ইমরান, ক্রিকেট, অর্থ ও রাজনীতি

তারিক আলি

পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড, যা বহুদিন ধরেই বিষধর সাপ আর চাটুকারদেরদের আখড়া। তারা প্রথমে স্কাই-কে সাক্ষাৎকারগুলি সম্প্রচার না করার জন্য অনুরোধ করে। শুধু তাই নয়, সম্প্রচার করা হলে, পাকিস্তান দল মধ্যাহ্নভোজের পর আর মাঠে নামবে না বলে হুমকি পর্যন্ত দেন দমন-পীড়ন মন্ত্রী। যদিও, এই ব্ল্যাকমেল কাজে দেয়নি। স্কাই তাদের দাবি উপেক্ষা করে। পাক দল মাঠে ফেরে— যদিও সেটাকে নিছকই খেলার জন্য খেলতে আসা বলা যায়। উইকেট পড়তে থাকে হুড়মুড়িয়ে।... গোটা ঘটনাটা দলের মনোবল আরও ভেঙে দিয়েছে। পাকিস্তানের ক্রিকেট ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পিসিবি ক্রিকেটকে ধ্বংস করছে। 

ইমরান খান— পাকিস্তানের সবচেয়ে বিখ্যাত ক্রিকেট অধিনায়ক এবং বর্তমানে বিরোধী দলনেতা, যাঁর নির্বাচিত সরকারকে ২০২২ সালে সামরিক নির্দেশে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল, গত তিন বছর ধরে কারাগারে বন্দি। ইউক্রেন সম্পর্কে তাঁর মন্তব্যে পেন্টাগন বিরক্তি প্রকাশ করায় এবং আফগানিস্তান থেকে মার্কিনীদের পশ্চাদপসরণে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করার পর তাঁকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। 

পাকিস্তান এখন তার পঞ্চম সামরিক স্বৈরশাসকের অধীনে চলছে। অসামরিক শাসনের মুখোশটা যে সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য, ট্রাম্প, এমবিএস এবং ইরানের নেতৃত্ব— সবাই তা খুব ভালো করেই জানে। গোটা পাকিস্তান জানে, ইমরানকে কারাগারে রাখার একমাত্র ও প্রধান কারণ হল, তিনিই দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনীতিক। আর দেশটি নিজেই এখন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। সামাজিক পরিকাঠামো ভেঙে পড়ার অবস্থায়। খাদ্যের দাম আকাশছোঁয়া, কয়েক দশক ধরে শিশুমৃত্যুর হার একই জায়গায় থমকে আছে, শিশুরা খর্বকায় অবস্থায় জন্ম নিচ্ছে এবং ১৯৮০-এর দশকের পর থেকে অধিকাংশ পাকিস্তানির গড় উচ্চতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছে। এক নির্দয়, লোভী, নির্লজ্জ রাজনৈতিক-সামরিক অভিজাত শ্রেণি ক্ষমতা আঁকড়ে আছে, আর তাকে টিকিয়ে রাখছে আইএমএফ, চীন এবং সৌদি আরব। পাকিস্তানের অর্থমন্ত্রী মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব ফিনান্সিয়াল টাইমস-কে বলেছেন, ওয়াশিংটনের কাছে গত মাসে পাকিস্তান যে ১,০০০ কোটি ডলারের সোয়াপ লাইন চেয়েছিল, তার উদ্দেশ্য ছিল ‘আত্মবিশ্বাসের সংকেত’ দেওয়া— যাতে ইসলামাবাদের সামরিক-সমর্থিত সরকার ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে পারে। চীন যখন ঋণে দেওয়ার ব্যাপারে ক্রমশ কঠোর হয়ে উঠছে, তখন মরিয়া অর্থমন্ত্রী আমেরিকার কাছ থেকে আরও কিছু অনুদানের জন্য কাকুতি-মিনতি করছেন।

একা বন্দি থেকে থেকে, প্রতি সপ্তাহেই যখন তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটছে, ইমরানকে কোনও সাহায্যই করতে অস্বীকার করছে সেই অসামরিক পেয়াদারা, যারা সেনাবাহিনীর হয়ে কাজ করে এবং দেশের দুই সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত বংশানুক্রমিক দলের অন্তর্ভুক্ত-  মুসলিম লিগের শরিফ ভ্রাতৃদ্বয় এবং পিপলস পার্টির জারদারি-ভুট্টো পরিবার। অবশ্য তাঁদের করার মতো বিশেষ কিছু নেই, কারণ তাঁর কারাবন্দিত্বের নির্দেশ আসছে উর্দি-পরা সেই হর্তাকর্তার কাছ থেকেই, যিনি নিজেকে ফিল্ড মার্শাল হিসেবে ঘোষণা করেছেন— আসিম মুনির। কিন্তু তাঁদের নীরবতা ক্ষমার অযোগ্য। শুধু দুর্নীতিগ্রস্ত দলগুলিই নয়, বহু উদারপন্থীও ইমরানের অবিলম্বে এবং নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানাতে ব্যর্থ হয়েছেন। রাজনৈতিকভাবে তাঁরা তাঁর সঙ্গে একমত নন। কিছু কিছু বিষয়ে আমিও তাঁর সঙ্গে একমত নই, কিন্তু তাতে কী এসে যায়? এতে আমার মনে পড়ে যায়, কীভাবে বাম ও ডান— উভয় দিকের বহু জুলফিকার আলি ভুট্টো-বিরোধী রাজনীতিক জেনারেল জিয়ার সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন এবং ভুট্টোকে ১৯৭৯ সালে ফাঁসিতে ঝুলতে দিয়েছিলেন। পরে তাঁদের কেউ কেউ অনুতপ্ত হয়েছিলেন, কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে এবং জেনারেল জিয়া এমন এক নতুন, মার্কিন-সমর্থিত জিহাদি ‘ঐকমত্য’ তৈরি করতে ব্যস্ত, যা দেশটিকে ধ্বংস করে দেয়। বারবার নিজের ভুলের পুনরাবৃত্তি করাই যে রাষ্ট্রের নিয়তি, সে কখনও এগোতে পারে না। অন্তত পাকিস্তানের তরুণ বামপন্থী ‘হক্ক-এ-খালক’ [জনগণের অধিকার পার্টি] এটা স্বীকার করেছে। অন্যান্য কাজের পাশাপাশি তারা ইমরানের মুক্তির জন্যও লড়াই করছে। তাদের অন্যতম প্রধান নেতা আম্মার জান একদল দৃঢ়চেতা সমাজতান্ত্রিক বুদ্ধিজীবীর একজন, এবং তাঁর প্রবন্ধসংকলন রুল বাই ফিয়ার: এইট থিসিস অন অথোরিটারিয়ানিসিম ইন পাকিসস্তান একটা খুবই কার্যকর ও পাঠযোগ্য রাজনৈতিক বই। 

যে পচন গোটা দেশটিকে গ্রাস করেছে, তা এখন তার সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা— ক্রিকেটকেও গ্রাস করেছে। এর প্রতীক হল, পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান মহসিন নকভি একইসঙ্গে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (অর্থাৎ দমন-পীড়নের মন্ত্রী)। তাঁর বস, ফিল্ড মার্শালের মতোই, ইমরান খানকে পাকিস্তানের ইতিহাস থেকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলার ইচ্ছে তাঁকেও গ্রাস করেছে। ১৯৯২ সালে অধিনায়ক হিসেবে ইমরানের ক্রিকেট বিশ্বকাপ জয়ের তথ্যচিত্রের ফুটেজ পাকিস্তানের টেলিভিশনে এখন নিষিদ্ধ। আর বর্তমানে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে চলতে থাকা টেস্ট সিরিজে দলের যে পতন ঘটছে, সেটিও অবক্ষয়ের আরেকটি স্মারক। দলটি ব্রিটেনে পৌঁছনোর সময়, যে ২১টি দেশে ক্রিকেট খেলা হয়, সেই সব দেশের ২১ জন ক্রিকেট অধিনায়ক (ভারত থেকে সুনীল গাভাসকর ও কপিল দেব এবং পাকিস্তান থেকে জাভেদ মিয়াঁদাদও তাঁদের মধ্যে ছিলেন, ওয়াসিম আকরাম, ওয়াকার ইউনিস এবং ইনজামাম-উল-হক ছিলেন না— যদিও এই তিনজনকেই আবিষ্কার করে প্রতিষ্ঠা এবং উৎসাহ দিয়েছিলেন ইমরান) পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেন। অত্যন্ত ভদ্র ভাষায় তাঁরা দাবি করেন, ইমরানের যেন যথাযথ চিকিৎসা পরীক্ষা করা হয়, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি দেওয়া হয় এবং তাঁর স্বাস্থ্যসংক্রান্ত যে কোনও সমস্যার জন্য যেন বাধাহীন চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। ২৮ আগস্ট, পাকিস্তান যখন ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে খেলছে, তখন স্কাই স্পোর্টস টেলিভিশন মধ্যাহ্নভোজের বিরতির ১৮ মিনিট মাইক আথারটনকে দিয়েছিল— ইমরানের দুই ছেলের সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য, যারা লন্ডনে থাকে। পাকিস্তানের অভ্যন্তরে, সুপ্রিম কোর্ট সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে ইমরানকে মুক্তি দিতে এবং তাঁর চোখের অবস্থা গুরুতর তাই তার চিকিৎসার জন্য তাঁকে একটি শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। সরকার তা প্রত্যাখ্যান করে। পরিবর্তে তাঁকে সেনাছাউনির সাগরেদ এক চক্ষুবিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানো হয়, যিনি ঘোষণা করেন যে সব ঠিকঠাক আছে, এবং তারপর তাঁকে আবার কারাগারে ফেরত পাঠানো হয়।

‘পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড’ (পিসিবি), যা বহুদিন ধরেই বিষধর সাপ আর চাটুকারদের আখড়া। তারা প্রথমে স্কাই-কে সাক্ষাৎকারগুলি সম্প্রচার না করার জন্য অনুরোধ করে। শুধু তাই নয়, সম্প্রচার করা হলে, পাকিস্তান দল মধ্যাহ্নভোজের পর আর মাঠে নামবে না বলে হুমকি পর্যন্ত দেন দমন-পীড়ন মন্ত্রী। যদিও, এই ব্ল্যাকমেল কাজে দেয়নি। স্কাই  তাদের দাবি উপেক্ষা করে। পাক দল মাঠে ফেরে— যদিও সেটাকে নিছকই খেলার জন্য খেলতে আসা বলা যায়। উইকেট পড়তে থাকে হুড়মুড়িয়ে। 

গোটা ঘটনাটা দলের মনোবল আরও ভেঙে দিয়েছে। পাকিস্তানের ক্রিকেট ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পিসিবি ক্রিকেটকে ধ্বংস করছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই খেলোয়াড়রা এই প্রক্রিয়ার শিকার হচ্ছেন। সম্ভবত তাঁদের টেস্ট ক্রিকেট পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া উচিত এবং ২০-২০ সংস্করণে মনোযোগ দেওয়া উচিত, যেখানে বিপুল অর্থ উপার্জন করা যায়। দুর্নীতি সর্বত্র। এবং বেটিং সংস্থাগুলিই খেলাটির উপর কর্তৃত্ব করছে। 

দেশটার ভালো না হলে পাকিস্তানের ক্রিকেটও ভালো হবে না।

ভাষান্তর: নবারুণ চক্রবর্তী


প্রকাশের তারিখ: ২০-সেপ্টেম্বর-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org