|
বর্বরতার বিরুদ্ধে মানবতার দাবিকুমার রাণা |
বিপদটা ভারতকে কেবল হিন্দু-রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা নয়, সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের মতো ধারণাগুলোর অবলুপ্তি নয়, বিপদটা ভারতবাসীর স্বাধীন দেশের নাগরিক অস্তিত্বের। কেবল মুসলমান নিধন নয়, কেবল নীচু জাতের লোক, নারী, আদিবাসী ও সভ্যতায় বিশ্বাসী মানুষের ওপর অত্যাচারই নয়, অত্যাচারটা নেমে আসছে সমগ্র মানব সমাজের ওপর। যে উগ্র দক্ষিণপন্থা আজ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধ, নরসংহার, ক্ষুধা, অপুষ্টি, অশিক্ষার মতো বর্বরতাকে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক নিয়মে পরিণত করে তুলছে, ভারতের একক প্রভুত্ববাদী বর্বরতা সেই মানববিদ্বেষী পরিকল্পনাটিকে বাস্তব ও সর্বব্যাপী করে তুলছে। |
সেদিন আমরা মুহ্যমান হয়েছিলাম। ৬ই ডিসেম্বর ১৯৯২। সেদিন আমরা অনেকে মুখে অন্ন তুলতে পারিনি। পারিনি, কারণ, সেদিন কেবল একটি সৌধকেই ভেঙ্গে ফেলা হল না, ভেঙ্গে ফেলা হল মানবসভ্যতার একটি নিদর্শনকে। সৌধটি কার জমির ওপর বানানো, কার সৌধ ভেঙ্গে বানানো, কার দ্বারা বানানো– এই প্রশ্নগুলোই বর্বরতা সঞ্জাত। একটি সৌধ, মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি, শৈল্পিক কল্পনা এবং কারিগরি কুশলতা মিলে যার নির্মাণ, সভ্যতা সেটাকে গ্রহণ করে মানুষের সৃষ্টি হিসেবে– সে-মানুষকে, কোন দেশে তার জন্ম, কোথাকার সে নাগরিক, এ-সব কথা সভ্যতার কাছে অবান্তর। অথচ, ঠিক এই অবান্তর কথাগুলিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠল বর্বরতার এমন এক পাঠক্রম, যার কাছে বিচার-বুদ্ধি, যুক্তি, প্রশ্নোত্তর, ইত্যাদির কোনো দাম নেই। ৬ই ডিসেম্বর ১৯৯২ ছিল বর্বরতার এই পাঠক্রমের ফলিত প্রয়োগের এক সূচনা। সে-প্রয়োগ ছিল ঈশ্বরের নামে ঈশ্বরের বিভাজন– যে বিভাজন নাকি ঈশ্বরবিশ্বাসীরাই মানতে চান না। আমরা মুহ্যমান হয়েছিলাম। কিন্তু, পাশাপাশি আশায় বুকও বেঁধেছিলাম– ভারতবর্ষের মৃত্তিকা বর্বরতাকে প্রশ্রয় দেবে না। বহু শ্রমে, বুদ্ধিবৃত্তির অনুশীলনে, ভারতবাসীর মিলিত প্রয়াসে গড়ে ওঠা সংবিধান, আইন, আদালত, গণতান্ত্রিক রাজনীতি, বহু ভাষা-ধর্ম-আঞ্চলিকতা নিয়ে গড়ে ওঠা বৃহত্তর ভারতীয় সমাজ, এ-দেশের মানবিক চিন্তার বিকাশ ও তার সভ্যতাকে রক্ষা করবে। বিশ্বকে পথ দেখাবে– বিভিন্নতার সাহায্য নিয়ে কীভাবে বিভাজনকে দূর করা যায়। বহু মানুষের সম্মিলিত চিন্তা ও কর্মের মধ্য দিয়ে কীভাবে পৃথিবীর মানবসভ্যতাকে পুষ্ট ও অগ্রসর করে তোলা যায়। আমাদের কল্পনায় কোনো ভুল ছিল না। ভারতের নির্মাণে ভারতীয়ত্বের সঙ্গে বিশ্ববোধের যে সম্মিলন ঘটেছিল, নানান অপূর্ণতা সত্ত্বেও তা হয়ে উঠেছিল আমাদের গর্বের বস্তু। কিন্তু, বিশ্বমানবের সঙ্গে ভারতবাসীর মানবিক সংযোগ নিয়ে আমাদের স্বপ্ন যতখানি প্রসারিত ছিল, তাকে রূপ দেওয়ার জন্য যে মেহনত ও মানসিক দৃঢ়তার প্রয়োজন ছিল, তাতে বাস্তবিকই অনেক খামতি ছিল। তাই একদিকে যেমন বর্বরতা তার পূর্ণ স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করতে পারল, তেমনি তার দুর্বৃত্তির অহংকার ও আস্ফালনের বিরুদ্ধে বৃহত্তর মানব-সংহতি গড়ে তোলা দূর, এই সংহতিকে একটা কর্তব্য হিসেবে চিহ্নিত করাটাও সম্ভব হল না। ক্রমে, তিন দশকের মধ্যে বর্বরতার আস্ফালনই হয়ে উঠল ভারতীয় সমাজ ও রাজনীতির প্রভু। বর্বরতার এ-এক ভিন্নতর রূপ, বিভাজন যার ভিত্তি। উত্তরপ্রদেশের ফৈজাবাদ জেলার অযোধ্যাতে, ষোড়শ শতাব্দীতে নির্মিত বাবরি মসজিদ নামক সৌধটিকে চূর্ণ করাটা যতটা না ছিল ভগবানের অবতার হিসেবে বিশ্বাস করা রামের জন্মভূমিকে উদ্ধার করার বাসনা, তার চেয়ে অনেক বেশি ছিল মানুষের ওপর মানুষের প্রভুত্ব স্থাপন করার প্রকল্প। এবং, সভ্যতাকে যদি মূল্যবান মনে করতে হয়, মানুষের ওপর মানুষের প্রভুত্বকে অস্বীকার করতেই হবে। সেটা না-করে, বাবরি মসজিদ ধ্বংসকে কেবল ভারতের মুসলমানদের ওপর আক্রমণ বা ভারত রাষ্ট্র থেকে ধর্মনিরপেক্ষকতাকে বিসর্জন দেবার উদ্যোগ হিসেবে দেখলে সেটা হবে, অস্পষ্ট ও খণ্ডীকৃত একটা দেখা। অথচ, ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক হিসেবে নিজেদের দাবি করা বিভিন্ন শক্তি, বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনাটিকে এ-ভাবেই দেখে এসেছে। আর এর রাজনৈতিক সংগঠক ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)কে দেখে এসেছে নিছক এক সংসদীয় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দী হিসেবে। কিন্তু সত্য হল এই, বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনাটি আসলে বহুসংখ্যক মানুষের ওপর কতিপয় লোকের প্রভুত্ব স্থাপনের একটা প্রকল্পের সূচনা। এ-প্রকল্পেরর সম্মুখভাগে আছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি), কিন্তু অন্তর্ভাগে একদিকে রয়েছে হিন্দুত্ব-ভিত্তিক বিভাজন সৃষ্টিকারী মতাদর্শ প্রচার ও স্থাপন করে চলা বিভিন্ন সংগঠন, এবং অন্যদিকে পুঁজির সার্বভৌমত্ব কায়েম করার জন্য অধীর হয়ে ওঠা নানান ব্যবসায়িক মস্তিষ্ক। এই দুই প্রকারের বিভাজক শক্তিরই প্রধান আদর্শগত ভিত্তি হচ্ছে বর্বরতা, যার ওপর ভিত্তি করে আজকের বিজেপি শাসিত ভারতবর্ষে সভ্যতার সকল চিহ্ন মুছে দেবার নানা উপক্রম: বহু পরিশ্রমে ও অভিজ্ঞতায় নির্মিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে একে একে ভেঙ্গে ফেলা, সংবিধান সংশোধন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার মধ্যে কষ্টার্জিত কিন্তু সীমিত যে-সব আধুনিকতা অর্জিত হয়েছিল সেগুলোকে বিসর্জন দেওয়া, শ্রমজীবীদের জন্য সহায়ক সামান্য যেটুকু আইনী ও প্রশাসনিক সুবিধা ছিল সেগুলোকে বিলুপ্ত করা, আদিবাসী ও প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল গোষ্ঠীগুলোর জন্য রচিত আইনী সুরক্ষা তুলে দেওয়া, নারীদের এক কল্পিত স্বর্ণযুগে লালিত সতীত্বের অবগুন্ঠনে আবৃত করা এবং প্রজার ওপর বলপ্রয়োগের জন্য নির্মিত নানান প্রতিষ্ঠানের হাতে অবাধ ক্ষমতা প্রদান। ৬ই ডিসেম্বরের পর যত দিন গেছে, ততই এর সংগঠকরা বলশালী হয়ে উঠেছে, যে-বলের প্রয়োগের মধ্যে দিয়ে ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদীর প্রধানমন্ত্রীত্বে সরকার গঠন। এর পর তাদের আর পিছনে তাকাবার প্রয়োজন পড়েনি– ধর্মীয়, জাতপাতকেন্দ্রিক, এবং ভাষাগত বিভাজনকে হাতিয়ার করে যে ক্ষমতার উত্থান, পুঁজির পরাক্রমকে কাজে লাগিয়ে সেই আধিপত্যকে চিরস্থায়ী করে তোলার আয়োজন। সত্যকে সহজে গ্রহণ করি বা না-করি, তাকে মানতে হবে। আজ আমাদের না-মেনে উপায় নেই যে, বর্বরতার আধিপত্যের আয়োজন অনেকখানি সম্পূর্ণ। সংবিধান বিপন্ন। নাগরিকত্ব বিপন্ন। এতদিন যে অশিক্ষাকে সামাজিক স্তরে গড়ে তোলা হচ্ছিল, আজ তা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অঙ্গ। মানুষের স্বাস্থ্যকে সম্পূর্ণত কেনাবেচার সামগ্রী করে তোলার কাজ মোটামুটি পাকা। মজুরি, কর্মদিবস, কাজের সময়, ইত্যাদি নিয়ে যেটুকু সুরক্ষা ছিল, তাকে শুধু যে অবলুপ্তি করে ফেলা হচ্ছে তাই নয়, এ-সবও যে কোনোসময় দেশের ব্যবস্থার মধ্যে ছিল, সেগুলোকেও ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। প্রকৃতিকে রিক্ত করে, তাকে লুণ্ঠন করার ছাড়পত্র পেয়ে গেছে কতিপয় পুঁজিমালিক। বিরোধিতার ইঙ্গিতমাত্রকেও সহ্য করা হচ্ছে না, জেলে পোরা হচ্ছে সাংবাদিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মী, বিদ্যাবেত্তা এবং সমাজে সভ্য কণ্ঠক্ষেপকারী মানুষদের। অন্যদিকে, গোটা আগ্রাসনটাকেই “মানুষের রায়” বলে চালানোর জন্য, নির্বাচনী প্রকরণে রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগ থেকে নিয়ে বিবিধ অসাধু, অসামাজিক কর্মকাণ্ডকে ব্যবহার করে সভ্য রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে অপসৃত করা হচ্ছে। সামনেই আর একটি সাধারণ নির্বাচন, যাকে পুরোপুরি তামাশায় পরিণত করে ভারতীয় রাষ্ট্র ও সমাজের ওপর বর্বরতার নিরঙ্কুশ আধিপত্য কায়েম করার নীল নকশা রচিত হয়ে আছে। বিপদটা ভারতকে কেবল হিন্দু-রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা নয়, সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের মতো ধারণাগুলোর অবলুপ্তি নয়, বিপদটা ভারতবাসীর স্বাধীন দেশের নাগরিক অস্তিত্বের। কেবল মুসলমান নিধন নয়, কেবল নীচু জাতের লোক, নারী, আদিবাসী ও সভ্যতায় বিশ্বাসী মানুষের ওপর অত্যাচারই নয়, অত্যাচারটা নেমে আসছে সমগ্র মানব সমাজের ওপর। যে উগ্র দক্ষিণপন্থা আজ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধ, নরসংহার, ক্ষুধা, অপুষ্টি, অশিক্ষার মতো বর্বরতাকে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক নিয়মে পরিণত করে তুলছে, ভারতের একক প্রভুত্ববাদী বর্বরতা সেই মানববিদ্বেষী পরিকল্পনাটিকে বাস্তব ও সর্বব্যাপী করে তুলছে। আমাদের পিঠ ও দেওয়ালের মধ্যে ব্যবধান নেই বললেই চলে। মুখ গুঁজে পড়ে থাকার মতো বালুকারাশিও হাতের নাগালে নেই। ভঙ্গুর এই সময়ে যদি কিছু থাকে, তা হল মানবতাকে রক্ষা করার প্রতিজ্ঞা। বর্বরতার ভয়ানক হুংকারের মধ্যেও আমাদের সামনে একটা সুযোগ আছে। বর্বরতা আক্রমণ নামিয়ে এনেছে যাবতীয় ভিন্নতাগুলোর ওপর: দেশ, জাতি, ধর্ম, ভাষা, লিঙ্গ, রাজনৈতিক মত– কোনো কিছুই তার লক্ষের বাইরে নয়। এটাকেই আমরা সুযোগ হিসেবে দেখতে পারি: ভিন্নতাগুলোর মধ্য থেকেই ঐক্য গড়ে তোলার সুযোগ। এই ঐক্যের সাহায্যেই গড়ে উঠতে পারে দুর্বল সহনাগরিকদের নিজস্ব কণ্ঠস্বর গড়ে তোলার মতো সক্ষমতা; তাঁদের নিজস্ব উদ্যোগে গড়ে উঠতে পারে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি ঘোষিত দায়বদ্ধতার সসম্মান রূপায়ণ। নির্মিত হতে পারে ধর্মনিরপেক্ষতার নতুন অর্থ, শুধু ধর্মীয় পক্ষপাত থেকে মুক্ত থাকা নয়, ধর্মনিরপেক্ষতার অনুশীলন হবে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে। আর গণতন্ত্র শক্তিশালী হতে পারে, মানুষের ওপর মানুষের প্রভুত্বের ধারণাটিকে সম্পূর্ণত পরাভূত করে– একক নেতার বিপরীতে অন্য কোনো একক নেতাকে তুলে ধরে নয়, নেতৃত্বকে একক ক্ষমতার মোহময় প্রদর্শন হিসেবে গড়ে তুলে নয়, তাকে সামূহিক করে তুলেই আমরা প্রভুত্বের বর্বরতাকে পরাজিত করতে পারি। আমাদের দৈনন্দিন আচরণে, আমাদের ভাষায়, আমাদের বাক্যালাপে, প্রভুত্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধঘোষণার এই বার্তাটি পৌঁছে দেওয়ার ব্যাপারে কালক্ষেপ করার বিলাসিতা দেখানোর উপায় নেই। বর্বরতার বিরুদ্ধে সংগঠন গড়ে তোলার এটাই প্রাথমিক ধাপ, এটাই অন্তিম বিজয়ের সম্ভাবনা। প্রকাশের তারিখ: ০৬-ডিসেম্বর-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |