|
আমাদের সময়ের সাম্রাজ্যবাদ, রুশ বিপ্লবের অভিঘাতপ্রকাশ কারাত |
|
আমাদের সময়ের সাম্রাজ্যবাদ এবং চলমান সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামগুলিকে বুঝতে হলে, তার উৎস খোঁজা দরকার ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবে। অক্টোবর বিপ্লবই হল বিশ্বের প্রথম সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী, পুঁজিবাদ-বিরোধী বিপ্লব। লেনিন ১৯১৬ সালে তাঁর সাম্রাজ্যবাদের তত্ত্ব হাজির করেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, পুঁজিবাদী শক্তিগুলির নতুন বাজার খোঁজার তাগিদ, সহজে সম্পদ কুক্ষিগত করার সুযোগ নিশ্চিত করা, পুঁজি রপ্তানির নতুন নতুন পথ চিহ্নিত করা — এগুলিই সাম্রাজ্যবাদের চালিকাশক্তি। এই প্রক্রিয়া থেকে জন্ম নেয় প্রতিযোিগতা, সঙ্ঘাত ও বিশ্বজোড়া শোষণ। লেনিনের সাম্রাজ্যবাদের তত্ত্ব উন্নত দেশগুলিতে শ্রমিকশ্রেণির সংগ্রাম এবং উপনিবেশ ও আধা উপনিবেশের জনগণের জাতীয় মুক্তির সংগ্রামকে এক জায়গায় এনে ফেলেছিল। তাঁর তত্ত্ব আন্তঃ সাম্রাজ্যাবাদী দ্বন্দ্বগুলিকেও ভালভাবে বুঝতে সাহায্য করেছিল। এই দ্বন্দ্বগুলিই পরিণামে যুদ্ধ ডেকে এনেছিল। এই তত্ত্ব থেকে আমরা জানতে পেরেছিলাম লেনিন রাশিয়ার জন্য কোন্ বিপ্লবী রণনীতি বিকশিত করেছিলেন। বিষয়টাকে তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন সাম্রাজ্যবাদী শৃঙ্খলের দুর্বলতম গ্রন্থি হিসাবে। সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধকে জারতন্ত্র-বিরোধী গৃহযুদ্ধে পরিণত করার ডাক দিয়েছিলেন লেনিন। এই ঐতিহাসিক বিপ্লব থেকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছিল। প্রথমত, রাশিয়ায় সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা। পরে রাশিয়া হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। এবং তার পরিণতিতে উঠে এসেছিল নতুন একটা বিশ্ব পরিসরের দ্বন্দ্ব— সেটা হল সাম্রাজ্যবাদ ও সমাজতন্ত্রের দ্বন্দ্ব। সেই প্রথম, একটা সফল বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে সমাজতন্ত্র হয়ে উঠেছিল একটা পার্থিব বাস্তবতা। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল বিপ্লবের একটা ঢেউ যা বিংশ শতাব্দীকেই বদলে দিয়েছিল। নানা দিক থেকে এই বিপ্লবগুলির চরিত্র ছিল সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী। রুশ বিপ্লব থেকে শুরু করে এই প্রক্রিয়া চলেছিল চীন, ভিয়েতনাম, কোরিয়া এবং কিউবার বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে। এই সব বিপ্লব ছিল সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির বিরুদ্ধে জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম কিংবা দেশীয় শাসক শ্রেণির বিরুদ্ধে সংগ্রাম। সেই সব শাসকেরা হয় সাম্রাজ্যবাদের অধীন ছিল কিংবা তাদের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছিল। সাম্রাজ্যবাদ ও সমাজতন্ত্রের মধ্যে শক্তির যে ভারসাম্য তা জাতীয় মুক্তি সংগ্রামগুলিকে শক্তিশালী করে তুলতে সাহায্য করেছিল। সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন এবং জাতীয় মুক্তির আন্দোলন ক্রমশ পরস্পরের সঙ্গে এক সূত্রে বাঁধা পড়েছিল। এর ফলে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির অধীনে থাকা অধিকাংশ উপনিবেশ মুক্ত হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী পর্বে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা তাদের বিশ্বজোড়া অবস্থান রক্ষা ও সংহত করতে চাইছিল এমন একটা সময়ে যখন উপনিবেশ-বিরোধী আন্দোলন এবং জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম আরও শক্তি সঞ্চয় করছিল। তখন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদী ব্লক সমাজতান্ত্রিক ব্লকের বিরুদ্ধে ঠান্ডা যুদ্ধ শুরু করে দেয়। সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের আগ্রাসন বিংশ শতকের বিপ্লবী জোয়ার এই শতকের শেষ দু দশকে থিতু হয়ে ভাটার টানে পরিণত হয়। আন্তর্জাতিক লগ্নি পুঁজির উত্থান, যার পিছনে ছিল বিভিন্ন দেশের লগ্নি পুঁজির নজিরবিহীন কেন্দ্রীকরণ ও কেন্দ্রীভবন, সেটা ছিল সেই পর্বের একটা নতুন বৈশিষ্ট্য। এটাই গতি সঞ্চার করল ফিনান্স পরিচালিত বিশ্বায়নে যা সারা বিশ্বজুড়ে জোর করে চাপিয়ে দিল নয়া উদারবাদী পুঁজিবাদকে। এই সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের আগ্রাসন মিলে গেল পূর্ব ইউরোপের দেশগুলির সমাজতান্ত্রিক ব্লকের পতন এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়ার সঙ্গে। এই প্রক্রিয়া আরও গতি পেয়েছিল নয়া উদারবাদী পুঁজিবাদের কারণেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নজিরবিহীন আধিপত্য ১৯৯০ এর দশকে বিজয়ীর বেশে মঞ্চে এল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদ। এবং তখন মনে হল, একটা এক মেরু বিশ্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বিপুল আগ্রাসনের অ্যাজেন্ডা নিয়ে মাঠে নামল সাম্রাজ্যবাদ। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসবাদী হামলার পর ঘোষণা করা হল ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’। ২০০১ সালে আক্রান্ত হল আফগানিস্তান, ২০০৩ সালে দখল করা হল ইরাক এবং তারপর সেখানে নেমে এল বিপুল ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ। পরে লিবিয়া ও সিরিয়ায় ঘটে গেল সামরিক হস্তক্ষেপ। সেই পর্বে সামনে এল নয়া-রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গী যার সাহায্যে বিশ্বকে নতুন করে বিন্যস্ত করার পরিকল্পনা সামনে আনা হল। এর সুযোগ নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নির্বিচারে তাদের সামরিক শক্তিকে ব্যবহার করতে শুরু করল। যদিও তাতেও ধরাছোঁয়ার মতো কোনও সাফল্য অর্জন করতে পারল না। এর ফলে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের ক্ষমতা কতটা সীমাবদ্ধ, তা স্পষ্ট হয়ে গেল। ২০২১ সালে তালিবানরা আফগানিস্তানে ক্ষমতায় ফিরল। তার আগে সেদেশ থেকে সব সেনা সরাতে হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে। সমসাময়িক সাম্রাজ্যবাদের বৈশিষ্ট্য শুধুই সামরিক হস্তক্ষেপ নয়। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক জবরদস্তি ও আর্থিক যুদ্ধও তার বৈশিষ্ট্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমী মিত্ররা সেই সব দেশের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেয় যে দেশগুলোকে তারা মনে করে তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পক্ষে বিপজ্জনক কিংবা যে সব দেশ আমেরিকার দাবি মেনে নিতে অস্বীকার করে। এ সব দেশকে দাগিয়ে দেওয়া হয় সন্ত্রাসবাদের রাষ্ট্রীয় মদতদাতা হিসাবে কিংবা তাদের সঙ্গে আচরণ করা হয় অচ্ছুৎ রাষ্ট্র হিসাবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্ররা অসংখ্য দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দিয়েছে। এই সব দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কিউবা, ভেনেজুয়েলা, ইরান ও উত্তর কোরিয়া। ইতিমধ্যে নয়া উদারবাদের অধীনে লগ্নি পুঁজি ফুলেফেঁপে উঠছে। এর জেরে একদিকে উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলির মধ্যে এবং অন্যদিকে ধনী ও গরিব দেশগুলির মধ্যে তীব্র অসাম্য বেড়েই চলেছে। প্রাকৃতিক সম্পদের লাগামছাড়া লুণ্ঠন এবং যে কোনো মূল্যে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের চেষ্টার পরিণামে পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে এবং বিশ্বের উষ্ণায়ন বাড়ছে। একুশ শতকের গোড়ায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ছিল তাদের ক্ষমতার শীর্ষে। অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে, জি সেভেন ও ন্যাটোর মিত্রদের ক্ষমতাকে ব্যবহার করে,তারা বেলাগাম আধিপত্য চালাতে পারত। তবে এই শতকের প্রথম দশকের মধ্যেই এমন পরিস্থিতির পরিবর্তন শুরুর বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে উঠল। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সামনে চ্যালেঞ্জ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বাধীন সমসাময়িক সাম্রাজ্যবাদের সামনে এখন রয়েছে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ:নয়া উদারবাদের সঙ্কট, প্রধান অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত শক্তি হিসাবে চীনের উত্থান এবং বহুপাক্ষিক বিশ্বের বিকাশ। এই বিকাশগুলি পরস্পরের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং তা দীর্ঘকালীন বিচারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যের আপেক্ষিক ক্ষয়ের প্রতিফলন। ২০০৮এর বিশ্বজোড়া ফিনান্সের সঙ্কট নয়া উদারবাদের সঙ্কটকে সামনে এনেছিল। তখন থেকেই, নয়া উদারবাদী পুঁজিবাদ সঙ্কট সমাধানে ব্যর্থ হয়েছে এবং মনে হয় একটা কানা গলিতে গিয়ে পড়েছে। এই অচলাবস্থা থেকে বেরোবার পথ না পেয়ে শাসক শ্রেণিগুলি সঙ্কট থেকে নজর ঘোরাতে ক্রমশ বেশি বেশি করে নয়া ফ্যাসিবাদী শক্তির দ্বারস্থ হচ্ছে। সেই শক্তিগুলি নিশানা করছে পরিযায়ীদের এবং ধর্মীয় বা জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর। গত দেড় দশকে বিভিন্ন দেশে উগ্র দক্ষিণপন্থী শক্তি ও নয়া ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলি মাথাচাড়া দিয়েছে। এই ঘটনা নাটকীয় ভাবে স্পষ্ট হয়েছে ইউরোপে। ফ্রান্সে শক্তি বাড়িয়েছে দ্য ন্যাশনাল রালি, জার্মানতে অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি), ইতালিতে ব্রাদার্সরা, স্পেনে ভক্স , ব্রিটেনে রিফর্মসহ অন্যরা। লাতিন আমেরিকায় উগ্র দক্ষিণপন্থীরা ভালমতোই এগিয়েছে। আর্জেন্টিনা, চিলি, কলম্বিয়া ও ব্রাজিলে এদের মদত দিচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। মার্কিন মাস্রাজ্যবাদ ক্রমশ বেশি বেশি করে এই সব উগ্র দক্ষিণপন্থী এবং নয়া ফ্যাসিবাদী শাসকদের ওপর ভরসা রাখছে তাদের আধিপত্য ও প্রভাব টিকিয়ে রাখার জন্য। ইজরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে কট্টর দক্ষিণপন্থী সরকার হল নেতানিয়াহু সরকার এবং তারাও ট্রাম্পের একনিষ্ঠ সমর্থক। গাজায় তারা যে গণহত্যা চালিয়েছে তাতে পূর্ণ মদত দিয়েছে বাইডেন ও ট্রাম্প প্রশাসন। চীনের উত্থান চীনের দ্রুতগতির আর্থিক বিকাশ, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং উদ্ভাবনের ক্ষমতা উল্লেখযোগ্য ভাবে বাড়িয়ে তুলেছে তাদের রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক প্রভাব। তাদের আধিপত্যের সামনে এবং বিদ্যমান সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার পক্ষে চীনকে স্ট্র্যাটেজিক চ্যালেঞ্জ বলে মনে করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। নতুন নতুন প্রযুক্তিতে চীন দ্রুত এগিয়ে চলেছে। এগোচ্ছে কৃত্রিম মেধার জগতে, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও রোবোটিকসে। বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে তারা নেতৃত্বদায়ী শক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে এবং সেই সব ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে সব প্রযুক্তিগত সুবিধাগুলি এতদিন উপভোগ করে এসেছে সেগুলিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে শুরু করেছে। উন্নত প্রযুক্তি চীন যাতে না পায় বা চীন যাতে সেগুলি নিজেরা তৈরি করতে না পারে সেকাজে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তবে তাতেও চীনের অগ্রগতি রোধ করা যায়নি। বহুপাক্ষিক বিশ্ব গ্লোবাল সাউথের পুঁজিবাদী দেশগুলি,যারা অনেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে, তাদের মধ্যেও একটা প্রবণতা ক্রমশ বাড়ছে। তা হল, তাদের জাতীয় স্বার্থে আরও বেশি স্বাধীন অবস্থান গ্রহণ। এই প্রবণতা প্রতিফলিত হচ্ছে ব্রিকসের সম্প্রসারণে এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা শক্তিশালী করার প্রয়াসে। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিয়য় হল চীন ও রাশিয়ার মধ্যে একটা স্ট্র্যাটেজিক বোঝাপড়া। শাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেসন, ব্রিকস এবং অন্যান্য উদ্যোগগুলি, যার লক্ষ্য গ্লোবাল সাউথের দেশগুলির মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি, সেগুলিই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যের অধীন বিশ্বব্যবস্থার একটা বিকল্প খোঁজার প্রয়াস। বহুপাক্ষিক বিশ্বের দিকে অগ্রগতি একাজে অংশগ্রহণকারী দেশগুলির মধ্যেকার দ্বন্দ্বগুলিকে খারিজ করে না। তাদের এক মঞ্চে আসার মানেও এই নয় যে তারা সকলেরই সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গী রয়েছে। এতদসত্ত্বেও, এই সব অগ্রগতি দেখিয়ে দেয় যে, আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্য আরও বেশি জটিল হচ্ছে এবং একটামাত্র আধিপত্যবাদী শক্তির হাতে ক্ষমতা অনেক কম সংহত হচ্ছে। আধিপত্য রক্ষার বেপরোয়া চেষ্টা আমাদের অবশ্যই এই পরিপ্রেক্ষিত থেকেই বুঝতে হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের বিষয়টিকে (ট্রাম্প ফেনোমেনা)। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব রক্ষা করার চেষ্টা করছেন ট্রাম্প। তাঁর ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ ও ‘মেক আমেরিকা গ্রেট আগেন’ থেকে বোঝা যায় যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শাসকশ্রেণি যখন বুঝতে পারছে যে তারা তাদের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক আধিপত্য হারাচ্ছে তখন তাকে উল্টো পথে হাঁটাতে চাইছেন ট্রাম্প। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শাসক শ্রেণিগুলি পথ খুঁজছে তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও আধিপত্য ফিরে পেতে। এই পটভূমিতেই ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতায় আসেন ট্রাম্প। তাঁর আমেরিকা ফার্স্ট শ্লোগানকে এখন কাজে পরিণত করার চেষ্টা চলছে। মার্কিন মিত্রসহ বিভিন্ন দেশের বিরুদ্ধে জবরদস্তিমূলক শুল্ক আরোপ এবং আমেরিকায় উৎপাদন ক্ষেত্রে তাদের পুঁজি বিনিয়োগ করানোর চেষ্টা — এসবের লক্ষ্য হল মার্কিন অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা। এছাড়া আরও নানা পদক্ষেপ করা হচ্ছে এটা নিশ্চিত করতে যাতে পশ্চিম গোলার্ধ মার্কিন আধিপত্যের অধীনে থাকে। এর মধ্যে পড়ে নতুন চেহারায় মনরো নীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং গোটা দক্ষিণ আমেরিকা জুড়ে দক্ষিণপন্থী জমানা চাপিয়ে দেওয়া। এই কৌশলের একটা অর্থনীতিক মাত্রাও রয়েছে, বিশেষ করে ভেনেজুয়েলার বিপুল তেল সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করার প্রেক্ষিতে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্রমাগত বেশি বেশি করে ঝুঁকছেন সামরিক পদক্ষেপের দিকে, যা ভেনেজুয়েলার ঘটনায় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ২০২৫ সালের জুনে ইজরায়েলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ট্রাম্প ইরানের তিনটি পরমাণু স্থাপনার ওপর বোমা হামলা চালিয়েছেন। এখন তিনি ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছেন এবং তা চলছে গত ৮ মাস ধরে। এসবের সঙ্গে মিল রয়েছে গ্যাংস্টার সাম্রাজ্যবাদের যারা কোনওরকম নীতি বা সীমা মানে না। যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব ক্ষয় পেয়েছে, এবং বিশ্বে বহুপাক্ষিকতা বেড়েছে, তবে এখনও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি। তারা নিজেদের সামরিক শক্তির নির্বিচার ব্যবহার করছে তাদের আধিপত্য বজায় রাখার জন্য। তবে প্রকৃত অর্থে এটা হতাশা থেকে উঠে আসা পদক্ষেপ। আপাতবৈপরীত্যের পরিস্থিতি লাতিন আমেরিকা এর প্রধান উদাহরণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শুধুমাত্র ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকেই বন্দী করেনি, বরং সে দেশের শাসন ও তেল সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেছে। ট্রাম্প গত ১৮ মাসে সাতটি দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সফলভাবে উগ্র দক্ষিণপন্থী প্রার্থীদের মদত দিয়েছেন যার মধ্যে রয়েছে চিলি ও হন্ডুরাসও। এবং সেই দেশগুলিতে প্রগতিশীল প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন। তবে ব্যতিক্রম ব্রাজিল। সেখানে লুলা ফ্লাবিও বলসোনারের চেয়ে প্রথম দফায় পিছিয়ে থেকেও উল্লেখযোগ্য জয় ছিনিয়ে এনেছেন। শাসক বদলের জন্য কিউবাকে নিশানা করেছেন ট্রাম্প। কিউবার বিরুদ্ধে জ্বালানি অবরোধ গড়ে তোলা হয়েছে। চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে আরও অনেক শত্রুতামূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। তাতে কিউবার জনগণের দুর্দশা ভয়ঙ্কর ভাবে বেড়েছে এবং কিউবার সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলছে। গাজায় ইজরায়েলের গণহত্যা এবং ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক দখল করার অভিযানেও মদত দিয়েছেন ট্রাম্প। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যে সংগ্রাম,তাকে অতি অবশ্যই এই সব বিষয়গুলিকে হিসাবের মধ্যে নিতে হবে। রণনীতিগত ভাবে, দীর্ঘকালীন বিচারে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এখন ক্ষয়ের দিকে। তবে রণকৌশলগত বিচারে, আশু অর্থে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে বিপুল সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি যা তারা কাজে লাগাতে পারে। এই পরিস্থিতিতেই মাও জে দংয়ের বক্তব্য প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। মাও বলেছিলেন, ‘রণনীতিগত ভাবে, আমাদের সব শত্রুকেই অবজ্ঞা করা উচিত। কিন্তু রণকৌশলগতভাবে আমাদের উচিত সব শত্রুকে গুরুত্ব দেওয়া।’ যদি এই কথাগুলিকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে প্রয়োগ করা হয় তাহলে বিষয়টা দাঁড়াবে এরকম: "রণনীতিগতভাবে, আমাদের মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে অবজ্ঞা করতে হবে, কিন্তু রণকৌশলগতভাবে আমাদের উচিত হবে তাদের গুরুত্ব সহকারে নেওয়া।'' এর মানে হল , আমাদের মার্কিন আধিপত্যের দীর্ঘকালীন সীমাবদ্ধতার স্বীকৃতি দিতে হবে। তবে একই সঙ্গে আমাদের গুরুত্ব দিয়ে একথা মাথায় রাখতে হবে যে, সামরিক হস্তক্ষেপ, অর্থনৈতিক জবরদস্তি ও রাজনৈতিক অশান্তি সৃষ্টির মাধ্যমে তাদের ক্ষতি করার ক্ষমতা এখনও রয়েছে। প্রতিরোধ বাড়ছে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ও নয়া উদারবাদী নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধও এখন বাড়ছে। গাজায় ইজরায়েলের যুদ্ধ এবং প্যালেস্তিনীয়দের গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে লক্ষ লক্ষ মানুষ অংশ নিয়েছেন। লন্ডন,প্যারিস, রোম এবং অন্য ইউরোপীয় এবং লাতিন আমেরিকার রাজধানীতেও দেখা গেছে গণ প্রতিবাদ। একইভাবে ইউরোপ সাম্প্রতিক সময়ে দেখেছে স্কুলের পড়ু্য়াদের বিপুল বিক্ষোভ। ফ্রান্সে পড়ুয়ারা দাবি করেছে শিক্ষার আরও ভাল সুযোগ। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে ট্রেড ইউনিয়নগুলি। গণ প্রতিবাদ হয়েছে স্পেন, ইতালি, পর্তুগাল ও জার্মানিতে। এই বিক্ষোভ হয়েছে জীবনধারণের খরচ বেড়ে যাওয়া, আবাসনের ঘাটতি এবং অপ্রতুল শিক্ষার সুযোগের বিরুদ্ধে। শ্রমিক শ্রেণি,কৃষক, যুব সম্প্রদায় এবং প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলিকে সঙ্গে নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা এবং নয়া উদারবাদী পুঁজির বিরুদ্ধে সংগ্রাম অবশ্যই প্রতিটি দেশে গড়ে তুলতে হবে। এর মানে ভারতে হিন্দুত্ব–কর্পোরেট জমানার বিরুদ্ধে সংগ্রামই হল বৃহত্তর সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের অংশ। কারণ মোদি জমানা আসলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের ঘনিষ্ঠ এবং কট্টর মিত্র। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লব যে স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়েছিল, তার শিখা আজকের দিনেও অম্লানভাবে প্রজ্বলিত রয়েছে। অনুবাদ:সুচিক্কণ দাস প্রকাশের তারিখ: ০৭-নভেম্বর-২০২৬ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |