|
হিমন্তের ‘কল্যাণে’ বিহুতেও এখন হিন্দুত্বটিম মার্কসবাদী পথ |
এমন একটি কৃষিকেন্দ্রিক অসাম্প্রদায়িক উৎসবকে ধর্মের রঙে রাঙিয়ে দিতে গত ১৪ এপ্রিল রঙালি বিহুর দিনে আসামের মুখ্যমন্ত্রী এক্স হ্যান্ডেলে একটি বার্তায় গরুবিহু উদযাপনের সাথে গোমাতার পূজনকে জুড়ে দেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, গরুর পবিত্রতা সম্পর্কিত প্রচলিত হিন্দু বয়ানের সাথে উত্তরপূর্ব ভারতের স্থানীয় সমাজের কোনো সম্পর্ক নেই। রঙালি বিহু বা বহাগ (বৈশাখ) বিহু উদযাপিত হয় বিচিত্রভাবে। নানা ধরনের উদযাপনের মাধ্যমে একমাস ধরে চলে এই বিহু। বিহুর প্রথম দিনকে বলা হয় গরুবিহু। অসমীয়া ভাষায় গরু বলতে ইংরেজি কাও বোঝায় না। ইংরেজি কাও-এর অসমীয়া প্রকৃত প্রতিশব্দ গাই। গরু শব্দের অর্থ যে কোনো চতুষ্পদ গবাদি পশু। গরু শব্দ দিয়ে বুদ্ধিহীন, বোকাও বোঝায়। |
তখনও বিজেপির জন্ম হয়নি, ক্ষমতায় আসা তো দূরস্থান, আরএসএস-এর প্রচারকরা উত্তরপূর্বের পাহাড় অঞ্চলে ঘুরে বেড়াতো জনজাতিদের ধর্মবিশ্বাসকে কীভাবে হিন্দু ধর্মাচারের সাথে একীভূত করা যায় তার লক্ষ্যে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার আগে যে যে ধর্মীয় আচার বা প্রথা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচলিত ছিল তার সবকিছুকে হিন্দু ধর্ম বলে প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টা করা। এই কাজ করার জন্যে তাদের একটি স্বতন্ত্র সংগঠনও রয়েছে যার নাম বনবাসী কল্যাণ আশ্রম। লক্ষ্যণীয়, আরএসএস কখনো আদিবাসী শব্দটি ব্যবহার করতে চায় না। তাদের মতে ভারতের আদি বাসিন্দা আর্যরা। ফলেই আদিবাসীদের তারা অভিহিত করে বনবাসী নামে। আদিবাসীদের মধ্যে যে অংশটি আধুনিক নাগরিক শিক্ষায় শিক্ষিত, তাদের একটি অংশের মধ্যেও আর্যব্রাহ্মণ্যতন্ত্রে অন্তর্ভুক্তির একটি উদগ্র বাসনা রয়েছে। এই মনোভাব থেকে তারাও নিজেদেরকে আর্যধারার অভিন্ন অংশ বোঝাতে নিজেদের আদিবাসী ধর্মবিশ্বাসগুলিকে হিন্দুধর্মের সাথে মেলাবার চেষ্টা করে। এটা তাদের কাছে সামাজিক সিঁড়িতে একটা উর্ধমুখী উল্লম্ফনের প্রচেষ্টাও। দক্ষিণপন্থী ইতিহাসবিদদেরও এই প্রবণতা ছিল। ট্রাইবাল আচার সংস্কৃতি ধর্মাচারগুলির গায়ে আর্যব্রাহ্মণ্য পরিধান পরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। অ-খ্রিস্টান আদিবাসী সমাজের এলিটদের একাংশের দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই আরএসএস তাদের হিন্দুত্বের সুদূরপ্রসারী প্রকল্প নিয়ে পা রেখেছে অনেকদিন আগেই। সর্বত্রই তাদের নিশানা ছিল চার্চ এবং তারা খুঁজে বেড়াতো সেই জনজাতি গোষ্ঠীগুলিকে যারা খ্রিস্টান ধর্মের আওতায় আসেনি। এভাবেই নাগা, খাসি, জয়ন্তীয়া, গারো, চাকমা, ত্রিপুরার আদিবাসী, আসামের ডিমাসা, কার্বি, অরুণাচল প্রদেশের নানা জনগোষ্ঠীর অ-খ্রিস্টান অংশকে তারা কাছে টানার চেষ্টা করেছে। উত্তরপূর্বে বিজেপি সরকার বিভিন্ন রাজ্যে গঠিত হওয়ার পর আর্যত্বের সাথে এই অঞ্চলের যোগসূত্র স্থাপনের তৎপরতায় নতুন নানা প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। দ্বারকাধীশ শ্রীকৃষ্ণ ও তাঁর প্রধান মহিষী রুক্মিনীর প্রণয় ও বিবাহ উপাখ্যানকেও উত্তরপূর্ব ভারতের আর্যায়নের কাজে ব্যবহার করার উদ্যোগ শুরু হয়েছে নরেন্দ্র মোদীর আমলে। শাস্ত্রমতে, রুক্মিনী লক্ষ্মীর অবতার। তাকে বিদর্ভরাজ ভীষ্মকের কন্যা বলা হয়। বিশ্বাস মতে, শ্রীকৃষ্ণের গুণে-কর্মে মুগ্ধ হয়ে রুক্মিনী আকৃষ্ট হন। তার পিতা ভীষ্মক শিশুপালের সাথে তার বিবাহসম্বন্ধ করলে তিনি শ্রীকৃষ্ণকে চিঠি লিখে তাকে নিয়ে যেতে বলেন। শ্রীকৃষ্ণ রুক্মিনীকে হরণ করে গুজরাটের মাধবপুর নামের একটি স্থানে বিয়ে করেন। গুজরাটের মাধবপুরে শ্রীকৃষ্ণ ও রুক্মিনীর বিবাহ অনুষ্ঠানকে উদযাপন করার জন্যে বাৎসরিক একটি মেলা হয়ে আসছে। ২০১৮ সালে দেখা গেল সেই মেলায় অরুণাচল প্রদেশের ইদু মিশমী জনজাতিগোষ্ঠীর এক বিশাল সাংস্কৃতিক দল নিয়ে হাজির হয়েছে সেই রাজ্যের মন্ত্রীরা। সঙ্গে মনিপুরের মুখ্যমন্ত্রী বীরেন সিং। বিজেপির দাবি রুক্মিনী অরুণাচল প্রদেশের ইদু মিশমী জনজাতির কন্যা ছিলেন। অরুণাচল প্রদেশ থেকে শ্রীকৃষ্ণ রুক্মিনীকে নিয়ে এসে গুজরাটের মাধবপুরে বিবাহ করেন। সেই অতীত স্মৃতির উদযাপনের উদ্দেশ্যে কনেযাত্রী হয়ে অরুণাচল প্রদেশ থেকে এসেছে এই বিশাল সাংস্কৃতিক দল। নিজেদের যুক্তির স্বপক্ষে তারা উল্লেখ করলেন অরুণাচল প্রদেশের পরশুরাম কুণ্ড ও ভীষ্মক নগর নামে দু’টি স্থানের নাম যা পুষ্ট করে এই দাবি যে রুক্মিনী প্রকৃতপক্ষেই ইদু মিশমী রমণী ছিলেন। এমন ধরনের মিল খোঁজার বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে। আর্যায়ন প্রক্রিয়াটি প্রকৃতপক্ষে শুধুমাত্র আধুনিককালের বিষয় নয়। এ অঞ্চলের ইতিহাসবিদরা দেখিয়েছেন, লাঙল-নির্ভর কৃষির পত্তনের মধ্য দিয়ে আর্যায়নের সূচনা। স্থানীয় রাজা বা শাসকেরা আর্যাবর্তের ব্রাহ্মণদের ভূমিদান করতেন যার সাক্ষ্য নানা তাম্রশাসনে পাওয়া যায়। এই প্রক্রিয়াতেই নানা স্থানের নাম পরিবর্তিত হয়। এর একটি সাধারণ ধরনও রয়েছে। স্থানীয় নামগুলিকে নিকটতম আর্যনামে পরিবর্তিত করা হয়। একটি উদাহরণ, বরাক উপত্যকায় একটি আদিনাম কূপ-লী আর্যায়ন প্রক্রিয়ায় কপিলী হয়ে যায়। মেঘালয়ের পরম্পরাগত ধর্ম সেংখাসির দেবী দুর্গা হয়ে যায় আরএসএস-এর উদ্যোগে। ফলে অরুণাচলে পরশুরাম কুণ্ড বা ভীষ্মক নগর নামটিও তৈরি করা নাম, যার সূত্র ধরে রুক্মিনীকে অরুণাচল প্রদেশে প্রতিস্থাপন করে শ্রীকৃষ্ণকে জুড়ে দেওয়া। মনিপুর রাজ্যকে একইভাবে মহাভারতের মনিপুরের সাথে মিলিয়ে চিত্রাঙ্গদাকে উত্তরপূর্বের মনিপুরদুহিতা হিসেবে দাবি করা হয়। আর্যসভ্যতার ছোঁয়া উত্তরপূর্বে ছিল না এটা যেমন সত্য নয়, তেমনি এই অঞ্চলের সমস্ত আদিবাসীদের আর্যদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়াটিও অনৈতিহাসিক। এর সীমা পরিসীমার বিচার বিজ্ঞানভিত্তিক ইতিহাসচর্চার মাধ্যমেই হতে পারে। এর ভার ইতিহাসবিদদের হাতে ছেড়ে এবারে আসব আসামের সাম্প্রতিক দৃষ্টান্তে। অসমীয়াদের প্রধান উৎসব বিহু। বিহু তিনটি। কঙালি, ভোগালি এবং রঙালি। তিনটি বিহুই পালিত হয় সংক্রান্তিতে। কঙালি কার্তিক সংক্রান্তিতে, ভোগালি পৌষ সংক্রান্তিতে এবং রঙালি চৈত্র সংক্রান্তিতে। এই উৎসব ঋতুকেন্দ্রিক, ফসলের সাথে সম্পর্কিত। কার্তিক মাসে যখন ফসল কাটার সময় আসেনি, সেই অভাবের সময়ের উৎসব কঙালি বিহু অর্থাৎ কাঙালের উৎসব। পৌষমাসে ফসল ওঠার পর ভোগের উৎসব ভোগালি বিহু। আর বৈশাখ মাসে নতুন চাষের প্রাক্কালে চৈত্র সংক্রান্তির উৎসব রঙালি বিহু। রঙ মানে বর্ণ তেমনি উৎসবও বোঝায়। এমন একটি কৃষিকেন্দ্রিক অসাম্প্রদায়িক উৎসবকে ধর্মের রঙে রাঙিয়ে দিতে গত ১৪ এপ্রিল রঙালি বিহুর দিনে আসামের মুখ্যমন্ত্রী এক্স হ্যান্ডেলে একটি বার্তায় গরুবিহু উদযাপনের সাথে গোমাতার পূজনকে জুড়ে দেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, গরুর পবিত্রতা সম্পর্কিত প্রচলিত হিন্দু বয়ানের সাথে উত্তরপূর্ব ভারতের স্থানীয় সমাজের কোনো সম্পর্ক নেই। রঙালি বিহু বা বহাগ (বৈশাখ) বিহু উদযাপিত হয় বিচিত্রভাবে। নানা ধরনের উদযাপনের মাধ্যমে একমাস ধরে চলে এই বিহু। বিহুর প্রথম দিনকে বলা হয় গরুবিহু। অসমীয়া ভাষায় গরু বলতে ইংরেজি কাও বোঝায় না। ইংরেজি কাও-এর অসমীয়া প্রকৃত প্রতিশব্দ গাই। গরু শব্দের অর্থ যে কোনো চতুষ্পদ গবাদি পশু। গরু শব্দ দিয়ে বুদ্ধিহীন, বোকাও বোঝায়। হিমন্ত বিশ্বশর্মার অনুবাদে গরুকে অসমীয়াতে গোমাতা বলাটা শুধু ভুল নয়, দুরভিসন্ধিমূলক। কোনো না কোনোভাবে হিন্দুত্বের বয়ানে আসামের বিহুকে ঠেসে দেওয়ার প্রচেষ্টা। রঙালি বিহুর প্রথমদিন গরুবিহুতে সমস্ত গবাদিপশুকে নিকটবর্তী নদী বা কোনো জলাশয়ে স্নান করানো হয়। নানা ধরনের সবজি ও পিঠা খাওয়ানো হয়। পুরোনো দড়ি পাল্টে নতুন দড়ি পরানো হয়। এর মধ্য দিয়ে পরবর্তী কৃষির মরশুমের প্রস্তুতিপর্ব শুরু হয়। দ্বিতীয় দিনের নাম মানুহ বিহু অর্থাৎ মানুষ বিহু, সেদিন মানুষের উদযাপন করা হয়। নতুন পোশাক পরে একে অপরের বাড়ি যায়, ভোজপর্ব চলে। আসামের বিভিন্ন অঞ্চলে বিহু উদযাপনের ধরন ভিন্ন ভিন্ন। বিহু নাচের আসর একটি অভিন্ন বিষয় সর্বত্র। অঞ্চল বিশেষে কোথাও পশুবলি হয়, কোথাও নানা ধরনের খেলাধূলার আসর বসে। সব মিলিয়ে বিহু কৃষিকেন্দ্রিক উৎসব যেখানে সমাজের নানা অংশের মানুষ যোগ দেয়। একে হিন্দুত্বের কাঠামোয় ঠেসে দেওয়াটা শুধু ভুল নয়, একটি অপরাধ। হিন্দুধর্মেরও ভারতের নানা অঞ্চলে নানা রূপ। সঙ্ঘ পরিবার হিন্দু ধর্মেরও বৈচিত্রের দিকগুলিকে আর্যাবর্তের হিন্দু ধর্মের কাঠামোয় জোর করে ঠেসে দিতে চায়। এরই সাম্প্রতিকতম দৃষ্টান্ত হিমন্ত বিশ্বশর্মার গরুবিহুতে গোমাতা পূজন উদ্ভাবন। প্রকাশের তারিখ: ০২-মে-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |