ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি এক জরুরি দাবি 

শংকর মুখার্জি
মার্কস একদা বলেছিলেন: যখন কোনও ধারণা জনগণের ওপর প্রভাব বিস্তার করে, তখন সেটা বস্তুগত শক্তিতে পরিণত হয়। এটা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, এখন দেশের শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে ন্যূনতম মজুরির দাবি প্রায় সেইরকম শক্তি অর্জন করেছে, যার জন্য নয়ডা, গাজিয়াবাদ, মানেসর থেকে হাওড়া শিল্পাঞ্চল সর্বত্র শ্রমিকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই দাবিতে মালিকদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে শামিল হচ্ছেন।

কয়েকটি সাধারণ দাবির ভিত্তিতে দেশের কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলির একমঞ্চে ঐক্যবদ্ধ হবার একটা প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০০৯ সাল থেকে। মূলত সিআইটিইউ এবং বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়নগুলির উদ্যোগেই এটা বাস্তবে রূপ পায়। যদিও কংগ্রেসের আইএনটিইউসি এবং সঙ্ঘ পরিবারের বিএমএস-কে সেই মঞ্চে একসঙ্গে পাওয়ায় সমস্যা ছিল। ২০১২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির ট্রেড ইউনিয়নগুলির ডাকা সাধারণ ধর্মঘট— দেশের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে প্রথমবার, যেখানে আইএনটিইউসি এবং বিএমএস একসঙ্গে যোগ দেয়। এটাও যেমন ছিল দেশের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে একটা গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি, ঠিক একইভাবে আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় ওই ধর্মঘটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে। ২০০৯ সালে কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলির ঐক্যবদ্ধ মঞ্চের ছিল পাঁচ দফা দাবি, ২০১২ সালের ধর্মঘটে তার সঙ্গে যুক্ত হয় আরও পাঁচ দফা দাবি। যার মধ্যে অন্যতম হলো: ‘ন্যূনতম মজুরি মাসে ১০ হাজার টাকার কম করা যাবে না’। 

সর্বজনীনভাবে ন্যূনতম মজুরির এইরকম একটি টাকার অঙ্ক নির্ধারণ করা সম্ভবত স্বাধীন ভারতে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের ছিল একটি নবতম সংযোজন। তবে জাতীয় স্তরে কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলির মঞ্চে বর্তমানে আইএনটিইউসি থাকলেও বিএমএস কিন্তু আর নেই।

দাবিসনদে ১০ হাজার টাকার ন্যূনতম মজুরির দাবি দেখে সেসময়ে অনেকেই চোখ টেড়িয়েছিল। আর করবেই না কেন! একটা উদাহরণ দিলেই ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার হবে। সম্প্রতি উত্তর ভারতে মানেসর, গুরগাঁও, নয়ডা, ফরিদাবাদ প্রভৃতি শহর যে শ্রমিক বিক্ষোভে উত্তাল হয়েছিল, তার একটা অন্যতম কারণ ছিল খুবই কম মজুরি। পরে জানা যায়, এখানকার অস্থায়ী, চুক্তিভিত্তিক, ঠিকা শ্রমিকরা মাসে ৯ হাজার থেকে ১১ হাজার টাকা পান। যদিও, এরাই এখন এখানকার শ্রমশক্তির বড় অংশ। তাই বুঝতে অসুবিধা হয় না, আজ থেকে ১৪ বছর আগে ১০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে কেন অনেকে অবাক হয়েছিলেন। পরবর্তীতে দেশের ঐক্যবদ্ধ ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন মাসে ন্যূনতম মজুরির দাবি ১৮ হাজার টাকা, ২৮ হাজার টাকা প্রভৃতি করেছে, বর্তমানে সেটা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। সেটাই স্বাভাবিক, এবং নির্দিষ্ট সময় অন্তর বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে তার সংশোধন হওয়া দরকার।

।দুই। 

সারা দেশে  অভিন্ন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রেও একটি গুরুতর সমস্যা রয়েছে। কারণ সরকারিস্তরে কিছু নীতিগত নির্দেশিকা ছাড়া এমন কোনও বাধ্যতামূলক আইনগত কাঠামো নেই, যার ভিত্তিতে ন্যূনতম মজুরি নিয়ে নির্দ্বিধায় ও বিতর্কহীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। ফলে প্রায়ই দেখা যায়, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের দায়িত্বপ্রাপ্ত ত্রিপাক্ষিক সংস্থাগুলিতে শ্রমিকদের স্বার্থে বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা হস্তক্ষেপ করলেও শেষ পর্যন্ত পুঁজিপতি শ্রেণি ও শাসকশ্রেণির পক্ষেই এই সংস্থাগুলি অবস্থান নেয়। আবার ন্যূনতম মজুরির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য আঞ্চলিক বৈষম্যও বিদ্যমান। এমনকী পাশাপাশি দুটি অর্থনৈতিক অঞ্চল যারা ভৌগোলিকভাবে একেবারে একই ভূখণ্ডে, শুধু দুটি ভিন্ন রাজ্যে অবস্থিত হওয়ার জন্য মজুরিতে বৈষম্য রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, নয়ডা ও গুরগাঁওয়ের ন্যূনতম মজুরি প্রতিবেশী দিল্লির তুলনায় প্রায় ৪৩ শতাংশ কম। সম্প্রতি বৃদ্ধি হওয়ার আগে উত্তরপ্রদেশে ন্যূনতম মজুরি ছিল মাসে ১১,৩১৩ টাকা, যেখানে দিল্লিতে পূর্বতন আপ পরিচালিত সরকার ১৯,৮৪৫ টাকা নির্ধারণ করেছিল। এই দুই জায়গাতেই প্রায় একই হারে বাজারদর বাড়লেও ন্যূনতম মজুরির মধ্যে রয়েছে বিশাল ব্যবধান। আরেকটি সমস্যা হলো, আমাদের দেশে বহু রাজ্যেই ন্যূনতম মজুরি দীর্ঘদিন ধরে সংশোধিত হয় না। যেমন হরিয়ানায় ৫ বছর, উত্তরপ্রদেশে ১২ বছর এবং আমাদের পশ্চিমবঙ্গেও ১২ বছর ন্যূনতম মজুরি সংশোধিত হয়নি।  

ন্যূনতম মজুরির ধারণার মূল ভিত্তিই হচ্ছে, একজন শ্রমিকের বেঁচে থাকার জন্য ও উৎপাদন প্রক্রিয়া মসৃণভাবে চালানোর জন্য ন্যূনতম যা প্রয়োজন সমসাময়িক বাজারদর অনুযায়ী তা অর্জন করতে যে অর্থ দরকার। তাই ন্যূনতম মজুরি সংশোধনের আগে নির্দিষ্ট সময় অন্তর ডিএ যুক্ত করার বিষয়ও থাকে। ন্যূনতম মজুরি নির্ণয় করার সূত্র প্রথমবার এদেশে হয় ১৯৫৭ সালে ভারতীয় শ্রম সম্মেলনে। আসলে এই সূত্র নির্ণয় করা হয়েছিল, ১৯৪৮ সালে ডাক্তার ভ্যালেন্স অ্যাকরয়েডের প্রস্তাবিত বৈজ্ঞানিক মানদণ্ডের ওপর। ডাঃ অ্যাকরয়েড ছিলেন রাষ্ট্রপুঞ্জের ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অরগানাইজেশন (ফাও)-এর প্রথম ডিরেক্টর। তিনি যে কোনও দেশে শ্রমিকদের বেঁচে থাকার জন্য মূল খরচ এবং তাদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি তৈরি করেন। ওই বছরই ‘মিনিমাম ওয়েজেস অ্যাক্ট, ১৯৪৮’ প্রণীত হয়। স্বাধীন ভারতে ওটাই ছিল প্রথম শ্রম আইন। তবে এই আইনে ন্যূনতম মজুরি কীভাবে নির্ধারিত হবে তা কিন্তু বলা ছিল না। অ্যাকরয়েডের প্রস্তাবিত মানদণ্ডের ভিত্তিতে ভারতীয় শ্রম সম্মেলনে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের সেই পদ্ধতি তৈরি হয়। তাতে বলা হয়েছিল— স্বামী, স্ত্রী এবং দুই শিশুর একটি পরিবারে তিনটি ভোগ্য ইউনিট বিচার করে প্রতি ইউনিটের প্রতিদিনের জন্য ২৭০০ ক্যালোরি পাওয়া যাবে এরকম সুষম খাদ্য, বছরে পরিবারপিছু ৭২ গজ কাপড়, সরকারি শিল্পাঞ্চল আবাসন প্রকল্প অনুযায়ী ঘরভাড়া এবং জ্বালানি, বিদ্যুৎ, অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের জন্য ন্যূনতম মজুরির ২০ শতাংশ যুক্ত করার কথা বলা ছিল। অনেক পরে ১৯৯২ সালে সুপ্রিম কোর্ট ন্যূনতম মজুরির হিসেবে আরও ২৫ শতাংশ শিশুদের পড়াশুনা, স্বাস্থ্য এবং  উৎসব, বিয়ে প্রভৃতির জন্য খরচকে যুক্ত করার কথা বলে। এই সব বিষয়কে একসঙ্গে করেই ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করতে হবে। সম্প্রতি কেন্দ্রের বিজেপি সরকার যে শ্রম কোড চালু করেছে তার আগে পর্যন্ত এটাই ছিল ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের একমাত্র পদ্ধতি।

।তিন।

এগুলিকে বিবেচনায় রেখে সারা দেশে একটা অভিন্ন ন্যূনতম মজুরি করার কথা স্বাধীন ভারতে কোনও কেন্দ্রীয় সরকার ভাবেনি। যার ভিত্তিতে অদক্ষ, আধা দক্ষ, দক্ষ কিংবা বেশি দক্ষ এবং ব্যবসাবাণিজ্য, পরিষেবা এবং শিল্প ও কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থার কেনো ক্ষেত্রেই তার থেকে কম মজুরি কোনও শ্রমিক ও কর্মচারীকে দেওয়া যাবে না— এইরকম একটা ব্যবস্থা তৈরি করা। বর্তমানে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে আরও অনেকগুলি বিষয় যুক্ত করার কথা কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলি দাবি করেছে। কেন্দ্রীয়ভাবে না-হলেও সিআইটিইউ’র হরিয়ানা রাজ্য কমিটি একেবারে সাম্প্রতিক হিসেবে একটা ন্যূনতম মজুরির হিসাব করেছে। যাতে একটা পরিবারের ভোক্তা ইউনিট ৪ (যেটা আগে ৩ ছিল) ধরে, এবং এর সঙ্গে নতুন করে মোবাইল ফোনের খরচ, ভ্রমণ অনুদান যুক্ত করা হয়েছে। হরিয়ানা রাজ্য সরকার ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে সে রাজ্যে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের জন্য একটা কমিটি তৈরি করেছিল, যাতে সব ট্রেড ইউনিয়নকে ডাকা হয়। সিআইটিইউ সেই কমিটিতে নতুন এই বিষয়গুলি যুক্ত করে মাসে ন্যূনতম মজুরি ৩১,৮৪৩.৪৮ টাকা প্রস্তাব রাখে, পরে সব ট্রেড ইউনিয়ন মিলিতভাবে মাসে ৩০ হাজার টাকার দাবি করে রাজ্য সরকারের কাছে।

আগেই জেনেছি এদেশে একটা নির্দিষ্ট ন্যূনতম মজুরি নেই। মিনিমাম ওয়েজেস অ্যাক্ট, ১৯৪৮-এর দেওয়া ক্ষমতায় কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলি ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করে। বেসিক এবং তার সঙ্গে পরিবর্তনশীল মহার্ঘভাতা যোগ করেই ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়। সারা ভারত উপভোক্তা সূচকের ভিত্তিতে বছরে দুবার, এপ্রিল ও অক্টোবর মাসে মহার্ঘভাতা ঠিক করা হয়। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের এক্তিয়ারে কোন কোন ক্ষেত্রের ন্যূনতম মজুরি ঠিক করার অধিকার থাকবে তা ওই আইনে নির্দিষ্ট করা আছে। কোড অন ওয়েজেস, ২০১৯ চালু হওয়ার আগে পর্যন্ত ন্যূনতম মজুরি আইন ব্যবসাবাণিজ্য ও উৎপাদনের সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল না। অসংগঠিত ক্ষেত্রের বেশিরভাগ অংশের শ্রমিক-কর্মচারীরা এর আওতায় আসতেন না। যদিও দেশের শ্রমশক্তির ৯০ শতাংশই অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করে, যাদের মধ্যে গ্রামীণ খেতমজুররা রয়েছে। এরা সংখ্যায় সর্বাধিক। আইন অনুযায়ী কৃষি শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ঠিক করার দায়িত্ব রাজ্য সরকারগুলির, তারা সেটা নির্ধারণ করলেও, সারা বছর কৃষিকাজের এত ওঠানামা যে খেতমজুর (কৃষিশ্রমিক)-রা মজুরি পাওয়ার ক্ষেত্রে বিরাটভাবে বঞ্চনার শিকার হন। 

কেরালা, তামিলনাডু প্রভৃতি কয়েকটি রাজ্যে কিছু ব্যতিক্রম হলেও সারা দেশে খেতমজুরদের বঞ্চনার ছবিটা একইরকমের। তবে কোড ওন ওয়েজেসে সমস্ত শ্রমিক-কর্মচারীকে ন্যূনতম মজুরির আওতায় আনার কথা বলা আছে এবং তিন বছর অন্তর এই মজুরি সংশোধন করা বাধ্যতামূলক। এই কোডে বলা হয়েছে, কেন্দ্র একটা ‘ন্যাশনাল ফ্লোর ওয়েজ’ ঠিক করবে, কোনও রাজ্যের ন্যূনতম মজুরি তার কম কখনই করা যাবে না। ২০১৯ সালে সেটা ঠিক করে কেন্দ্র, এবং তখন তা ছিল প্রতিদিন মাত্র ১৭৮ টাকা। কেন্দ্রের নির্ধারণ করা ন্যশনাল ফ্লোর ওয়েজ এতটাই কম যে, এটা কোনওভাবেই ন্যূনতম মজুরির একটা শক্তিশালী ভিত্তি হতে পারে।

হরিয়ানায় ট্রেড ইউনিয়নগুলি ঐক্যবদ্ধভাবে ন্যূনতম মজুরি মাসে ৩০ হাজার টাকার প্রস্তাব রাখলেও রাজ্য সরকার তা মেনে নেয়নি। হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী এবছর ২ মার্চ সে রাজ্যের ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করেছে ১৫,২২০ টাকা। হরিয়ানার বিজেপি সরকার এতটাই শ্রমিক-বিরোধী এবং অনৈতিক যে, তারা এটা কার্যকর পর্যন্ত তখন করেনি। শেষে এপ্রিল মাসে মানেসরে যখন শ্রমিক বিক্ষোভ দেখা দিল, তখন মান বাঁচাতে  হরিয়ানা সরকার এই ন্যূনতম মজুরি চালু করে। উত্তরপ্রদেশেও একই ঘটনা ঘটে। সেখানেও যোগী সরকার রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলগুলোতে শ্রমিক অসন্তোষের পরও  ন্যূনতম মজুরির সংশোধন করেনি, শুধু মহার্ঘভাতা যুক্ত করে দিয়েছে। এখন সেরাজ্যে শ্রমিকদের নয়ডা ও গাজিয়াবাদে পাওয়ার কথা মাসে ১৩,৬৯০ টাকা এবং বাকি রাজ্যে কোথাও ১৩,০০৬ টাকা কোথাও ১২,৩৫৬ টাকা। আরেক বিজেপি শাসিত রাজ্য উত্তরাখণ্ডেও শ্রমিক বিক্ষোভের  পর ন্যূনতম মজুরি মাসে ১২,৩৯১ টাকা থেকে সামান্য বৃদ্ধি করে করা হয় ১৩,৮০০ টাকা। যদিও এই বৃদ্ধি শুধুমাত্র প্রযোজ্য এমন সংস্থায়, যেখানে ৫০ কিংবা তার বেশি শ্রমিক-কর্মচারী কাজ করে। আর রাজস্থানে ন্যূনতম মজুরি মাত্র ৭,৪১০ টাকা। এই বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে কোথাও বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী ন্যূনতম  মজুরি সংশোধিত করা হয়নি।

।চার। 

শ্রমিক, কর্মচারী, খেতমজুরদের মজুরি বৃদ্ধি, মজুরি সংশোধন বামপন্থীদের, কমিউনিস্টদের রাজনীতির অন্যতম প্রধান অ্যাজেন্ডা। মজুরি বৃদ্ধি যে শুধু ব্যক্তি শ্রমিকের অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে জড়িত তা নয়, দেশের অর্থনৈতিক প্রগতি, ধনী-গরিবের বৈষম্য হ্রাস, উৎপাদন-পরিষেবা-ব্যবসাবাণিজ্যে সমগ্র লেনদেনে মজুরির অংশ বৃদ্ধি প্রভৃতির ওপর গুরুত্বপূর্ণ  প্রভাব ফেলে। কেরালার পূর্বতন এলডিএফ সরকার ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে সারা দেশে নজির সৃষ্টি করেছিল, সে রাজ্যে ন্যূনতম মজুরি দৈনিক ৯০০ টাকারও বেশি করা হয়। পশ্চিমবঙ্গে ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট যে ইশতেহার প্রকাশ করেছিল সেখানেও ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। ক্ষমতায় এসে বামফ্রন্ট সরকার নিয়মিতভাবে কৃষিক্ষেত্রে এবং শিল্প ও পরিষেবা ক্ষেত্রে ন্যূনতম মজুরি সংশোধন করে গেছে।

গ্রামে কৃষি ও অ-কৃষি শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধিতে ১০০ দিনের কাজের প্রকল্প বিশেষ সহায়ক হয়েছিল। বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়ন ও কৃষক সংগঠনগুলি এই প্রকল্পে বছরে কাজের দিন ২০০ এবং দৈনিক ৬০০ টাকার দাবিতে আন্দোলন চালাচ্ছে। এটা যদি আন্দোলনের মাধ্যমে আদায় করা যেত তাহলে দেশের গ্রামঞ্চলে মজুরি স্তরে উল্লম্ফন ঘটত। কিন্তু তা করা যায়নি। এখন বিজেপি সরকার এমজিএন রেগা প্রকল্প তুলেই দিতে চাইছে। তারা যে নতুন প্রকল্প এনেছে তাতে কাজ পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকারটাকেই খর্ব করা হয়েছে, যেটা এই প্রকল্পের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল।

দেশের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন সমকাজে সম বেতন, মজুরি ও বেতনে লিঙ্গ বৈষম্য দূর করার জন্য লাগাতার আন্দোলন করে চলেছে। তবে কিছু ইতিবাচক আইনি নির্দেশ ছাড়া এক্ষেত্রে বিশেষ কোনও অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। বহু বহু ক্ষেত্রে মহিলা শ্রমিকদের মজুরিতে বিরাট  বৈষম্য রয়েছে, স্থায়ী প্রকৃতির কাজে কর্মরত অস্থায়ী শ্রমিকরা বহু ক্ষেত্রেই স্থায়ী শ্রমিক-কর্মচারীর অনুরূপ মজুরি/ বেতন পায় না। এমনকী রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রেও এ সমস্যা বিরাটভাবে রয়েছে। এই ইস্যুগুলি দেশের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের কাছে বিরাট চ্যালেঞ্জ। 

কার্ল মার্কস একদা বলেছিলেন: যখন কোনও ধারণা জনগণের ওপর প্রভাব বিস্তার করে, তখন সেটা বস্তুগত শক্তিতে পরিণত হয়। এটা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, এখন দেশের শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে ন্যূনতম মজুরির দাবি প্রায় সেইরকম শক্তি অর্জন করেছে, যার জন্য নয়ডা, গাজিয়াবাদ, মানেসর থেকে হাওড়া শিল্পাঞ্চল সর্বত্র শ্রমিকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই দাবিতে মালিকদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে শামিল হচ্ছেন। এটা নিঃসন্দেহে দেশের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের এক বড় সাফল্য। অন্যদিকে এই সংকটের সময় মালিকশ্রেণির লক্ষ্যই হবে— শ্রমনিবিড়তা, উৎপাদনশীলতা এমনমকী শ্রমঘণ্টা বৃদ্ধি না-করেও মুনাফা বৃদ্ধি করতে মজুরি হ্রাস কিংবা অপরিবর্তিত রাখা। এই বিষয়টিকেও শ্রমিকশ্রেণির সচেতনতার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে।


প্রকাশের তারিখ: ১৪-জুলাই-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org