|
মতাদর্শের সংগ্রামরতন খাসনবিশ |
তৃণমূল কংগ্রেস যত বেশি করে কংগ্রেসের মতাদর্শগত পরিমণ্ডল থেকে নিজেকে আলাদা করার চেষ্টা করেছে, তত বেশি করে তা আরএসএস-নির্মিত বিকল্প যে প্রভাববলয় এদেশে বিদ্যমান ছিল, দলটি সচেতন বা অবচেতনভাবে তারই শিকার হয়েছে। মতাদর্শগত অবস্থানে দুই দলের এই যে অভিন্নতা এতে বোঝা যায়, মতাদর্শগত বিষয়গুলি যখন আলোচনায় আসে এবং সেই প্রসঙ্গে একটি পরিষ্কার অবস্থান নিতে হয়, সেক্ষেত্রে আজ পর্যন্ত কোনও মৌলিক বিষয়ে বিজেপি বিরোধিতার কোনও ইতিহাস নেই পশ্চিমবঙ্গের এই ‘সর্বভারতীয়’ তৃণমূল কংগ্রেসের। |
নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল, যেটি ইতিমধ্যে আইনে পরিণত হয়েছে, লোকসভায় সেই বিলটি উপস্থাপিত করা হয় ২০১৯ সালের ১০ ডিসেম্বর। এই বিল-এ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা ছিল সেটি এই রকম। উই দ্য পিপল অফ ইন্ডিয়া নামে অবহিত একটি বিশেষ জাতিসত্তা ভারতবর্ষের সংবিধান রচনা করার দায়িত্ব দেয় স্বাধীন ভারতের কনস্টিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলিকে। উই দ্য পিপল সেখানে ছিল জাত, ধর্ম, বিশ্বাস, মূল্যবোধ– সবকিছুর ওপরে ওঠা একটি বিশেষ সত্তা। এবং ভারতীয় সংবিধান তৈরি করা হচ্ছিল এই বিশেষ জাতিসত্তার ইচ্ছা অনুসারে। ২০১৯ সালের ১০ ডিসেম্বর সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট-এর নামে এই উই দ্য পিপল-এর ওপরে একটি বিশেষ ধর্মীয় মোড়ক লাগানো হয়। ভারতীয়দের মধ্যে সুস্পষ্ট বিভাজন আনার যাবতীয় উপাদান নিহিত ছিল এই সংশোধনী বিলে। প্রত্যাশিত ছিল এই যে, বিজেপি বিরোধী সবকটি রাজনৈতিক দল এই বিলের বিরোধিতা করবে। বামপন্থী সাংসদেরা সভায় উপস্থিত থেকে সেই দিন এই বিলের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিলেন। এখন যারা এই সিএএ-এর বিরুদ্ধে তর্জনগর্জন করছেন, সেই তৃণমূল কংগ্রেসের ৮ জন সাংসদ সেদিন সংসদে উপস্থিত ছিলেন ঠিকই, কিন্তু ভোটাভুটির সময় কোনও অজ্ঞাত কারণে তারা অনুপস্থিত থাকেন। সিএএ কার্যকর করার ক্ষেত্রে বিজেপিকে সুবিধা করে দিয়েছিল এই রাজনৈতিক দলটি। যাদবপুরের নেতাজি নগরের বাসিন্দা এক যুবক এই সিএএ-এর তাড়নায় সম্প্রতি আত্মঘাতী হয়েছেন। ঘটনাটি নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের এক্স হ্যান্ডলে লেখা হয়েছে, ‘মোদি সরকারের সিদ্ধান্তে বিরাট বিপর্যয়। দেবাশিস সেনগুপ্ত নামে নেতাজিনগরের এক বাসিন্দা আত্মহত্যা করেছেন’। যা লেখা হয়নি তা এই যে, মোদী সরকার যেদিন এই সিদ্ধান্তকে আইনি রূপ দেওয়ার জন্য সংসদে সিএএ পেশ করেন, সেদিন এই দেবাশিস সেনগুপ্তের এলাকার তৃণমূল সাংসদ আইনটির বিরোধিতা করার বদলে সংসদে অনুপস্থিত থাকেন। সিএএ নিয়ে তৃণমূলের দ্বিচারিতা এখন একেবারেই স্পষ্ট হয়ে গেছে। পরিস্থিতিটিকে তাঁরা কাজে লাগাতে চাইছেন এ রাজ্যের মুসলিম জনগণের ভিতরে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করে। বলা দরকার, সিএএ যেদিন সংসদে পেশ করা হয়, সেদিন যেভাবে তৃণমূল কংগ্রেস পৃষ্ঠ প্রদর্শন করেছিল, আইনটিকে অমিত শাহ যদি পশ্চিমবঙ্গে কার্যকর করতে নামেন এবং এই আইনের অজুহাতে এরাজ্যের ব্যাপক মুসলিম সমাজকে আতঙ্কগ্রস্ত অবস্থায় ফেলে দেন, সেদিনও তৃণমূল কংগ্রেস এক কাজই করবেন– তারা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবেন। সরকারি নিয়মের অজুহাত তুলে এখানে ডি-ভোটার সনাক্ত করতে নামবেন তাঁরা, ডিটেনশন ক্যাম্প করবার জন্য জায়গা খুঁজতে শুরু করবেন, যাঁদের আধার কার্ড বাতিল হবে তাঁদের কোনওরকম সুরাহার রাস্তা দেখাবেন না তাঁরা। বস্তুত, এর বিপরীতে কোনও কিছুই তৃণমূল সরকার করবে না। করার ইচ্ছা থাকলে প্রথমেই তাঁরা সংসদে এই আইনের বিরুদ্ধে ভোট দিতেন। এবং সংসদের বাইরে এ নিয়ে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলতেন। আসন্ন নির্বাচনে সিএএ অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে। স্বয়ং শান্তনু ঠাকুর যখন সরকারি পোর্টালে নিজের নাম তুলতে ইতস্তত করছেন, তখন বোঝা যায় এরাজ্যের বিজেপি সদস্যরাও এই আইন নাগরিকত্বহীন বিপুল হিন্দু সমাজকে কোথায় নিয়ে ফেলবে সে সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে উঠেছেন। মুসলিমদের একাংশকে ডি-ভোটার করা তো আছেই, তার দায় এসে পড়বে নাগরকিত্বের শংসাপত্রহীন হিন্দু সমাজের ওপরেও– আসামে যা ঘটেছে মোটামুটি তারই অন্য একটি সংস্করণ এরাজ্যে দেখা দেবে। নির্বাচনী আশু লাভের অঙ্ক কষতে বসা তৃণমূল কংগ্রেস অবশ্য বিষয়টিকে অন্য দিক থেকে ভাবছে। ডি-ভোটার হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় শঙ্কিত পচিমবঙ্গের ব্যাপক মুসলিম সমাজ এবং একইসঙ্গে নাগরিকত্বহীন মতুয়া সমাজ এইবার একেবারেই দৃঢ়পণ হয়ে দিদিকে ভোট দেবে, বিজেপিকে রুখে দেওয়ার জন্য। এই ভোটের বলে বলীয়ান হয়ে দিদি নামবেন সিএএ কার্যকর করতে। আজ না হলেও আগামিকাল এ কাজই যে তিনি করবেন, তা বোঝা গেছে সংসদে সিএএ বিল পাস হওয়ার দিনই। আসলে তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে বিজেপির মতাদর্শগত পরিমণ্ডলে কোনও ভেদ নেই। এটা ঘটার কারণ এই যে, তৃণমূল যত বেশি করে কংগ্রেসের মতাদর্শগত পরিমণ্ডল থেকে নিজেকে আলাদা করার চেষ্টা করেছে তত বেশি করে তা আরএসএস-নির্মিত বিকল্প যে প্রভাববলয় এদেশে বিদ্যমান ছিল, দলটি সচেতন বা অবচেতনভাবে তারই শিকার হয়েছে। মতাদর্শগত অবস্থানে দুই দলের এই যে অভিন্নতা এতে বোঝা যায়, মতাদর্শগত বিষয়গুলি যখন আলোচনায় আসে এবং সেই প্রসঙ্গে একটি পরিষ্কার অবস্থান নিতে হয়, সেই সময় আজ পর্যন্ত কোনও মৌলিক বিষয়ে বিজেপি বিরোধিতার কোনও ইতিহাস নেই পশ্চিমবঙ্গের এই ‘সর্বভারতীয়’ তৃণমূল কংগ্রেসের। বিজেপিকে রোখার নামে এই রাজনৈতিক দলটি ধর্মকে রাজনৈতিক বিষয়ে রূপান্তরিত করেছে, অযোধ্যার রামলালাকে টেক্কা দেওয়ার জন্য যত্রতত্র মন্দির বানানোর কর্মসূচি নিয়েছে তৃণমূল। বিজেপি চেয়েছে এদেশের ধর্মীয় অ্যাজেন্ডা আরএসএসের মতো করে সাজিয়ে নিতে। প্রশ্নটা এই নয় যে, আমি কতটা সেকুলার। প্রশ্নটা এই যে আমি কতটা হিন্দু। তৃণমূল একেবারেই এই অ্যাজেন্ডায় নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে নিয়েছে। বাড়তি লাভ এই যে, রাজ্যের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে প্রায় বন্দিদশায় ফেলে একটা মুক্তিপণ আদায়ের ব্যবস্থাও করে নিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যটি এই আরএসএস নির্ধারিত অ্যাজেন্ডাকে বদলে দেবে কিনা, সময় সেটা প্রমাণ করবে। তবে এই সিএএ-র কীর্তন শুনতে শুনতে রাজ্যের মানুষ ইতিমধ্যেই তৃণমূলী মতলব সম্পর্কে ক্রমশ সচেতন হয়ে উঠছেন। বহু মুসলিম প্রধান এলাকায় তীব্র অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে সিএএ নিয়ে মমতা ব্যানার্জির এই দ্বিচারিতাকে কেন্দ্র করে। নিম্নবর্গের মানুষেরাও এই ধর্মীয় রাজনীতি কতটা সহ্য করছেন, তা নিয়ে সন্দেহের কারণ আছে। কীর্তনিয়া দীনকৃষ্ণ ঠাকুর ওরফে সূর্য নস্কর কীর্তনের আসরে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন তুলেছেন কোটি কোটি টাকা খরচ করে যেখানে রামমন্দির হচ্ছে, সেখানে চটকল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কেন। প্রশ্ন তুলেছেন তিনি, আপনার বিশ্বাস কেন অন্ধবিশ্বাস হবে, কেন সে বিশ্বাস জ্ঞানভিত্তিক হবে না। দীনকৃষ্ণ ঠাকুরের কীর্তন শুনতে হাজার হাজার মানুষের জমায়েত ঘটছে। আর ঠিক সেই কারণেই তাঁকে সরাসরি আক্রমণ করে ধর্মীয় মৌলবাদীরা। ঘটনাটি ঘটে ১০ ফেব্রুয়ারি। লক্ষণীয় এই যে, মমতা ব্যানার্জির পুলিশ দীনকৃষ্ণ ঠাকুরকেই গ্রেপ্তার করে এবং ক্রমাগত মারতে মারতে জয়নগর পৌর এলাকার বকুলতলা থানায় নিয়ে গিয়ে লাঠি দিয়ে ফের একপ্রস্থ প্রহার করে তাঁকে। মমতা ব্যানার্জির পুলিশ যে কারণে এই কীর্তনশিল্পীকে আক্রমণ করে, ঠিক একই কারণে দলটি সিএএর বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার বদলে সংসদ থেকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে। আশার কথা এই যে, মানুষ ক্রমশ তৃণমূল-বিজেপি’র এই সখ্যের রাজনীতি নিয়ে সচেতন হচ্ছেন। দীনকৃষ্ণ ঠাকুরের ওপর আক্রমণের প্রতিবাদে কলকাতার ভারতসভা হলে এক প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা হয়েছিল। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিরা জড়ো হয়েছিলেন সেই সভায়। এই ধরনের প্রতিবাদ যত দ্রুত প্রতিরোধে রূপান্তরিত হবে ততই পশ্চিমবঙ্গ আরএসএস-এর প্রভাববলয় থেকে নিজেকে মুক্ত করার পথ খুঁজে পাবে। সিএএ-বিরোধী চেতনা যত বেশি দৃঢ় হবে, এরাজ্যের তৃণমূল কংগ্রেস তত বেশি করে জুজু দেখিয়ে ভোট নেওয়ার কৌশল অবলম্বন করতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হবে। মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত, মতাদর্শগত যে প্রভাববলয় নির্মাণ করেছে বিজেপি ও তৃণমূল সেটিকে চ্যালেঞ্জ জানানো। এই চ্যালেঞ্জ জানাবার জন্য সিএএ নিয়ে মমতা ব্যানার্জির দ্বিচারিতা যেভাবে উন্মোচিত করতে হবে, ঠিক একই রকম গুরুত্ব দিয়ে দাঁড়াতে হবে দীনকৃষ্ণ ঠাকুরদের পাশে। প্রকাশের তারিখ: ২৮-মার্চ-২০২৪ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |