কীভাবে আমি কমিউনিস্ট হলাম

ফিদেল কাস্ত্রো
লেনিনের বইয়ের চেয়ে আরও সুনির্দিষ্ট আকারে সাম্রাজ্যবাদকে জানার সুযোগ ছিল আমার। আমি দেখলাম, জানলাম সাম্রাজ্যবাদকে— সবচেয়ে জঘন্য, সবচেয়ে আগ্রাসী— এবং, আমি বিশ্বাস করি জীবন আমাকে দিয়েছে বাস্তবকে উপলব্ধি করার একটি উন্নততর বোঝাপড়া। জীবনই আমাকে তৈরি করেছে আরও বিপ্লবী, আরও সোস্যালিস্ট, আরও কমিউনিস্ট।

একজন জোতদারের সন্তান ছিলাম আমি— যে একটি কারণের জন্য আমি সহজেই হতে পারতাম একজন প্রতিক্রিয়াশীল। 

আমি পড়েছি ধর্মীয় স্কুলে, যেখানে আমার সহপাঠীরা ছিল বিত্তশালী পরিবারের সন্তান— আরেকটি যে কারণের জন্য আমি অনায়াসে হতে পারতাম একজন প্রতিক্রিয়াশীল। 

আমি থাকতাম কিউবায়, যেখানে সমস্ত সংস্থা, চলচ্চিত্র, প্রকাশনা এবং গণমাধ্যম ছিল ‘মেড ইন ইউএসএ’— তৃতীয় যে কারণের জন্য আমি স্বাভাবিকভাবেই হতে পারতাম একজন প্রতিক্রিয়াশীল। 

যে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি পড়তাম, সেখানে ২০,০০০ ছাত্রছাত্রীর মধ্যে মাত্র ৩০ জন ছিল সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী— এবং আমি ছিলাম ওই তিরিশ জনের একেবারে শেষে। যখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকলাম, একজন জোতদারের সন্তান হয়েই আমি ছিলাম— এবং ছিলাম রাজনৈতিকভাবে নিরক্ষর।

বিশ্বাস করুন, কোনও পার্টি সদস্য, কোনও কমিউনিস্ট, কিংবা কোনও সোস্যালিস্ট, অথবা কোনও অতিবিপ্লবী এসে আমার হাত ধরেননি, আমায় প্রভাবিত করার কোনও চেষ্টা করেননি। 

বরং, আমায় দেওয়া হয়েছিল একটি মোটাসোটা, ভারি, অসহ্য, অপাঠ্য টেকসট বই— যাতে ছিল একজন বুর্জোয়ার দৃষ্টিভঙ্গীতে রাজনৈতিক অর্থনীতির ব্যাখ্যার চেষ্টা— ওরা তাকেই বলত রাজনৈতিক অর্থনীতি!

এবং, সেই অসহ্য বইয়ে ছিল অতি উৎপাদনের সংকট-সহ অন্যান্য সমস্যার কথা, যা বিশ্বের সবচেয়ে স্বাভাবিক বিষয়। যেমন এতে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল, ব্রিটেনে যখন কয়লার প্রাচুর্য, তখন কীভাবে ইতিহাসের অমোঘ অপরিবর্তনীয় নির্মম আইন বয়ে আনে বেকারী, অনাহার। যখন প্রচুর কয়লা, শ্রমিকদের বেতন তখন একই জায়গায়, অনাহার, অনাহারে মৃত্যু। 

ফলে জোতদারের ছেলে, যে পড়েছে বুর্জোয়াদের স্কুলে, বেড়ে উঠেছে ইয়াঙ্কি প্রচারে, সে ভাবতে শুরু করে কিছু একটা ভুল আছে এই ব্যবস্থার মধ্য। 

আমার বাবা, একজন গরিব থেকে যিনি পরে জোতদার হয়েছিলেন, তাঁর সন্তান হিসেবে আমার অন্তত গ্রামে কৃষকদের সঙ্গে থাকার সুযোগ হয়েছিল, যারা সবাই ছিল আমার বন্ধু। যদি আমার দাদু জোতদার হতেন, তবে নিশ্চিত আমার বাবা আমায় নিয়ে যেতেন রাজধানীতে। তাহলে অবশ্য এই ইতিবাচক প্রভাবগুলি আমায় প্রভাব ফেলত না। শহুরে আত্মকেন্দ্রিকতা, অহংবোধ এবং অন্যান্য নেতিবাচক দিকগুলি গোড়া থেকেই আমায় চেপে বসত। 

যেসব স্কুলে আমি পড়েছি, সেখান কিছু ইতিবাচক উপাদান আমার মধ্যে গড়ে উঠেছিল। একটি বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন আদর্শবোধ, কোনটা ভালো কোনটা মন্দ— তা বিচার করার ক্ষমতা, ন্যায্য ও অন্যায্যর মধ্যে ফারাক এবং শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মানসিকতা আমাকে মানব সমাজের ব্যাখ্যা করার দিকে প্রভাবিত করেছিল। এমন এক জায়গায় পৌছে দিয়েছিল, পরে আমি বুঝেছি তা ছিল এক কাল্পনিক কমিউনিস্ট। সেসময় একজন কমিউনিস্ট, কিংবা কোনও কমিউনিস্ট নথিপত্র পড়ার সুযোগ আমার হয়নি।

পরে একদিন হাতে এল কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’র একটা কপি— বিখ্যাত কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো— গোগ্রাসে পড়ে ফেললাম, যা আমি কখনও ভুলব না। কী অসাধারণ শব্দবন্ধ! কী অকাট্য সত্য এবং আমরা সেইসব সত্য দেখেছিলাম প্রতিটি দিন। 

আমার মনে হলো আমি যেন অরন্যের সেই ছোট্ট পশুর মতো, যার কিছুই সে জানে না। তারপর, একদিন হটাৎই সে খুঁজে পায় সেই জঙ্গলের মানচিত্র— তার বিবরণ, তার ভুগোল, সবকিছু। 

একবার তাকিয়ে দেখুন, যদি মার্কসের মতাদর্শ ন্যায্য, যথার্থ এবং প্রেরণাদায়ক না হতো, যদি আমাদের সংগ্রামের বুনিয়াদ মার্কসবাদ না হতো, তবে আমরা এখানে আসতে পারতাম না। আমরা পারতাম না এখানে আসতে। 

তারপর কি আমি কমিউনিস্ট হলাম? 

না, আমি সেই সৌভাগ্যবানদের মধ্যে একজন, যে আবিষ্কার করতে পেরেছিল একটি রাজনৈতিক তত্ত্ব, পুরোদমে একজন কমিউনিস্ট হওয়ার আগে যে ঘুরপাক খাচ্ছিল কিউবার রাজনৈতিক সংকটের প্রবল ঘূর্ণিস্রোতে। 

তারপর আমি নিজেকে উন্নত করতে থাকলাম। 

লেনিনের বইয়ের চেয়ে আরও সুনির্দিষ্ট আকারে সাম্রাজ্যবাদকে জানার সুযোগ ছিল আমার। আমি দেখলাম, জানলাম সাম্রাজ্যবাদকে— সবচেয়ে জঘন্য, সবচেয়ে আগ্রাসী— এবং, আমি বিশ্বাস করি জীবন আমাকে দিয়েছে বাস্তবকে উপলব্ধি করার একটি উন্নততর বোঝাপড়া। 

জীবনই আমাকে তৈরি করেছে আরও বিপ্লবী, আরও সোস্যালিস্ট, আরও কমিউনিস্ট। 



কীভাবে
আমি কমিউনিস্ট হলাম: ফিদেল কাস্ত্রো। চিলির কনসেপশন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের প্রশ্নের জবাবে। ১৯৭১’র ১৮নভেম্বর।

[জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ফিদেল ছিলেন একজন আদর্শ মার্কসবাদী-লেনিনবাদী। 

যে ঘোষণা তিনি প্রথম করেছিলেন ১৯৬১-র ২ ডিসেম্বরে। গ্রানমা অবতরণের পঞ্চম বার্ষিকীতে, কিউবার টেলিভিশন ও রেডিওতে এক দীর্ঘ ভাষণে। সেখানেই তিনি সবিস্তারে ব্যাখ্যা করেন কিউবা বিপ্লবের উন্নয়নের অভিমুখ। ‘কোন ধরনের সমাজতন্ত্র এখানে আমাদের প্রয়োগ করতে হবে? কোনও কাল্পনিক সমাজতন্ত্র?’ না! তিনি বলেছিলেন: ‘আমাদের প্রয়োগ করতে হবে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র। যে কারণে আমি অকপটে বলতে চাই, আমরা বিশ্বাস করি মার্কসবাদে। আমরা মনে করি এটি অভ্রান্ত, সবচেয়ে যথার্থ, সর্বাধুনিক বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব। একমাত্র প্রকৃত বিপ্লবী তত্ত্ব। সম্পূর্ণ আত্মতুষ্টি এবং পূর্ণ প্রত্যয়ের সঙ্গে আমি এখানে বলতে চাই: আমি একজন মার্কসবাদী-লেনিনবাদী, এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমি থাকব একজন মার্কসবাদী-লেনিনবাদী।’

১৯৬১-র ১৬ এপ্রিল, বে অব পিগসে আক্রমণের আগেই শ্রমিকশ্রেণি ও জনগণের উদ্দেশে ফিদেল ঘোষণা করেছিলেন কিউবার বিপ্লব সমাজতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক। ‘এ হলো নিপীড়িত মানুষের জন্য, নিপীড়িত মানুষের দ্বারা, নিপীড়িত মানুষেরই সমাজতান্ত্রিক ‍ও গণতান্ত্রিক বিপ্লব।’ 

তারও আগে, প্রতিস্পর্ধী ফিদেল ১৯৬০ সালে মার্কিনী মালিকানার তেল, চিনি, টেলিযোগাযোগ-সহ বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলিকে রাষ্ট্রায়ত্ত করে নেন। পরে কিউবার ধনীদের বড় সম্পত্তিও বাজেয়াপ্ত করা হয়। চালু হয় জমি বণ্টনের আইন। শুরু হয় সাক্ষরতার অভিযান— যে অভিযানে এক সময় কিউবা ছাড়িয়ে যায় উন্নত ধনতান্ত্রিক দেশগুলিকেও।

তবে, ২ ডিসেম্বর ছিল তাঁর প্রথম প্রকাশ্যে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের পক্ষে ব্যক্তিগত ঘোষণা।

অতীতের কিউবান কমিউনিস্ট পার্টি, পার্তিদো সোসালিস্তা পপুলার (পিএসপি) এবং ১৯৫৩-তে ফিদেলের তৈরি ২৬ জুলাই আন্দোলন মিলে তখনও তৈরি হয়নি বর্তমানের কিউবার কমিউনিস্ট পার্টি, পার্তিদো কমিউনিস্তা দে কিউবা (পিসিসি), যার প্রতিষ্ঠা ১৯৬৫-তে, ফার্স্ট সেক্রেটারি হন ফিদেল কাস্ত্রো।

সেদিন ভাষণে ফিদেল বিশদে ব্যাখ্যা করেন শ্রেণিসংগ্রাম ও বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাস। বলেন কার্ল মার্কস, ফ্রেডরিখ এঙ্গেলসের কথা। ভ্লাদিমির লেনিন হলেন সেই তাত্ত্বিক নেতা, যিনি মার্কসবাদকে প্রয়োগ করেছিলেন বিশ শতকে। সবিস্তারে ব্যাখ্যা করেন আদিম সাম্যবাদী সমাজ, দাস ব্যবস্থা, বুর্জোয়াদের সঙ্গে সর্বহারাদের উত্থান, ফরাসী বিপ্লব থেকে রুশ বিপ্লব। 

ফিদেলের প্রত্যয়ী ভাষণ, ‘যে জনগণ অধিকারের জন্য লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত নেয়, তাকে মোকাবিলা করার সাধ্য কোনও সমরাস্ত্র, কোনও শক্তির নেই।’ 

যেমন বলেছিলেন ভিক্টর হুগো: যে ধারণা এখন প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে তাকে কেউ থামাতে পারবে না। 

যেমন বলেছিলেন মার্কস: যখন জনগণ কোনও ধারণার দ্বারা অনুপ্রাণিত হন হন তখন তা পরিণত হয় বাস্তব শক্তিতে।

মার্কসীয় তত্ত্ব এবং চর্চার সৃষ্টিশীল রূপকার হিসাবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন কমরেড কাস্ত্রো। বিশ শতকের দ্বিতীয় অর্ধে সমাজতন্ত্রের একজন প্রথম সারির নেতা হিসাবে নিজেকে তুলে ধরেছেন তিনি। ইতিহাসে ফিদেল কাস্ত্রো অনন্য হয়ে থাকবেন তত্ত্ব এবং প্রয়োগে একজন সৃজনশীল মার্কসবাদী হিসেবে। মাও জে দঙ এবং হো চি মিনের সঙ্গে তিনিও অনুন্নত দেশের বাস্তব পরিস্থিতির নিরিখে মার্কসবাদ প্রয়োগ করেছেন। সমাজতান্ত্রিক অগ্রগতির যে পথ দেখিয়েছেন তার বিপুল প্রভাব পড়েছে গোটা তৃতীয় বিশ্বে।

কোনও একক শব্দে, কোনও একটা ক্যানভাসে ফিদেলকে ধরা অসম্ভব। আজীবন তিনি ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন সমাজতন্ত্র, ন্যায়বিচার, শান্তি, সর্বহারার আন্তর্জাতিকতাবাদ, বিশ্ব মানবতা, কিউবা বিপ্লবের নিশান। 

একটি জীবন। বহু প্রজন্মের প্রেরণা।

যেমন বলেছেন ব্রেখট: ‘কিছু মানুষ আছেন যারা একদিনের জন্য সংগ্রাম করেন, তারা ভালো। কিছু আছেন যারা একবছরের জন্য, তারা আরও ভালো। আবার কিছু আছেন যারা বেশ কয়েকবছরের জন্য, তারা খুবই ভালো। কিন্তু, যারা জীবনভর সংগ্রাম করে যান: তারা অপরিহার্য।’ 

শতবর্ষে ফিদেল: ফিদেল গতকালের। ফিদেল আজকের। ফিদেল চিরদিনের। ফিদেল অপরিহার্য।— টিম মার্কসবাদী পথ]  

 

 

 

 

 

 


প্রকাশের তারিখ: ১৩-আগস্ট-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org