের ঘটনাক্রমের মধ্য দিয়ে। পরিবারটির সঙ্গে তাদের ট্রমার বিষয়ে কথা বলতে বলতে আমরা এই মনুবাদী বর্ণব্যবস্থার চারটি পর্যায় দেখতে পেলাম। প্রথম পর্যায় : অপরাধ গত ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মূল অপরাধটি সংঘটিত হয়, এবং সেটাই প্রথম পর্যায়। উচ্চবর্ণের চার ব্যক্তি গণধর্ষণ করে হত্যা করল হতদরিদ্র এক দলিত পরিবারের ১৯ বছর বয়সী একটি মেয়েকে। আসলে ভারতবর্ষের নিজস্ব ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ সামাজিক ছকের দুর্বলতম অংশটিতে মেয়েটির অবস্থান। সে দলিত সম্প্রদায়ভুক্ত; বাল্মিকী বর্ণ; গরিব; নারী এবং ১৯ বছরের কিশোরি। এখানে বর্ণ-শ্রেণি-পুরুষতন্ত্রের সম্মিলিত শোষণ ও নিপীড়নের সমন্বয় ঘটেছে। এই অপরাধ লক্ষ্যবস্তু একজন নিম্নবর্ণের মানুষ। এই অপরাধের লক্ষ্যবস্তু একজন নারী। গ্রামের অভিজাত সম্প্রদায়-কৃত এই অপরাধের লক্ষ্য এক গরিব নিম্নবর্ণের নারী। ফলত শোষণ-বঞ্চনার ভিত্তিতে কৃত এই অপরাধ তো আসলে অপরাধ-ই নয়। দ্বিতীয় পর্যায় : সরকারি পক্ষপাত মনুবাদী নৃশংসতার দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হল যখন উত্তরপ্রদেশ সরকার ও প্রশাসন বর্ণবাদী এই অপরাধকে ধামাচাপা দিতে উদ্যোগী হল। অপরাধ সংঘটিত হল ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। তারপর থেকেই উত্তরপ্রদেশ সরকার এবং প্রশাসন মিলে তদন্তকার্যে অন্তর্ঘাত করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে গেল। প্রথমেই বলে দেওয়া হল, ধর্ষণের কোনও ঘটনা ঘটেনি। শারীরিক সম্পর্ক যেটা হয়েছে তা সম্মতির ভিত্তিতে হয়েছে। প্রথম পাঁচ দিন পর্যন্ত কোনও এফ আই আর লিপিবদ্ধ হল না। নির্যাতিতার শারীরিক পরীক্ষা করতে অনেকটা দেরি করা হল, যার ফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হারিয়ে গেল। জরুরি চিকিৎসা প্রদান করতেও অহেতুক বিলম্ব করা হল, যার কারণে মেয়েটির শারীরিক অবস্থা দ্রুত অবনতির দিকে যেতে লাগল। শেষ পর্যন্ত মেয়েটিকে দিল্লির এক হাসপাতালে নেওয়া হল বটে, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। মারা যাওয়ার পরেও পরিবার-পরিজনের কাছে হস্তান্তরিত না করে পুলিশ জোর করে মেয়েটির শবদেহ ছিনিয়ে নিয়ে চলে গেল এবং পরিবারের কোনো সম্মতি না নিয়েই রাতের অন্ধকারে দেহটি পুড়িয়ে দেওয়া হল। যাতে আর দ্বিতীয়বার ময়না তদন্তের কোনও দাবি-ই না উঠতে পারে। কিন্তু গোটা দেশ যখন প্রতিবাদে ফেটে পড়ল তখন বাধ্য হয়ে সরকার মামলাটি সি বি আই-কে হস্তান্তর করার সিদ্ধান্ত নিল। তৃতীয় পর্যায় : আইনি লড়াই আইনি লড়াই শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই মনুবাদী বর্ণব্যবস্থার তৃতীয় পর্যায় স্পষ্ট হয়ে উঠল অভিযুক্তদের বাঁচানোর লক্ষ্যে সরকারের নির্লজ্জ পক্ষপাতিত্বের মধ্য দিয়ে। কিশোরি মেয়েটির উপর নামিয়ে আনা নির্যাতনের পুরো বর্ণনা দেওয়া হয়েছে সি বি আই-এর অভিযোগপত্রে (চার্জশিট)। গণধর্ষণ, খুন এবং ষড়যন্ত্র বিষয়ক ধারাগুলি ব্যবহার করে অভিযোগপত্র তৈরি করা হয়েছিল। এর জন্য গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল মেয়েটির মৃত্যুকালীন জবানবন্দি এবং তার মায়ের জবানবন্দির উপর যিনি মেয়ে-কে অর্ধমৃত অবস্থায় প্রথম খুঁজে পেয়েছিলেন। স্পেশাল জেলা আদালত যেখানে প্রিভেনশন অব অ্যাট্রোসিটিজ আইনের মাধ্যমে বিশেষভাবে এসসি/এসটি- বিরোধী অপরাধগুলির বিচার হয় সেখানে এই মামলা উঠেছিল। আদালত নির্যাতিতার মৃত্যুকালীন জবানবন্দিটি কোনও কারণ না দর্শিয়েই খারিজ করে দেয়। মেয়েটির মায়ের জবানবন্দিও গুরুত্ব পায়নি। বিচার প্রক্রিয়া শেষে নির্যাতিতা যে চারজনের নাম উল্লেখ করেছিল, তাদের তিনজনকেই বেকসুর খালাস করে দেওয়া হয়। চতুর্থ জনকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় বটে, কিন্তু অনেকটা লঘু অপরাধে, ৩০৪ ধারার অন্তর্গত মারাত্মক আক্রমণজনিত অপরাধের জন্য। উত্তরপ্রদেশে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথের নিজ সম্প্রদায়ের ব্যক্তিরা আইনের দিক থেকে একটা বিশেষ ছাড় পেয়ে আসছে। এই ঘটনার বর্ণ বিষয়ক পরিচিতিগুলি যদি বিপরীত হত, অর্থাৎ নির্যাতিতা মেয়েটি যদি উচ্চবর্ণের হত এবং অভিযুক্তরা যদি নিম্ন বর্ণের অথবা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের হত, তাহলে কিন্তু সেই ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবে মেয়েটির মৃত্যুকালীন জবানবন্দিকে কোনো তর্ক ছাড়াই গ্রাহ্য করা হত এবং অভিযুক্তদের ফাঁসি না হলেও অন্তত যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতই। স্বাভাবিকভাবেই মৃত্যুকালীন জবানবন্দিকে সব সময়েই আদালতে বিশেষ প্রাধান্য দেওয়া হয়। কিন্তু হাথরসের ক্ষেত্রে এমনটা হল না। এই ক্ষেত্রে মেয়েটি বাল্মিকী সম্প্রদায়ের অর্থাৎ নিম্নবর্ণের, অপরদিকে মৃত্যুর আগে সে যে চার অভিযুক্তের নাম উচ্চারণ করেছে, তারা সবাই উচ্চবর্ণের। এদিকে মামলার রায় ঘোষণার পর থেকে মেয়েটির পরিবারের উপর আদালতের রায় মেনে নিতে প্রচণ্ড চাপ প্রয়োগ করা হতে থাকে। পরিবারটি আশা করেছিল সরকার হয়ত উচ্চতর আদালতে আপিল করবে। কিন্তু তেমনটা হল না। সরকার আপিল করল না। শুধু তাই নয় সি বি আই তদন্ত করে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) তৈরি করেছিল এবং আদালতে মামলা তুলে ধরেছিল, তারাও আপিল না করার সিদ্ধান্ত নিল। এমনটা এর আগে কখনও ঘটেছে? যে অভিযোগপত্রে গণধর্ষণ, ষড়যন্ত্র, হত্যার মত অপরাধের উল্লেখ রয়েছে সেটি নিম্ন আদালতেই খারিজ হয়ে গেল এবং তারপরেও সি বি আই নিজেই নিজের মামলাটি আর উচ্চতর আদালতে নিয়ে গেল না। সি বি আই কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীন একটি সংস্থা। ধরেই নেওয়া যেতে পারে যে আপিল না করার সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক এবং মন্ত্রকের ক্ষমতাধর মন্ত্রী অমিত শাহের থেকেই অনুমোদিত হয়ে এসেছে। সরকার শুরু থেকেই পাশে নেই, সি বি আই-ও সরে গেছে। এই অবস্থাতে পরিবারটি ন্যায়বিচারের দাবিতে এলাহাবাদ হাইকোর্টে আপিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেই মামলা এখনো বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে। দ্বিতীয় মামলাটি হল লক্ষ্ণৌ বেঞ্চের। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এই নৃশংস অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর লক্ষ্ণৌ বেঞ্চ একটি স্বতঃপ্রণোদিত মামলা গ্রহণ করে। ২০২০ সালের অক্টোবর মাসে নির্যাতিতার পরিবারকে আদালতের সামনে ডেকে পাঠানো হয়। পরিবারের বক্তব্য শোনার পর আদালত সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে – পরিবারের একজনকে সরকারি চাকরি দিতে হবে, পরিবারটির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে এবং ঐ অঞ্চল থেকে পরিবারটিকে সরিয়ে কোনো নিরাপদ স্থানে বসবাসের সুযোগ করে দিতে হবে। এই নির্দেশ পাওয়ার পরই উত্তরপ্রদেশ সরকার হঠাৎ স্বমূর্তি ধারণ করে। যে সরকার অভিযুক্তদের বেকসুর খালাস দেওয়ার নির্দেশের বিরুদ্ধে আপিল করেনি, সেই সরকারই লক্ষ্ণৌ বেঞ্চ-এর নির্দেশের বিরুদ্ধে সরাসরি সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে ফেলল। পরিবারের একজনকে সরকারি চাকরি দেওয়া এবং পরিবারটিকে নিরাপদ স্থানে বসবাসের সুযোগ করে দেওয়ার নির্দেশ খারিজ করার আবেদন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হল। অগত্যা অসহায়, নিঃস্ব পরিবারটি সুপ্রিম কোর্টে মামলা লড়ার পথে এগিয়ে যেতে বাধ্য হল। গত ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে সুপ্রিম কোর্টের তিন সদস্যের বেঞ্চ, যার প্রধান সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি, সেই বেঞ্চ লক্ষ্ণৌ আদালতের নির্দেশে স্থগিতাদেশ দেওয়ার জন্য দাখিল করা উত্তরপ্রদেশ সরকারের আবেদন খারিজ করে দিয়েছে। তবে তার পরেও উত্তরপ্রদেশ সরকার আদালতের নির্দেশ পালন করবে না বলেই জানিয়েছে। সুপ্রিম কোর্টে মামলাটির পরবর্তী শুনানি হবে ২০২৪-এর জানুয়ারি মাসে। দুটি মামলাতেই ন্যায়বিচার পাওয়ার লড়াই চালাতে হচ্ছে গরিব পরিবারটিকে। মামলা চালানোর খরচও তাদেরই বহন করতে হচ্ছে। দুটি ক্ষেত্রেই তাদের লড়াই করতে হচ্ছে সরকারের বিরুদ্ধে। চতুর্থ পর্যায় : টিঁকে থাকার লড়াই চতুর্থ এবং ক্রমাগত চলতে থাকা পর্যায়টি হল প্রতিদিনকার জীবনসংগ্রাম এবং এই লড়াই তাদের সবসময়েই লড়তে হয়। কারণ গ্রামের প্রতিপত্তিশালী শ্রেণি থেকে শুরু করে সরকারের শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত কর্তাব্যক্তিরা সকলেই পরিবারটিকে একেবারে ধ্বংস করে দিতে উদ্যত হয়েছে। এই প্রতিকূল অবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করে পরিবারটি টিঁকে থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছে। নির্যাতিতার দুই ভাই সতীন্দর এবং সন্দীপ আমাদের জানিয়েছেন সেই সময়টার কথা যখন অভিযুক্তদের মুক্তি দেওয়া হল। শুনতে শুনতে আমাদের মনে পড়ে যাচ্ছিল বিলকিস বানো মামলার অপরাধীদের মুক্তি পাওয়ার সময়ে ভিএইচপি আয়োজিত উদযাপনের দৃশ্যগুলি। সতীন্দর এবং সন্দীপ জানালেন, ‘গত ২০২৩ সালের ৩ মার্চ তারিখে মামলার রায় প্রকাশের পর খুব শীঘ্রই অভিযুক্তদের ছেড়ে দেওয়া হয়। তখনও হোলির কয়েকদিন বাকি ছিল। কিন্তু সেই দিনই যেন হোলি উদ্যাপন শুরু হয়ে গিয়েছিল। ছিল ব্যান্ড পার্টির বাজনা। লোকগুলো হাজত থেকে বেরিয়ে আসতেই তাদের উপর পুষ্পবৃষ্টি করা হল। তারপর ফুলের মালা পরিয়ে তাদের নিজের গোষ্ঠীর লোকেরা রাস্তায় রাস্তায় মিছিল করে চলল।’ বুল গঢ়ি গ্রামে মাত্র ছয় পরিবার দলিতের বাস। অন্যদের মধ্যে অধিকাংশই ঠাকুর সম্প্রদায়ের। অভিযুক্তরাও সকলেই ঠাকুর। এছাড়াও গ্রামে বেশ কয়েকটি ব্রাহ্মণ পরিবার রয়েছে। জানা গেল নির্যাতিতার পরিবারটি তখন বিচ্ছিন্ন এবং ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ছিল। প্রাথমিকভাবে সরকার পরিবারটিকে ২৫ লক্ষ টাকা ‘ক্ষতিপূরণ’ হিসাবে দিয়েছিল। এছাড়াও পরিবারটিকে চব্বিশ ঘন্টা নিরাপত্তা প্রদানের যে নির্দেশ দিয়েছিল আদালত, সেটিও বাস্তবায়ন করা হয়েছে। আমরা যখন ওই বাড়িতে গিয়েছিলাম, তখন তাদের বাড়ির এক অংশে কেন্দ্রীয় বাহিনীর একটা ক্যাম্প দেখেছি। আমরা জানতে পারলাম, পরিবারটির নিরাপত্তার জন্য অন্তত ১৫ জন নিরাপত্তাকর্মীর একটি বাহিনি সেখানে সর্বদা মোতায়েন থাকে। বাহিনির এক কনস্টেবল আমাদের জানালেন এই নিরাপত্তা বাহিনি না থাকলে এত দিনে পরিবারের সবাই খুন হয়ে যেত। তাঁদের কথায়, ‘পরিবারটি মামলা চালিয়ে যাচ্ছে বলে গ্রামে তাদের বিরুদ্ধে একধরণের ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।’ তবে নিরাপত্তা বাহিনি মোতায়েন হওয়ার অন্য আরেকটা সমস্যাজনক দিক-ও রয়েছে। সতীন্দররা দুই ভাই-ই তাঁদের কাজ হারিয়েছেন। সতীন্দর কাজ করতেন নয়ডার এক কারখানায়। ছোট ভাই সন্দীপ কাজ করতেন গাজিয়াবাদের এক মোবাইল কোম্পানিতে। কাজ ছেড়ে দুজনকেই গ্রামে ফিরে এসে বাবা-মার সঙ্গে থাকতে হচ্ছে। নিরাপত্তা বাহিনি ছাড়া তাঁরা কেউই বাড়ির বাইরে বেরোতে পারেন না। সঙ্গে বন্দুকধারী পুলিশ থাকে তাই এই কারণেই কেউ তাঁদের কাজ দিতে রাজি নয়। সুতরাং কাজ নেই। বহু দশক আগে দলিতদের জন্য যে ভূমিবণ্টন কর্মসূচি হয়েছিল, তখন পরিবারটি পাঁচ বিঘা জমি পেয়েছিল। ইতিমধ্যেই দুই বিঘা জমি গ্রামের উচ্চবর্ণের লোকেরা বেআইনিভাবে জবরদখল করে নিয়েছে। বাকি রয়েছে তিন বিঘা। সেখানেও চাষের কাজ করতে গেলে বন্দুকধারী পুলিশ সঙ্গে নিতে হয়। এমনকি শাকসবজি কিনতে গেলেও সঙ্গে সশস্ত্র পুলিশ নিয়ে যেতে হয়। তাঁরা জানালেন, বাজারে গেলে দুইপাশে সশস্ত্র পুলিশ পাহারায় যান তাঁরা। ফলে তাদের দিকে সকলের চোখ পড়ে। গ্রামে খুব সহজেই ‘হাথরস মামলার পরিবার’ নামেই চিহ্নিত হয়ে গেছেন তাঁরা। দুই ভাই ছাড়াও বাড়িতে রয়েছেন ঠাকুমা শান্তি দেবী, যাঁর বয়স আশির চেয়েও বেশি এবং নির্যাতিতার পিতা ওমপ্রকাশ ও মাতা রমা দেবী। ওমপ্রকাশ দীর্ঘ কয়েক দশক আসানসোলে কর্মরত ছিলেন। লাল ঝান্ডার সঙ্গে তাঁর পরিচয় আছে। তিনি বললেন, জ্যোতি বসুর সময়ে পশ্চিমবঙ্গে এমন অন্যায়-অবিচারের কথা কেউ কল্পনাও করতে পারত না। এছাড়া এই পরিবারে রয়েছেন সতীন্দরের স্ত্রী সন্ধ্যা, তাঁদের তিন সন্তান এবং ছোট ভাই সন্দীপ, যার বয়স তেইশ। নিরাপত্তার অভাবে বাচ্চারা স্কুলে যাওয়া বন্ধ করেছে। বড় সন্তানটিকে সন্ধ্যার বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাকি দুই সন্তানের জন্য শিক্ষার অধিকার বলে আর কোনও কিছুর অস্তিত্বই নেই। পরিবারটি আর্থিক অনটনে ধুঁকছে। ক্ষতিপূরণের টাকার পুরোটাই খরচ হয়ে গেছে গত তিন বছরে মামলা লড়ার কাজে। উকিলরা সচরাচর কোনও অর্থ নেন না, কিন্তু মামলার তারিখগুলোতে আদালত যেতে-আসতে খরচ হয় প্রায় পনেরো-কুড়ি হাজার টাকা। আদালতে যাওয়ার সময় শুধু যে নিজেদের জন্য গাড়ি ভাড়া করতে হয় তাই নয়, আবার নিরাপত্তা বাহিনির জন্যেও গাড়ি ভাড়া করতে হয় তাঁদেরকেই। প্রথমদিকে একাধিক আদালতে যেতে হত তাঁদের। মাসের মধ্যে কয়েকবার লক্ষ্ণৌ এবং এলাহাবাদ আদালতে হাজিরা দিতে হত। আবার কোনও সামাজিক অনুষ্ঠানে যেতে হলেও একই অবস্থা। গাড়ি ভাড়া থেকে শুরু করে যাতায়াতের ব্যয় বহন করতে হয় পরিবারটিকেই। ফলে পরিবারটি বাইরে যাওয়াই পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। গত বছর সন্ধ্যা দেবী প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তখন তাঁকে আগ্রা হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে চিকিৎসা করাতে হয়েছে। চিকিৎসা বাবদ একগাদা খরচ তো আছেই, তার উপর আবার হাসপাতালে নিরাপত্তা রক্ষীদের জন্য আলাদা একটা ঘর ভাড়া করতে হয়েছিল। সব মিলিয়ে পরিবারটিকে প্রচুর টাকাপয়সা খরচ করতে হয়েছে। আমাদের সঙ্গে কথা বলার সময় রমা দেবী বারবার ভেঙে পড়ছিলেন। তিনি বলছিলেন, সবসময় চোখের সামনে নিজের মেয়ের ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত দেহের ছবি ভেসে ওঠে, তখন তিনি আর কিছুতেই স্থির থাকতে পারেন না। এই ভয়ানক নৃশংস ঘটনা যারা ঘটাল, তারা বেকসুর খালাস পেয়ে গেল এটা তিনি মেনে নিতে পারেন না। কাঁদতে কাঁদতে আমাদের বললেন, শুধু মেয়েটাকেই তো নয়, পুরো পরিবারটাকেই শেষ করেছে ওরা। দুই ছেলেকে দেখিয়ে তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘ওরা কী এমন অপরাধ করল যে, তাদের স্বাভাবিক জীবনটাকেই ছিনিয়ে নেওয়া হল? ওরা যদি কাজ না পায় তাহলে আমরা বাঁচব কীভাবে?’ তখনই সতীন্দর জানালেন, ক্ষতিপূরণের টাকা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। তিনি বললেন, মামলার খরচ জোগানোর জন্য কিছুটা টাকা আলাদা করে রাখা হয়েছে, অন্যান্য খরচও যথাসম্ভব কমানো হয়েছে। ‘আমাদের খাওয়ার খরচ ইত্যাদির জন্য মাসে কম করেও ১৫,০০০ টাকা প্রয়োজন কিন্তু এক পয়সাও রোজগারের উপায় নেই তাই পরিস্থিতি একেবারে হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে।’ যে পোশাক পরেছিলেন সেইটা দেখিয়ে বললেন তিনি, ‘পোশাকগুলিও আমাদের আত্মীয়দের দেওয়া। নিজেদের দুরবস্থা নিয়ে কথা বলতে লজ্জা হয় আমাদের।’ স্থানীয় লোকসভা আসনটি তপশিলী জাতির জন্য সংরক্ষিত। রাজবীর দিলের এখানকার নির্বাচিত সাংসদ। এই বিজেপি সাংসদ একবারের জন্যেও নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে দেখা করেননি। এ বিষয়ে তাঁকে প্রশ্ন করা হলে তিনি উলটে প্রশ্ন করেন, সরকার ২৫ লক্ষ টাকা দিয়েছে, আর কী লাগে? অথচ তিনি নিজে দলিত সম্প্রদায় থেকে উঠে আসা একজন রাজনীতিবিদ। গ্রামের লোকদের থেকে জানা গেল, এই সাংসদ যখনই কোনও উচ্চবর্ণের মানুষের বাড়িতে যান, তখন নিজের সঙ্গে আলাদা একটি গ্লাস নিয়ে যান। সেই বাড়িতে চা খেতে দিলে নিজের গ্লাসে ঢেলে নিয়ে পান করেন। উচ্চবর্ণের বাড়িতে দলিতদের চা দেওয়া হয় না, গ্লাস তো নয়ই। সাংসদ উচ্চবর্ণের মানুষদের বিরাগভাজন হতে চান না বলে নিজের গ্লাস নিজেই নিয়ে যান। এটা অত্যন্ত লজ্জার বিষয় বিজেপি-র দলীয় সাংসদ যিনি নিজেই দলিত সম্প্রদায়ের, তিনি এভাবে বর্ণবাদী প্রথা মেনে চলেছেন। সুতরাং কার্যত তিনি জনপ্রতিনিধি হওয়ার সুবাদে সকল দলিতের কাছে দৃষ্টান্তস্বরূপ হয়ে উঠে দেখাতে চান, কীভাবে দলিত মাত্রেরই এই বর্ণবাদী নিয়মাবলী মান্য করে চলা উচিত। বর্তমানে এই পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে কার্যত একটি দলিত পরিবারকে শাস্তি দেওয়া হবে বলে। শাস্তি, কারণ তাঁরা অপরাধ করেছেন এবং তাঁদের অপরাধ এটাই যে, বাড়ির মেয়েটিকে যারা গণধর্ষণ করে খুন করল, সেই ধর্ষক, খুনীদের সঙ্গে তাঁরা কোনও রকম আপোষ করতে রাজি হননি। বিজেপি পরিচালিত ডবল-ইঞ্জিন সরকার দলিত এবং নারীদের পদদলিত করবার জন্য যে মনুবাদী ব্যবস্থা প্রণয়ণ করেছে সেই ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত হিংস্রতা ও অবিচারের প্রতিমূর্তি হয়ে উঠেছে হাথরস। সি পি আই (এম) দলের পক্ষ থেকে ন্যায়বিচারের দাবীতে লড়াই করে যাওয়া এই সাহসী পরিবারটি-কে সবরকম সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছি আমরা। সৌজন্যে: পিপলস ডেমোক্রেসি: ২২-২৮ জানুয়ারি, ২০২৪ প্রকাশের তারিখ: ০৮-মার্চ-২০২৪ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |