|
অযোধ্যায় হিন্দুত্ববাদীদের লুট লজ্জা দেবে গজনিকেওবাদল সরোজ |
এই ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করে যে, যারা ধর্মের পতাকা তুলে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করে এবং ঘৃণা ছড়ায়, তাদের ধর্মের প্রতি প্রকৃত কোনও নিষ্ঠা নেই। যে ধর্মীয় বিশ্বাসের নামে তারা মানুষকে সংগঠিত করে, বিশ্বাস জাগায় ও আবেগকে উসকে দেয়, সেই বিশ্বাসের সঙ্গেই তারাই সবার আগে বিশ্বাসঘাতকতা করে। |
অযোধ্যার রামমন্দিরে ভক্তদের দানের অর্থ লুট হওয়ার খবর সরল ভক্তদের কাছে নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর মনে হতেই পারে। কিন্তু যা ঘটেছে, তা আসলে রামমন্দিরের নামে শুরু থেকেই যা চলছিল তারই ধারাবাহিকতা। ধর্মীয় উন্মাদনা ও ব্যাপক জনসমাবেশের কোলাহলের আড়ালে এই সমস্ত ঘটনাই দীর্ঘদিন জনসমক্ষে আসতে দেওয়া হয়নি। আব্রাহাম লিংকনের বহুল উদ্ধৃত কথাকে ধার করে বলা যায়, এটি এমন এক ডাকাতির কাহিনি, যা সংঘটিত করেছে সেই দুষ্কৃতীরাই, যাদের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মন্দির ট্রাস্টে তাঁর ‘নিজের লোক’ হিসেবে নিয়োগ করেছিলেন। মন্দির নির্মাণ কমিটির চেয়ারম্যান নৃপেন্দ্র মিশ্র এই ঘটনাকে ‘প্রকাশ্য ডাকাতি’ বলে অভিহিত করেছেন। যে সময় মন্দিরে এই অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটে, সেই সময় চার বছর ধরে মন্দির কমিটির সদস্য ছিলেন জ্ঞানেশ কুমার গুপ্ত— যিনি ভোট চুরিতে তাঁর ভূমিকার জন্য কুখ্যাত। পরবর্তীকালে মোদি তাঁকেই নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ করেন। এই ঘটনাপ্রবাহ থেকে স্পষ্ট হয়, এ ধরনের নিয়োগের ক্ষেত্রে কী ধরনের ‘যোগ্যতা’কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। মূলধারার সংবাদমাধ্যমের বড় একটি অংশ বিষয়টি নিয়ে নীরব থাকার বা গুরুত্ব কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করলেও, শেষ পর্যন্ত দেশ তো বটেই, গোটা বিশ্বই জানতে পারে যে, এমনকী রামও লুটেরাদের হাত থেকে রক্ষা পাননি। এই লুটের পরিধি ও ব্যাপ্তি— উভয়ই প্রকাণ্ড এবং সাঙ্ঘাতিক। প্রথমদিকে জানানো হয়েছিল, আত্মসাৎ হওয়া অর্থের পরিমাণ ২০০ কোটিরও বেশি। কিন্তু এখন ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে যে, প্রকৃত অঙ্কটি এর চেয়ে অনেক বেশি। কারণ, এই চুরি কেবল দানবাক্স থেকে প্রতিদিন উধাও হয়ে যাওয়া নগদ অর্থের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এর সঙ্গে জড়িত ছিল রামমন্দির নির্মাণের জন্য দেশব্যাপী প্রচারাভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে ভক্তদের দান করা বিপুল পরিমাণ সোনা, রূপা, হীরা এবং অষ্টধাতুর ফলক ও স্মারকফলক। এগুলির প্রকৃত মূল্য স্বাভাবিকভাবেই কয়েকশো কোটি টাকা ছুঁয়ে যাবে। এত বিপুল পরিমাণ সম্পদ আত্মসাতের ঘটনায় বর্তমানে যারা গ্রেপ্তার হয়েছেন, তাঁরা যে একমাত্র অপরাধী নন কিংবা এই লুটের প্রধান সুবিধাভোগীও নন, তা বলাই বাহুল্য। ১৯৮৯ সালে এই ফলকগুলির নথি সংরক্ষণের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সে সময় ভক্তদের দান করা মাটির ফলকগুলি এখনও করসেবক পুরমে সংরক্ষিত রয়েছে। কিন্তু সোনা ও রূপার ফলকগুলির নিরাপত্তার দায়িত্ব ছিল ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাইয়ের ওপর। ফলে এই মূল্যবান দানসামগ্রী নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় তাঁর দায়িত্ব ও ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। এমনও মনে হয় যে, এই লুটপাট যাতে নির্বিঘ্নে চলতে পারে, তার জন্য পরিকল্পিত ও সুসংগঠিত ব্যবস্থা করা হয়েছিল। নৃপেন্দ্র মিশ্রের বক্তব্য অনুযায়ী, নির্ধারিত নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রায় ৯০ শতাংশই কার্যত উপেক্ষা করা হয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রায় দেড় বছর আগে যখন দানের অর্থ গণনার জন্য ব্যবহৃত অত্যন্ত স্পর্শকাতর কক্ষে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হচ্ছিল, তখন ট্রাস্টের এক অত্যন্ত প্রভাবশালী কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে সেই কাজ বন্ধ করে দেন। তাঁর যুক্তি ছিল, সেখানে যাঁরা কাজ করেন তাঁরা ‘আমাদের নিজেদের লোক’, তাই তাঁদের ওপর নজরদারির কোনও প্রয়োজন নেই। তা সত্ত্বেও, নিরাপত্তা সংস্থাগুলি গোপনে সেখানে লুকানো ক্যামেরা বসিয়েছিল, যাতে তাঁদের কর্মকাণ্ড রেকর্ড করা যায়। তদন্ত চলাকালে এই পাঁচ কর্মচারীর একজনের বাড়িতে গোবরের স্তূপের নিচ থেকে ১০ লক্ষ টাকা উদ্ধার করা হয়। এই ব্যক্তিদের প্রতি যে সুরক্ষা ও প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছিল, তা শুধু মন্দির চত্বরের ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল না; মন্দিরের বাইরেও তা অব্যাহত ছিল। সাধারণত নগদ অর্থের দায়িত্বে থাকা কর্মীদের প্রতিষ্ঠান থেকে বের হওয়ার আগে ছোটখাটো প্রতিষ্ঠানেও তল্লাশি করা হয়। কিন্তু এই কর্মচারীরা শুধু কড়া তল্লাশি থেকেই নয়, এমনকী নিয়মিত ও সাধারণ তল্লাশি থেকেও সম্পূর্ণ অব্যাহতি পেয়েছিলেন। এমনকী কোনও আকস্মিক নজরদারি বা তল্লাশি যাতে না হয়, তা নিশ্চিত করতে দানের অর্থ গণনার কক্ষের আশপাশে উত্তর প্রদেশ পুলিশ বা অন্য কোনও নিরাপত্তা সংস্থার কর্মীদেরও ইচ্ছাকৃতভাবে মোতায়েন করা হতো না। এসবের কোনওটিই আকস্মিকভাবে ঘটেনি। সবই করা হয়েছিল ট্রাস্টের এক ‘প্রভাবশালী কর্মকর্তার’ নির্দেশে। মোদির গঠিত এই ট্রাস্ট কার্যত আরএসএস-এর রামমন্দির-সংক্রান্ত শাখা হিসেবেই কাজ করে। এর সদস্যদের বেছে নেওয়া হয়েছে এমন ব্যক্তিদের মধ্য থেকে, যাঁরা মোদির প্রতি গভীরভাবে অনুগত, সংঘ ও তার আদর্শের প্রতি সম্পূর্ণভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং রামমন্দির আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। আইনগত বাধ্যবাধকতার কারণে ট্রাস্টে একজন দলিত সদস্যকেও রাখা হয়েছে; তিনিও সংঘ-পরিবারেরই একজন ব্যক্তি। ১৯৮৯ সালে, মোদি তখনও জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভূত হননি। তাই সেই দলিত সদস্যকেই মূল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, যাতে মূলত রাজনৈতিক এই প্রকল্পে ‘সামাজিক সমন্বয়’-এর একটি প্রতীকী আবরণ দেওয়া যায়। চম্পত রাই আজীবন সংঘের একজন কর্মী। এর আগেও রামমন্দিরের জন্য জমি কেনাকাটা নিয়ে তিনি বিতর্কের মুখে পড়েছিলেন। অভিযোগ ছিল, তিন কোটিরও কম টাকায় কেনা একটি জমি মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই প্রায় ২৪ কোটি টাকায় মন্দির ট্রাস্টের কাছে বিক্রি করা হয়। সেই জমি বিতর্ক ব্যাপকভাবে প্রকাশ্যে আসে এবং আরও বেশ কয়েকটি জমি কেনাকাটা নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। মন্দির নির্মাণের সমগ্র প্রক্রিয়াই চম্পত রাইয়ের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়েছে। রামের উদ্দেশে নিবেদিত ভোগ থেকে শুরু করে মন্দিরের দৈনন্দিন সমস্ত কর্মকাণ্ড— কোনও কিছুই তাঁর অনুমোদন ছাড়া সম্পন্ন হয় না। তাই তাঁর অজ্ঞাতে, সম্মতি ছাড়া কিংবা অংশগ্রহণ ব্যতিরেকে এত বিপুল পরিমাণ দানসামগ্রী ও অর্থ উধাও হয়ে যেতে পারে— এমনটি বিশ্বাস করা অত্যন্ত কঠিন। এখন আর বিষয়টি শুধু সন্দেহের পর্যায়ে নেই। ‘আমাদের নিজেদের লোক’ হিসেবে পরিচিত ওই কর্মচারীদের পাশাপাশি, এই ঘটনায় জড়িত আরেকজন ব্যক্তি হিসেবে চম্পত রাইয়ের চালক টুন্নু যাদবের নামও সামনে এসেছে। এই নির্লজ্জ চুরির ঘটনা প্রকাশ্যে আসামাত্র বিজেপি’র আইটি সেল বিষয়টিকে রাজনৈতিক রং দেওয়ার চেষ্টা করে এবং এর জন্য বিরোধী দলগুলিকে দায়ী করতে শুরু করে। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ এই ডাকাতির অভিযোগ নিয়ে আলোচনা সীমিত রাখার নির্দেশ দেন। তাঁর দাবি ছিল— এ নিয়ে সমালোচনা করা মানে অযোধ্যার বদনাম করা এবং ভগবান রামের অবমাননা করা। সংঘের অনলাইন ট্রোল বাহিনী এতটাই নিচে নেমে যায় যে, তারা উত্তর প্রদেশের বৃহত্তম বিরোধী দল সমাজবাদী পার্টি (এসপি)-র সভাপতির অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যাকে লক্ষ্য করে ঘৃণ্য অপপ্রচার শুরু করে। কিন্তু বিষয়টিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার এই চেষ্টা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। রামমন্দির আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বহু ব্যক্তি, এমনকী কয়েকজন শঙ্করাচার্যও, এই কেলেঙ্কারি সম্পর্কে প্রকাশ্যে কঠোর মন্তব্য করতে শুরু করেন। ট্রাস্টের সভাপতি মহন্ত নৃত্য গোপাল দাসের মনোনীত উত্তরসূরি মহন্ত কমলনয়ন দাস বলেন, ‘যদি কোনও অনিয়ম হয়ে থাকে, তবে অবশ্যই তার তদন্ত হওয়া উচিত।’ তবে তদন্ত প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা প্রকাশ না করে তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু তদন্ত করবে কে? যারা তদন্ত করবে, তারাই তো অসৎ। যারা আজ এত হইচই করছে, তারাও সাধু নয়। যারা একসময় সাইকেলে চলাফেরা করত, তারা এখন বিলাসবহুল গাড়িতে ঘোরে এবং প্রাসাদোপম বাড়িতে বাস করে। এসব কীভাবে ঘটল, তা জানার অধিকার সমাজের আছে।’ শেষ পর্যন্ত গভীর হতাশা প্রকাশ করে তিনি বিষয়টির বিচার ঈশ্বরের ওপর ছেড়ে দিয়ে বলেন, ‘ঈশ্বর প্রত্যেক মানুষকে তার কর্ম অনুযায়ী বিচার করেন।’ অভিমুক্তেশ্বরানন্দ সরস্বতীর অভিযোগ, শুরু থেকেই মোদির উদ্দেশ্য ছিল রামমন্দির ট্রাস্টকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের একটি সম্প্রসারিত শাখায় পরিণত করা, যাতে তাঁর পছন্দের কয়েকজন ব্যক্তি সেটির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে পারেন এবং প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকার দানসামগ্রী আত্মসাৎ করতে পারেন। এমনকী বিনয় কাটিয়ারও বলেছেন, এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া উচিত, কারণ এটি কোটি কোটি ভক্তের ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িত। প্রসঙ্গত, মনে রাখা দরকার যে রামমন্দিরের নামে আর্থিক দুর্নীতির এই বিশেষ পদ্ধতিটি নতুন হলেও, এ ধরনের ঘটনা এই প্রথম নয়। শুরু থেকেই রামমন্দির আন্দোলনের সঙ্গে নানা বিতর্ক এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ জড়িয়ে রয়েছে। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে দানের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ সামনে এসেছে। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর, যখন ৫,০০০ কোটিরও বেশি টাকার অনুদান সংগ্রহ করা হয়, তখনও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। কিন্তু যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁরা যখন ক্ষমতার সর্বোচ্চ স্তরে অবস্থান করেন, তখন এ ধরনের বিষয় চাপা দেওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ হয়ে যায়। আর যখন গণমাধ্যম প্রহরীর ভূমিকা ছেড়ে ক্ষমতাসীনদের অনুগত ভৃত্যে পরিণত হয়, তখন শুধু জনগণের চোখে ধুলো দেওয়াই নয়, রূপক অর্থে তাদের চোখ উপড়ে নেওয়াও সম্ভব হয়ে ওঠে। অতীতেও এমনটাই ঘটেছে। বাবা লাল দাসের পরিণতি সেই বাস্তবতার এক ভয়াবহ স্মৃতি হয়ে রয়েছে। ১৯৮০-এর দশকের গোড়ার দিকে এলাহাবাদ হাইকোর্ট তাঁকে বাবরি মসজিদ চত্বরে স্থাপিত রামলালার বিগ্রহগুলির প্রধান মহন্ত হিসেবে নিয়োগ করেছিল। লাল দাস প্রকাশ্যে বলতেন যে, অযোধ্যা-বিবাদ মূলত একটি স্থানীয় জমি-সংক্রান্ত বিরোধ, একে রাজনৈতিক রং দেওয়া উচিত নয়। তিনি আরও অভিযোগ করেছিলেন যে, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ রাজনৈতিক স্বার্থে এই বিষয়টিকে ব্যবহার করছে। তাঁর কথায়, ‘যারা এটি করতে চায়, তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য সারা দেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করা, যাতে তারা হিন্দু ভোটকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগাতে পারে।’ ভগবান রামের নামে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানোর তিনি তীব্র নিন্দা করেছিলেন এবং উল্লেখ করেছিলেন যে, অযোধ্যায় হিন্দু ও মুসলমানরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শান্তিপূর্ণভাবে একসঙ্গে বসবাস করে এসেছে। তিনি লালকৃষ্ণ আদবানির রথযাত্রারও বিরোধিতা করেছিলেন। এর পরেই কল্যাণ সিংয়ের সরকার তাঁকে প্রধান পুরোহিতের পদ থেকে অপসারণ করে। এই স্পষ্ট ও নির্ভীক অবস্থানের কারণে তিনি সংঘ পরিবার ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নিশানায় পরিণত হন। শেষ পর্যন্ত ১৯৯৩ সালের ১৬ নভেম্বর রানিপুর ছাত্তার গ্রামে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এত বড় অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পরও, মন্দির ইস্যুকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে এবং সাম্প্রদায়িক আবেগকে উসকে দিয়ে যাঁদের রাজনৈতিক উত্থান ঘটেছে, সেই সংঘ পরিবারের কোনও শীর্ষ নেতা কেন মুখ খুলছেন না? প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, যিনি দাবি করেছিলেন যে, বহু শতাব্দীর পর তিনিই ভগবান রামকে একটি মন্দির উপহার দিয়েছেন— তিনি নীরব রয়েছেন। একইভাবে নীরব রয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। এমনকী আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতও এ বিষয়ে একটি কথাও বলেননি। চুরির ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় কেটে গেলেও অযোধ্যা বা উত্তর প্রদেশের অন্য কোথাও কোনও থানায় এফআইআর দায়ের করা হয়নি। পরিবর্তে, কোনও আনুষ্ঠানিক পুলিশ অভিযোগ ছাড়াই একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (এসআইটি) গঠন করা হয়। চম্পত রাই বা অনিল মিশ্র— কারও নামই তাতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। কোনও আদালতগ্রাহ্য অপরাধে মামলা নথিভুক্ত না করেই একটি এসআইটি কীভাবে অর্থবহ তদন্ত চালাতে পারে? এই আশঙ্কাগুলি যে অমূলক ছিল না, পরবর্তী ঘটনাবলি তা-ই প্রমাণ করেছে। প্রত্যাশিত পথেই পরিস্থিতির অগ্রগতি হয়েছে। আপাতত বোড়েদের ঘিরে ফেলা হয়েছে, কিন্তু যাঁরা প্রকৃত চালচিত্রের নেপথ্য-নির্মাতা, তাঁরা সুরক্ষিতই থেকে গেছেন। শেষ পর্যন্ত গোটা কেলেঙ্কারিকেই দেশ এবং হিন্দুধর্মকে কলঙ্কিত করার একটি ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দেওয়া হতে পারে। মোদির হাতে যখন সরকার এবং গণমাধ্যমের বড় অংশ যখন অনুগত— তখন প্রায় সবকিছুই সম্ভব। এই ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করে যে, যারা ধর্মের পতাকা তুলে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করে এবং ঘৃণা ছড়ায়, তাদের ধর্মের প্রতি প্রকৃত কোনও নিষ্ঠা নেই। যে ধর্মীয় বিশ্বাসের নামে তারা মানুষকে সংগঠিত করে, বিশ্বাস জাগায় ও আবেগকে উসকে দেয়, সেই বিশ্বাসের সঙ্গেই তারাই সবার আগে বিশ্বাসঘাতকতা করে। এই প্রসঙ্গে তুলসীদাসের একটি উক্তি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক— যার বাংলা ভাবার্থ— ‘যারা নিজেদের রামের ভক্ত বলে পরিচয় দিয়ে মানুষকে প্রতারণা করে, যারা ধন-সম্পদ, লোভ, ক্রোধ ও কামনার দাস, যারা ধর্মের পতাকা তুলে প্রতারণাকেই পেশা বানিয়েছে— এই পৃথিবীতে সেই প্রতারিতদের মধ্যে আমিই প্রথম সারিতে আছি।’ ঋণ: পিপলস ডেমোক্রেসি প্রকাশের তারিখ: ১৬-জুলাই-২০২৬ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |