|
সাম্রাজ্যবাদী অবরোধ বনাম কমিউনিস্ট প্রত্যয়ময়ূখ বিশ্বাস |
মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ১৯৬০ সালের কুখ্যাত ম্যালোরি স্মারকলিপিতে উল্লিখিত নীল নক্সা প্রয়োগ করতে বদ্ধপরিকর। যেখানে ষাটের দশকে মার্কিন কর্মকর্তা লেস্টার ম্যালোরি স্পষ্ট করেছিলেন, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের লক্ষ্য হলো ছোট্ট কিউবাকে ‘অর্থ ও খাদ্য সরবরাহ’ থেকে বঞ্চিত করা, ‘মজুরি ও প্রকৃত আয়’ কমিয়ে আনা এবং ‘ক্ষুধা, হতাশা থেকে সরকারের পতন’ ঘটানো। তাই ভেনেজুয়েলার কায়দাতেই একই ভাবে সন্ত্রাসবাদ ও ড্রাগ পাচারের মিথ্যা অজুহাত তৈরি করা হচ্ছে কিউবার বিরুদ্ধে। এভাবেই অতি দক্ষিণপন্থী ট্রাম্প প্রশাসন আক্রমণের ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে। |
আদর্শের সংঘাত সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গ ও কেরালার নির্বাচনে এবং অতীতে ত্রিপুরার নির্বাচনে বামপন্থীদের পরাজয়ে স্বয়ংসেবক প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর উচ্ছ্বাস গোপন করেননি। ভারতের একটি অঙ্গরাজ্য পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি-র জয়ে মোদিকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিউবাকে শেষ করতে চাওয়া চরম কমিউনিস্ট-বিরোধী মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিও কলকাতা ছুঁয়ে দিল্লিতে গিয়ে মোদির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ঠিক যেমন চোদ্দ বছর আগে মার্কিন বিদেশসচিব হিলারি ক্লিন্টন কলকাতা থেকে শুরু করেছিলেন ভারত সফর। রাজ্যে বামফ্রন্টের পরাজয়ের পরে সেদিন মমতা ব্যানার্জিকে শুভেচ্ছা জানাতে এসেছিলেন হিলারি। স্বাভাবিক। সাম্রাজ্যবাদ তাঁর দোসর-মিত্র যেমন খুঁজে নেয়, তেমনই চিনতে ভুল করে না ওদের লুটের সাম্রাজ্যের সামনে মূল প্রতিবন্ধকতা কারা কোথায় তৈরি করছে। মার্কিন শাসকদের বরাবরের টার্গেটে পশ্চিম গোলার্ধের একমাত্র সমাজতান্ত্রিক দেশ, ফিদেল-রাউল-ক্যামিলো-ভিলমাদের গড়া বিপ্লবী দ্বীপরাষ্ট্র কিউবা। কমিউনিস্ট কিউবার বিরুদ্ধে অমানবিক মার্কিন অবরোধ সেই ১৯৬২ থেকে চলছে। যে বছর বব ডিলানের প্রথম অ্যালবাম প্রকাশ, সেই বছরই কিউবার উপর পুরোপুরি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। অপরাধ ‘আ্যঙ্কেল স্যাম’-এর থেকে মাত্র ৮০ মাইল দূরে, প্রায় নাকের ডগায় বসে বিপ্লবোত্তর কিউবায় জাতীয়করণ, মার্কিনী মাফিয়াদের স্বর্গরাজ্যের অবসান ঘটিয়ে থেকে সকলের জন্য বিনা পয়সায় শিক্ষা-স্বাস্থ্যের ব্যবস্থা করা। কিন্তু মানব ইতিহাসে দীর্ঘতম এই ছয় দশকের বেশি সময়ের মার্কিন অবরোধে কিউবার ক্ষতি হয়েছে কয়েক লক্ষ কোটি মার্কিন ডলার। প্রথমদিকে অনৈতিক অবরোধে ওষুধের অভাবে মারা গিয়েছে কিউবার বহু কিউবান। কিউবার বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই অঘোষিত যুদ্ধ যে কিউবা ও আমেরিকার জন্যে কোনও সুফল বয়ে আনেনি, প্রাক্তন মার্কিন রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামাও তা স্বীকার করেন। যেমন, কিউবার অনবদ্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, বায়োফার্মেসি সুফল আনতে পারত মার্কিন গরিব-মধ্যবিত্তদের জন্য। কিন্তু কিউবাকে বিশ্ব বাজারে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না মার্কিন ওষুধ এবং স্বাস্থ্য বিমা কোম্পানিগুলোর স্বার্থে। এতে ক্ষতি হচ্ছে উভয় দেশেরই। অন্যদিকে কিউবার পর্যটন ব্যবস্থা ধ্বংস হচ্ছে মার্কিন চাপে। বার বার অবরোধের কামড় তীব্র হয়েছে। নব্বই দশকের প্রথমে পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক শিবির ও সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরেই কিউবায় সমাজতন্ত্র শেষ করার ধান্দায় ছিলো রেগান-ক্লিন্টনরা। ১৯৯২ সালে মার্কিন কংগ্রেসে গৃহীত টরিসেল্লি আইনের বলে কিউবার সঙ্গে জলপথে যোগাযোগ ব্যবস্থাও নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। যে জাহাজ কিউবার উপকূলে নোঙর ফেলবে সেই জাহাজকে মার্কিন জল সীমানায় প্রবেশ করতে গেলে কমপক্ষে ৬ মাস অপেক্ষা করতে হবে এবং নতুন করে জোগাড় করতে হবে মার্কিন অনুমতিপত্র। ১৯৯৬ সালে হেলমস-বার্টন আইন পাস হওয়ায় ওই নিষেধাজ্ঞার আওতা আরও সম্প্রসারিত হয়েছে। এর কবলে পড়েছেন বিদেশী বিনিয়োগকারীরাও। তাছাড়া এই আইনের বলে কিউবায় অন্তর্ঘাত চালানোর জন্য অর্থসাহায্যও বৈধতা পেয়েছে। ‘কমিশন ফর অ্যাসিসটেন্স টু আ ফ্রি কিউবা’ প্রভৃতি মাফিয়া সংগঠনের মাধ্যমে অস্থিরতা ছড়ানোর চেষ্টা করছে গোটা কিউবা জুড়েই। এই গোটা সাম্রাজ্যবাদী প্রক্রিয়াটি মূলত এক ধরনের অর্থনৈতিক যুদ্ধ, যার মানবিক পরিণতি ভয়াবহ। সেই কিউবাকে সাড়ে ছয় দশক ধরে অবরোধ করেও শান্তি নেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। এখন লক্ষ্য— জ্বালানি তেল সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ করে কিউবাকে পিষে মারা। এবছর ২৯ জানুয়ারি ‘এপস্টিন ফাইলে’ জ্বল জ্বল করা নাম, যৌন নিগ্রহকারী ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি প্রশাসনিক আদেশে দাবি করেছেন, কিউবা আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘বিপজ্জনক’। সঙ্গে হুঁশিয়ারি শুনিয়েছেন, কোনও দেশ কিউবাকে জ্বালানি তেল দিলে বা বিক্রি করলে সেই দেশের বিরুদ্ধেও আমেরিকা ব্যবস্থা নেবে। এরপর ১ মে ট্রাম্প ফের আরেকটি আদেশ জারি করে কিউবার ওপর আরেক দফা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। আগের নিষেধাজ্ঞাগুলিতে শুধু কিউবা বা তার সরকারি কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করলেও, এবারের শাস্তির আওতায় পড়েছে বিদেশি নাগরিক প্রতিষ্ঠান এবং ব্যাঙ্কগুলিও। ট্রাম্পের আদেশের ভূমিকায় বলা হয়েছে, কিউবা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘একটি অস্বাভাবিক ও চরম হুমকি’ ( ‘… an unusual and extraordinary threat, which has its source in whole or substantial part outside the United States.’)। এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় যাঁরা পড়বেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তাঁদের সব সম্পদ ও সম্পত্তির স্বত্ব বাজেয়াপ্ত হবে এবং তাঁরা আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে পারবেন না। শুধু তাই নয়, যাঁরা সরাসরি নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা সংগঠনগুলোর সঙ্গে পরোক্ষভাবে যোগাযোগ রাখেন বা তাদের সমর্থন দেন, তাঁরাও এই তালিকায় জড়িয়ে পড়বেন। আর সবচেয়ে ভয়ানক হল— কাউকে আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া হবে না। এবং এই নিষেধাজ্ঞাগুলো শুধু কিউবা আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং অন্য দেশগুলোর ওপরেও এর প্রভাব পড়বে। অর্থাৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভৌগোলিক সীমানার বাইরেও মার্কিন আইন খাটানো। মে মাসের ২০ তারিখ আরও আগ্রাসী পদক্ষেপ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। ফিদেল কাস্ত্রোর ভাই, কিউবার সেনার প্রাক্তন জেনারেল এবং প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে মার্কিন বিচার বিভাগ ষড়যন্ত্র, খুন ও বিমান ধ্বংসের অভিযোগ এনেছে। এটা সেই ১৯৯৬ সালের ঘটনা যখন কিউবার আকাশসীমায় দুটি বিমান ধ্বংস করা হয়েছিল। এই অভিযোগ এনে মার্কিন প্রসিকিউটর টড ব্লানশে রাউল কাস্ত্রোর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড চেয়েছেন। এই ঘটনাকে আগ্রাসনের আরেক অজুহাত বলে নিন্দা করেছে কিউবা। আমেরিকায় কিউবার রাষ্ট্রদূত আর্নেস্তো সোবেরন বলেছেন, কিউবার ওপর সামরিক হামলা চালানোর রাউলের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আনা হয়েছে। এবং এ সব নিয়ে তাঁর সরকারের পক্ষ থেকে আলোচনার আর্জিও খারিজ করে দেওয়া হয়েছে। কিউবায় নতুন করে মার্কিন সামরিক আগ্রসনের হুমকির বিরোধিতা করেছে চীন ও রাশিয়া। আন্তর্জাতিক আইনে এমন বিচারের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে চীন। অবরোধের ব্যপকতা বিগত ৭ মে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশদপ্তর ঘোষণা করে দেয় যে, কানাডার শেরিট করপোরেশন কোম্পানি কিউবার সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে নিকেল ও কোবাল্ট খনি চালাচ্ছে। তাই তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। শেরিট করপোরেশন জানায়, এই আদেশ জারি হওয়ার কারণেই তাদের স্বাভাবিক কাজকর্ম করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোম্পানির তিনজন পরিচালক পদ ছেড়েছেন আর শেয়ার বাজারে কোম্পানির শেয়ারের দাম ৩০ শতাংশ পড়ে গিয়েছে। এছাড়া কিউবার সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত বিশাল ব্যবসাগোষ্ঠী GAESA-কেও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে। কানাডার সংবাদমাধ্যম পিপলস ভয়েস কানাডা সরকারের সমালোচনা করে বলেছে, শেরিট করপোরেশনের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে চুপ করে থাকা ঠিক নয়। কানাডাকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষায়, আন্তর্জাতিক আইনের সম্মানে এবং বিদেশি চাপ ছাড়াই কানাডার কোম্পানির বৈধ ব্যবসা করার অধিকার নিশ্চিত করতে। কানাডাকে পরিষ্কার জানিয়ে দিতে হবে, তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এ হুমকি মেনে নেবে কি না! যদিও এখনো কানাডা সরকার কিছু বলতে পারেনি। এভাবেই যাঁরা কিউবার জ্বালানি ক্ষেত্র, প্রতিরক্ষা, ধাতু ও খনি, আর্থিক বা নিরাপত্তা খাতে কাজ করে, কিউবা সরকারের মালিকানাধীন, নিয়ন্ত্রিত বা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে কিউবা সরকারের হয়ে কাজ করে এমন সংস্থা, যাঁরা কিউবা সরকারকে ‘বস্তুগত সহায়তা’ বা পণ্য-সেবা দিয়ে সাহায্য করেছেন অথবা যে বিদেশি ব্যাঙ্কগুলো কিউবা সংক্রান্ত লেনদেনের সাথে যুক্ত, কোপ পড়ছে তাদের সবার ওপর। অর্থাৎ মার্কিন নীতি হলো পুরো বিশ্বকে এটা মানতে বাধ্য করা যে, তারা কিউবার সঙ্গে সম্পর্ক রাখলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ও আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার পাবে না। ট্রাম্পের জারি করা এই নিষেধাজ্ঞা শুধু কিউবার ওপর নয়, বরং যে কোনও দেশের ওপর মার্কিন শক্তি প্রয়োগের এক ঘৃণ্য নজির। অতীতেও এ ঘটনা ঘটেছে। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের জন্য খাদ্যসামগ্রী সাহায্য পাঠাতে অস্বীকার করে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র। সেদিনও অজুহাত ছিলো— বাংলাদেশ মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কিউবায় পাট রপ্তানি করেছিল। সোভিয়েতের বিপর্যয়ের পর পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল হয় কিউবা। করোনা কালে এই পর্যটন থেকে আয় কমে যায়, খাদ্য ও ওষুধের সংকট দেখা দেয়। কিউবা বিস্ময়কর করোনা ভ্যাকসিন (প্রায় ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসেও ঠিক থাকে, যা মূলত গ্রীষ্মকালীন দেশগুলোকে মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছিল) তৈরি করলেও অবরোধের কারণে বিশ্ব তা থেকে বঞ্চিত হয়। আর মার্কিনীরা করোনাকালেও এই অসুবিধার সুযোগ নিয়ে ২০২১-এর জুলাইয়ে প্রতিবিপ্লবের ছক কষে। মায়ামি থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় অজস্র ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে মিথ্যা খবর ছড়ায়, ‘রেডিও মার্তির’ মাধ্যমে উস্কানি দেয়। কিন্তু কিউবার কমিউনিস্ট পার্টি ও রাষ্ট্রপতি মিগুয়েল দিয়াজ-কানেলের নেতৃত্বে জনগণ সেই প্রতিক্রিয়াশীল ষড়যন্ত্র ছিন্ন করতে সক্ষম হন। এইবার এলএসইজি জাহাজ ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে মাত্র দুটি ছোট জাহাজ ও একটি ট্যাঙ্কার জ্বালানি নিয়ে কিউবায় গিয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ট্যাঙ্কারটি জানুয়ারিতে হাভানার বন্দরে জ্বালানি সরবরাহ করেছে, সেটি মেক্সিকো থেকে এসেছিলো। তখন পর্যন্ত মেক্সিকো দ্বীপরাষ্ট্রটির নিয়মিত তেল সরবরাহকারী ছিল। দ্বিতীয় জাহাজটি জামাইকা থেকে ফেব্রুয়ারিতে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (যা রান্নার গ্যাস হিসাবে পরিচিত) নিয়ে কিউবা গিয়েছিল। আর সম্প্রতি এই মে মাসে রাশিয়ার ট্যাঙ্কার ‘আনাতোলি কোলোদকিন’ কিউবায় পৌঁছেছে সাত লাখের বেশি ব্যারেল তেল নিয়ে। তিন মাসের মধ্যে এই প্রথম তেল পেল কিউবা। কিন্তু এইগুলো ট্রাম্প প্রশাসনের নিশানা না হওয়ার কারণ, ট্রাম্প প্রশাসন ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যবসাগুলোর জন্যেই জ্বালানি রপ্তানির অনুমতি দিচ্ছে, কিন্তু সরকারকে নয়। এদিকে কিউবায় বেসরকারি খাত কিছু বাড়লেও, বেশিরভাগ জরুরি পরিষেবা এখনও দেয় সরকার। সরকারই ঝড়ের সময় মানুষ সরিয়ে নিয়ে আশ্রয় দেয়। যানবাহন চালায়, আবর্জনা ফেলে, জন্মের সময়ের পরিষেবা থেকে শেষকৃত্য পর্যন্ত করে, বিনামূল্যে সেরা শিক্ষা-স্বাস্থ্য পরিষেবা দেয়, খেলাধুলা আর সংস্কৃতির অনুষ্ঠানে সুলভ মূল্যে প্রবেশের সুযোগ দেয়। বাড়ি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, খাবারের ওপর ভর্তুকি দেয়। আর ওষুধ ও টিকা বানায় এবং সেগুলো বিনামূল্যে দেওয়া হয়। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন চায় কমিউনিস্ট সরকারের পতন ঘটিয়ে মার্কিন কর্পোরেটদের স্বার্থে কিউবা চালানো। এমতাবস্থায় ট্রাম্প- রুবিওর মুখপাত্ররা বলছে, ‘সমস্যাটা অবরোধ নয়। সমস্যাটা সমাজতন্ত্র।’ কিন্তু কিউবার এখানকার প্রজন্ম, সাংবাদিক লিজ অলিভিয়া ফার্নান্ডেজের প্রশ্ন তাদের উদ্দেশ্যে, ‘এটা সত্যি হলে ওরা অবরোধ ওঠায় না কেন?’ নিশানা কিউবা, আক্রান্ত ভেনেজুয়েলা এক বছর আগেও কিউবায় তেল সরবরাহকার করত ভেনেজুয়েলা। এ বছর সে দেশ থেকে কিউবায় কোনও জ্বালানি আসেনি মার্কিন খবরদারির কারণে। কিউবার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ দেশ ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলের ভান্ডারের দিকে বহুদিন ধরে নজর ছিলো বিশ্বের তাবড় তেল কোম্পানিগুলোর। লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে ভেনেজুয়েলার বামপন্থী সরকারের তেল কূটনীতির ফলে, ‘সাউথ সাউথ সহযোগিতা’র ফলে মার্কিন আধিপত্য খর্ব হচ্ছিলো। তাই ট্রাম্পের প্রথম দফা শাসনকালে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন ঠিক করেছিলেন, এমনটা চলতে দেওয়া যায় না। কারণ ১৮২৩ এর ‘মনরো ডকট্রিন’-এর প্রেসক্রিপশন অনুসারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করবে পশ্চিম গোলার্ধ। তাই মার্কিনীরা শুরু করলো নৌ অবরোধ, মাদক পাচারের জড়িত বলে মিথ্যা অভিযোগে ভেনেজুয়েলার জাহাজগুলির ওপর অবৈধ বোমা বর্ষণ, হাইড্রোকার্বন সরবরাহ অবরোধ, তেল ট্যাঙ্কার দখল এবং শেষ পর্যন্ত একটি সার্বভৌম দেশে বৈধ উপায়ে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ও তার স্ত্রীকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়ে নিজেদের দেশে অবৈধভাবে বিচার করছে সাম্রাজ্যবাদী ট্রাম্প প্রশাসন। কিউবার ঘনিষ্ঠতম মিত্র ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি মাদুরোর অপহরণের পর সেখানকার বামপন্থী সরকার এখন কিছুটা ব্যাকফুটে। এ বছরের জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলায় অতি অত্যাধুনিক মার্কিন হামলার সময় কিউবার ৩২ জন যোদ্ধা সাহসিকতার সাথে লড়াই করে শহীদ হয়েছিলেন ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতিকে বাঁচাতে গিয়ে। কিন্তু এখন আরোও নির্মম আক্রমণের ভয়ে ভেনেজুয়েলার সরকার কিউবাকে তেল দেওয়া বন্ধ করেছে। এই অবস্থার সুযোগে কিউবার জনগণের ওপর মার্কিনীরা সর্বোচ্চ অবরোধ চাপিয়ে দিচ্ছে। এটা স্পষ্ট, আবার মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ১৯৬০ সালের কুখ্যাত ম্যালোরি স্মারকলিপিতে উল্লিখিত নীল নক্সা প্রয়োগ করতে বদ্ধপরিকর। যেখানে ষাটের দশকে মার্কিন কর্মকর্তা লেস্টার ম্যালোরি স্পষ্ট করেছিলেন, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের লক্ষ্য হলো ছোট্ট কিউবাকে ‘অর্থ ও খাদ্য সরবরাহ’ থেকে বঞ্চিত করা, ‘মজুরি ও প্রকৃত আয়’ কমিয়ে আনা এবং ‘ক্ষুধা, হতাশা থেকে সরকারের পতন’ ঘটানো। তাই ভেনেজুয়েলার কায়দাতেই একই ভাবে সন্ত্রাসবাদ ও ড্রাগ পাচারের মিথ্যা অজুহাত তৈরি করা হচ্ছে কিউবার বিরুদ্ধে। এভাবেই অতি দক্ষিণপন্থী ট্রাম্প প্রশাসন আক্রমণের ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে। অবরোধ নয়, যুদ্ধ কিউবায় এখন জ্বালানি তেল পুরোপুরি ফুরিয়ে গিয়েছে। মানুষ ২০-২২ ঘণ্টার বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অকেজো। ‘পাওয়ার রেশনিং’ (দিনের নির্দিষ্ট সময়ে বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেওয়া) চলছে। অতিরিক্ত বা অপ্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক আলো, রাস্তার ল্যাম্প ইত্যাদি বন্ধ। মার্কিন অবরোধ ও ট্রাম্প সরকারের নিষেধাজ্ঞার ফলে কিউবায় জ্বালানি সরবরাহ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করার এই নতুন পদক্ষেপের ফলে সেখানে দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ বিপর্যস্ত। হাসপাতালগুলো অচল। নবজাতকের ইনকিউবেটর ও লাইফ সাপোর্ট যন্ত্র বন্ধ হয়ে পড়ছে, জরুরি অস্ত্রোপচারও অন্ধকারে ভ্যাপসা গরমের মধ্যে করতে হচ্ছে। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস-আদালত, দোকান বন্ধ। জ্বালানির অভাবে খাদ্য, ওষুধপথ্যের মতো জরুরি পরিষেবা-পরিবহণ ব্যাহত হচ্ছে, খাবার নষ্ট হচ্ছে। অনেক বাড়িতে এখন গ্যাসের বদলে কাঠ দিয়ে রান্না হচ্ছে। জ্বালানি কেন্দ্রের যন্ত্রাংশ, সোলার প্যানেল কিংবা শিশুর জীবন বাঁচানোর ওষুধ, মাছের ট্রলার, গ্লাভস- সবকিছুই আটকে দিচ্ছে এই নিষেধাজ্ঞা। কিউবার অর্থনীতির মূল স্তম্ভ পর্যটন ব্যবসা বন্ধ। ইন্টারনেট ব্যবহারেও প্রতিবন্ধকতা লাগিয়েছে মার্কিন কর্পোরেট সংস্থাগুলো (কিউবার কমিউনিস্ট সরকার কিন্তু ফ্রি ইন্টারনেটের পক্ষে)। ফ্যাক্টরির জায়গায় আবার ব্যবহার করা হচ্ছে বলদ। বড় বড় ফার্মগুলো তেলের অভাবে সমস্যায় পড়েছে। খাদ্য উৎপাদন ব্যহত হচ্ছে। বিদেশি ব্যাঙ্ক ও কোম্পানিগুলো ভয়ে কিউবার সঙ্গে কোনও সম্পর্ক রাখতে চাইছে না। তৃতীয় দেশের ব্যাঙ্ক গুলো যদি কিউবার কোনও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেন করে, তাহলে তারা যুক্তরাষ্ট্রের পুরো আর্থিক ব্যবস্থা থেকেই ছিটকে যাওয়ার আশঙ্কায় পড়বে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের লক্ষ্য— কিউবার সাধারণ জনগণের ওপর একটি সুপরিকল্পিত ও নৃশংস আক্রমণ চালানো। যার প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল কিউবায় ক্ষুধা, দুর্দশা, বঞ্চনা, হতাশা থেকে বিক্ষোভ তৈরি করা। তখন সেখানে ‘সুপারম্যান’, ‘র্যাম্বো’, ‘জ্যাক রায়ান’ নামক ভগবানের সন্তান মার্কিনীরা বাঁচাতে আসবে কিউবানদের। তারপর ১৯৫৯'এর বিপ্লবের আগে যেমন, চিনি থেকে নিকেল- লুঠ, মাফিয়াদের মোচ্ছব চলতো, তাই চলবে। এমনই ইচ্ছা চরম কমিউনিস্ট বিরোধী কিউবান-মার্কিন রাজনীতিবিদ মার্কো রুবিও, কার্লোস গিমেনেজ ও মারিয়া এলভিরা সালাজারদের। কারণ এদের পরিবার ছিলো কাস্ত্রো-উত্তর কিউবার বিশাল জমি কোম্পানির মালিক। কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় এসে ওদের পরিবারের বিপুল সম্পত্তি জাতীয়করণ করে এবং জমি জনসাধারণের মধ্যে বিলিয়ে দেয়। তাই প্রতিশোধ স্পৃহায় বদলা নিতে বদ্ধপরিকর রুবিওরা। প্রকাশের তারিখ: ২৮-মে-২০২৬ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |