লেনিন কীভাবে মার্কস পড়েছিলেন (১)

নাদেঝদা ক্রুপস্কায়া
মার্কসবাদের এই অপবক্তারা কখনও ভেবে দেখেনি সমালোচনার অস্ত্রের বদলে অস্ত্রের সমালোচনা প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে মার্কস কী বলেছেন। মিথ্যেই তারা মার্কসের নাম করে, আদতে রণকৌশলের যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তা সম্পূর্ণ ফ্র্যাঙ্কফুর্টের বাচাল বুর্জোয়াদের মতো, যারা স্বৈরতন্ত্রের অবাধ সমালোচনা করে গণতান্ত্রিক চৈতন্যকে গভীর করে তুললেও একথা বুঝতে অক্ষম, যে বিপ্লবের কাল হল ওপর-নীচ দুদিক থেকেই সংগ্রামের কাল।
রাশিয়া ছিল শিল্পের দিক থেকে অনুন্নত দেশ। সেই কারণে এ দেশে শ্রমিক আন্দোলনের সূচনা হয় কেবলমাত্র উনিশ শতাব্দীর শেষ দশকের মধ্যে, যখন অন্যান্য বেশ কয়েকটি দেশের শ্রমিক শ্রেণি ব্যাপকভাবে বিপ্লবী সংগ্রাম শুরু করে দিয়েছে—  ১৮৭১ সালের প্যারি কমিউন ও ১৮৪৮ সালের বিপ্লবের অভিজ্ঞতা তাদের পিছনে। আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের মহান বিপ্লবী নেতা মার্কস এবং এঙ্গেলস বিপ্লবী সংগ্রামের মধ্যে থেকে পোক্ত হয়ে উঠেছিলেন। সামাজিক বিকাশের পথ মার্কসবাদ উজ্জল করে তুলেছে, পুঁজিবাদের বিনাশ এবং সে জায়গায় কমিউনিজমের প্রতিষ্ঠা যে অনিবার্য তা প্রকাশ করে দিয়েছে। দেখিয়েছে সমাজের নতুন রূপ বিকাশের পথ। শ্রেণি সংগ্রামের পথ, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পথ। এই সংগ্রামে প্রলেতারিয়েতের ভূমিকা কী তা ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছে, জয় তার অনিবার্য।

আমাদের শ্রমিক আন্দোলন মার্কসবাদের পতাকার নীচে বিকশিত হয়ে উঠেছে, পথের সন্ধানে তা হাতড়ে বেড়ায়নি, অন্ধের মত এগিয়ে যায়নি। ছিল সুস্পষ্ট, পথও তাই।

এই সংগ্রামে রুশ প্রলেতারিয়েত কোন্‌ পথ অবলম্বন করবে মার্কসবাদের সাহায্যে তা আলোকিত করে তোলার দিক থেকে লেনিন অনেক কিছু করেন। আজ পঞ্চাশ বছর হল মার্কস মারা গিয়েছেন, কিন্তু আজও আমাদের পার্টির সমস্ত কাজে মার্কসবাদই পথপ্রদর্শক। লেনিনবাদ হল মার্কসবাদেরই অধিকতর বিকাশ, এর সম্প্রসারণ। কাজেই লেনিন কীভাবে মার্কস পড়েছিলেন, সে বিষয়ে একান্ত আগ্রহ খুবই স্বাভাবিক।
লেনিন নিখুঁতভাবে মার্কসকে জানতেন। ১৮৯৩ সালে তিনি যখন পিটার্সবুর্গে আসেন, তখন মার্কস এবং এঙ্গেলসের রচনা সম্বন্ধে তাঁর জ্ঞান আমাদের মার্কসবাদীদের বিস্মিত করে।

১৮৯০-এর দশকে যখন প্রথম মার্কসবাদী চক্র সংগঠিত হয়, সভ্যরা তখন প্রধানত ‘পুঁজি’ বইখানির প্রথম খণ্ডটি পড়ত, ঐ খণ্ডটিই তবু বহু কষ্টে পাওয়া সম্ভব ছিল। মার্ক্সের অন্যান্য রচনার কথা না বলাই ভালো। আমাদের চক্রের অধিকাংশ সভ্যই এমনকি ‘কমিউনিস্ট ইশতেহার’ও পড়েনি। আমি নিজেই তা পড়ি মাত্র (জার্মান ভাষায়) ১৮৯৮ সালে, নির্বাসনকালে।

মার্কস এবং এঙ্গেলস একেবারে নিষিদ্ধ ছিল। ১৮৯৭ সালে ‘নভয়ে স্লভো’র [Novoye Slovo, নব বাণী পত্রিকা, ১৮৯৭ সালের এপ্রিল মাস থেকে ‘আইনি মার্কসবাদীদের’ হাতে আসে] জন্য লেখা ‘অর্থনৈতিক রোমান্টিজমের চরিত্র নির্ণয়’ প্রবন্ধে ‘মার্কস’ ও ‘মার্কসবাদ’ কথা দুটি এড়াবার জন্য লেনিন নানা রূপকের সাহায্য গ্রহণ করেন। তা না করলে পত্রিকাটিকে বিপদে পড়তে হত।

মার্কস এবং এঙ্গেলসের সমস্ত রচনাই ভ্লাদিমির ইলিচের জানা ছিল। এবং তিনি সর্বদা জার্মান ও ফরাসি ভাষায় রচনাগুলি জোগাড় করার চেষ্টা করতেন। আন্না ইলিনিচনা (লেনিনের বোন আ ই উলিয়ানভা-ইয়েলিজারভা) বলেন, তাঁর মনে আছে ভ্লাদিমির ইলিচ ও তাঁর বোন ওলগা ‘দর্শনের দৈন্য’ ফরাসি ভাষায় পড়েন। কিন্তু মার্কস এবং এঙ্গেলসের বেশীরভাগ রচনাই তাঁকে জার্মান ভাষায় পড়তে হয়েছিল, তা থেকে চিত্তাকর্ষক ও গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলি তিনি রুশ ভাষায় অনুবাদ করেন। তাঁর প্রথম বিরাট রচনা, ‘‘জনগণের বন্ধুদের’ স্বরূপ কী এবং কী ভাবে তারা সোশ্যাল-ডেমোক্রাটদের সঙ্গে লড়ে’ – এটি  ১৮৯৪ সালে বে-আইনিভাবে প্রকাশিত হয়। এই রচনায় তিনি ‘কমিউনিস্ট ইশতেহার’, ‘রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্রের সমালোচনা’, ‘দর্শনের দৈন্য’, ‘জার্মান মতাদর্শ’, ১৮৪৩ সালে লেখা রুগের কাছে মার্ক্সের চিঠি, এঙ্গেলসের ‘অ্যান্টি-ডুরিং’ এবং ‘পরিবার, ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও রাষ্ট্রের উদ্ভব’ থেকে উদ্ধৃত করেন।

তখনকার দিনের বেশীর ভাগ মার্কসবাদীদের মার্কসের রচনার সঙ্গে বিশেষ পরিচয় ছিল না। ‘জনগণের বন্ধুরা’ বইটিতে তাদের মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গীর প্রসার হয়, তাতে ধারাবদ্ধ কতগুলি প্রশ্নকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করা হয় এবং বইটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

লেনিনের পরবর্তী রচনা– ‘নারোদবাদের অর্থনৈতিক মর্মবস্তু এবং মিঃ স্ত্রুভের বইয়ে তার সমালোচনা’, এতে ‘লুই বোনাপার্টের ১৮ই ব্রুমেয়ার’, ‘ফ্রান্সের গৃহযুদ্ধ’, ‘গোথা কর্মসূচির সমালোচনা’ এবং ‘পুঁজি’ বইখানির দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড থেকে উদ্ধৃতি দেখতে পাই।

প্রবাসের বছরগুলিতে লেনিন মার্কস এবং এঙ্গেলসের সমস্ত রচনা ভালোভাবে পড়ে নেন। ১৯১৪ সালে গ্রানাত বিশ্বকোষের জন্য লেনিনের লেখা মার্কসের জীবনী থেকে চমৎকার ভাবে দেখা যায় মার্কসের রচনা সম্বন্ধে তাঁর কত জানা-শোনা ছিল। মার্কস পড়ার সময় তিনি যে অগণিত অংশ উদ্ধৃত করে রাখতেন তা থেকেও এটা বোঝা যায়। মার্কসের রচনা থেকে উদ্ধৃত অংশে ভরা বহু খাতা ‘লেনিন ইনস্টিটিউটে’ আছে।

ভ্লাদিমির ইলিচ এগুলি তাঁর লেখায় ব্যবহার করতেন, ফিরে ফিরে পড়তেন, টীকা লিখতেন। মার্কস তিনি পড়েছিলেন তাই নয়, অনুশীলন করেছিলেন। ১৯২০ সালে কমসোমলের তৃতীয় নিখিল রুশ কংগ্রেসে ভ্লাদিমির ইলিচ বলেন, ‘‘আমাদের প্রয়োজন মানবিক জ্ঞানের সারাংশ আয়ত্ত করতে পারা এবং তা এমনভাবে আয়ত্ত করা যাতে কমিউনিজম মুখস্থ করা একটা ব্যাপার হয়ে না থেকে, হয় এমন একটা বস্তু যা আপনারাই নিজে ভেবে বার করেছেন, তার মধ্যে অঙ্গীকৃত হবে এমন সব সিদ্ধান্ত যা আধুনিক শিক্ষার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অনিবার্য।’’ [ভি আই লেনিন, সংকলিত রচনাবলী, ২য় খণ্ড, ২য় অধ্যায়, পৃঃ ৪৮০]

মার্কসের লেখাটুকুই শুধু নয়, মার্কস ও মার্কসবাদ সম্বন্ধে তাঁর শত্রুপক্ষ বুর্জোয়া গোষ্ঠীর লোকেরাও যা কিছু লিখেছেন তা সবকিছুও তাঁর পড়া ছিল, এবং তাদের সঙ্গে তর্কে তিনি মার্কসবাদের মূল নীতিগুলি বিশ্লেষণ করেছেন।

‘‘জনগণের বন্ধুদের’ স্বরূপ কী এবং কীভাবে তারা সোশ্যাল- ডেমোক্রাটদের সঙ্গে লড়ে’ (‘রুসস্কয়ে বগাতস্তভো’তে প্রকাশিত মার্কস বিরোধী প্রবন্ধের উত্তর), তাঁর এই প্রথম বৃহৎ রচনায়, লেনিন নারোদবাদীদের (মিখাইলভস্কি, ক্রিভেঙ্কো ও য়ুজাকভের) মতের বিপরীতে মার্কসের দৃষ্টিভঙ্গি হাজির করেন। [‘রুসস্কয়ে বগাতস্তভো’ (রুশ সম্পদ)- একটি মাসিক পত্রিকা। ১৮৯০ এর দশকের প্রথমভাগে নারোদবাদীদের সপক্ষে ছিল এবং মার্কসবাদের সঙ্গে সংগ্রামে প্রধান মুখপত্র হয়ে ওঠে]

‘নারোদবাদের অর্থনৈতিক মর্মবস্তু এবং মিঃ স্ত্রুভের বইয়ে তার সমালোচনা' নামক প্রবন্ধে তিনি দেখিয়েছেন স্ত্রুভের দৃষ্টিভঙ্গি মার্ক্সের সম্পূর্ণ বিপরীত।

‘কৃষি সমস্যা এবং মার্কসের ‘সমালোচকবৃন্দ’ রচনায় (৫ম খণ্ড, পৃঃ ৮৭–২০২ এবং ১৩শ খণ্ড, পৃঃ ১৪৯–১৯৩, চতুর্থ রুশ সংস্করণ) লেনিন কৃষি সমস্যার বিশ্লেষণ করেন এবং জার্মান সোশ্যাল-ডেমোক্রাট– ডেভিড, হেরৎস এবং রুশ সমালোচকদের– চেরনভ, বুলগাকভের– পেটি বুর্জোয়া মতবাদের বিরুদ্ধে মার্কসের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিষ্ঠা করেন।

একটি ফরাসি প্রবাদ আছে ‘মত-সংঘাত থেকে সত্যের জন্ম’। ইলিচ এই প্রবাদটি উদ্ধৃত করতে ভালোবাসতেন। শ্রমিক আন্দোলনের প্রধান প্রধান প্রশ্নগুলির ক্ষেত্রে তিনি সব সময় সে বিষয়ের শ্রেণিগত দৃষ্টিভঙ্গিগুলিকে বের করে এনে তাদের প্রতিতুলনা দিতেন।

লেনিনের এ কাজের একটি বিশিষ্ট ধরন ছিল। উদাহরণ স্বরূপ, এই দিকটি ‘লেনিনের বিবিধ সংগ্রহ’ ১৯শ খণ্ডে প্রতিফলিত হয়েছে। এই খণ্ডে ১৯১৭ সালের পূর্বেকার কৃষি সমস্যা প্রসঙ্গে তাঁর মতামতের উদ্ধৃতি, নির্যাস ইত্যাদি সংকলিত আছে।

‘সমালোচক’দের বক্তব্যগুলি তিনি মন দিয়ে পড়তেন, অত্যন্ত পরিষ্কার ও প্রতিনিধি স্থানীয় জায়গাগুলি বেছে লিখে রাখতেন, এবং তারপর মার্কসের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে তাদের তুলনা করতেন। নানান সমালোচনামূলক প্রবন্ধের বিস্তারিত বিশ্লেষণে তিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি সমস্যাগুলির ওপর জোর দিয়ে তাদের শ্রেণি মর্মবস্তু তুলে ধরবার চেষ্টা করতেন।

প্রায়ই লেনিন ইচ্ছা করে কোনও একটি প্রশ্নের উপর বিশেষ জোর দিতেন। তিনি বলতেন, এটা কেবল ভাষার রূঢ়তা বা অমায়িকতার প্রশ্ন নয়। যতক্ষণ যুক্তির ওপর কথা বলা হচ্ছে, ততক্ষণ সে কথা তীব্র ও রূঢ়ভাবে বলার অধিকার সকলেরই আছে। জোর্গের পত্রাবলির ভূমিকায় তিনি মেহরিং’এর কথা উদ্ধৃত করে বলছেন, ‘মেহরিং যে বলেছেন (‘Der Sorgesche Briefwechse’) মার্কস এবং এঙ্গেলসের বিশেষ ‘ভদ্রতা’ বোধ ছিল না সেটা যথার্থই বলেছেন, “তাঁরা যে আঘাত করতেন সে বিষয়ে যদি তাঁরা বিশেষ মাথা ঘামিয়ে না থাকেন, তবে তাঁরা নিজেরা যে আঘাত পেতেন তা নিয়েও ঘ্যানঘ্যান করতেন না।’ [ভি আই লেনিন, মার্কস-এঙ্গেলস-মার্কসবাদ, মস্কো, ১৯৫৩, পৃঃ ২৪৫] তীক্ষ্ণতা লেনিনের চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য, মার্ক্সের কাছ থেকে তিনি তা শিখেছিলেন। তিনি লিখছেন, ‘মার্কস বলছেন তিনি আর এঙ্গেলস সর্বদা ‘সোশ্যাল-ডেমোক্রাট’ যে রকম ‘খারাপ’ (miserabel) ভাবে পরিচালিত হত তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতেন এবং প্রায়ই তাঁদের মতামত তাঁর ভাষায় (wobei’s oft scharf hergeht) প্রকাশ করতেন। ইলিচ তীব্রতায় ভয় পেতেন না, কিন্তু চাইতেন পাল্টা জবাবগুলি যেন সঙ্গত হয়। [‘সোশ্যাল-ডেমোক্রাট’– বার্লিনে ১৮৬৪ থেকে ১৮৭১ অবধি প্রকাশিত ‘জার্মান শ্রমিক ইউনিয়ন’– লাসালীয় সুবিধাবাদী সংগঠনের মুখপত্র]

একটি কথা লেনিন খুব পছন্দ করতেন– ‘ছিদ্রান্বেষণ’। যখন যুক্তিগুলি সঙ্গত হত না, বক্তা ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তুচ্ছ খুঁত ধরার দিকে মন দিত, তখন লেনিন বলতেন, ‘এ নেহাৎই ‘ছিদ্রান্বেষণ’।’

কোনও প্রশ্নের মীমাংসা করার উদ্দেশ্য না রেখে তুচ্ছ দলীয় কোনও স্বার্থ সাধনের জন্য যে বিতণ্ডার অবতারণা হত তার বিরুদ্ধতা তিনি করতেন আরও তীব্রভাবে। প্রসঙ্গত ওইটিই মেনশেভিকদের একটি প্রিয় পন্থা হয়ে উঠেছিল। একান্তভাবে নিজেদের দলগত উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য তারা মার্কস ও এঙ্গেলসের নির্দেশগুলির অপব্যবহার করত। ফ. আ. জোর্গের পত্রাবলির ভূমিকায় লেনিন লিখেছেন:
‘মার্কস ও এঙ্গেলসের বৃটিশ ও মার্কিন শ্রমিক আন্দোলনের প্রতি এই সব নির্দেশাবলি রুশ পরিবেশেও অতি সহজে সোজাসুজি প্রয়োগ করা যাবে এ কথা ভাবার অর্থ – মার্কসবাদকে ব্যবহার করা তার পদ্ধতি উপলব্ধি করার জন্য নয়, বিশেষ বিশেষ শ্রমিক আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য অনুধাবনের জন্য নয়, কেবলমাত্র তুচ্ছ দলগত বুদ্ধিজীবীসুলভ স্বার্থসিদ্ধির জন্য।’
[ভি আই লেনিন, মার্কস-এঙ্গেলস-মার্কসবাদ, মস্কো, ১৯৫৩, পৃঃ ২৪৯]

এই প্রসঙ্গে আমাদের সামনে প্রশ্ন আসছে লেনিন কী ভাবে মার্কস অধ্যয়ন করেছিলেন। উপরোক্ত উদ্ধৃতি থেকে তা অংশত বোঝা যাবে: মার্কসের পদ্ধতি উপলব্ধি করতে হবে, তাঁর কাছ থেকে বিশেষ বিশেষ দেশের শ্রমিক আন্দোলনের বৈশিষ্ট্যগুলি অনুধাবন করতে শিখতে হবে। লেনিন ঠিক তাই করেছিলেন। লেনিনের কাছে মার্কসবাদ গুরুবাক্য নয়, কর্মসাধনের পথসূচক। একবার তিনি বলেছিলেন: ‘মার্কসের সঙ্গে যিনি পরামর্শ করতে চান...’ এটি তাঁর একটি বৈশিষ্ট্যসূচক উক্তি। তিনি নিজে সর্বদা মার্কসের সঙ্গে ‘পরামর্শ করতেন’। বিপ্লবের সবচেয়ে কঠিন, সঙ্গীন মূহর্তে তিনি বারবার করে মার্কস পড়েছেন। তাঁর দপ্তরে গিয়ে প্রায়ই দেখেছি সবাই উত্তেজিত কিন্তু ইলিচ মার্কসে মগ্ন হয়ে বসে থাকতেন; বই থেকে তাঁকে টেনে তোলা সত্যিই কঠিন হয়ে উঠত। তাঁর স্নায়ুগুলিকে কিছু শান্ত করার জন্য অথবা শ্রমিক শ্রেণির ক্ষমতা বা তার চরম বিজয়ে তাঁর আস্থা আরও দৃঢ়তর করার উদ্দেশ্যে তিনি মার্কসের শরণাপন্ন হতেন না- সে বিষয়ে তিনি যথেষ্ট আস্থাবান ছিলেন। তিনি মার্কস পড়তেন তাঁর সঙ্গে ‘পরামর্শের’ জন্য, শ্রমিক আন্দোলনের সম্মুখীন জরুরি সমস্যাগুলির জবাব পাবার জন্য। ‘দ্বিতীয় দুমার প্রসঙ্গে ফ. মেহরিং’এর মত’ নামক প্রবন্ধে লেনিন লিখেছেন: ‘কেউ কেউ যুক্তি দিতে গিয়ে ভুল উদ্ধৃতি বেছে নেয়: প্রতিক্রিয়াশীল পেটি বুর্জোয়ার বিরুদ্ধে বৃহৎ বুর্জোয়ার সমর্থন সংক্রান্ত সাধারণ নীতিগুলি আঁকড়ে ধরে তারা, কোনও বিচার বিবেচনা না করে তা প্রয়োগ করে রুশ নিয়মতান্ত্রিক ডেমোক্রাট ও রুশ বিপ্লবের ক্ষেত্রে, মেহরিং এই সব লোকদের বেশ শিক্ষা দিয়েছেন। বুর্জোয়া বিপ্লবে যারা প্রলেতারিয়েতের কর্তব্য কী তা জানার জন্য মার্ক্সের পরামর্শ চায়, তাদের উচিত জার্মান বুর্জোয়া বিপ্লব সম্বন্ধে মার্কস যা বলেছেন ঠিক সেইটে অধ্যয়ন করা। মেনশেভিকরা যে সেই মতামত এড়িয়ে যায় তা অকারণে নয়! রুশ বুর্জোয়া বিপ্লবে আপোষকামী বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে রুশ ‘বলশেভিকরা’ যে নির্মম সংগ্রাম চালাচ্ছে তার পরিপূর্ণ এবং সুস্পষ্ট প্রতিফলন আমরা এই মতামতের মধ্যে দেখতে পাই।’ [ভি আই লেনিন, রচনাবলী, ৪র্থ রুশ সংস্করণ , ১২শ খণ্ড, পৃঃ ৩৪৮]

লেনিনের পদ্ধতি ছিল অনুরূপ পরিস্থিতির ক্ষেত্রে মার্কস যা লিখেছেন তা বেছে নিয়ে সযত্নে বিশ্লেষণ করে বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে তার তুলনা দ্বারা উভয়ের মধ্যেকার মিল ও গরমিলগুলি বের করে আনা। লেনিন তা কী করে করতেন তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হল ১৯০৫-১৯০৭ সালের বিপ্লবে তাঁর এই পদ্ধতির প্রয়োগ।

‘কী করিতে হইবে’ (১৯০২) পুস্তিকায় লেনিন লিখেছেন: ‘যে কোনও দেশের প্রলেতারিয়েতের সম্মুখস্থ আশু কর্তব্যগুলির মধ্যে যা সর্বাপেক্ষা বিপ্লবী এমন একটি আশু কর্তব্যই ইতিহাস আমাদের সামনে এনে হাজির করেছে। এই কর্তব্য পালন করতে পারলে, কেবলমাত্র ইউরোপীয় নয়, (অধুনা বলা যায়) এশীয় প্রতিক্রিয়ারও এই অতি সুদৃঢ় ঘাঁটি ধ্বংস করতে সক্ষম হলে, রুশ প্রলেতারিয়েত হয়ে উঠবে আন্তর্জাতিক বিপ্লবী প্রলেতারিয়েতের অগ্রবাহিনী।’ [ভি আই লেনিন, সংকলিত রচনাবলী, ১ম খণ্ড, ২য় অধ্যায়, পৃঃ ২৩১]

আমরা জানি ১৯০৫ সালের বিপ্লবী সংগ্রাম রুশ শ্রমিক শ্রেণির আন্তর্জাতিক ভূমিকা বাড়িয়ে দেয়, এবং ১৯১৭ সালে জারতন্ত্রের উচ্ছেদ রুশ প্রলেতারিয়েতকে সত্যই আন্তর্জাতিক বিপ্লবী প্রলেতারিয়েতের অগ্রবাহিনী করে তুলেছে। কিন্তু ‘কী করিতে হইবে’ লেখা হবার ১৫ বছর পর এ ঘটনা ঘটে। ১৯০৫ সালের ৯ই জানুয়ারি, প্যালেস স্কোয়ারে শ্রমিকদের হত্যার পর যে বিপ্লবের ঢেউ দেখা দেয় তার ফলে পার্টি জনগণকে কোন দিকে নিয়ে যাবে, কোন রণকৌশল গ্রহণ করবে, এই প্রশ্ন ওঠে। এই সময় লেনিন আবার মার্ক্সের সঙ্গে ‘পরামর্শ করেন’। ১৮৪৮ সালের ফরাসি এবং জার্মান বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্বন্ধে মার্ক্সের রচনা লেনিন খুঁটিয়ে পড়েন: ‘ফ্রান্সে শ্রেণি সংগ্রাম, ১৮৪৮ থেকে ১৮৫০’ এবং মেহরিং প্রকাশিত মার্কস ও এঙ্গেলসের ‘সাহিত্যিক উত্তরাধিকার’ (জার্মান বিপ্লব বিষয়ক) বইয়ের তৃতীয় খণ্ড।

১৯০৫ সালের জুন এবং জুলাই মাসে লেনিন ‘গণতান্ত্রিক বিপ্লবে সোশ্যাল- ডেমোক্রেসির দুই রণকৌশল’ শীর্ষক পুস্তিকাটি লেখেন। এই পুস্তিকায় লেনিন মেনশেভিক রণকৌশলের বিপরীতে হাজির করেন বলশেভিকদের রণকৌশল-মেনশেভিকরা অনুসরণ করছিল উদারনৈতিক বুর্জোয়াদের সঙ্গে আপোষের নীতি আর বলশেভিকরা শ্রমিক জনগণকে অনুপ্রাণিত করছিল স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সুদৃঢ় আপোষহীন সংগ্রাম চালিয়ে যেতে, প্রয়োজন হলে সশস্ত্র অভ্যুত্থান করতে। সেই পুস্তিকায় লেনিন বলেন জারতন্ত্রের অবসান ঘটানো প্রয়োজন। তিনি লিখছেন, ‘(নব-ইস্ক্রাপন্থীদের- ক্রুপস্কায়া) সম্মেলন একথাও ভুলে গেছে যে যতক্ষণ পর্যন্ত জারের হাতে সমস্ত ক্ষমতা থাকছে, ততক্ষণ যে কোনও প্রতিনিধিদল কর্তৃক গৃহীত সমস্ত সিদ্ধান্তই শূন্যগর্ভ ও সকরুণ বাগাড়ম্বর হয়ে থাকবে যেমন হয়েছিল ১৮৪৮ সালের জার্মান বিপ্লবের ইতিহাসে বিখ্যাত ফ্র্যাঙ্কফুর্ট পার্লামেন্টে গৃহীত ‘সিদ্ধান্তগুলি’। [‘ইস্ক্রা’ – ১৯০০ সালে লেনিন কর্তৃক স্থাপিত প্রথম নিখিল রুশ মার্কসবাদী সংবাদপত্র। ১৯০৩ সালে রুশ সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাটিক লেবার পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসে পার্টি দুই দলে ভাগ হয়ে যায়– এক দল ‘বলশেভিক’ (বিপ্লবী), অন্য দল মেনসেভিক (সুবিধাবাদী)। এর পর ‘ইস্ক্রা’ মেনসেভিকদের হাতে আসে। লেনিনের পুরানো ‘ইস্ক্রা’র সঙ্গে তফাত করার জন্য তাকে বলা হয় ‘নব ইস্ক্রা’, তাই থেকে ‘নব-ইস্ক্রাপন্থী’ কথার উদ্ভব] ‘নৈয়ে রাইনিশে ৎসাইতুং’ (Neue Rheinische Zeitung) সংবাদপত্রে বিপ্লবী প্রলেতারিয়েতের প্রতিনিধি মার্কস ফ্র্যাঙ্কফুর্টের উদারপন্থী ‘ওসভবজদেনেৎস’দের নির্মম বিদ্রূপে বিদ্ধ করেন ঠিক এই কারণে যে তারা চমৎকার চমৎকার বুলি আওড়েছে, নানাবিধ গণতান্ত্রিক ‘সিদ্ধান্ত’ গ্রহণ করেছে, যাবতীয় স্বাধীনতার ‘কথা সংবিধানভুক্ত’ করেছে, কিন্তু আসলে তারা ক্ষমতা রেখে দিয়েছিল রাজার হাতে, এবং রাজার করায়ত্ত সামরিক ফৌজের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করতে পারেনি। [‘ওসভবজদেনেৎস’—  ১৯০২-১৯০৫ সালে রাশিয়ার বুর্জোয়া উদারনৈতিক ‘ওসভবজদেনিয়ে’ (মুক্তি) দলের সভ্য। এখানে জার্মান জনসভার ডেপুটিদের লেনিন ‘ওসভবজদেনেৎসি’ বলেন] ফ্র্যাঙ্কফুর্টের ওসভবজদেনেৎসদেরা যখন বাগবিস্তার করছিল তখন রাজা তাঁর সুযোগ খুজছিলেন, তাঁর সামরিক শক্তি সংহত করছিলেন। আসল শক্তির উপর ভিত্তি করে প্রতি-বিপ্লব গণতন্ত্রীদের এবং তাদের চমৎকার চমৎকার সব ‘সিদ্ধান্ত’ সমস্তই বিধ্বস্ত করে।’ [ভি আই লেনিন, সংকলিত রচনাবলী, ১ম খণ্ড, ২য় অধ্যায়, পৃঃ ৩০]

ভ্লাদিমির ইলিচ এই প্রশ্ন তোলেনঃ বুর্জোয়ারা জারতন্ত্রের সঙ্গে একটা বোঝাপড়া করে রুশ বিপ্লবকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে, নাকি মার্ক্সের ভাষায়, জারতন্ত্রের ফয়সালা করবে ‘প্লেবিয়ান ধরনে’।

‘এ বিপ্লব যদি চূড়ান্ত জয়লাভ করে - তাহলে আমরা জ্যাকোবিয় ধরনে, বা বলা যেতে পারে, প্লেবিয়ান ধরনে জারতন্ত্রের ফয়সালা করব। বিখ্যাত ‘নৈয়ে রাইনিশে ৎসাইতুং’ সংবাদপত্রে ১৮৪৮ সালে মার্কস লিখেছেন, ‘ফরাসি দেশের সন্ত্রাস হল বুর্জোয়ার যারা শত্রু সেই স্বৈরতন্ত্র, সামন্ততন্ত্র ও কূপমণ্ডুকতার সঙ্গে প্লেবিয়ান ধরনে ফয়সালা করা ছাড়া আর কিছুই নয়’ (Marx, ‘Nachlass, মেহরিইং সংস্করণ, তৃতীয় খন্ড, ২১১ পৃঃ দ্রষ্টব্য)। গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পর্বে রাশিয়ার সোশ্যাল-ডেমোক্রাট শ্রমিকদের যারা ‘জ্যাকোবিনবাদের’ জুজুর ভয় দেখাতে চায় তারা কি একবারের জন্যও মার্ক্সের এই কথাগুলির তাৎপর্য ভেবে দেখেছে?’ [ভি আই লেনিন, সংকলিত রচনাবলী, ১ম খণ্ড, ২য় অধ্যায়, পৃঃ ৫৯]
মেনশেভিকরা বলে তাদের রণকৌশল হল ‘চূড়ান্ত বিপ্লবী একটা বিরোধী পার্টি হিসাবে থাকা’ এবং তার মানে, আংশিকভাবে, বিচ্ছিন্নভাবে ক্ষমতা দখল করা, এবং কোনও কোনও শহরে বিপ্লবী কমিউন প্রতিষ্ঠা করা হবে না, তা নয়। ‘বিপ্লবী কমিউন’ কথাটির অর্থ কী?’ লেনিন প্রশ্ন করেন এবং উত্তর দেন: ‘বৈপ্লবিক চিন্তার বিভ্রান্তি থেকে যা প্রায়ই ঘটে, তাই ঘটছে, ওরা (নব-ইস্ক্রাপন্থীরা) চলেছে বিপ্লবী বুলি কপচানির মধ্যে। সত্যিই সোশ্যাল-ডেমোক্রেসির প্রতিনিধিদের গৃহীত সিদ্ধান্তে ব্যবহৃত “বিপ্লবী কমিউন” কথাটি নিতান্ত বিপ্লবী বুলি কপচানি, তা ছাড়া কিছুই নয়। বিগত অতীতের ‘মনোগ্রাহী’ শব্দ ঝঙ্কারে যখন ভবিষ্যতের কর্তব্য প্রচ্ছন্ন করে রাখার চেষ্টা হত, মার্কস তখন একাধিকবার এ জাতীয় বুলি কপচানির নিন্দা করেছেন। এই সব ক্ষেত্রে ইতিহাসে যার ভূমিকা সমাপ্ত হয়ে গেছে, তেমন একটা মনোহারী কথা হয়ে দাঁড়ায় এক নিষ্ফল ও বিষাক্ত প্রবঞ্চনা, শিশুর বাক্‌বিলাস। শ্রমিকদের তথা সমগ্র জনগণের কাছে পরিষ্কার, দ্ব্যর্থহীন ভাষায় আমাদের ব্যাখ্যা করতে হবে কেন আমরা এক অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার প্রতিষ্ঠা করতে চাই, এবং যদি সরকারের ওপর একটা নির্ধারক প্রভাব বিস্তার করতে পারি তাহলে যে গণ অভ্যুত্থানের সূচনা এখনি দেখা গেছে তার বিজয়ের পরদিনই ঠিক কোন কোন পরিবর্তন আমরা সাধন করব? রাজনৈতিক নেতাদের সামনে এই হল প্রশ্ন।’ [ভি আই লেনিন, সংকলিত রচনাবলী, ১ম খণ্ড, ২য় অধ্যায়, পৃঃ ৮৩]

‘মার্কসবাদের এই অপবক্তারা কখনও ভেবে দেখেনি সমালোচনার অস্ত্রের বদলে অস্ত্রের সমালোচনা প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে মার্কস কী বলেছেন। মিথ্যেই তারা মার্কসের নাম করে, আদতে রণকৌশলের যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তা সম্পূর্ণ ফ্র্যাঙ্কফুর্টের বাচাল বুর্জোয়াদের মতো, যারা স্বৈরতন্ত্রের অবাধ সমালোচনা করে গণতান্ত্রিক চৈতন্যকে গভীর করে তুললেও একথা বুঝতে অক্ষম, যে বিপ্লবের কাল হল ওপর-নীচ দুদিক থেকেই সংগ্রামের কাল।’ [ভি আই লেনিন, সংকলিত রচনাবলী, ১ম খণ্ড, ২য় অধ্যায়, পৃঃ ১০২]

এই লেখাটি প্রকাশিত হয় ‘শিক্ষাদীক্ষা– বক্তৃতা ও প্রবন্ধের সংকলন’ বইটিতে।

প্রকাশকঃ প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, অনুবাদঃ সুপ্রিয়া ঘোষ, সম্পাদনাঃ ননী ভৌমিক

প্রকাশের তারিখ: ২৫-ফেব্রুয়ারি-২০২৩

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org