|
ভারতের সংবিধান ও গণতন্ত্রজাদ মাহমুদ |
এই সংবিধানটি ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় চরিত্রকে, সংসদীয় গণতন্ত্রকে, ও তার নাগরিকের মৌলিক অধিকারকে সুনিশ্চিত করে। এর মুখবন্ধ সাধারণতন্ত্রের প্রধান মূল্যবোধের উল্লেখ করে ভারতকে সার্বভৌম গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র হিসাবে সংজ্ঞায়িত করে। যেকোনো বিশ্বাসকে নাগরিকের উপর চাপানোর বিপরীতে দাঁড়িয়ে এর ড্রাফটিং কমিটি “ঈশ্বরের নামে” শব্দবন্ধটিকে বাতিল করে; উপরন্তু তা ভারতের নাগরিককে কর্তৃত্ব হিসাবে উল্লেখ করে। অসাম্য, ও বৈষম্যকে নিকেশ করার প্রতিশ্রুতির উপর জোর দিতে, প্রথাগত অবিচারের চর্চাকে সংশোধন করতে এই সংবিধান ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা, সমানতার প্রসঙ্গকে উল্লেখযোগ্যভাবে উত্থাপন করে। |
স্বাধীনতার ৭৫ তম বছরে আজাদি কা অমৃত মহোৎসব উদযাপনকালে আমাদের দেশের সংবিধানের নীতিগত অবস্থান গুরুতর কিছু প্রশ্ন তুলছে। প্রতিটি দেশের সংবিধানের মতো ভারতের সংবিধানেও দেশের মৌলিক আইন ও তার ভিত্তির কথা উল্লেখ আছে, একইসঙ্গে তা নির্দেশ করে সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোটিকে। এ দেশের সংবিধান রচিত হয় এক জটিল পরিস্থিতিতে – যখন এই দেশে জাতীয় ঐক্য বিপন্ন, দেশের সামগ্রিক বঞ্চনাকে অতিক্রম করার লক্ষ্যে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের যে প্রতিশ্রুতি তা পূরণ করায় তাকে নিরন্তর মননিবেশ করতে হচ্ছে, ধর্মীয় গোষ্ঠী, জাত জাতির মধ্যে পরিচিতি, সংস্কৃতি, ভাষার ভিত্তিতে বিভেদের বাতাবরণ হয়ে রয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইওরোপ, এশিয়ার চেয়েও ভয়ঙ্কর সর্বগ্রাসী দারিদ্র্য, অনাহার, ব্যাধির সম্মুখীন তখন ভারত। একটি উপনিবেশকে সাধারণতন্ত্রে রূপান্তর ঘটানোর মুহূর্তকে নির্দেশ করছিল এই যাবতীয় দ্বন্দ্ব, আর এই দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়েই আমাদের সংবিধানের সংশ্লেষ। এটি আমাদের রাষ্ট্রকে তার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দিয়েছে। নাগরিকদের সমতার অধিকার, মর্যাদা, সার্বভৌম্যতাকে সুনিশ্চিত করতে সাধারণতন্ত্রের যে বুনিয়াদি মূল্যবোধ, সামাজিক দ্বন্দ্বকে প্রশমিত করার যে উপায়-কৌশল তার ধারণা দিয়েছে সংবিধান। দারিদ্র-অসাম্য দূর করতে, স্বাধীনতাকে সুনিশ্চিত করতে, ও গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা করতে প্রয়োজনীয় ব্যাপক সামাজিক পরিবর্তনের রূপরেখা রয়েছে এই সংবিধানেই। দুই প্রকারের বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটার এই সংবিধান – জাতীয় এবং সামাজিক। এই সংবিধানটি ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় চরিত্রকে, সংসদীয় গণতন্ত্রকে, ও তার নাগরিকের মৌলিক অধিকারকে সুনিশ্চিত করে। এর মুখবন্ধ সাধারণতন্ত্রের প্রধান মূল্যবোধের উল্লেখ করে ভারতকে সার্বভৌম গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র হিসাবে সংজ্ঞায়িত করে। যেকোনো বিশ্বাসকে নাগরিকের উপর চাপানোর বিপরীতে দাঁড়িয়ে এর ড্রাফটিং কমিটি “ঈশ্বরের নামে” শব্দবন্ধটিকে বাতিল করে; উপরন্তু তা ভারতের নাগরিককে কর্তৃত্ব হিসাবে উল্লেখ করে। অসাম্য, ও বৈষম্যকে নিকেশ করার প্রতিশ্রুতির উপর জোর দিতে, প্রথাগত অবিচারের চর্চাকে সংশোধন করতে এই সংবিধান ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা, সমানতার প্রসঙ্গকে উল্লেখযোগ্যভাবে উত্থাপন করে। নানাবিধ সমুদায়ের প্রতিনিধিত্বকে নিশ্চিত করতে ভারত রাষ্ট্রকে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার দ্বারা চালিত যুক্তরাষ্ট্রীয় সাধারণতন্ত্র হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। তা সত্ত্বেও সাংবিধানিক ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রীয় ও কেন্দ্রিক প্রবণতার মধ্যেকার টানাপড়েনের সম্ভাবনা থেকেই যায়, এবং ক্ষমতা বন্টনের ধরনে আরোপিত গণতন্ত্র সম্পর্কে নির্মাতাদের উৎকণ্ঠার প্রতিফলন দেখা যায়। নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠের নৈতিক অবস্থান সম্পর্কে তাঁরা নিশ্চিত হতে পারেননি, তাঁরা চেয়েছিলেন এমন একটি ব্যবস্থাকে সুনিশ্চিত করতে যা সাধারণতন্ত্রের মতাদর্শের সাহায্যে সংখ্যাগুরুবাদকে প্রশমিত করবে। ভারতের সংবিধান স্পষ্টতই একটি যুগান্তকারী দলিল যা গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার ধারণার পক্ষে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা আন্দোলনের স্বাধীনতাকে সুরক্ষিত করে। প্রাতিষ্ঠানিক অসাম্যের যুগাবসান ঘটিয়ে, স্বাধীন, ও সমানতা প্রথিত করে, সংসদীয় গণতন্ত্রে স্বাধীন, সমান নাগরিককে আশ্বস্ত করে সামাজিক বিপ্লব ঘটাতে চায় এই সংবিধান। দেশভাগের প্রেক্ষাপটে গণতন্ত্র, স্বাতন্ত্র, এবং সামাজিক ন্যায়ের প্রতি প্রতিশ্রুতি যুগান্তকারীই ছিল। যেখানে পাকিস্তান নিজের ধর্মীয় পরিচিতিকে প্রকট করে, সেখানে ভারত তার স্বাধীনতা সংগ্রামকে নিজের ঐতিহ্যবাহী পরিচিতি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করে। সামাজিক ও আর্থিক ন্যায়কে সুনিশ্চিত করতে ভারত রাষ্ট্র চালিত উন্নয়নকে গ্রহণ করে, যাতে সম্পদ, আয়ের সমবন্টন হয়, ও অসাম্য ঘুচে যেতে পারে। এই মডেল এক দীপ্ত, উজ্জ্বল নেতৃত্বের দ্বারা সংঘটিত একটি নি:শব্দ বিপ্লব ছিল। ৭৫ বছর অতিক্রম করে ভারতের সংবিধান সাধারণতন্ত্রকে একটি মজবুত ভিত দিতে পেরেছে। বিশ্বের অন্যান্য সংবিধান যেখানে ১৭ বছর অবধি স্থায়ী হয়েছে (১৭৮৯ সাল থেকে) সেখানে এ দেশের সংবিধানের স্থায়ীত্ব বিশেষত উল্লেখযোগ্য। কিছু অবশ্যম্ভাবী সীমাবদ্ধতা বাদ দিলে এই সংবিধান সংসদীয় গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। সামাজিক, আর্থিক, রাজনৈতিক ন্যায়; নাগরিকের চিন্তন, ভাবপ্রকাশ, ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বাধীনতা; সুযোগ ও সম্মানের সমানতা এক স্বাধীন ভারতকে চেনায়। বঞ্চিত, সংখ্যালঘু মানুষের অধিকার সুরক্ষিত করে এটি সমানতা, ন্যায়, এবং স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করে। এই সংবিধান এতগুলি বছরে বহু পরিবর্তন, পরিমার্জনের মধ্যে দিয়ে গেছে। পরিবর্তনগুলি সাংবিধানিক সংশোধনী্র মাধ্যমে হয়। ১৯৫০ সালে প্রণয়নের পর থেকে এখনো অবধি ভারতের সংবিধানের ১০৫ টি সংশোধনী আনা হয়েছে। এই সংশোধনীগুলি প্রধানত প্রক্রিয়া সংক্রান্ত, তবে কিছু সংশোধনী স্পষ্টত ব্যবহারিক। গোড়ার দিকের বেশিরভাগ সংশোধনী রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর পরিশোধনের জন্য, এবং সামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা গোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য হয়েছিল। উল্লেখযোগ্য সংশোধনী আসে ৪২ তম সংশোধনী আইনের মাধ্যমে – যেক্ষেত্রে কার্যকরী ও আইনি ক্ষমতার প্রসার ঘটে, সম্পত্তির মৌলিক অধিকার খর্ব করা হয়। এছাড়া ১৯৯০ আরো একটি সংশোধনী আসে। আর্থিক উদারিকরণ ছিল সাংবিধানিক ক্ষেত্রে একটি মূলগত বদল। ১৯৯১ সালের পর থেকে ৪০টি সংশোধনী আনা হয়। এর মধ্যে বেশ কিছু সংশোধনী আনা হয় যা গণতন্ত্রকে আরো গভীরে প্রথিত হতে সাহায্য করে, নাগরিক এবং সামাজিক অধিকারের ক্ষমতায়ন ঘটায় – যেমন ৭৩ ও ৭৪তম সংশোধনী – এক্ষেত্রে আঞ্চলিক সেলফ-গভর্নমেন্ট প্রতিষ্ঠান, তফসিলি জাতি ও জনজাতির জন্য জাতীয় কমিশন (৬৫তম), শিক্ষার অধিকার (৮৬তম), ওবিসি নাগরিকের জন্য সরকারি ও অসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষণ (৯৩তম)। এভাবে সামাজিক ও রাজনৈতিক ন্যায়ের ক্ষেত্রে প্রকট হয়ে উঠলেও, আর্থিক ন্যায়ের ক্ষেত্রটি পিছনে চলে যেতে থাকে। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর সংবিধানের সামাজিক ও রাজনৈতিক দর্শনে পরিবর্তন আসে। ২০১৪ সালের পর থেকে আসা সংশোধনী সংবিধানের প্রতিষ্ঠিত বন্দোবস্তকে বদল করতে দেখা গেছে – বিচারিক নিয়োগ প্রক্রিয়ার জন্য ন্যাশানাল জুডিশিয়াল অ্যাপয়েনমেন্টস কমিশন, গুডস অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্যাক্স-এ বদল, পিছিয়ে থাকা গোষ্ঠীর জন্য জাতীয় কমিশন গঠন, আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষদের জন্য বিশেষ ক্যাটেগোরি। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় স্পষ্ট পরিবর্তন, লক্ষ করা গেছে সামাজিক সচলতায় তপসিলি জাতি, জনজাতিকে পরিহার করার নতুন যুক্তিকাঠামো। এই সব আলোচনা সত্ত্বেও বলা দরকার যে - সংবিধান মৌলিক আইনের কোনো বই নয়, এর নিজস্ব কিছু দর্শন রয়েছে যা নাগরিকের অনুজ্জ্বল বাস্তবজীবনকে গড়েপিঠে দিতে পারে। কোনো সংবিধানের সাফল্য মূল্যায়নের ক্ষেত্রে মেপে দেখতে হয় জনজীবনে তার প্রভাবকে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, ভারতের প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধের উপর গুরুতর আঘাত আনা হচ্ছে। এই আঘাত মূলত হিন্দুবাদীদের তরফ থেকে হচ্ছে – যারা ভারতকে ধর্মীয় পরিচয়ে পরিচিত একটি গণতন্ত্র হিসাবে দেখতে চাইছে। এক্ষেত্রে সর্বত্র সংখ্যাগুরুর দাপট, এবং সংখ্যালঘুর প্রান্তিকীকরণ দেখা যাচ্ছে। সমানতা, স্বাধীনতা, ন্যায়, এবং সংহতির নীতিকে ধারাবাহিকভাবে ও সচেতনভাবে আঘাত করা হচ্ছে। ধর্মীয় পরিচয়কে নাগরিকত্বের উপাদান হিসাবে ঘোষণা করা সিএএ ২০১৯-এর মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষতা, অন্তর্ভূক্তিমূলক নাগরিকত্বের ধারণাকে বিনষ্ট করা হচ্ছে। বিজেপি শাসিত রাজ্যে ভিন্ন সমুদায়ভুক্তের দুই মানুষ বিবাহ করার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। জম্মু কাশ্মীর রিওরগানাইজেশন অ্যাক্ট পাশ হয়েছে কোনো প্রকার বিতর্ক, চর্চা, বা আলোচনা ছাড়াই। এই প্রত্যেকটি কাজ আমাদের নতুন করে ভাবায় যে সংবিধানের নীতি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রীয়, ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র বহাল থাকছে তো? সংখ্যালঘুর অধিকার রক্ষা হবে তো? আইনি ক্ষেত্রে লঙ্ঘনের ঘটনা ছাড়াও নিত্যদিনের অনাচার চলে। সাধারণভাবে বিভেদের রাজনীতির ঘরানায় অত্যাচার, অনাচার চালিয়ে, মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিক, ছাত্র, বুদ্ধিজীবীদের বেপরোয়াভাবে গ্রেপ্তার করে, সংবিধানের মূল্যবোধ, স্বাধীনতাকে নি:শেষ করছে। সরকার আইন আনছে গোমাংসের দোকানের বিরুদ্ধে, মুসলমান মানুষজনকে টার্গেট করে ধর্মান্তরের বিরুদ্ধে বিধি বানাচ্ছে, এদিকে আইনশৃঙ্খলার অপপ্রয়োগ করে চলেছে সমালোচকদের বিরুদ্ধে। ভারত এখন সাংবাদিকদের জন্য অসুরক্ষার প্রশ্নে বিশ্বে ৩য় স্থান লাভ করেছে। ২০০০০ নন-গভর্নমেন্ট সংস্থাকে বিদেশী অর্থ সাহায্য নিয়ে কাজ করা ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। অক্সফোর্ড-এর অধ্যাপক তরুণাভ খৈতান এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে বলেন – কিলিং আ কন্সটিটিউশান উইথ আ থাউস্যন্ড কাটস। ওঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দায়বদ্ধতা সুনিশ্চিত করার, ও রাজনৈতিক কার্যকারিতা নজর করার জন্য গণতান্ত্রিক সংবিধানে মূল তিনটি প্রক্রিয়া আছে – জনগণের কাছে নির্বাচনী দায়বদ্ধতা, অন্যান্য (বিচারিক) রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে দায়বদ্ধ করে, এবং সংবাদমাধ্যম, নাগরিক সমাজকে দায়বদ্ধ করে। খৈতান দেখিয়েছেন যে, মোদি সরকার এই তিনটিকেই দুর্বল করে রেখেছে, তবে সাতের দশকের মতো করে নয়। এ প্রশ্নে বিজেপি-র কাজের ধরন সূক্ষ্ম, ঘুরপথে, ধারাবাহিক, এবং ধরনে সামগ্রিক। সরকার এবং তার সমর্থকেরা বোঝাতে চায় যে সংবিধানের আসল বিপর্যয় ঘটেছিল সাতের দশকের জরুরি অবস্থায়। কংগ্রেসের জমানায়। অরবিন্দ নারায়ণের মতে, ভারতে বর্তমানে অঘোষিত জরুরি অবস্থা চলছে। বিচারব্যবস্থা নাগরিকদের বেপরোয়া গ্রেপ্তারি ঘটলে তার পাশে এসে দাঁড়ায় না। তিনি ভীমা কোরেগাঁও কেসে গ্রেপ্তার হওয়া মানুষজনের কেস হিস্ট্রি একত্র করে দেখিয়েছেন কেমন করে সংবাদমাধ্যমের সাহায্য নিয়ে রাষ্ট্র অপরাধের শিকার যে মানুষগুলি, তাদের অপরাধী বানিয়েছে। আমারা ফাদার স্ট্যান স্বামীর কথা ভুলতে পারি না। প্রাতিষ্ঠানিক অবনমনের মাধ্যমেও গণতন্ত্রের বিপন্নতা সংঘটিত হচ্ছে। ফরেন কন্ট্রিবিউশান আইন ২০১০-এর সংশোধনী আনা হয় ২০১৬ সালে। এই সংশোধনী কেবল রাজনৈতিক দলের কাছে বিদেশী অর্থ সরবরাহকে আইনসিদ্ধ করে না, উপরন্তউ “ইলেক্টোরাল বন্ডস” নামক ফান্ডিং প্রক্রিয়ার কারণে বিদেশি অর্থদাতার নাম/ পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখা যাবে। হাই কোর্ট, ও সুপ্রীম কোর্টে বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রেও সরকার হস্তক্ষেপ করছে। ২০১৬ সালে উত্তরাখণ্ড ও অরুণাচলপ্রদেশে রাজ্যপালের সাহায্যে বিরোধী দলের সরকারকে সরানোর উদ্যোগও করা হয়েছিল। দুই ক্ষেত্রেই সুপ্রীম কোর্ট হস্তক্ষেপ করে পুরানো সরকারকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, গোয়া-র ক্ষেত্রেও রাজ্যপালেদের বিজেপি সরকারকে সাহায্য করার নিদর্শন রয়েছে। সংবিধানের বিপন্নতার প্রসঙ্গে উপসংহার টানার ক্ষেত্রে এ কথা উঠে আসে যে নানা শাসনকালেই নিয়ন্ত্রণ ও দাপটের পথ নেওয়া হয়েছে, সংবাদমাধ্যমকেও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা হয়েছে। ভারতের সংবিধান ব্যাপকার্থে উদার গণতান্ত্রিক হওয়া সত্ত্বেও উদারবাদ সংবিধানের শেষ কথা হয়ে দাঁড়ায় না। কন্সটিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলির প্রস্তাবানুযায়ী সাংবিধানিক সুযোগগুলিকে উদারবাদ সম্পূর্ণ তুলে ধরেনি। কন্সটিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলির রাজনৈতিক দলের পরিসরের বাইরে থাকা সদস্যেরা সংশোধনী আনাকালীন উদারবাদের কথা বললে সেসব প্রস্তাব গৃহীতও হয়নি। ভারতের সংবিধান গোড়া থেকেই জাতীয় ঐক্য প্রসঙ্গে বিশেষ মনোযোগ দিয়েছে। উদ্বেগ দেখিয়েছে দারিদ্র, নিরক্ষরতার মতো সামাজিক বাস্তবতা, আর্থিক উন্নয়ন, এবং পৃথিবীতে ভারিতের অবস্থান প্রসঙ্গেও। উদয় চন্দ্র যৌথ স্বাধীনতা ও জাতীয় ঐক্য, এবং সেই ঐক্য নির্ধারণকারী যে সামাজিক উন্নয়নের তার মধ্যেকার দ্বন্দ্বের দিকে নজর করিয়েছেন। সংবিধান নির্মাতারা নিশ্চিত ছিলেন যে, স্বাধীনতা, সমানতা, এবং ভ্রাতৃত্বের নীতিই গণতন্ত্রকে তুলে ধরবে, এবং জাতীয় ঐক্যকে নিশ্চিত করবে। একইভাবে সংবিধানের কেন্দ্রিক আবেদন, যাতে করে কেন্দ্র, রাজ্য ও সংসদের আইন ও প্রশাসনের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে, রাজ্যকে পুনর্বিন্যাস করে, যথেষ্ট পরিমাণ গণতান্ত্রিক দর্শন ও কাঠামো ছাড়াই গণতন্ত্র চর্চায় উদ্বেগ প্রকাশ করে। নির্মাতারা নিয়ন্ত্রকের স্বার্থ এবং সংখ্যাগুরুবাদের প্রবণতার উপর সাধারণতন্ত্রের দর্শন চালিত একটি দাপুটে কেন্দ্রিক ব্যবস্থা দিয়েই নিয়ন্ত্রণ রাখতে চেয়েছিলেন। যখন সাংবিধানিক হাতিয়ারকে রাষ্ট্রের ক্ষমতা প্রয়োগের কারণে ব্যবহার করা হয়, তখন জাতিয়তাবাদী, সংখ্যাগুরুবাদী ভারতকে তুলে ধরা হয়। যখন দারিদ্র, অক্ষরজ্ঞান বঞ্চনা, দুর্দশাগ্রস্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থার সমস্যা সম্পর্কে উদাসীন থাকা হয়, দলিত, মহিলা, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, প্রান্তিক শ্রমজীবী, বস্তিবাসী, বনবাসীদের বিরুদ্ধে হিংসা সংঘটিত করা হয়, তখন সংবিধানের দুর্বৃত্তায়ন ঘটানো হয়। সংবিধানের উপর আক্রমণ কেবল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, আক্রমণ করা হয় ভারতের মূল্যবোধ ও নীতিকেও। সংবিধান রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে, প্রান্তিক মানুষের কাজের মাধ্যমে সামাজিক সংস্কার সুনিশ্চিত করে উদারবাদী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়। একইসঙ্গে এটি ভীষণভাবে রাষ্ট্র নির্মাণের কাজও বটে। নানাবিধ সাংবিধানিক সুযোগে যথেষ্টই কেন্দ্রিক প্রবণতা থাকলেও তা সংবিধানের বৈচিত্রকে ঢেকে ফেলে না। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বার্তাবহ সংবিধান পৃথিবীর নানা অংশ থেকে মূল্যবোধ এবং আইনকে নিজের মধ্যে যুক্ত করেছে। ভারতীয় প্রয়োজনকে মেটানোর জন্য তৈরি এই সংবিধান প্রকৃতিতে বহু-সংস্কৃতিময়, বহুত্বকে অন্তর্ভূক্ত করেছে, এবং সর্বজনীন উদারবাদ, সমানতা, ও ভ্রাতৃত্বের নীতিকে আপন করেছে। প্রকাশের তারিখ: ২৫-জানুয়ারি-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |