হেমন্ত গঙ্গোপাধ্যায় স্মরণে

রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য
সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যর নিষ্ঠাবান ছাত্র, বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে চর্চা করেছিলেন প্রাচীন ভারতের দর্শন, বিশেষ করে বেদান্তদর্শন, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃত বিভাগ ছিল কর্মক্ষেত্র। এমন একজন মানুষ মার্কসবাদী হবেন,শুধু ব্যক্তিগত প্রত্যয়ে নয়, রীতিমতো অবিভক্ত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য, তার জন্য কারাবাসও করেছেন দীর্ঘকাল।

সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যর নিষ্ঠাবান ছাত্র, বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে চর্চা করেছিলেন প্রাচীন ভারতের দর্শন, বিশেষ করে বেদান্তদর্শন, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃত বিভাগ ছিল কর্মক্ষেত্র— এমন একজন মানুষ মার্কসবাদী হবেন— শুধু ব্যক্তিগত প্রত্যয়ে নয়, রীতিমতো অবিভক্ত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য, তার জন্য কারাবাসও করেছেন দীর্ঘকাল— এমনটি ঠিক প্রত্যাশিত নয়। এই অপ্রত্যাশার পেছনে আসলে একটি সংস্কার কাজ করে। সেটি এই প্রাচীন ভারতের দর্শন মানেই নানা রূপে ভাববাদ কোনো মার্কসবাদীর তার থেকে কিছু পাওয়ার নেই।

কিন্তু দু’জন ব্যক্তির কথা মনে রাখলে বোঝা যায়: এমন সংস্কার নিতান্তই অমূলক। প্রথম জন হলেন ভাটপাড়ার জানকীবল্লভ ভট্টাচার্য (১৯০৪-৯২), দ্বিতীয় জন দীর্ঘকাল খড়দাবাসী হেমন্তকুমার গঙ্গোপাধ্যায় (১৯১৪-২০০৭)। নানা সময়ে অবশ্য তিনি নিজের নাম লিখতেন: হেমন্ত গঙ্গোপাধ্যায়, ইংরিজি রচনায় হেমন্ত কুমার গাঙ্গুলী, আরও সংক্ষেপে হেমন্ত গাঙ্গুলী। জানকীবাবুর কর্মক্ষেত্র ছিল কলকাতার সুরেন্দ্রনাথ কলেজ, গবেষণা করেছিলেন ভারতীয় দর্শনে অভাব (যার মানে, ইউরোপীয় দর্শনের পরিভাষায়, নিগেশন) নিয়ে; চার্বাকদর্শন সমেত আরো বহু বিষয়ে বহু প্রবন্ধর লেখক, জয়ন্তভট্ট-র ন্যায়মঞ্জরী-র ইংরিজি অনুবাদক (যদিও কাজটি সম্পূর্ণ হয়নি)। এছাড়াও তিনি যুক্ত ছিলেন ভাটপাড়া মিউনিসিপ্যালিটি-র সঙ্গে; কিছুকাল অধুনালুপ্ত পশ্চিমবঙ্গ বিধান পরিষদ-এর সদস্যও ছিলেন।

হেমন্ত গঙ্গোপাধ্যায়ের পার্টি-জীবনের একটা বড়ো অংশ কেটেছিল আসাম-এ; ওই রাজ্যের কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্যও হয়েছিলেন, কারাবাসও সেখানেই। মুক্তি পাওয়ার পর চলে আসেন পশ্চিমবঙ্গে, অধ্যাপনা করেন কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর বিভাগে। তখন খড়দা-তেই ছিল তাঁর বাস। খড়দার পার্টিকর্মীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল স্নেহ-ভালোবাসার। সমাজ সাহিত্য ও দর্শন-এর ভূমিকায় এমন কয়েকজন কর্মীর নামও আছে। এককালে খড়দহ থানা সমাচার নামে একটি পত্রিকায় ‘সত্যাসত্য’ নামে তাঁর একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ বেরিয়েছিল। হেমন্তবাবু লিখেছেন: ‘পত্রিকাটির নামকরণ বিভ্রান্তিকর হলেও বস্তুত “থানার” সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক ছিল না। দুঃখজনক কারণে এই পত্রিকাটির অপমৃত্যু একটি মননধর্মী উজ্জ্বল সম্ভাবনার অপমৃত্যু।’ পরে হেমন্তবাবু যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে যোগ দেন; খড়দার পার্ট গুটিয়ে চলে যান যাদবপুরে অধ্যাপকদের কোয়ার্টারস-এ। অবসর নেওয়ার পর তিনি থাকতেন সল্ট লেকের বিদ্যাসাগর আবাসন-এ। আমরণ এই ছিল তাঁর ঠিকানা। কমিউনিস্ট পার্টি ভাগ হওয়ার পর তাঁর যোগ ছিল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র সঙ্গে। একবার লোকসভা নির্বাচনে সেই পার্টির তরফে প্রার্থীও হয়েছিলেন। কিন্তু হেমন্তবাবুর পরিচয় এই সব দিয়ে নয়। তিনি কেমন অধ্যাপক ছিলেন তা আমার জানা নেই। তবে সংস্কৃত ছাড়াও অন্যান্য বিষয়ের অধ্যাপকরাও তাঁর পাণ্ডিত্যর জন্যে তাঁকে খুবই শ্রদ্ধা করতেন। বিদ্যাসাগর কলেজের কয়েকজন অধ্যাপক— বিশেষ করে অর্থনীতির সুবোধকৃষ্ণ দত্ত আর রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বঙ্গেন্দু গঙ্গোপাধ্যায় প্রতি রবিবার কলকাতা থেকে খড়দায় আসতেন তাঁর সঙ্গে আলাপ আলোচনা করতে— এটুকু জানি। সুকুমারী ভট্টাচার্য যাদবপুরের ছাত্রছাত্রীদের বলতেন, আমরা লিখি তোমাদের জন্যে, তার থেকে তোমরা শেখো; উনি লেখেন আমাদের জন্যে, তার থেকে আমরা শিখি। ‘অধ্যাপকদের অধ্যাপক’ এই পরিচয় হেমন্তবাবুর মতো মানুষকেই মানায়।

অথচ, এত বিশাল পাণ্ডিত্য সত্ত্বেও, লেখার ব্যাপারে জানকীবল্লভ ভট্টাচার্য ও হেমন্তবাবু দু’জনেরই আলস্য ছিল অপরিসীম। তাঁদের বিদ্‌বত্তার তুলনায় রচনার পরিমাণ অতি অল্প; কোনো অনুপাতেই আসে না। কেউ কিছু জানতে চাইলে এঁরা কাউকে নিরাশ করতেন না; অজস্র কথা বলে যেতেন। কিন্তু লিখতে বললেই কেমন যেন গুটিয়ে নিতেন নিজেদের। সমাজ সাহিত্য ও দর্শন-এর ভূমিকায় হেমন্তবাবু লিখেছেন: ‘... উৎসাহ ও উদ্যমের অভাব আমার অন্তরঙ্গ স্বভাব। আমার পক্ষে কলম ধরা নিজের সঙ্গে কুস্তি লড়ার সামিল।’ তবে লেগে থাকলে তাঁকে দিয়েও লেখানো যেত। পশ্চিমবঙ্গ শান্তিসংসদ-এর মুখপত্র, আন্তর্জাতিক-এর সম্পাদক বেদুইন চক্রবর্তী তাঁকে দিয়ে বহুমূল্য সাতটি রচনা লিখিয়ে তবে ছেড়েছিলেন। তার বিষয়বৈচিত্র্য দেখার মতো: ‘রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যদৃষ্টি’, ‘অতিশয়োক্তি ও কাব্য’, ‘সাহিত্য ও সাদৃশ্য’, আবার ‘ভাষার দর্শন’, ‘দার্শনিক হিরাক্লিটাস’, ‘বিবেকানন্দ বেদান্ত ও ভারতীয় সমাজ’। শেষ প্রবন্ধটি বিবেকানন্দ জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে লেখা; সার্ধশতবার্ষিকী বছরেও সেটি একাধিকবার পুনর্মুদ্রিত হয়েছে। খড়দহ থানা সমাচার-এ প্রকাশিত দীর্ঘ প্রবন্ধ ‘সত্যাসত্য’রও বিষয়: দর্শন, কিন্তু শুধু এইটুকু বললে যথেষ্ট বলা হয় না। এর পুরো ধাঁচাটি পলেমিকাল বা তর্কমূলক। বারট্রান্ড রাসেল, উইলিয়ম জেমস্‌, জন ডিউঈ প্রমুখ দার্শনিক মহারথীদের বিরুদ্ধে হেমন্তবাবু একাই লড়ে গেছেন— শুধু সত্য আর অসত্যর তফাত দেখাতে নয়, বিষয়নিষ্ঠা (অবজেকটিভিটি) আর মার্কসবাদের মানবকেন্দ্রিক চরিত্র প্রতিষ্ঠা করতে।

‘মহাভারতের তাৎপর্য’ প্রবন্ধটি অধুনালুপ্ত আনৃণ্য পত্রিকায় আবার ছাপার সময়ে তার সম্পাদক সুবীরকুমার পোদ্দার বলেছিলেন: “এ লেখা পড়ে তো আমাদের মা-মাসিরাও বুঝতে পারবেন।” কথাটা ঠিকই। সব ধরনের পাঠকের জন্যে, বিজ্ঞ-অবিজ্ঞ নির্বিশেষে, হেমন্তবাবু লিখতে জানতেন। তাঁর ‘মার্কসবাদ কেন?’ প্রবন্ধটিও মূলত অবিজ্ঞ পাঠকদের জন্যেই লেখা।

শুধু দর্শন ও সাহিত্য নয়, অলংকারশাস্ত্রেও হেমন্তকুমারের দখল ছিল অসাধারণ। ‘অতিশয়োক্তি ও কাব্য’ প্রবন্ধটি তো বটেই, ‘বিদ্যাসাগরের চটি’-ও তার নিদর্শন। সংস্কৃত অলংকারশাস্ত্রর সীমাবদ্ধতা কোথায়? তিনি লিখেছেন:

আমাদের দেশের রসবাদী আলংকারিকরা সাধারণীকৃতির সূত্রটি ঠিকই ধরেছিলেন। এজন্য তাঁদের কৃতিত্বকে আমরা শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি। কিন্তু সূত্রটিকে তাঁরা বৃহত্তর সমাজের ক্ষেত্রে বিস্তৃত করতে পারেননি, সাধারণী-কৃতিকে বৃহত্তর মানবিকতার বোধে বিন্যস্ত করতে পারেন নি...

এই বক্তব্যকে এবার খানিকটা সংকুচিত করে তিনি যোগ করেছেন:

অবশ্য রামায়ণ-মহাভারতকে বাদ দিয়ে এ-কথা বলছি। রামায়ণ-মহাভারতের মানবিক ও সাহিত্যিক আবেদন সমালোচকদের প্রশংসার অপেক্ষা রাখে না। সংস্কৃত নাটকের মধ্যে ‘মৃচ্ছকটিক’কেও আমরা বাদ দিয়ে এ-কথা বলছি।

আপাতদৃষ্টিতে এখানে একটু গোলমাল আছে। কথা হচ্ছিল রসবাদী বৈদান্তিক আলংকারিকদের নিয়ে। সেখানে হঠাৎ সংস্কৃত সাহিত্যর মূল্যায়ন ঢুকে পড়ল কেন? প্রসঙ্গটি মনে রাখলে বিষয়টি বোঝা যাবে। শোনা যায়, নীলদর্পণ-এ নীলকর সাহবের ভূমিকায় অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফীর অভিনয় দেখতে দেখতে উত্তেজিত হয়ে বিদ্যাসাগর তাঁর দিকে নিজের পায়ের চটি ছুঁড়ে মেরেছিলেন। আলংকারিকদের মতে কাজটা ঠিক রসিক-সুলভ হয়নি। শিল্প-সাহিত্য যে-ধরনের আবেগ জাগায় তার আস্বাদ অলৌকিক। কিন্তু বিদ্যাসাগর সম্পূর্ণ লৌকিক মানবিক অনুভূতির তাড়নায় ওই কাণ্ডটি করেছিলেন। হেমন্তবাবু বলতে চান: শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম শুধু রসাস্বাদের বাহন নয়, মানবিক আবেগকেও তা জাগিয়ে তোলে:

সামাজিক মানুষের ভাবনা ও ধারণার যে সাধারণীকৃতি পরিব্যাপ্ত হয়ে থাকে কবি ও সহৃদয়ের সাধারণীকৃতি তার সংস্কৃত, পরিশোধিত ও পরিমার্জিত রূপ। উৎপীড়িত মানুষের প্রতি সমবেদনায় ভাস্বর বেদনাহত কবিমানস হতেই রামায়ণ-মহাভারতের মতো মহাকাব্য উৎসারিত হয়েছে। সর্ব যুগের মানুষের মতো সুখ-দুঃখ ও কল্যাণ কামনা কবিহৃদয়ে সাধারণ্য প্রাপ্ত হয়ে এই মহাকাব্য দুটিকে অসাধারণ করে তুলেছে।

এর থেকেই হেমন্তবাবুর সিদ্ধান্ত: ‘সুতরাং বিদ্যাসাগর মশাইয়ের চটি বেরসিক মানুষের চিত্ত-চাঞ্চল্যের প্রতীক নয়, গভীর ভাবাবেগে অনুপ্রাণিত রসবোধেরই প্রতীক, অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফীর অভিনয় প্রতিভার শ্রেষ্ঠ পুরস্কার।’

প্রসঙ্গত বলি তত্ত্ব আলোচনার সময়েও হেমন্তবাবুর রসবোধ, বিশেষ করে হাস্যরস, কোনো বাধা মানে না। বিদ্যাসাগরের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে তিনি লিখেছেন: ‘সেদিন তাঁর হাতে বন্দুক থাকলে নীলকর সাহেব মারা পড়ত না, মারা পড়তেন নটশেখর অর্ধেন্দুশেখর।’ জীবনানন্দ প্রমুখ আধুনিক কবির রচনায় অলংকরণের বাড়াবাড়ি হেমন্তবাবুর যদি-বা সহ্য হতো, অন্য এক কবির কবিতার এই পঙ্‌ক্তিগুলি তার সহ্য হয় না:

তিনগুণ দশের সত্যি চুয়াত্তর হলে

যত পরমাণু ধরে

তাদের বিভাগ্য শক্তি, ক্ষমতায় যা কেবল শুধু

E=MC2--এর সীমা জানে...

 

হেমন্তবাবুর মন্তব্য: ‘সত্যিই গণিত হলে মা সরস্বতী চমকাবেন না, কারণ তিনি গণিত-বিদ্যারও দেবতা। কিন্তু গণিতও নয়, কবিতাও নয়— এ কেমন রূপ ? এতো মা সরস্বতীর শ্রাদ্ধের মন্ত্র!’

দর্শন বিষয়ে হেমন্তবাবু বাংলার চেয়ে বেশি লিখেছেন ইংরিজিতে। তবে গোপিকামোহন ভট্টাচার্য স্মারক বক্তৃতামালা অবশ্য তিনি বাংলাতেই দিয়েছিলেন। তার বিষয় ছিল: চার্বাকদর্শন। তিনটি অধ্যায় ও কয়েকটি পরিশিষ্ট সমেত এই ছোট্ট বইটি পড়লে বোঝা যায়: শুধু বস্তুবাদ নয়, মীমাংসা, বেদান্ত ও ন্যায়-বৈশেষিক দর্শনেও তাঁর ব্যুৎপত্তি ছিল কত গভীর। বিশেষ করে মীমাংসা দর্শনের চর্চা বাংলায় এককালে চালু থাকলেও, উনিশ-কুড়ি শতকে আর নতুন করে তার পুনরুজ্জীবন হয়নি। সেদিক দিয়ে হেমন্তবাবু ছিলেন এক বিরাট ব্যতিক্রম। বৈদিক ধর্ম ও মীমাংসা দর্শন বইটিতে একই সঙ্গে মীমাংসা ও ভর্তৃহরি-র ব্যাকরণ দর্শনের বিশ্লেষণ পাওয়া যায়। পুনা থেকে প্রকাশিত নিউ হরাইজনস্ অফ রিসার্চ ইন ইন্ডোলজি (১৯৮৯)-তে প্রাচীন মীমাংসায় যৌক্তিক ও অযৌক্তিক বিষয়ে তাঁর প্রবন্ধটিও সমান উল্লেখযোগ্য। কিন্তু এক-এক করে তাঁর প্রতিটি রচনার বিচার-বিশ্লেষণের উপযুক্ত উপলক্ষ তাঁর জন্মশতবর্ষপূর্তি অনুষ্ঠান নয়। তাই আলোচনা এবার গুটিয়ে আনি।

হেমন্তবাবুকে যাঁরা চিনতেন তাঁদের কাছে শতবর্ষপূর্তি উদ্‌যাপনের যৌক্তিকতা এইরকম: সকৃতজ্ঞ স্মরণ, ঋণস্বীকার, আর সব মিলিয়ে কর্তব্য পালন।

যাঁরা হেমন্তবাবুকে চিনতেন না, বা চেনার সুযোগ হয়নি, তাঁদের কাছে এই অনুষ্ঠানের তাৎপর্য অন্য। বাংলা তথা ভারতে মার্কসবাদ চর্চার জগতে, বিশেষ করে দর্শনের ক্ষেত্রে, হেমন্তবাবুর অবদান সম্পর্কে সঠিক ধারণা করা তাঁদের কাছে প্রধান কাজ। আর সেইসঙ্গে তাঁর উত্তরাধিকার ঠিক কী— এই নিয়েও নিশ্চয়ই ভাবনা-চিন্তা করা যায়।

আমার মনে হয়, হেমন্তবাবুর উত্তরাধিকার এইরকম:

  • কঠিন বিষয়ে সহজ ভাষায় লিখতে পারা। এ-ব্যাপারে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে হেমন্ত গঙ্গোপাধ্যায়ের দৃষ্টান্ত অনুসরণযোগ্য।
  • ভাষা সরল করার জন্যে আলোচ্য বিষয়কে তরল না-করা। দরকার পড়লে নিশ্চয়ই কঠিন পারিভাষিক শব্দ ও কমবেশি সংস্কৃত বা ইংরিজি উদ্ধৃতি দিতে হবে। কিন্তু তার সঙ্গে যেন বাংলায় অন্তত ভাবানুবাদ দেওয়া থাকে।
  • বিতর্কে ঢুকতে পেছপা না-হওয়া। প্রতিপক্ষ যতই নামজাদা হন, তার রেয়াত না-করা।
  • ভক্তি বাদ দিয়ে যেখানে দরকার সেখানে শ্রদ্ধা জানানো।
  • দেশজ-ঐতিহ্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট জ্ঞান: তার কোন্ কোন্ দিক হেয় আর কোন্‌গুলি উপাদেয়— এ-বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা থাকা।  
  • নতুন নতুন ক্ষেত্রে মৌলিক চিন্তা নিয়ে সাহস করে এগোনো।

বাংলায় তথা বাংলাভাষায় মার্কসবাদ চর্চার ধারাটি এখনও অবধি খুব সমৃদ্ধ নয়। কয়েকজন ব্যক্তির একক প্রয়াসেই যেটুকু কাজ হয়েছে। মৌলিকতা দাবি করতে পারেন অল্প কয়েকজন। এখন তো ভারতবিদ্যার জগতে মার্কসীয় বিশ্লেষণের খরার পর্ব চলছে (চৌতিরিশ বছরের বাম শাসন সত্ত্বেও)। তবে খরা একদিন কাটবেই। তখন অন্যান্য স্মরণীয় মার্কসবাদীর সঙ্গে হেমন্তবাবুর রচনার কদর হবে— এই আশায় রইলুম। সুখের বিষয় তাঁর কয়েকটি বই আবার পাওয়া যাচ্ছে। আমার এই আশা তাই একেবারে অমূলক নয়।

 

পরিশিষ্ট

হেমন্তকুমার গঙ্গোপাধ্যায়ের রচনাপঞ্জি (অসম্পূর্ণ)

১. Philosophy of Logical Construction. Sanskrit Pustak Bhandar, 1963

২. সমাজ সাহিত্য ও দর্শন। ঐ ১৩৭৩/১৯৬৬, অবভাস, ২০১০।

৩. Radicalism in Advaita Vedanta. Indian Publicity Society, 1988, (মূল রচনা ১৯৭৫)।

8. God Religion & Reason. University of Calcutta, 1982. (মূল রচনা ১৯৮১)।

৫. চার্বাক দর্শন। আকাদমিআ ১৯৯৩, অবভাস, ২০১০।

৬. প্রাচীন ভারতে ধর্ম, সমাজ ও দর্শন। বেদবিদ্যাকেন্দ্র, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, ২০০৩।

৭. বৈদিক ধর্ম ও মীমাংসা দর্শন। অবভাস ২০০৮।

অগ্রন্থিত রচনা

‘মার্কসবাদ কেন?’, মূল্যায়ন, শারদীয়া ১৩৭৫।

‘বিদ্যাসাগরের চটি’, আন্তর্জাতিক, অক্টোবর ১৯৬৬ (পুনর্মুদ্রণ মানবমন এপ্রিল ২০১৫)।

 

—রহড়া সংঘ ভবন, ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৫-য় অনুষ্ঠিত হেমন্তকুমার গঙ্গোপাধ্যায় শতবর্ষ স্মারক বক্তৃতা-র পাঠ।


প্রকাশের তারিখ: ২৭-অক্টোবর-২০২২

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org