হাইড্রোকার্বন থেকে সৌরশক্তি: কোন পথে দাঁড়িয়ে পৃথিবী?

শান্তনু ঝা
ভারতবর্ষ লিথিয়াম -ব্যাটারি ব্যবহারের ক্ষেত্রে এখনও পুরোপুরি আমদানি নির্ভর। এর প্রায় পুরোটাই আমদানি করা হয় চীন এবং হংকং থেকে। আর্জেন্টিনা এবং অষ্ট্রেলিয়ায়  লিথিয়াম এবং কোবাল্ট নিষ্কাশনে ভারত কিছুটা বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু সাধারণ ভাবে লিথিয়াম উত্তোলন এবং নিষ্কাশনে ৫-৭ বছরের একটা গর্ভসঞ্চার কাল বা জেস্টেশন পিরিয়ড লাগে। এসমস্ত কাজের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তিবিদের অভাব ও রয়েছে এদেশে। ফলে, ভারতবর্ষের নিজস্ব লিথিয়াম উৎপাদন ও নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অগ্রগতি ঘটানোও সময় সাপেক্ষ বিষয়।

আধুনিক পৃথিবীতে সমস্ত দেশের কাছেই শক্তি নিরাপত্তার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একথা বললে অত্যুক্তি হবে না, আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটা বড় অংশই শক্তি নিরাপত্তার প্রশ্নে আবর্তিত হয়। এতদিন পর্যন্ত তা থেকেছে মুখ্যতঃ হাইড্রো-কার্বন বা ফসিল ফুয়েল-কেন্দ্রিক। কিন্তু শক্তির সে উৎস তো পুনর্নবীকরণ যোগ্য নয়। সে শক্তির ব্যবহার ছাড়া আমাদের কাছে বিকল্প কোনও রাস্তা না থাকলেও, তার সীমিত ভাণ্ডার এবং সে শক্তি ব্যবহারের ফলে তার যে বহুমাত্রিক প্রভাব পরিবেশের ওপর পড়ছে, তার হিসেবনিকেশ এখন আমাদের হাতের কাছেই রয়েছে। শক্তি ব্যবহারের বিশ্ব চালচিত্রের দিকে তাকালে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, আমাদের ৬৩ শতাংশ নির্ভরতা কিন্তু এখনও সেই ফসিল ফুয়েলের ওপরেই। বিদ্যুৎ নির্ভরতা মাত্র ২২ শতাংশ। সেই বিদ্যুতের মধ্যে আবার মাত্র ২৮ শতাংশ পুনর্নবীকরণযোগ্য উৎসের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বিশ্ব উষ্ণায়ন নিয়ন্ত্রণের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রায় পৌছোতে হলে ২০৫০ সালের মধ্যে আমাদের বিদ্যুৎ নির্ভরতা বেড়ে দাঁড়াবে ৫১ শতাংশে। ফসিল ফুয়েলের ব্যবহার কমিয়ে নিয়ে আসতে হবে ১২ শতাংশে। শক্তির উৎস হিসেবে হাইড্রোজেনের ব্যবহার এখনও একেবারে প্রাথমিক অবস্থায়। কিন্তু সে উৎসের ব্যবহারেও বিপুল বৃদ্ধি ঘটিয়ে ব্যবহার্য পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির ১৪ শতাংশ-এ পৌঁছোতে হবে।

পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির উৎসগুলি তো অফুরন্ত! কিন্তু সে শক্তি ব্যবহারযোগ্য করে তুলতে হলেও কোনও না কোনও ভাবে সীমিত খনিজ উৎসের ওপর আমাদের নির্ভর করতে হবে।

আজকের আলোচনায়, অন্য বিষয়গুলি বাদ দিয়ে আমরা ব্যবহার্য বিদ্যুতের উৎস হিসেবে সৌরশক্তির কথা আলোচনা করবো। এই শক্তি ব্যবহারেও আমাদের এখনও পর্যন্ত লিথিয়ামের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তাহলে কি, বিশ্ব রাজনীতির ভরকেন্দ্র খনিজ হাইড্রোকার্বনের ভাণ্ডারগুলি থেকে সরে গিয়ে লিথিয়ামের ভাণ্ডরের ওপর পড়বে? সেটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু তার সাথে সাথে সে উৎসের ব্যবহারে বিজ্ঞান প্রযুক্তিগত দক্ষতার প্রশ্নটি নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। এই লিথিয়াম ভাণ্ডার নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা চললেও,তার বাস্তব চেহারা কি তা আলোচনা করা অত্যন্ত জরুরি।

লিথিয়াম ও  বিশ্বের শক্তি বাজারের (এনার্জি মার্কেট) এর ব্যবসায়িক যুদ্ধ:

লিথিয়ামের অতুলনীয় শক্তি সংরক্ষণ ক্ষমতাই সৌরশক্তির মতো পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির ভাঁড়ারকে আমাদের কাছে ব্যবহারযোগ্য করে তুলেছে ।

একটি লিথিয়াম ব্যাটারি যখন শেল প্রতি ৩ ভোল্ট শক্তি উৎপাদন করতে পারে,তখন একটি লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি উৎপাদন করে ২.১ ভোল্ট আর জিঙ্ক-কার্বন শেল করে ১.৫ ভোল্ট। সেইজন্যই বড় আকৃতির ব্যাটারির পরিবর্তে বোতাম ব্যাটারি গুলি আধুনিক যন্ত্রপাতিতে ব্যবহৃত হচ্ছে।

লিথিয়াম কোথায় না লাগে! লাগে, অ্যালুমিনিয়ামের মতে তাপপ্রবাহী সঙ্কর ধাতু তৈরিতে, সিরামিকস ও লেন্স তৈরিতে, গ্রিজ থেকে শুরু করে রকেট প্রপেল্যান্ট, এমনকি হাইড্রোজেন বোমা তৈরিতে, অ্যান্টি ডিপ্রেসন ড্রাগ তৈরিতে লাগে লিথিয়াম। আর ইলেকট্রিকাল বা ইলেকট্রনিক গ্যাজেটে তো কথাই নেই।লিথিয়াম ব্যাটারি ছাড়া সেখানে চলেই না। এখন ই-ভেহিকল বা ব্যাটারি চালিত এবং হাইব্রিড গাড়িতে ও লিথিয়াম ব্যাটারিই ভরসা। এর মূল কারণ, এহেন ব্যাটারিতে কম আয়তনে অনেক বেশি শক্তি সংরক্ষিত থাকে।

কিন্তু সমস্যা তো সেই একটাই।এহেন খনিজের ভাঁড়ারও তো সীমিত। অথচ লিথিয়ামের চাহিদা বাড়ছে বিপুল গতিতে। অদূর ভবিষ্যতে লিথিয়ামের চাহিদা বাড়বে, ৪০০-৪০০০ শতাংশ। স্বাভাবিক ভাবেই,সরবরাহের পরিমাণকে কে বিপুল চেহারায় ছাপিয়ে যাবে চাহিদা। ফলে, লিথিয়াম অক্সাইডের উৎস গুলির দিকে নজর পড়েছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাগুলির।

লিথিয়াম ভাণ্ডার

লিথিয়াম পাওয়া যায় দু’ধরনের উৎস থেকে। প্রথমতঃ পাথুরে খনিজের চেহারায়। এহেন চেহারায় লিথিয়াম পাওয়া যায় মূলতঃ অষ্ট্রেলিয়ায়। এর থেকে যে রাসায়নিক লিথিয়ামে রূপান্তর ঘটানো হয়,তা করে মূলতঃ চীন। এর বাইরে আছে নোনা জলে মিশে থাকা লিথিয়াম। বহু সহস্র বছর আগে এই সমস্ত অঞ্চল সমুদ্রের তলদেশ হিসেবে থাকায়, এই এলাকাগুলি নোনা মরুভূমির চেহারা পেয়েছে। এর উপরিস্তরের ঠিক নীচে নোনা জলে মিলে মিশে দ্রবীভূত চেহারায় থাকে লিথিয়াম। এহেন চেহারায় থাকা লিথিয়ামের ৯২ শতাংশই পাওয়া যায় বলিভিয়া, আর্জেন্টিনা, চিলি, চীন এবং আফগানিস্তানে।  দক্ষিণ আমেরিকার লিথিয়াম ত্রিভূজ (বলিভিয়া-চিলি-আর্জেন্টিনা) হিসেবে চিহ্নিত এলাকাই লিথিয়ামের মূল ভাঁড়ার। হিসেবে দেখা যাচ্ছে, দক্ষিণ আমেরিকার দেশ গুলিতেই পৃথিবীর ৭১ শতাংশ লিথিয়াম জমা রয়েছে। এর মধ্যে, বলিভিয়াতেই রয়েছে ৩ ৪শতাংশ, চিলিতে ৩১ শতাংশ আর আর্জেন্টিনায় রয়েছে ৬ শতাংশ। এ জাতীয় নোনা উৎস থেকে সংগৃহীত লিথিয়াম ব্যবহৃত হয় লিথিয়াম কার্বনেট, হাইড্রক্সাইড এবং ক্লোরাইড উৎপাদনে।

লিথিয়াম ব্যবহারের গতিপ্রকৃতি

২০০০ সালের পর থেকে লিথিয়ামের বাণিজ্যিক উৎপাদনের বিপুল বৃদ্ধি ঘটছে। চারটি বহুজাতিক কোম্পানি লিথিয়াম উৎপাদনের ৮০শতাংশ এর অংশীদার। অংশীদারিত্বের হিসেব অনুযায়ী কোম্পানি গুলো হলো: ট্যালিসন (৩৫ শতাংশ), এসকিউএম (২৬ শতাংশ), রকউড (১২ শতাংশ), এফএমসি (৭ শতাংশ)।

অষ্ট্রেলিয়ার পাথুরে লিথিয়াম নিষ্কাশন করে মূলতঃ লিথিয়াম কার্বনেট বিক্রি করে ট্যালিসন। চীন হলো এর মূল ক্রেতা। উচ্চমানের কাঁচ এবং সিরামিক তৈরিতেও এই লিথিয়াম ব্যবহৃত হয়। এহেন ট্যালিসন-এর ৫১ শতাংশ শেয়ার ২০১৪ সালে কিনে নিয়েছে চীনের চেংডু টিয়াঙ্কিi নামের কোম্পানি। এরা লিথিয়াম নির্ভর নানা রাসায়নিক উৎপাদন করে। ট্যালিসন-এর বাকি ৪৯ শতাংশ এর অংশিদার জার্মানির রকউড কোম্পানি। চীনের এই চেংডু টিয়াঙ্কি নামের কোম্পানিটি দ্রুত নয়া শক্তি উৎপাদক কোম্পানি হিসেবে বিশ্ববাজারে আবির্ভূত হয়েছে। এরা লিথিয়াম নির্ভর শক্তি উৎপাদনকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

সারা পৃথিবীতে লিথিয়াম ব্যবহার বৃদ্ধির গতি ভবিষ্যৎ চাহিদার একটা ইঙ্গিত দেয়। ২০০০-২০১২  লিথিয়ামের ব্যবহার বৃদ্ধি ঘটে ৬.৪ শতাংশ হারে। ২০১২-২০১৭ তে তা ছিলো ১১ শতাংশ হারে। ২০০০-২০১২তে প্রতি বছর লিথিয়াম নির্ভর ব্যাটারির ব্যবহার বৃদ্ধি পায় ২১ শতাংশ হারে, তা পরের ৫ বছরে বেড়েছে ২০০ শতাংশ। এই লিথিয়াম নির্ভর ব্যাটারি তৈরিতে কিন্তু বিশ্বগুরু (!) তিনটি এশীয় দেশ– চীন, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়া। তারাই ৮৫-৯০ শতাংশ লিথিয়াম আয়ন নির্ভর ব্যাটারি তৈরি করছে এবং বিশ্বের ৬০ শতাংশ লিথিয়ামও তারাই ব্যবহার করছে। অন্যদিকে, ইউরোপ ব্যবহার করছে মাত্র ২৪ শতাংশ এবং আমেরিকা ৯ শতাংশ লিথিয়াম। সর্বশেষ হিসেব চীন একাই সারা বিশ্বের উৎপাদিত লিথিয়ামের ৫০ শতাংশ ব্যবহার করছে।

এ থেকে আধুনিক শক্তি বাজারের ব্যবসায়িক যুদ্ধের চেহারাটা সহজেই অনুমেয়।


লিথিয়াম: কোথায় দাঁড়িয়ে ভারত?

ভারতে, জম্মু-কাশ্মীরের জম্মু অংশের রিজি জেলায় সালাল হাইমানা এলাকায় লিথিয়ামের ভান্ডারের সন্ধান দিয়েছে জিএসআই। তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হচ্ছে। তবে তা মিশে আছে কাদার সাথে। আর আছে ছত্তিশগড়ে কাঠঘোড়া অঞ্চলে।

লিথিয়ামের প্রাকৃতিক সম্ভার পাওয়া যায় মূলতঃ নোনা মরুভূমির তলায় নুন-জলে দ্রবীভূত অবস্থায়, পাথরের সাথে মেশানো অবস্থায় আর কাদার সাথে মেশানো চেহারায়।

খনিজ হিসেবে লিথিয়াম উত্তোলন প্রকৌশলে যেমন দক্ষতা প্রয়োজন হয়,তেমনই বিশেষ দক্ষতা লাগে তা নিষ্কাশনেও।

নোনা জলে দ্রবীভূত লিথিয়াম নিষ্কাশন প্রযুক্তি ইতিমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত চেহারা পেয়েছে। পাথরে মেশানো লিথিয়াম নিষ্কাশন পদ্ধতিও মোটামুটি মানোপযোগী বা স্ট্যান্ডারডাইসড হয়েছে। কিন্তু কাদা থেকে নিষ্কাশন পদ্ধতি এখনও পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে  নেভাদা উপত্যকার থ্যাকার গিরিবর্তে এই কাদার সাথে মিশে থাকা লিথিয়াম নিষ্কাশনের কাজে হাত দিয়েছে ‘লিথিয়াম আমেরিকাস’। কিন্তু তাদেরও একাজে পরিপূর্ণ ভাবে প্রস্তুত হতে সম্ভবতঃ ২০২৬ সাল হয়ে যাবে।

ভারতে লিথিয়াম ভাণ্ডার খানিকটা চিহ্নিত হয়েছে বটে,তবে তা একেবারে প্রাথমিক অনুসন্ধান স্তরে রয়েছে। ছত্তিসগড়ের পাথরে বা  জম্মুতে কাদায় মেশানো লিথিয়াম কি পরিমানে রয়েছে,তা এখনও পুরোপুরি নির্ধারিত নয়। যা তথ্য পাওয়া যাচ্ছে,আমেরিকার নেভাদা উপত্যকায় প্রাপ্ত কাদায় মেশানো লিথিয়াম এর পরিমাণ ভারতের থেকে অনেক বেশি। জম্মুতে লিথিয়াম মেশানো খনিজের পরিমাণ ৫.৯ মিলিয়ন টন হিসেব করা হলেও, তা থেকে নিষ্কাষণ-যোগ্য লিথিয়ামের পরিমাণ এতো কম, যে তার বাণিজ্যিক ব্যবহার কতোটা করা সম্ভব তা নিয়ে অভিজ্ঞজনেরা সন্দেহ প্রকাশ করছেন।

ভারতবর্ষ লিথিয়াম -ব্যাটারি ব্যবহারের ক্ষেত্রে এখনও পুরোপুরি আমদানি নির্ভর। এর প্রায় পুরোটাই আমদানি করা হয় চীন এবং হংকং থেকে। আর্জেন্টিনা এবং অষ্ট্রেলিয়ায়  লিথিয়াম এবং কোবাল্ট নিষ্কাশনে ভারত কিছুটা বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু সাধারণ ভাবে লিথিয়াম উত্তোলন এবং নিষ্কাশনে ৫-৭ বছরের একটা গর্ভসঞ্চার কাল বা জেস্টেশন পিরিয়ড লাগে। এসমস্ত কাজের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তিবিদের অভাব ও রয়েছে এদেশে। ফলে, ভারতবর্ষের নিজস্ব লিথিয়াম উৎপাদন ও নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অগ্রগতি ঘটানোও সময় সাপেক্ষ বিষয়।

অথচ, ভারতবর্ষ ইতিমধ্যে নীতিগত ভাবে ঘোষণা করেছে, ২০৩০ সালের মধ্যে,দেশে ব্যবহৃত ব্যক্তিগত যানের ৩০শতাংশ, বাণিজ্যিক যানের ৭০শতাংশ,২চাকা-৩চাকা যানের ৮০শতাংশই হবে ইলেকট্রিক ব্যটারি চালিত। এরজন্য যে পরিমাণ লিথিয়াম প্রয়োজন তার জোগান কোথা থেকে হবে, তা কিন্তু এখনও চিহ্নিতই করা হয়নি।

লিথিয়াম -প্রযুক্তির ওপর চীনের একাধিপত্যের  থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আমেরিকা,ইউরোপীয় ইউনিয়ন,কানাডা,ভারত বিকল্পের পথ খুঁজছে বটে,কিন্তু বিকল্পের প্রস্তুতি তো এখনও বহু যোজন পিছিয়ে।

লিথিয়াম নিষ্কাশনে দূষণের সম্ভাবনা কেমন?

সূর্য,শক্তির অপার ভাণ্ডার।এ শক্তিই পৃথিবীর জীবজগতে চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করে। কিন্তু এই শক্তিকে আরও বিপুল পরিমাণে ব্যবহারের সুযোগ মানব সমাজের কাছে আছে। আমরা যখন পৃথিবীর বুকে সঞ্চিত ফসিল ফুয়েলের সীমাবদ্ধতা নিয়ে চিন্তিত তখন বিকল্প হিসেবে,সৌরশক্তি ব্যবহারে গুরুত্ব দিচ্ছি।

কিন্তু সে সৌরশক্তি আবদ্ধকরণে আমাদের নির্ভর করতে হয় আরেক খনিজ,লিথিয়ামের ওপর। এ নিয়ে ইতিপূর্বে আমরা আলোচনা করেছি। কিন্তু সে লিথিয়াম সংগ্রহ ও ব্যবহারোপযোগী করে তোলার জন্য যে নিষ্কাশন ব্যবস্থা তা কতোটা দূষণ সৃষ্টি করতে পারে তারও একটা হিসেব নিকেশ প্রয়োজন। বিজ্ঞানীরা তারও একটা পরিমাপ ও সে দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য পদক্ষেপের চেষ্টা করছেন।

এ আলোচনার শুরুতে লিথিয়াম নিষ্কাশনের পদ্ধতিগুলির দিকে আমরা আরও একবার চোখ বুলিয়ে নিই।

লিথিয়ামের যে ভাণ্ডারগুলির ওপর মুখ্যতঃ আমাদের নির্ভর করতে হয় তার মধ্যে প্রধান হ'ল নোনা জলে মিশে থাকা ভাণ্ডার। এই ভাণ্ডারগুলিও আবার তিন চরিত্রেরঃ কনটিনেনট্যাল,জিওথার্মাল এবং তৈল ভাণ্ডারে জমাকৃত। তবে আমরা সব উৎস গুলি নিয়ে আলোচনায় না গিয়ে,মূলতঃ কনটিনেনট্যাল ব্রাইনের উৎস নিয়েই আলোচনা করবো। সারা পৃথিবীতে এমন ব্রাইনের প্রায় ৮টি কেন্দ্র থেকে লিথিয়াম নিষ্কাশনের কাজ চলছে। এগুলি মূলতঃ রয়েছে পশ্চিম অষ্ট্রেলিয়া, চিলি, চীন, আর্জেন্টিনায়।

এই ব্রাইন বা নোনা জল থেকে লিথিয়াম নিষ্কাশনের জন্য বাষ্পীভবন প্রযুক্তির ওপর মুখ্যতঃ আমাদের নির্ভর করতে হয়। উপরোক্ত আটটি সংগ্রহ ক্ষেত্রের মধ্যে,সাতটি ক্ষেত্রেই বাষ্পীভবন প্রযুক্তির ওপর আমাদের নির্ভর করতে হচ্ছে।আর সে প্রযুক্তিতে সুপেয় জল ব্যবহার করতে হয় বিপুল পরিমানে। এই প্রযুক্তিতে, মাটির তলদেশ থেকে লিথিয়াম মিশ্রিত নোনাজল প্রথমে পাম্প করে তুলে আনতে হয়। উত্তোলিত এ ধরনের জলের ৯০ শতাংশই বাষ্পীভূত করা হয়। তারপর ঘনীভূত এই নোনা জল লিথিয়াম নিষ্কাশন যন্ত্র বা রিফাইনিং প্ল্যান্টে প্রেরণ করা হয়।এরপর পুনঃপৌনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে  সোডিয়াম কার্বনেটের মতো রাসায়নিক সংযুক্তিকরণ ও ম্যাগনেসিয়াম, বোরেট ইত্যাদি পৃথকীকরণ,লিথিয়াম কার্বোনেট ধৌতিকরণ করা হয়। এই প্রক্রিয়া সঞ্জাত লিথিয়াম ক্লোরাইড বাদ দিলে বাকি ৯০শতাংশ নুনই জমা হয় ভূপৃষ্ঠে সৃষ্ট বিশেষ জলাশয় গুলিতে। যা কিন্তু সামগ্রিক লিথিয়াম উৎপাদন প্রক্রিয়া জাত জঞ্জাল।

এই প্রযুক্তিতে শক্তি ব্যবহার ও কার্বন ফুটপ্রিন্টের একটা সুসংহত তথ্য ভিত্তি তৈরি করা হলেও ভূগর্ভে সঞ্চিত জলের ব্যবহারের পরিপূর্ণ চিত্র কিন্তু আমাদের হাতে আসছে না। যেমন: নোনা জলের যে ভাণ্ডার থেকে ব্রাইন উত্তোলন হয়,তার একটা হিসেব আমাদের হাতে থাকে। কিন্তু এই নোনাজল উত্তোলনের ফলে সেই ভাণ্ডারে যে শূণ্যস্থান তৈরি হয়,তা ভরাট করে লাগোয়া অ্যাকুইফারের সুপেয় জল ভাণ্ডার থেকে বয়ে আসা জল। এই ভাবে বিপুল পরিমানে সুপেয় জল ধীরে ধীরে লবনাক্ত হয়ে, অব্যবহার্য হয়ে যায়। ভূগর্ভস্থ জলচিত্রের এই পরিবর্তনের কোনও হিসেব কিন্তু আমরা পাইনা।

আমাদের একটা কথা মনে রাখা জরুরি। সারা পৃথিবীতেই,লিথিয়ামের উৎস হিসেবে বিবেচিত মাটির তলার লবনাক্ত হ্রদগুলি প্রত্যন্ত শুখা যে অঞ্চল গুলিতে পাওয়া গেছে সাধারণতঃ তার প্রকৃতিক পরিবেশ অত্যন্ত অস্থিতিশীল। ইতিমধ্যেই এই অঞ্চলগুলিতে, উপগ্রহ তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে,সবুজ আচ্ছাদিত অঞ্চল কমে যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে,সংলগ্ন এলাকা গুলিতে ভূত্বকের তাপ মাত্রা বছরে গড়ে ০.৭৪ (গরম কালে)- ২.৬৮শতাংশ (শীতকালে) হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর সম্ভাব্য কারণ, মাটির তলার জল কমে যাওয়া বা লবনাক্ত হওয়ার কারনে আঞ্চলিক গাছপালাগুলি সে জল ব্যবহার করতে পারছে না। একটি প্রকল্প এলাকায় ‘কারোব’ নামের এক ধরনের শুখা সহনশীল গাছের এক তৃতীয়াংশই ২০১৩-১৭ র মধ্যে মারা পড়েছে। আর তা হয়েছে মাটির তলার জল নিঃশেষিত হওয়ার কারণে।

জলস্তর এভাবে নেমে যাওয়ার ফলে সালার দ্য আতাকামা (স্প্যানিশে, সালার অর্থ নোনা জলের হ্রদ) এলাকায় জেমস এবং আন্দিয়ান ফ্লেমিঙ্গোদের সংখ্যা প্রায় ১০-১২শতাংশ কমে গেছে। ঐ অঞ্চলের হ্রদ গুলি, বিশেষতঃ শীতকালে শুকিয়ে যাওয়ার কারনেই এমনটা হচ্ছে বলেই প্রকৃতিবিদেরা জানাচ্ছেন।

লিথিয়ামের বিকল্প উৎস হিসেবে,জিওথার্মাল উৎস গুলি ব্যবহারের প্রযুক্তি এখনও ব্যবহার্য স্তরে পৌছোয়নি। ডায়রেক্ট লিথিয়াম এক্সট্রাকসন প্রযুক্তি একটা বিকল্প হতে পারে। কিন্তু এ প্রযুক্তিতে শক্তি ব্যবহার ও তার ব্যয় বহুলতার হিসেব নিকেশ পুরোপুরি হয়নি।

সংক্ষেপে বলা যায়,লিথিয়াম উত্তোলন প্রযুক্তি গুলির পরিবেশের ওপর প্রভাবের হিসেব নিকেশ করতে হলে কয়েকটি পারস্পরিক সম্পর্কিত সূচকের দিকে আমাদের নজর দেওয়া প্রয়োজন:

১.সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে জল প্রবাহের পরিবর্তনের চেহারা।

২.মৃত্তিকার স্বাস্থ্যের পরিবর্তন: যেমন লবনাক্ততা বৃদ্ধি, পিএইচ-এর পরিবর্তন ইত্যাদি। ভূগর্ভস্থ জলের স্তর নেমে যাওয়া বা ওয়েস্ট পন্ড  থেকে নোনা জল চুইয়ে ভূগর্ভস্থ সুপেয় জলে মিশে যাওয়ার ফলে ভূগর্ভস্থ জলের লবনাক্ততা বৃদ্ধি।

৩.সংলগ্ন এলাকায় জৈব বৈচিত্রের পরিবর্তন।

মনে রাখা প্রয়োজন, উপরোক্ত প্রত্যেকটি ঘটনার প্রভাব এলাকাবাসী মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর ওপর পরে। সংশ্লিষ্ট অঞ্চল গুলির পরিবেশ এমনিতেই অস্থিতিশীল ও অ্যারিড বা শুখা অঞ্চলভুক্ত। ফলে, এজাতীয় লিথিয়াম উত্তোলন প্রকল্প এলাকাগুলির বাসিন্দাদের সংযুক্ত করেই প্রয়োজনীয় পরিবেশগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। নইলে মানুষের বিক্ষোভ, প্রকল্প রূপায়নে বাধা হয়ে দাঁড়াবে।

ভারতবর্ষের জম্মুতে দেশের সীমান্ত এলাকায় এই প্রকল্প রূপায়নের লক্ষ্যে তড়িঘড়ি ৩৭০ ধারা বাতিল ও রাজ্য ভাগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। যা জানা যাচ্ছে,এই অঞ্চলে চিহ্নিত লিথিয়ামের ভাণ্ডার গুলি তেমন সমৃদ্ধ নয়। তার ওপর এলাকার মানুষের সম্ভাব্য বাধা অতিক্রম করে লিথিয়াম উত্তোলন প্রকল্পের পরিণতি কি হবে তার উত্তর ভবিষ্যতের গর্ভে লুকিয়ে আছে।

তবে একথা নিঃসন্দেহেই বলা যায়, খনিজ তৈলের ভাণ্ডার দেশ গুলির থেকে বিশ্ব রাজনীতির নজর অবশ্যম্ভাবী ভাবে লিথিয়ামের সঞ্চয়ের দিকে ফিরছে। কিন্তু তার দখলদারির  দ্বন্দ্বে মুখ্য চরিত্র কিন্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে বিজ্ঞান-প্রযুক্তিগত দক্ষতার প্রশ্নটি। ইউরোপ-আমেরিকাকে ছাপিয়ে চীন কিন্তু এ লড়াইয়ে এখন বহুদূর এগিয়ে। ফলে,  খনিগুলি থেকে লিথিয়াম উত্তোলন ও নিষ্কাশনে চীনেরই এখনও রমরমা। লিথিয়াম ব্যাটারি বাটারি ব্যবসার সিংহভাগও তাদেরই নিয়ন্ত্রণে।


প্রকাশের তারিখ: ০৬-আগস্ট-২০২৪

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org