|
মুদ্রাস্ফীতি, খাদ্য সুরক্ষা ও আয়ের পুনর্বন্টনসাত্যকি রায় |
উদাহরণস্বরূপ বলা যায় নভেম্বর-২০১৯ থেকে এপ্রিল ২০২১ ডালের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে গড়ে প্রায় ১৬ শতাংশ হারে, অতিমারির সময় মে-২০২০ থেকে জানুয়ারি-২০২২ এই সময় ভোজ্য তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে ২২.৪ শতাংশ হারে এবং অক্টোবর ২০২২ এর পরে খাদ্যশস্যের দাম বেড়েছে ১৪ শতাংশ হারে। একেবারে সাম্প্রতিক সময় মাস ভিত্তিক মূল্যবৃদ্ধির হার দেখলে দেখা যাবে যে এবছর জুলাই মাসে সবজির দাম বৃদ্ধি পেয়েছে ৩৮ শতাংশ হারে এবং ওই মাসে টমেটোর মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ২১৩.৭ শতাংশ। অতএব বিগত সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ে মানুষের খাদ্য বাবদ খরচ অস্বাভাবিক মাত্রায় বেড়েছে। |
গত পাঁচ বছরে আমাদের দেশে মুদ্রাস্ফীতির বিভিন্ন পর্যায় দেখতে পাওয়া যাবে। একথা ঠিক যে এই সময় আমরা কতগুলি গভীর অসুবিধার মধ্যে দিয়ে গিয়েছি। এর মধ্যে যেমন কোভিড অতিমারির সময় রয়েছে, আবার কোভিড পরবর্তী সময় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পৃথিবীর অর্থনীতিতে গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এগুলি পৃথিবীব্যাপী উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের সংকোচন ঘটায়, যার ফলস্বরূপ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের গরিব, নিম্নবিত্ত মানুষের আয় সংকুচিত হয় এবং একটা বড় অংশের মানুষ– পৃথিবীর জনসংখ্যার প্রায় ৮.৯ শতাংশ, অপুষ্টির অন্ধকারে চলে যায়। কিন্তু উৎপাদনের হাল ধীরে ধীরে ফিরলেও কর্মসংস্থানের ধরন, শর্ত বা মজুরি কোনটাই সবার ক্ষেত্রে পুরনো অবস্থায় ফিরে আসেনি। এর সাথে সাথে যেটা লক্ষ্যনীয় তা হল উৎপাদন সংকুচিত হওয়া সত্বেও জিনিসের দাম উর্ধগামী থেকেছে। সাধারণভাবে মনে করা হয়, অর্থনীতিতে কোনও সময় যদি প্রকৃত সামগ্রিক চাহিদার পরিমাণ সেই সময় উপস্থিত উৎপাদনের ও পরিষেবার জোগানের চাইতে বেশি হয় তবে মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিতে পারে। যদিও অর্থনীতিতে মোট উৎপাদন কখনোই পূর্ব নির্ধারিত নয় অর্থাৎ অর্থনীতিতে যদি অব্যবহৃত উৎপাদন ক্ষমতা থেকে থাকে তবে শ্রমের ব্যবহার ও অন্যান্য রসদ ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে উৎপাদনের পরিমাণ পরিবর্তন করা সম্ভব। মোটের উপরে চাহিদার গতি বৃদ্ধি যদি জোগানের গতি বৃদ্ধির চেয়ে বেশি হয় তখনই মুদ্রাস্ফীতির সম্ভাবনা থাকে। চাহিদার এই তুলনামূলক বৃদ্ধি ছাড়াও জিনিসের দাম বাড়তে পারে উৎপাদনের উপকরণের বা কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির কারণে। সাম্প্রতিক সময়ে যখন অতিমারির কারণে উৎপাদন কার্যত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তখনও দেখা যাবে জিনিসের দাম দ্রুত গতিতে বেড়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে চাহিদার খুব একটা সম্পর্ক নেই। আসলে ওই অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে চাহিদা বৃদ্ধি তো দূরের কথা, চাহিদা প্রকৃত অর্থে সংকুচিত হয়েছিল। অতএব সাধারণভাবে বলতে গেলে জোগানের সমস্যার কারণেই উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পায় এবং অর্থনীতির গতি স্লথ হলেও জিনিসের দাম বেড়ে চলেছিল। গত পাঁচ বছর সময়কালে ভোগ্যপণ্যের দাম সাধারণ ভাবে বৃদ্ধি পেলেও দুটো পর্যায়ে জিনিসের দাম অস্বাভাবিক মাত্রায় বৃদ্ধি পায়। একটি হল ২০১৯-অক্টোবর থেকে নভেম্বর-২০২০ এবং দ্বিতীয় পর্যায়টি হল মে-২০২১ থেকে অক্টোবর-২০২২। এই দুটো সময়কালে কনজিউমার প্রাইস ইনডেক্স যথাক্রমে গড়ে ৬.৬ শতাংশ হারে এবং ৬.২ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পায়। এই দু’টি পর্যায়েতেই সাধারণ মূল্যবৃদ্ধির পেছনে খাদ্যদ্রব্যের দাম বৃদ্ধিই প্রধানত দায়ী। প্রথম পর্যায়ে একই সময়কালে খাদ্যদ্রব্যের দাম বেড়েছে গড়ে ৯.৯৭ শতাংশ হারে। এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি ঘটে মার্চ-২০২২ থেকে জুন-২০২২, যখন খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির গড় হার ছিল ৭.৭ শতাংশ। বর্তমানে অর্থাৎ জুন-২০২৩-এ খাদ্যদ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধির হার আবার ১১.৫ শতাংশ পৌঁছেছে। এটা খেয়ালে রাখা দরকার জিনিসের দাম বৃদ্ধি সমাজের সব অংশের মানুষকে একইভাবে প্রভাবিত করে না। ধনীদের আয় ও সম্পদের বেশিরভাগটাই নগদ অর্থে থাকে না এবং এদের অনেক আয় ও সম্পদ মূল্যবৃদ্ধির সূচকের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়। ফলে ধনীদের উপরে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম হয়ে থাকে। অন্যদিকে সমাজের বেশিরভাগ অংশের মানুষের, বিশেষত গরিব মানুষের উপার্জিত আয় নগদ টাকায় হয়ে থাকে এবং এর ফলে জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে যদি তাদের নগদ আয় একইভাবে বৃদ্ধি না পায়, তাহলে তাদের প্রকৃত আয় অর্থাৎ ক্রয় ক্ষমতা কমে যায়। বিশেষত খাদ্যদ্রব্যের দাম বৃদ্ধি গরিব মানুষকে গভীর ভাবে আঘাত করে। জাতীয় নমুনা সমীক্ষা অনুসারে গড় ভারতীয়ের মাসিক খরচের ৪৫.৮৬ অংশ ব্যয় হয় খাদ্যদ্রব্য কিনতে। কিন্তু শহরের উচ্চবিত্তদের মোট মাসিক ব্যয়ের মাত্র ২৯ শতাংশ খরচ হয় খাদ্যদ্রব্যের জন্য। অথচ গ্রামের ও শহরের গরিবদের মোট মাসিক খরচের প্রায় ৬০ শতাংশ খাবার জিনিস কিনতেই চলে যায়।গরিব মানুষদের গড় মাসিক খরচের ৭০ শতাংশ ব্যয় হয় খাদ্য, বস্ত্র এবং জ্বালানির পেছনে। একারণেই খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির আঘাত গরিব মানুষের উপরে ধনীদের তুলনায় অনেক বেশি। গত পাঁচ বছরের মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা দেখলে দেখা যায় বিভিন্ন সময় বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যের দাম আলাদা আলাদা করে বৃদ্ধি পেয়েছে। কখনো গমের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে কখনো বা শাক-সবজির আবার কখনও ভোজ্যতেল, ডাল ও মসলার অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় নভেম্বর-২০১৯ থেকে এপ্রিল ২০২১ ডালের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে গড়ে প্রায় ১৬ শতাংশ হারে, অতিমারির সময় মে-২০২০ থেকে জানুয়ারি-২০২২ এই সময় ভোজ্য তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে ২২.৪ শতাংশ হারে এবং অক্টোবর ২০২২ এর পরে খাদ্যশস্যের দাম বেড়েছে ১৪ শতাংশ হারে। একেবারে সাম্প্রতিক সময় মাস ভিত্তিক মূল্যবৃদ্ধির হার দেখলে দেখা যাবে যে এবছর জুলাই মাসে সবজির দাম বৃদ্ধি পেয়েছে ৩৮ শতাংশ হারে এবং ওই মাসে টমেটোর মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ২১৩.৭ শতাংশ। অতএব বিগত সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ে মানুষের খাদ্য বাবদ খরচ অস্বাভাবিক মাত্রায় বেড়েছে। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে যে দাম কমে আসলেও প্রকৃত আয়ের যে সংকোচন মূল্যবৃদ্ধির কারণে ঘটে থাকে সেটা সহজেই মেরামত হয়ে যায় না। দীর্ঘ সময় ধরে পণ্য বা খাদ্য বাবদ খরচ বাড়ার ফলে গরিব মানুষ,যাদের সঞ্চয় নেই বললেই চলে, তারা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে। শুধু তাই নয় প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার ফলে খাদ্যের মত প্রয়োজনীয় সামগ্রীতেও তারা খরচ কমাতে বাধ্য হয় যা অপুষ্টির মাত্রাকে বাড়িয়ে তোলে। একারণেই খাদ্য সুরক্ষার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইউনিসেফ এর একটি সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুসারে সারা পৃথিবীর ৯.৭ শতাংশ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। যদি সব ধরনের খাদ্য নিরাপত্তাহীনতাকে গণনায় রাখা হয় তবে পৃথিবীর ২৫.৯ শতাংশ মানুষ খাদ্য নিরাপত্তার অভাবের মধ্যে রয়েছে। আর যদি পুষ্টিকর খাদ্যের কথা বলা হয় তাহলে দক্ষিণ এশিয়ার ৪৫ শতাংশের বেশি এবং ভারত ও পাকিস্তানের যথাক্রমে ৭০ ভাগ ও ৮০ ভাগের বেশি মানুষ পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছে না। অপ্রত্যাশিত মূল্যবৃদ্ধি সাধারণভাবে আয়ের পুনর্বন্টন ঘটায়। মূল্যবৃদ্ধির দায় কীভাবে সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষের মধ্যে বন্টিত হবে তা নির্ভর করে বিভিন্ন অংশের মানুষদের মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব রোখার আপেক্ষিক শক্তির উপরে। খনিজ তেলের দাম বাড়ার কারণে যদি জিনিসপত্রের দাম বাড়ে এবং শ্রমজীবী মানুষ যদি সংগঠিত প্রতিরোধের মাধ্যমে নিজেদের মজুরি বাড়াতে সক্ষম হয় তাহলে তেল উৎপাদকরা বা জ্বালানি ব্যবহারকারী অন্য কোন উৎপাদক তেলের বর্ধিত দামের পুরোটাই সাধারণ ক্রেতার উপরে চালান করতে পারে না। আবার শ্রমজীবী মানুষ যদি বর্ধিত দামের সাপেক্ষে নিজেদের দাবি উত্থাপন করতে না পারে অথবা কোনও উৎপাদকের যদি বাজারের উপরে একচেটিয়া কর্তৃত্ব থাকে তবে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি সহজেই সাধারণ মানুষের উপরে চালান করে দেওয়া যায়। অতএব মূল্যবৃদ্ধির বোঝা কীভাবে উৎপাদক ও ক্রেতার মধ্যে বন্টিত হবে অথবা শিল্পপতি ও শ্রমিকদের মধ্যে বন্টিত হবে তা নির্ভর করে চলমান শ্রেণি সংঘাতের আপেক্ষিক শক্তির উপর। ভারতের মতো দেশে যেখানে বেশিরভাগ মানুষের মূল্যবৃদ্ধির সাপেক্ষে আয় বৃদ্ধির কোন প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা নেই,সেখানে মূল্যবৃদ্ধির প্রায় পুরোটাই সাধারণ মানুষের উপরে চালান করে দেওয়া সহজ। একথা ঠিক যে বিগত সময়ে কতগুলি অস্বাভাবিক ঘটনা, যেমন অতিমারি বা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ইত্যাদি আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি, ধাতু, খনিজ পদার্থ ও কিছু খাদ্যশস্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটিয়েছিল। উপকরণের সাপ্লাই চেনও এর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয় যা বিভিন্ন দেশে জিনিসের দাম বৃদ্ধির কারণ হয়েছিল। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ফাটকা কারবারিদেরও অতি মুনাফা করার সুযোগ নেওয়ার প্রভাব ছিল। কিন্তু সরকার এই প্রশ্নে প্রধান যে ব্যবস্থাটি গ্রহণ করে তা হল সুদের হার বৃদ্ধি করে টাকার জোগান কমানো যাতে সঞ্চয় আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে এবং ক্রেডিট বা ক্রেডিট-ভিত্তিক ক্রয় ক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া যায়। জোগানজনিত মুদ্রাস্ফীতির ক্ষেত্রে এই ধরনের নীতি একেবারেই কার্যকর নয় বরং এর ফলে সাধারণ মানুষের পূর্বতন লোনের ইএমআই ইত্যাদির খরচ বেড়ে যায় এবং মানুষের হাতে সরাসরি খরচ করার মত অর্থ আরো কমে আসে। অর্থনীতিতে এমনিই চাহিদার সংকট রয়েছে এর মধ্যে এরকম একটি নীতি আসলে চাহিদা বৃদ্ধির পরিপন্থী হয়ে ওঠে। একথা স্মরণে রাখা প্রয়োজন যে মুদ্রাস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সংকটগ্রস্ত হলেও মুদ্রাস্ফীতির ফলে জিনিসের বিক্রয় মূল্য বাড়ার কারণে ভারতবর্ষের কর্পোরেট সংস্থাগুলি কিন্ত এই সময়কালে তাদের মুনাফা বিপুল পরিমাণে বাড়িয়ে নিতে পেরেছে। দূর্মূল্যের বাজারে সেপ্টেম্বর-২০২০ থেকে জুন-২০২৩ এই সময়, ভারতের কর্পোরেটদের কোয়ার্টারলি গড় নেট মুনাফা বৃদ্ধির হার ছিল ২৩৯ শতাংশ আর ওই সময় দেশের গ্রামীণ খেতমজুরদের কোয়ার্টারলি গড়মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ৫.৮ শতাংশ যা ওই সময়ের মুদ্রাস্ফীতির গড়হারের চাইতেও কম। এভাবেই সাম্প্রতিককালে মুদ্রাস্ফীতি আমাদের দেশে ধনীদের পক্ষে আয়ের পুনর্বন্টন ঘটিয়েছে। প্রকাশের তারিখ: ৩০-আগস্ট-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |