|
সুন্দরবন বাঁচলে আমরা বাঁচবগৌর সরকার, মৎস্যজীবী (সুন্দরবন) |
এত প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে আমরা যা সংগ্রহ করি, তার একটা বড় অংশ ইম্পোর্ট হয়। চিন, সিঙ্গাপুরের মতো দেশে নিয়মিত চিংড়ি-কাঁকড়া যায়। এই পাঠানোর জন্য কোনও সরকারি ব্যবস্থা নেই। এখানে ফড়েরাই সব। এদের জালে আমরা জড়িয়ে পড়ছি। আমরা বারবার সরকারকে বলেছি একটা বিপণন সেন্টার বানাতে। কিন্তু না কেন্দ্র, না রাজ্য—কোনও সরকারই কান দেয়নি। এত পরিশ্রম করে আমরা যে মাছ কাঁকড়া ধরি সেই লাভের গুড় যদি ফড়েরাই খেয়ে যায়, তাহলে আমাদের কীভাবে চলে? |
আমার বয়স ৬৩। আমার বাবা সুন্দরবনের জঙ্গলে যেত মাছ-কাঁকড়া ধরতে। আমিও সেই কাজই করছি। বাবার সাথে জঙ্গলে যেতে যেতেই কাজ শেখা। পড়াশুনো করেছি। তারপরেও এই কাজ করছি। আমি সেই ৭২ সালে টাইগার রিজার্ভ হওয়ার আগে থেকেই জঙ্গলে যাই মাছ-কাঁকড়া সংগ্রহ করতে। বাড়িতে তিন ছেলে, এক মেয়ে। এই কাজ করেই দুই ছেলে এক মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। বাঘ, কুমিরের ভয় তো আছেই, তার সাথে আছে ডাকাত আর পুলিশ, বন দপ্তরের লোকজনদের জুলুম। আমাদের এইরকম জীবনের ঝুঁকি নিয়েই কাজ করতে হয়। তার সাথে সুন্দরবনেরও ক্ষতি হচ্ছে বিভিন্নরকম। সেগুলো বাঁচানোর তাগিদও দেখা যাচ্ছে না। এইসব নিয়ে আমাদের দিন কাটছে। ৭২ সালে টাইগার রিজার্ভ হয়। এই সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরে একটা জোন কোর জোন (Core Zone) আর একটা বাফার জোন (Buffer Zone) আছে। বাফার জোন যেটা হওয়া উচিত ছিল, সেটাকে করেছিল কোর জোন। অর্থাৎ রায়মঙ্গল নদী, ওদিকে বাংলাদেশ বর্ডার, খুলনা জেলা, যশোর জেলা, ওদিকে ওপার বাংলা; এপার উত্তর ২৪ পরগনা হিঙ্গলগঞ্জ ব্লকের একটা প্রত্যন্ত এলাকা সুন্দরবন, আর গোসাবা ব্লক জুড়ে বেশিরভাগ টাইগার রিজার্ভের ভেতরে। সেইসব এলাকায় চাষ করা যায় না। এসব এলাকায় কৃষিজীবীদের পেশা বদল করে ফেলতে হয়েছে। বিকল্প পথ না পেয়ে আমাদের পরিবারকেও আরও অজস্র অ-মৎস্যজীবী পরিবারের মত পেশা বদলে মাছ-কাঁকড়ার খোঁজে জঙ্গলে যেতে হল। বর্ডার এলাকা, রায়মঙ্গল নদীর পাশ দিয়ে কোর জোন করা উচিত ছিল। সেটাকে কোর জোন করেনি। সেটা হলে দেশের সেফটিও আরেকটু বেশি হত। এখন যতটুকু জায়গা বাফার জোন, সেখানে মাছ ধরার জায়গা খুব বেশি না। ফলে আমাদের মাছের খোঁজে বাধ্য হয়ে চলে যেতে হয় কোর জোনে। তখন ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট থেকে ধরে। আমাদের বিএলসি (Boat License Certificate) সিজ করে নিয়ে নেয়, এগারোশো সাড়ে এগারোশো টাকা ফাইন করে। প্রতিবারই প্রায় জঙ্গলে গেলে এই ফাইন হয়। আবার বেশি ভেতরে গেলে জলদস্যুর ভয়। মাছ ধরার নৌকো পেলে ডাকাতরা শুধু লজ্জা ঢাকার পোশাকটুকু বাদে সব লুটে নেয়। বছর তিনেক আগে আমার নিজের নৌকোতেই ডাকাত পড়েছিল। তারপর ছোট মোল্লাখালির কোস্টাল গার্ড আর অঞ্চল প্রধানের সাথে যোগাযোগ করলাম। কিন্তু কোনও সুরাহাই হয়নি। তারপর খবর পেলাম ওই এলাকাতেই আরও কিছু নৌকোয় ডাকাত পড়েছে। পরে জানা গেল ওরা বাংলাদেশের ডাকাত। নিয়মিতই বাংলাদেশের ডাকাতদল এখানে ঢুকে পড়ে। তাহলে ভাবুন আমাদের নিরাপত্তা কোথায়! এত প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে আমরা যা সংগ্রহ করি, তার একটা বড় অংশ ইম্পোর্ট হয়। চিন, সিঙ্গাপুরের মতো দেশে নিয়মিত চিংড়ি-কাঁকড়া যায়। এই পাঠানোর জন্য কোনও সরকারি ব্যবস্থা নেই। এখানে ফড়েরাই সব। এদের জালে আমরা জড়িয়ে পড়ছি। আমরা বারবার সরকারকে বলেছি একটা বিপণন সেন্টার বানাতে। কিন্তু না কেন্দ্র, না রাজ্য—কোনও সরকারই কান দেয়নি। এত পরিশ্রম করে আমরা যে মাছ কাঁকড়া ধরি সেই লাভের গুড় যদি ফড়েরাই খেয়ে যায়, তাহলে আমাদের কীভাবে চলে? সব বিক্রিবাটা করে সব খরচ জুগিয়ে হাতে থাকে সামান্যই। এর আগের সরকারের সময়ে এখানকার পুকুর-খাল-বিল এসব সংস্কার করে এলাকার লোকেদের লিজে দেওয়া হয়েছিল। এতে এলাকার লোকেদের রোজগারের একটু সুরাহা হয়েছিল। কিন্তু এখন এই সরকারের আমলে সব পুকুর-খাল অ-মৎসজীবীদের ইজারা দেওয়া। তাহলে আমাদের ঘরে ছেলেপুলেরাই ওখানে খাটে কিন্তু আবার সেই লাভ হয় ঠিকেদারের। তারা সব এখানকার লোকও না। আবার ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টে যেসব লোকজন নিচ্ছে তাদের সুন্দরবন নিয়ে কোনও জ্ঞানই নেই। আমাদের ঘরে সব হায়ার সেকেন্ডারি, গ্র্যাজুয়েশন পাশ করা ছেলেরা বসে আছে, তাদের যদি এই চাকরিতে নেওয়া হয় তাহলে তারা জঙ্গলটাকেও ভালো রাখতে পারবে, আবার পরিবারেরও আয়টাও একটু বেশি হয়। রাজ্যে চাকরি-বাকরির যা অবস্থা, জঙ্গলের ডিপার্টমেন্টেও সেই হাল। সব মিলিয়ে ক্ষতি হচ্ছে জঙ্গলের। জঙ্গলে যেতে গেলে বিএলসি লাগে। টাইগার রিজার্ভ যখন হল তখন নির্দিষ্ট করে দিল, ন’শো-টা লাইসেন্স দিয়েছিল। তারপর থেকে সেগুলো আর বাড়েনি। আজ যারা জঙ্গলে যায় অন্যের থেকে এই লাইসেন্স ভাড়া নেয়।চল্লিশ থেকে আশি হাজার অবধি ভাড়া দিয়ে সেটা কিনতে হয়। একজন মৎসজীবির যদি এই খরচ হয়ে যায় জঙ্গলে ঢোকার সময়েই, তাহলে কীভাবে সে লাভ করবে? তাই রিস্ক নিয়ে গভীর জঙ্গলে ঢুকতে হচ্ছে। সেখান থেকে হামেশাই বাঘের মুখে পড়তে হয়। তাই আমরা দাবি করছি আমাদের স্থায়ী বিএলসি দেওয়া হোক। আমি আজ প্রায় পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় ধরে জঙ্গলে যাচ্ছি। জঙ্গলেরও অনেক পরিবর্তন হচ্ছে। প্রতিবছর ঝড়ে ক্ষতি হচ্ছে। আয়লা-আম্ফান ঝড়ে অনেক ক্ষতি হয়েছিল। কত যে শুয়োর, হরিণ ওই সময় মারা গেছে তার কোনোও হিসেব নেই। এখানে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার থাকে। সেই বাঘের দিনে প্রায় সাত কেজি মাংস দরকার হয়। সরকার থেকে তো তার ব্যবস্থা করবে! সেসব কিছুই হয় না। যে স্বাভাবিক বাস্ততন্ত্র সেটাই নষ্ট হচ্ছে। বাঘকেও লোকালয়ের কাছে আসতে হচ্ছে। কিন্তু সরকার সেটা স্বীকার করবে না। এইতো আগের বছর একজন মৎসজীবীকে বাঘে টেনে নিয়ে গেল, কিন্তু তার রিপোর্টে লিখল না যে বাঘে ধরেছে। এইভাবে হিসেব চেপে দেওয়া হচ্ছে। তাই আমাদের বাঁচার জন্য দরকার সুন্দরবনকে বাঁচানো। প্রচুর বিজ্ঞানী, গবেষক আছেন যাঁরা সুন্দরবনকে বাঁচানোর জন্য কাজ করতে চান। তার সাথে আমরাও আছি। দরকার একটা সুষ্ঠ পরিকল্পনা। শুধু দূর শহর থেকে ঠাণ্ডা ঘরে বসে সুন্দরবন নিয়ে কথা বললে হবে না। সবাই মিলে একসাথে পরিকল্পনা করে কাজ করলে সুন্দরবনকে বাঁচানো যাবে। তাহলে আমরাও বাঁচব।
ক্ষেত্রসমীক্ষা- মোহাম্মদ খান, সৌগত তরফদার
প্রকাশের তারিখ: ১৮-ফেব্রুয়ারি-২০২৬ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |