নিজেকে ক্ষমা করিনি

মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ
তাঁকে হস্‌পিটালে নিয়ে যাওয়ার সময়ে তাঁর গাড়ী ডেকার্স লেনের ভিতর দিয়ে গিয়েছিল। আমরা গেটে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলাম। সুকান্ত অনেকক্ষণ আমার হাত চেপে ধরে থাকলেন। হয়তো তিনি ভেবেছিলেন আর যদি দেখা না হয়।

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের সেদিন চল্লিশ বছরের জন্ম-বার্ষিকী হয়ে গেল। বিশ বছর আগে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

বিশ বছরেরও অনেক আগে কবি নজরুল ইসলাম বোবা হয়ে গিয়েছিলেন। কবি সুকান্ত ছিলেন আমাদের আশা ও ভরসার স্থল। তাঁকেও আমরা হারালাম।

তখন ডেকার্স লেনে কমিউনিস্ট পার্টির অফিস।

একদিন দেখলাম, দোতলা হতে সুকান্ত নামতে যাচ্ছেন।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, 'খবর কি?' 

বললেন, 'স্বাধীনতায় একটা কিশোরদের বিভাগ খুলতে যাচ্ছি।'

তারপর সুকান্তকে আর দেখতে পাচ্ছিলাম না। মাঝে মাঝে মনে প্রশ্ন জাগে—কোথায় গেলেন সুকান্ত? কিন্তু কাউকে জিজ্ঞাসা করতে ভুলে যাই।

এভাবে ক'মাস যে কেটে গিয়েছিল তা এখন আমার মনে নেই।

একদিন ঢাকার শামসুদ্দীন আহমদ আমার বাসায় এলেন।

বললেন, 'আমি সুকান্ত ভট্টাচার্যের বাড়ীতে গিয়েছিলাম। দেখলাম সে যক্ষ্মা রোগাক্রান্ত হয়েছে। আমার পকেটে পাঁচটি টাকা ছিল। তাই আমি তাঁকে দিয়ে এসেছি।'

আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। একি অঘটন ঘটে গেল! আমি কলকাতার স্থায়ী বাসিন্দা। কমিউনিস্ট পার্টির বৃদ্ধ লোক আমি। আমার বয়স তখন ৫৭ বছর। ঢাকা হতে শামসুদ্দীন আহমদ এসে কিনা আমাকে সুকান্তের অসুখের খবর দিলেন! 

ভাবলাম আমার এই যে বিচ্যুতি হয়েছে তার জন্যে আমি নিজেকে কি ক্ষমা করতে পারব কোনদিন? আমি কেন সুকান্তের খোঁজ নিলাম না।

ত্রুটি আমার যাই হোক না কেন, এখন চিকিৎসা করানোই হচ্ছে আসল কথা। আমি কমরেড সুনীলকুমার বসুকে অনুরোধ জানালাম যে, এ ব্যবস্থাটি তাঁকেই করতে হবে। তিনি অভিজ্ঞ ব্যক্তি। এক সময়ে নিজে টি. বি. রোগী ছিলেন। কবি সুকান্তের যক্ষ্মা রোগ হয়েছে শুনে তিনি আগ্রহ সহকারে এ কাজে এগিয়ে গেলেন। তখন খুব তাড়াতাড়ি এক সঙ্গে অনেক ব্যবস্থা হয়ে গেল।

সুকান্তের জ্যেঠতুত দাদা শ্রীরাখাল ভট্টাচার্য এসে সুকান্তকে পূর্ব কলকাতা হতে শ্যামবাজারে তাঁর নিজের বাড়ীতে নিয়ে গেলেন। ডক্টর তাপসকুমার বসু এম. ডি. দয়া করে চিকিৎসার ভার নিলেন। অল্প চেষ্টায় যাদবপুর টিউবারকিউলোসিস্ হস্‌পিটালে ক্যাবিনও পাওয়া গেল। সেখানেই ভর্তি করানো হলো সুকান্তকে।

হস্‌পিটালে যাওয়ার পরে অসুখটা ভালোর দিকে না গিয়ে বাড়াবাড়ি রূপ নিল। রোগ বহু দূর এগিয়ে গিয়েছিল। আজ-কালকার মতো ঔষধও আবিষ্কার হয়নি তখনকার দিনে।

বাড়াবাড়ি অসুখের খবর পেয়ে আমরা একদিন সকাল বেলাতেই হস্‌পিটালে গেলাম। সঙ্গে ছিলেন শ্রীরাখাল ভট্টাচার্য। তিনি খুব দ্রুত হেঁটে গিয়ে আমাদের আগেই সুকান্তের ক্যাবিনে ঢুকলেন।

আমরা ক্যাবিনে প্রবেশ করে দেখলাম কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য আর নেই।

তাঁকে হস্‌পিটালে নিয়ে যাওয়ার সময়ে তাঁর গাড়ী ডেকার্স লেনের ভিতর দিয়ে গিয়েছিল। আমরা গেটে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলাম। সুকান্ত অনেকক্ষণ আমার হাত চেপে ধরে থাকলেন। হয়তো তিনি ভেবেছিলেন আর যদি দেখা না হয়।

আমার অনুশোচনার আর শেষ নেই। কেন আমি আগে খবর পেলাম না? কেন ঢাকা হতে এসে শামসুদ্দীন আহমদকে আমায় সুকান্তের অসুখের খবর দিতে হলো!

এই জন্যে আমি কখনও নিজেকে ক্ষমা করিনি।

সূত্র- সুকান্ত বিচিত্রা, বিশ্বনাথ দে (সম্পাদিত)


প্রকাশের তারিখ: ০৫-আগস্ট-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org