|
ইউনিয়ন থাকলে লোকের বাড়িতে যাতে ইজ্জতের সাথে কাজ করতে পারি সেটা দেখবেপুতুল কৈরী, গৃহ-সহায়ক শ্রমিক |
খুব মনে হয় আমাদের ইউনিয়ন দরকার, যেমন কারখানায় আছে তেমনটা। ইউনিয়ন তাহলে মাইনে ঠিক করবে, লোকের বাড়িতে যাতে ইজ্জতের সাথে কাজ করতে পারি সেটা দেখবে, আমরা অসুস্থ হলে ছুটিছাটা দেখবে। বাবুদের বাড়িতেও কখনসখনও দেখে, অসুস্থ হলে মাঝেমধ্যে ছুটি দেয় আবার কথাও শোনায়। ইউনিয়ন থাকলে কথা শোনাতে পারত না, ছুটি দিতেই হত৷ কিন্তু আমরা তো সবাই নিজেরটা দেখি এক হলে তবে তো ইউনিয়ন হবে, সবাই সে কথা বোঝে না। |
ঘর মোছা, বাসন মাজা, কাপড় কাচা এ সব তো রোজের কাজ। এ কাজ আমার নিজের ঘরের কাজ আবার পরের ঘরের কাজও। নিজের ঘরের খয়রাত যোগাতে পরের ঘরে কাজ করি। এতে কোনও শরম নেই। সব মেয়েরাই তো এ কাজ করে। যারা নিজের বাড়ির কাজটুকু করে তারা পয়সা পায় না, আর আমার মতো যারা অন্যের বাড়ির ঠিকা কাজ করে তারা পয়সা পায়। বাবুদের বাড়ির মেয়েবউরাও ঘরের কাজ করে তারা কেনে সুখ আর আমরা, “কাজের মেয়েরা”, কিনি মাসকাবারের চাল। আমার দাদা, পরদাদা সব এসেছিল বালিয়া জেলা থেকে। এখানে তখন মিলের কাজ খুব হত। কারখানায় কাজ করত আমার বাপ-দাদা। এখনও বালিয়ায় আমরা যাই। আমি ওখানে ক্লাস এইট অবধি পড়েছি। এখানে বাবা মিলমজদুরী করত আর মা বাড়িতে কাজ করত। আমাদের দেশওয়ালীরা বেশীরভাগই এখন বাড়ি বাড়ি কাজ করে। মিল তো আগের মতো চলে না তাই মেয়েদেরও কাজে বের হতে হয়। আমার বিয়ে হয়েছে তখন আমার বয়স বছর চোদ্দ। বাবা বলেছিল এতদিন বাড়িতে বসিয়ে রাখব না। আমাদের কম বয়সেই বিয়ে দেয়। বিয়ের জন্য আমার মত আমার বাবা নেয়নি। বুড়া আদমির সাথে বিয়ে ঠিক করল, জাত-বেরাদর দেখে, তাই আমি পালালাম আমার বন্ধুর সাথে (এখন বর)। তখন অত বুঝতাম না। এখন বুঝি মেয়েদের পড়ালেখা না করে, চাকরি না পেয়ে বিয়ে করা উচিৎ না। আমার এক মেয়ে, পনেরো বছর বয়স হল। সব কষ্ট সহ্য করে আমি ওকে স্কুলে পড়াই, বাংলা স্কুলে পড়ে। ও রবীন্দ্রনাথের কবিতা বলে, গিটার শেখে। আমার গর্ব হয় ওকে নিয়ে। তাই দশ বাড়ি কাজের যত কষ্ট হোক, সব করি। বর রাজমিস্ত্রীর কাজ করে। গায়ে হাতও তোলে, আবার আমি অসুস্থ হলে আমায় হাসপাতাল নিয়ে যায়। বর যা রোজগার করে তার হাফ দারুতে শেষ করে। দুবার পুলিশে দিয়েছি। আমি ওর বউ বলে কি কেনা পুতুল নাকি? যখন চাইবে ভালো কথা বলবে, যখন চাইবে পিটবে। মেয়েটাই বা কি শিখবে? নিজে হলে সহ্য করতাম। কিন্তু মেয়ে যাতে ভুল শিক্ষা না পায়। মেয়ে যাতে না ভাবে বাড়ির বউদের খালি মার খেতে হয়। মেয়ের গায়ে যাতে কেউ হাত দিতে ডরায় তাই পুলিশ ডেকে কয়েদ করিয়েছি। আবার ছাড়িয়েও এনেছি, মায়া পড়ে গেছে। এসব আমাদের হয়েই থাকে। টাকা থাকলে, পড়ালেখা বেশি হলে এ সব কম হত। বাড়িতে কখনই মারপিট হওয়া উচিৎ নয়। আর তাছাড়া সস্তা দারু বন্ধ হওয়া দরকার, না হলে গরীবের ঘর চলবে না। বাপ দারুতে পয়সা লোটালে, মেয়ের মাছের খরচা পাব কোথা থেকে। মেয়েকে রোজ মাছ দিই, নিজে না খেয়ে হলেও দিই। কাউগাছি পঞ্চায়েতে এক কাঠা জমি কিনে টালির ঘর করেছি। সেই সকাল ছ'টায় বের হয়ে দুপুর একটায় বাড়ি ঢুকি, আবার দুপুর তিনটেয় বের হয়ে সন্ধ্যে ছ'টায় বাড়ি ঢুকি। মাসে ১২০০০ টাকা রোজগার, দিনের রোজগার ধরলে ৪০০। কিন্তু গতরের খাটনি ধরলে আমার ডবল রোজ পাওনা হয়। পাওনা হলেই বা কে দেবে? শরীর সবসময় বয় না আজকাল, তবু কাজ করতেই হয়। একেক বাড়ির একেক ফরমান, শুনতে হয়। মানতে হয়। নইলে কাজ যাবে। আমি না বললে আরেকজন এসে জুটবে। মাইনে নিয়ে তাই বেশি দামাদামি করি না। আগে কামাই করলে সব বাড়িতে কথা শোনাতো, এখন আমরা নিজেদের মধ্যে ঠিক করেছি মাসে দুদিন ছুটি নেব। সব বাড়িতে বলা আছে। এখন দুদিন ছুটি দেয়। পুজোতে কোনও ছুটি নেই। অথচ যারা চাকরি করে তারা ছুটি পায়। আমাদের কোন বাঁধা ছুটি নেই। পুজো, পিকনিক, ঘুরতে যাওয়া কিছু নেই। ছটে ছুটি নিই তাও দুদিন। বিছানা না পড়ে গেলে জ্বরজারি নিয়েও কাজ করে যেতে হয়। কোনও কোনও বাড়িতে মাইনে কাটার হুমকি দেয়। এসব ইউনিয়ন থাকলে হত না। খুব মনে হয় আমাদের ইউনিয়ন দরকার, যেমন কারখানায় আছে তেমনটা। ইউনিয়ন তাহলে মাইনে ঠিক করবে, লোকের বাড়িতে যাতে ইজ্জতের সাথে কাজ করতে পারি সেটা দেখবে, আমরা অসুস্থ হলে ছুটিছাটা দেখবে। বাবুদের বাড়িতেও কখনসখনও দেখে, অসুস্থ হলে মাঝেমধ্যে ছুটি দেয় আবার কথাও শোনায়। ইউনিয়ন থাকলে কথা শোনাতে পারত না, ছুটি দিতেই হত৷ কিন্তু আমরা তো সবাই নিজেরটা দেখি এক হলে তবে তো ইউনিয়ন হবে, সবাই সে কথা বোঝে না। আমার এখন আফসোস হয় পড়ালেখা বেশি থাকলে হোটেলে কাজ করতাম। আমরা যেমন সেবা করি হোটেলেও তো সেবাই করে। ওদের ট্রেনিং আছে, তাই মাইনে বেশি। আমার না আছে বিদ্যা না আছে ট্রেনিং। তবু লড়ছি। কাজ করতে গিয়ে-ঘন্টার হিসাব রাখি না। কোনও কোনও বাড়িতে এক্সট্রা কাজও করে দিই। কাজের বাড়ির মন না রাখালে ছাড়িয়ে দেবে। আমাদের তো আর বাঁধা কাজ নয়, ঠিক কাজ। আজ আছে কাল নেই। আর বয়স থাকতে থাকতে গতর খাটিয়ে নিতে হবে। না হলে বয়স হলে কোন তখন গতর চলবে না। টাকাও আসবে না। সরকার আমাদের জন্য তো আর পেনশন দেবে না। ফ্যাকটারি-ওয়ালারা (ইছাপুরে দুটি অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি রয়েছে) তো পেনশন পায়। ওরা সরকারি চাকরে, আর ওদের খাবার তৈরি করে, জামা কেচে, ঘর সাফ করে আমরা যে হেল্প করি— তাহলে আমাদের সরকার দেখবে না কেন? তবে এখন পাতা লাগছে ওদেরও সরকার দেখছে না। চাকরি নাকি আর এত থাকবে না। তো আমাদের কী হবে? আমাদের কাজও তো কমে যাবে? কাজের বাড়িতে মাইনে নিয়ে টালবাহানা করে, অনেক সময় ঠিক টাইমে টাকা দেয় না। এমনিতেই আমাদের কষ্টের কাজ। ঝড়-জল-রোদ সবেতেই ঘড়ি ধরে কাজে যেতে হয়। আগে ফোন ছিল না এখন দেরি হলেই ফোন আসতে লাগে। ছ'সাত ঘন্টা বাড়ির বাইরে থাকি, সব বাড়িতে বাথরুম ব্যবহার করতে দেয় না। আমরা বাথরুমে গেলে বাথরুম নোংরা হবে, আমরা কাজের বাড়ির বাসন ধরলে সেটা পরিষ্কার হয় আর বাথরুম গেলে ময়লা হয়। পেটের দায়ে সব অপমান মানতে হয়। মুখে যতই ভালো কথা বলুক না কেন কাজের সময় সব আসল মুখ বেরিয়ে পরে। আমাদের সব ছোটলোক ভাবে। কিন্তু ভাবে না এই ছোটলোকেরা এক হলে ওদের ঘরের ময়লা পরিষ্কার হবে না। তখন কান্নাকাটি পড়ে যাবে। এখনও অন্নপূর্ণার টাকা পাইনি, জানি না পাব কিনা। তিন হাজার টাকা দিলেই কি সব হয়? সরকারকে একথা কে বোঝাবে? মেয়েটা বড় হচ্ছে, ভাল জায়গায় পড়াতে হলে কত টাকা দরকার। আমার ঘরের মেয়ে বলে ও পড়তে পারবে না? সরকার কেন দেখবে না? পড়াটা কমসে কম ফ্রি করে দিক। সরকারের উচিৎ যারা অক্ষম তাদের কে আরও বেশি করে সাহায্য করা। যার আছে তার তো আছেই। যার নেই তাকে সাহায্য করা দরকার। না হলে কিসের সরকার? কেনই বা আমরা ভোট দেব? ভোট তো এক লাইনে গরীব বড়লোক সব এক সাথে দেয়, তাহলে তারা বাকি দিনগুলোতে এক সাথে স্কুল কলেজে যাবে না কেন? আর একই চিকিৎসা পাবে না কেন? সরকার তো সবার। আমরা কি সরকারের সৎ সন্তান? কে কী খাবে, কে কী পরবে এসব না করে সবাই যাতে বাঁচতে পারে সে কথাই ভাবা উচিৎ সরকারের, আর আমাদের মতো যারা ঠিকা কাজ করে তাদের জন্য সরকার না ভাবলে কে ভাববে? আমাদের তো আর বাঁধা মালিক নেই, সরকারই আমাদের মালিক। আমরা না থাকলে বাবুদের বাড়ি চলবে না আর বাবুদের বাড়ি না চললে সরকারও চলবে না। ছোটবেলায় স্বাধীনতার দিন তেরঙ্গা তোলা হত, রাষ্ট্রগীত হত। এটাই তখন স্বাধীনতা বুঝতাম। এখন মনে হয় কিছুই বুঝি না। শুধু ভাবি, স্বাধীন দেশে এত কষ্ট তো পরাধীন দেশে আমার মতো গরীবরা কী করে ছিল? লেখাপড়া করলে জানতে পারতাম ওসব কথা। এখন আর উপায় নেই। আমি স্বাধীনতার মানে বুঝলাম না জীবনে, কিন্তু আমার মেয়ে যেন স্বাধীনতার মানে বোঝে তার জন্য লড়ে যাব। [“পুরাতন ভৃত্য” আধা সামন্ততান্ত্রিক ভারতের একটি পুরাতন পেশা। নয়া উদারবাদের প্রভাব বৃদ্ধির সাথে তৈরি হয়েছে মধ্য আয়ের একটি বিরাট অংশ। নারী, পুরুষ ও অন্যান্য সকল লিঙ্গের মানুষের বাইরে কাজের প্রয়োজন ও পরিসর বেড়েছে। সামজিক পুনরুৎপাদনের (স্যোসাল রিপ্রোডাকশন) কাজের জন্য এই পরিবারগুলিতে প্রয়োজনীয় শ্রমের যোগান হয়ে পড়েছে মহার্ঘ্য। তার ফলে তৈরি হয়েছে সস্তার সামাজিক শ্রমের বিপুল চাহিদা— গৃহসহায়তার কাজ। উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার ব্যারাকপুর-১ ব্লকের কাউগাছি-১ পঞ্চায়েতের বাসিন্দা, ৩৩ বছর বয়সী পুতুল কৈরী পেশায় একজন গৃহ-সহায়ক শ্রমিক। নারী শ্রমজীবী কর্মীদের যোগদান মূলত এই পেশায় বেশি রয়েছে। অনিশ্চয়তায় ভরা, দুদর্শাময় জীবনযাত্রার মান এবং নড়বড়ে নিয়োগ-নীতি না নিজেদের “শ্রমিক” পরিচয়কে এঁদের স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে চিনতে দিয়েছে, না আদায় করতে দিয়েছে ইউনিয়নের দাবী। এঁরা নারী-কর্মীবাহিনী হিসাবে পারিবারিক, সামাজিক এবং জীবিকার পরিসরে অবহেলিত ও অসম্মানিত। কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি, বৈষম্যমূলক আচরণ, পেশাগত স্বাস্থ্য-সংকট কোনও কিছুরই সমাধানের দায়িত্ব রাষ্ট্র নেয় না, কারণ শ্রমিক হিসাবে এঁদের যথাযথ স্বীকৃতি নেই। ই-শ্রম পোর্টালে “ডোমেস্টিক ওয়ার্কার” নামটি ছাড়া রাষ্ট্রের তরফ থেকে আর কোনও সুবিধা পাননি এঁরা। এই সমস্ত কারণেই এঁদের সংগঠিত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। যেহেতু শ্রমের বাজারে সেবা-কাজের (কেয়ার ইকোনমি) মূল্য যুক্ত। একই সূত্রে গৃহকাজে নিযুক্ত এই শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়নও অত্যন্ত জরুরী।] অনুলিখন: প্রিয়াঙ্কা কাঞ্জিলাল
প্রকাশের তারিখ: ২৪-জুলাই-২০২৬ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |