|
পাঠ্যপুস্তকে কীভাবে ইতিহাস ও বিজ্ঞানকে বদলে দিচ্ছে সঙ্ঘস্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য |
তাঁর মতে, মোদী সরকার যে জাতীয় শিক্ষা নীতি (এনইপি) প্রবর্তন করেছে তা অনেক বছর ধরেই বিদ্যা ভারতীর বিদ্যালয়গুলিতে বলবৎ রয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের বিদ্যালয়গুলিতে অনুসৃত কিছু পদ্ধতিকেই এনইপি আরো বৃহত্তর পরিসরে নিয়ে গেছে’। তাঁর আশা, সংস্কৃতি বোধমালার পুস্তকগুলি থেকে আরো অনেক তথ্যই আগামীতে বিদ্যালয় শিক্ষার বিধিসম্মত পাঠ্যসূচিতে স্থান পাবে। |
স্কুলের দেওয়ালে সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা হেডগেওয়ার, তাঁর উত্তরসূরী গোলওয়ালকরের ছবি সেখানে প্রার্থনা কক্ষের দেওয়ালে শোভা পায় হিন্দু দেবদেবী, সাধুসন্ত, পৌরাণিক নানা চরিত্র, প্রাচীন ভারতের পণ্ডিত থেকে রাজরাজড়াদের ছবি। আর হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন আচারের চিত্র সম্বলিত রঙবেরঙের পোস্টার। হিন্দু ধর্মের জ্ঞানের দেবী সরস্বতীর প্রশংসাসূচক মন্ত্রের সরস্বতী বন্দনা দিয়ে শুরু হয় প্রার্থনা। একই সূচি পালিত হয় চতুর্থ শ্রেণি অবধি শিশুদের প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যায়তন সারদা শিশু মন্দিরেও। প্রার্থনা শেষে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করার পর ছাত্ররা আরেকবার ওই চিত্রমালার মুখোমুখি হয়। এবার ‘সংস্কৃতি বোধমালা’ নামের ইংরেজি, হিন্দি-সহ নানা ভারতীয় ভাষায় প্রকাশিত সাংস্কৃতিক চেতনাবোধিনী বইয়ে। চতুর্থ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির সমস্ত ছাত্রদের জন্যে ‘সংস্কৃতি বোধমালা’ বাধ্যতামূলক। এবং এই বইয়ের উপর জাতীয় স্তরে আয়োজিত সমন্বিত পরীক্ষায় ছাত্রদেরকে আবশ্যকভাবে বসতে হয়। প্রায় দুশো বছরের বেশি দীর্ঘ সময় ধরে কোটি কোটি ভারতবাসী, বিশেষ করে হিন্দুরা প্রাচীন ভারতের বৈদিক যুগ বলে অভিহিত সময়পর্বের (খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ অবধি) পণ্ডিতদের লেখা দর্শন ও চিন্তার কথা পড়ে আসছে, যে সময়পর্বে অনেক ধর্মগ্রন্থগুলি রচিত হয়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর রাজত্বে হিন্দুদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস ও বিজ্ঞানের মধ্যকার সীমারেখাকে মুছে দিয়ে এই ধারণাগুলি ভারতের বিদ্যালয়স্তরের বিশালাকার পাঠ্যসূচিতে স্থান করে নিয়েছে। সমালোচকদের মতে, যে দেশে জনসংখ্যার অর্ধেক অনূর্ধ ২৫ বছর, সেখানে এই পদক্ষেপ মোদীর ভারতীয় জনতা পার্টি ও তাদের হিন্দু সংখ্যাগুরুবাদী সহযোগীদের শিক্ষাব্যবস্থাকে ব্যবহার করে তরুণমনকে প্রভাবিত করার সুযোগ করে দিয়েছে। এদের অনেকেই আগামী মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনে জীবনের প্রথম ভোটদান করবে এবার। অণু থেকে আকাশযান চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রদের পাঠ্যবইয়ে বলা আছে যে, অণু থেকে আকাশযান সবই বৈদিক যুগের দার্শনিক কণাদের অবদান। কণাদ তাঁর বৈশেষিক দর্শন গ্রন্থে অবশ্যই পদার্থ ক্ষুদ্রতম অবিভাজ্য উপাদান অণুর কথা বলেছিলেন। কিন্তু তাঁর তালিকায় পদার্থ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিল পৃথ্বী, জল, তেজস (অগ্নি), বায়ু, আকাশ, কাল, দিক, আত্মা ও মানস। এটা থেকেই, বিজ্ঞানীর মতে স্পষ্ট হয়ে যায় যে তিনি কথাটি দার্শনিক বা অধিবিদ্যার অবস্থান থেকে বলেছিলেন। পঞ্চম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকের মতে ‘বৈমানিক শাস্ত্র’ গ্রন্থের রচয়িতা ঋষি ভরদ্বাজই ‘আকাশচারিতার পিতা’। পঞ্চম ও দ্বাদশ শ্রেণির পাঠ্যপুস্তক অনুযায়ী প্রাচীন ভারতীয় চিকিৎসক সুশ্রুতই ‘প্লাস্টিক সার্জারির উদ্ভাবক’। সংস্কৃতি বোধমালার বইগুলি সরকারের দ্বারা অনুমোদিত নয়। কিন্তু সেগুলি বিজেপির উগ্র দক্ষিণপন্থী অভিভাবক রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (আরএসএস) পরিচালিত বিদ্যালয়ের বিশাল শাখাপ্রশাখার সর্বত্র সরকার স্বীকৃত পাঠ্যসূচির পাশাপাশি পড়ানো হয়। এই বিদ্যালয়গুলি পরিচালন করে আরএসএস-এর শিক্ষা সংক্রান্ত অঙ্গসংগঠন বিদ্যা ভারতী– যাদের অধীনে থাকা ১২,০০০ বিদ্যালয়ে পড়ছে ৩ কোটি ২ লক্ষ ছাত্রছাত্রী। এই বিদ্যালয়গুলি সেন্ট্রাল বোর্ড অব সেকেন্ডারি এডুকেশন (সিবিএসই) বা সংশ্লিষ্ট রাজ্য বোর্ডের অনুমোদনপ্রাপ্ত। সাম্প্রতিক বছরে বিদ্যা ভারতীর বিদ্যালয়ে পঠিত অপ্রমাণিত ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিক তথ্যগুলি সরকার পরিচালিত বিদ্যালয়গুলির বিধিসম্মত পাঠ্যসূচিতে স্থান করে নিয়েছে। কণাদের আণবিক তত্ত্ব ও সুশ্রুতের প্লাস্টিক সার্জারির দাবি ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীণ মুক্ত বিদ্যালয়ের জাতীয় প্রতিষ্ঠানের (এনআইওএস-এর) পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এনআইওএস-এর দাবি অনুযায়ী তারা ‘বিশ্বের বৃহত্তম মুক্ত বিদ্যালয়ের ব্যবস্থা, যার ক্রমবর্ধমান বিদ্যার্থীর সংখ্যা বর্তমানে ৪১.৩ লক্ষ (বিগত পাঁচ বছরে)’। আরএসএস নিয়ন্ত্রিত বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচির অন্য আরেকটি বিষয় বৈদিক গণিত-ও এনআইওএস-এর পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। চন্দ্রাভিযান বিষয়ক জাতীয় শিক্ষা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ পর্ষদের (এনসিইআরটি) নতুন পাঠ্য অনুযায়ী বৈমানিক শাস্ত্র গ্রন্থটি প্রমাণ করছে যে ‘আমাদের সভ্যতা সম্ভবত আকাশযান সম্পর্কিত জ্ঞানের অধিকারী ছিল’। বিদ্যালয় শিক্ষা ও আদর্শ পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নসম্পর্কে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদানের ক্ষেত্রে এসসিইআরটি-ই শীর্ষ প্রতিষ্ঠান। যদিও বিভিন্ন রাজ্য পর্ষদ এনসিইআরটি-র পরামর্শের থেকে সরে গিয়ে নিজেদের পাঠ্যসূচির প্রণয়ন করতে পারে। কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালিত পর্ষদগুলির মধ্যে সিবিএসই-র দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষায় ১২ লক্ষ ও দশম শ্রেণির পরীক্ষায় ১৮ লক্ষ পরীক্ষার্থী ছিল ২০২০ সালে। ২০১৯ সালে কেন্দ্রের শিক্ষামন্ত্রী রমেশ পোখরিয়াল দাবি করেন, ‘নিউটনের বহু আগেই আমাদের ধর্মগ্রন্থগুলি মাধ্যাকর্ষণ শক্তি আবিষ্কার করেছিল’। সংস্কৃতি বোধমালার বইগুলিও একই কথাই বলে। তাদের একটি বই এর কৃতিত্ব দেয় পঞ্চম শতকের গণিতবিদ আর্যভট্টকে। আরেকটি দেয় দ্বাদশ শতকের গণিতবিদ ভাস্করাচার্যকে। উলুবেড়িয়ার সারদা বিদ্যা মন্দিরের ভারপ্রাপ্ত প্রলয় অধিকারীর বক্তব্য, ‘সংস্কৃতি বোধমালার বইগুলির সাথে বিধিসম্মত পাঠ্যসূচির কোনও বিরোধ নেই, যেহেতু এখানে উল্লিখিত ইতিহাস বিধিসম্মত পাঠ্যসূচিতে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত কারণ সেখানে মুঘল-পূর্ব ইতিহাসকে পুরোটাই অবহেলা করা হয়েছে’। তাঁর মতে, মোদী সরকার যে জাতীয় শিক্ষা নীতি (এনইপি) প্রবর্তন করেছে তা অনেক বছর ধরেই বিদ্যা ভারতীর বিদ্যালয়গুলিতে বলবৎ রয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের বিদ্যালয়গুলিতে অনুসৃত কিছু পদ্ধতিকেই এনইপি আরো বৃহত্তর পরিসরে নিয়ে গেছে’। তাঁর আশা, সংস্কৃতি বোধমালার পুস্তকগুলি থেকে আরো অনেক তথ্যই আগামীতে বিদ্যালয় শিক্ষার বিধিসম্মত পাঠ্যসূচিতে স্থান পাবে। ‘গৌরবময় সংস্কৃতি’ বিদ্যা ভারতীর দাবি: ‘নতুন প্রজন্মের মধ্যে একটি গৌরবময় সংস্কৃতির বার্তা পৌঁছে দিতেই’ তাদের বিদ্যালয়গুলিতে সাংস্কৃতিক সচেতনতার পরীক্ষার প্রবর্তন করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে বিদ্যা ভারতীর আধিকারিক দেবাংশু কুমার পতি দাবি করেছেন তাদের পুস্তকের বিষয়বস্তু গভীর গবেষণার ফসল। তিনি বলেছেন, ‘আমরা ছাত্রদের সেই ইতিহাস সম্পর্কেই অবগত করতে চাই যা হিন্দুদের মধ্যে হীনমন্যতা জাগাতে ঔপনিবেশিক ও মার্কসবাদী ঐতিহাসিকরা চেপে রেখেছিল’। কিন্তু মার্কসবাদীরাই শুধু নয়, অন্য ইতিহাসবিদদের পাশাপাশি বিজ্ঞানী ও অন্য সমালোচকরাও অভিযোগ তুলে বলছেন যে মোদী সরকার নিজেদের হিন্দু জাতীয়তাবাদী কর্মসূচির লক্ষ্য পূরণে বিদ্যালয়স্তরের পাঠক্রমগুলি বদলে দিচ্ছে। সেন্টার ফর দ্য স্টাডিজ অব ডেভেলাপিং সোসাইটিজ-এর সহযোগী অধ্যাপক হিলাল আহমেদ বলেছেন, যে কাউকেই নতুন ইতিহাস বলার জন্যে অভিযুক্ত করা যাবে না, ‘যেহেতু অতীতের আবিষ্কার সবসয়ই নিহিত থাকে ভবিষ্যতের গর্ভে, যদি ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে যথাযথ পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়’। তাঁর বক্তব্য, ‘যেহেতু ইতিহাস রচনা একটি জটিল প্রক্রিয়া, গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসবিদরা তথ্যের উৎস যাচাই করার পাশাপাশি নানা পদ্ধতি ও প্রকরণের বিকাশ ঘটিয়েছেন, যেখানে উৎসের উল্লেখ করে কীভাবে আহরিত তথ্যের ব্যাখ্যা হচ্ছে এবং যোগসূত্রগুলি প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে তার বিবরণ দেওয়া হয়। কিন্তু এই বিদ্যালয়গুলি গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসের উল্লেখ করার যে পদ্ধতি অবলম্বন করা হয় তা অনুসরণ করে না।’ তাদেরকে ‘ছাত্র বিরোধী’ আখ্যায়িত করে হিলাল আহমেদ বলেছেন, সংস্কৃতি বোধমালার বইগুলি এমনভাবে ইতিহাসকে উপস্থাপন করে যেন তারা ‘অতীত সম্পর্কে চূড়ান্ত সত্যটি’ আবিষ্কার করে ফেলেছে। তিনি বলেছেন, ‘তারা জ্ঞানচর্চার এমন একটি ধরনকে প্রবর্তন করছে, যার মাধ্যমে ছাত্ররা অতীত সম্পর্কে নিজেদের অনুধাবনগুলি খুঁজবে না। ভবিষ্যতে, অতীত নিয়ে নতুন করে ভাবার তাদের পথটিই আটকে দেওয়া হচ্ছে।’ আর এজন্যেই তিনি তাদেরকে ‘ছাত্র বিরোধী’ বলেছেন। ভারতের শ্রেষ্ঠ মহাকাশবিজ্ঞানী জয়ন্ত বিষ্ণু নারলিকার তাঁর ২০০৩ এ প্রকাশিত ‘দ্য সায়েন্টিফিক এজ: দ্য ইন্ডিয়ান সায়েন্টিস্ট ফ্রম ভেদিক টু মডার্ন টাইমস’ বইয়ে তাদের বহু দাবিকে নস্যাৎ করে দিয়েছেন। নারলিকার লিখেছেন, ‘তাঁরা যে ব্রহ্মাণ্ড নিয়ে কৌতুহলী ছিলেন এ সম্পর্কে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্ত এটা কিছুতেই মানা যায় না যে, আজ যা কিছু আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, তার সবটাই তাঁদের জানা ছিল।’ ২০২৩ সালে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থার (ইসরো) প্রধান এস সোমনাথ দাবি করেন, ধাতুবিদ্যা, জ্যোতির্বিজ্ঞান, জ্যোতিষ এবং আকাশযান বিষয়ক শাখার গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির সবকিছুই প্রাচীন ভারতে ঘটেছিল এবং সেটাই্ পরবর্তীকালে আরবরা ইউরোপে নিয়ে যায়। এক বিবৃতিতে ব্রেকথ্রু সায়েন্স সোসাইটি (বিএসএস) পালটা প্রশ্ন তুলেছে, ‘জ্যোতির্বিজ্ঞান, বৈমানিক বিজ্ঞান ইত্যাদির উন্নত জ্ঞান যদি সংস্কৃত ভাষায় লেখা প্রাচীন গ্রন্থগুলিতেই পাওয়া যায়, তবে সেগুলি ইসরো ব্যবহার করছে না কেন?’ বিবৃতিতে তাদের জিজ্ঞাসা, ‘তিনি (সোমনাথ) কি একটি প্রযুক্তি বা তত্ত্বের দৃষ্টান্ত দেখাতে পারবেন, ইসরো যেটা বেদ থেকে গ্রহণ করে মহাকাশযান বা উপগ্রহ নির্মাণে ব্যবহার করেছে।’ বিএসএস একটি কলকাতা ভিত্তিক যুক্তিবাদী বিজ্ঞানীদের গোষ্ঠী। প্রান্ত থেকে কেন্দ্র দক্ষিণপন্থী হিন্দুদের প্রিয় রঙের নিরিখে সমালোচকেরা বিদ্যা ভারতীর এই সুনির্দিষ্ট ধরনের ইতিহাস তুলে ধরাকে আখ্যায়িত করেছেন ‘ইতিহাসের গৈরিকীকরণ’ নামে। এটা মোদী সরকার ও তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানগুলির অনুসৃত কর্মপদ্ধতি। সংস্কৃতি বোধমালার বইগুলি প্রকাশ করেছে বিদ্যা ভারতী সংস্কৃতি শিক্ষা সংস্থান যার প্রাক্তন সভাপতি গোবিন্দ প্রসাদ শর্মা ২০২১ সালে বিজেপি সরকার গঠিত জাতীয় পাঠক্রমকাঠামোর পরিচালন সমিতির সদস্য ছিলেন। সরকারি বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তক রচনার ভিত্তি হিসেবে জাতীয় পাঠক্রম কাঠামো তৈরি জন্যে সরকার পরিচালিত এনসিইআরটি যে ২৫টি ফোকাস গ্রুপ বা প্রধান গোষ্ঠী গঠন করেছে, তার পাঁচটিতে বিদ্যা ভারতীর কর্মকর্তারাই সদস্য হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। বিদ্যা ভারতীর কেন্দ্রীয় সভাপতি ডি, রামকৃষ্ণ রাও-এর মতে তাদের বিদ্যালয়ের ‘প্রবীণ ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের’ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে সরকারি বিদ্যালয়ের পাঠ্যবই রচনার জন্যে মনোনীত করা হয়েছে। ২০২১ সালে একটি দক্ষিণপন্থী ওয়েবসাইটে একটি নিবন্ধে রাও লিখেছেন, ‘সরকারের নীতি (শিক্ষা) প্রণয়নে বিদ্যা ভারতীর তরফ থেকে বিগত প্রায় পাঁচবছর ধরেই সর্বান্তকরণে সহায়তা প্রদান করা হয়েছে’। তাদের বেশকিছু বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষও পদাধিকারীরা জাতীয়স্তরে শিক্ষকদের পেশাগতমান নির্ণয়সংক্রান্ত কমিটির সদস্য এবং জাতীয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে গঠিত প্রতিটি রাজ্যের টাস্কফোর্সের সদস্য যারা ‘সক্রিয়ভাবে তদারকির’ প্রক্রিয়ায় রয়েছে। হিন্দু-মনকে তরুণ বয়সেই পাকড়াও করা ১৯৯৯ থেকে ২০০৪ পর্বে যখন বিজেপি কেন্দ্রে প্রথম সরকার গঠন করে, তখনও একইভাবে পাঠ্যসূচি পরিবর্তনের প্রচেষ্টা হয়েছিল। এই প্রকল্পের জন্যে যে নামটি তখন উঠে আসে তিনি বিদ্যা ভারতীর সাধারণ সম্পাদক দীননাথ বাত্রা। ২০০৪ সালে মোদী কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পরপরই তার নিজের রাজ্য গুজরাটে বাত্রার বইগুলিকে বিদ্যালয়স্তরে বাধ্যতামূলক করা হয়। বাত্রা হিন্দু জাতীয়তাবাদী ইতিহাসবিদদের মধ্যে পথিকৃৎ। যদিও রোমিলা থাপার বা ইরফান হাবিবের মত আবিশ্বমান্য ইতিহাসবিদ তাকে অভিযুক্ত করেন ইতিহাস ও ভূগোল এই দুইয়েরই কল্পকথায় রূপান্তর ঘটানোর জন্যে। হিন্দু জাতীয়তাবাদের উপর নানা বই ও মোদীর একটি জীবনীর লেখক সাংবাদিক নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায় বলেছেন, শিক্ষা সহ জীবনের সমস্ত দিকের উপর একাধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করার আরএসএস বৃহত্তর প্রকল্পের অংশই হচ্ছে বিদ্যা ভারতীর বিদ্যালয়গুলি। মুখোপাধ্যায় আরো বলেছেন, সারা দেশ জুড়ে আরএসএস-এর তরফে এমন একটি বিদ্যালয়সমূহের শাখাপ্রশাখা তৈরির পেছনের ভাবনাটি হচ্ছে, ‘হিন্দু মনকে তরুণ বয়সেই পাকড়াও করে তাতে অতীতের হিন্দু অপরাজেয়ত্বের ভাবনা প্রোথিত করে দেওয়া। এমন একটি অতীত যখন হিন্দু ভারত ছিল বিশ্বের সমস্ত জাতির প্রভু জাতি এবং ভারতীয় সভ্যতার সেই সোনার পাখিটিকে প্রথমে মুসলিম ও পরে খ্রিস্টান ঔপনিবেশিক শক্তির অধীন হাজার বছরের দাসত্ব।’ তিনি বলেছেন, ‘মোদীর শাসন তাদের সামনে একটি সেরা সুযোগ এনে দিয়েছে বিশ্বব্যাপী হিন্দু সমাজের শ্রেষ্ঠত্বের অতীত গৌরব পুনরুদ্ধারের। তুমি যদি এই ভাবনাগুলি শিশুমনে গেঁথে দিতে পারো, তবে তারা মুসলিম ও খ্রিস্টানদের প্রতি তীব্র ঘৃণা নিয়ে বড় হবে। এমন একটি বার্তা হিন্দুদের মনে সতত একটিবিকারের জন্ম দেবে যার মাধ্যমে গোটা বিশ্ব হিন্দুদেরপ্রভুত্বের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীহিসেবে প্রতীয়মান হবে’। শিরোনাম মার্কসবাদী পথ পত্রিকার
প্রকাশের তারিখ: ২৯-ফেব্রুয়ারি-২০২৪ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |