স্টারলিঙ্ককে নিষ্ক্রিয় করে ওয়াশিংটনের জমানা বদলের ছক ব্যর্থ করল ইরান

বাপ্পা সিনহা
ইরান যে ইলেকট্রনিকস যুদ্ধে জিতল তার প্রভাব এখনকার সংকটে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তথ্যের পরিসরে উপগ্রহ প্রযুক্তি অপছন্দের শাসকদের গলা টিপে ধরবে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলিকে এমন আশ্বাস দিয়ে রেখেছে উপগ্রহ প্রযুক্তির একচেটিয়া মালিকেরা। সেটাকে ইরানে অন্ততপক্ষে আংশিকভাবে ব্যর্থ করা গেছে। স্পেস এক্সের মালিকানায় রয়েছে ৬০০০ উপগ্রহ। এগুলোর দাম কয়েকশ কোটি টাকা। সেগুলোকে স্থলভিত্তিক ব্যবস্থার সাহায্যে নিষ্ক্রিয় করে তোলা যায়, তোলা যায় খুবই সামান্য খরচে। এটাই ইরানের আংশিক সাফল্যের প্রভাব।

৮ জানুয়ারি, ২০২৬। ইলেকট্রনিক বা বৈদ্যুতিন যুদ্ধের পরিসরে ঘটে গেল এক নজিরবিহীন ঘটনা। ইরান ওই দিন সক্রিয় করে তোলে একটি বহুস্তরীয় ডিজিটাল সম্প্রচার নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি যা মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নিষ্ক্রিয় করে দেয় ইলন মাস্কের স্টারলিঙ্ক ইন্টারনেট স্যাটেলাইট পরিষেবা। এর ফলে ইরান জুড়ে স্টারলিঙ্কের মাধ্যমে চালু করা ইন্টারনেট পরিষেবা একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। এই ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিকে ইঞ্জিনিয়াররা বলছেন, ‘তালি দেওয়া লেপের ঢাকার মতো সিগন্যালের একটা ছেঁড়া ছেঁড়া অন্তর্জাল’ যার ফলে ইন্টারনেট পরিষেবা ঘন ঘন ব্যাহত হয়। এর জেরে কার্যত ইন্টারনেট পরিষেবা পাওয়াই যায় না। ইরানের ইন্টারনেট অধিকার নজরদারি সংস্থা ফিল্টার ডট ওয়াচ জানিয়েছে, তেহরানে স্টার লিঙ্কের ইন্টারনেট পরিষেবার প্যাকেজ গোড়ায় ৩০ শতাংশ দেখা যাচ্ছিল না। পরে সেটা বেড়ে হয় ৮০ শতাংশ। এটাই হল প্রথম প্রমাণসিদ্ধ নজির যেখানে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটের সময় একটি জাতিরাষ্ট্র জাতীয় স্তরে সফলভাবে স্টারলিঙ্কের পরিষেবা বন্ধ করে দিতে সক্ষম হল।

ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুতে রাশিয়া ছিল এমন একটা দেশ যেখানে সবচেয়ে বেশি আর্থিক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। এখন বিশ্বের মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধেই সবচেয়ে বেশি আর্থিক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ট্রাম্পের প্রথম দফায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একতরফা জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অফ অ্যাকশন (জিসিপিওএ) থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছিল।  এর জেরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তখন তার মিত্রদের বাধ্য করেছিল ২০২৫-এর শেষের দিকে ইরানের ওপর আগের মতোই নিষেধাজ্ঞা চাপাতে। এর ফলে জেসিপিওএর আগের পর্বের মতোই কঠোর আর্থিক নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছিল। এসব কারণে ১ ডলারের নিরিখে ইরানের মুদ্রা রিয়ালের দাম ৮১৭,০০০ থেকে বেড়ে পৌঁছে যায় ১.৪২ মিলিয়নে। তার মানে ৩ মাসেরও কম সময়পর্বে রিয়ালের দাম কমেছে ৭৩ শতাংশের বেশি। গত বছরের তুলনায় খাদ্য পণ্যের দাম বেড়েছে ৭২ শতাংশ। বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৪২.২ শতাংশ। তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারের দোকানদারেরা দারুন সমস্যায় পড়েছিলেন। কারণ রিয়েলের দাম প্রতিদিন এত বেশি ওঠানামা করছিল যে তাঁরা কত দামে কোন্‌ জিনিস বিক্রি করবেন তা ঠিক করতে পারছিলেন না। ফলে স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভের জেরে তাঁরা দোকান বন্ধ করে দেন। ইরানের লোকেদের বিক্ষোভে নেমে পড়ার আশু কারণ ছিল কিনা, সেটা এখানে বড়ো কথা নয়। বড়ো ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল এর পরে যা ঘটল। মার্কিন ও ইজরায়েলির গোয়েন্দা সংস্থাগুলি সমন্বিত প্রয়াস শুরু করল অর্থনৈতিক ইস্যুতে অসন্তোষকে জমানা বদলের বিক্ষোভে রূপান্তরিত করতে। এ-কাজে তাদের প্রধান অস্ত্র ছিল উপগ্রহ প্রযুক্তি। এবং সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে নজরকাড়া ভাবে। 

অন্তর্ঘাতের পরিকাঠামো

নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে এমন দেশের ভেতরে স্টার লিঙ্কের টার্মিনাল ঘটনাচক্রে চলে আসে না। এগুলো খুব দামি যন্ত্রপাতি যা অবশ্যই গোপনে স্মাগল করে নিয়ে যেতে হবে। তারপর তা পছন্দ মাফিক জায়গায় পৌঁছে দিতে হবে, লুকিয়ে রেখে চার্জ দিতে হবে এবং তারপর সেগুলিকে চালু করতে হবে। একটা হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানু্যারি মাসের মধ্যে ইরানে এভাবে চোরাচালান মারফৎ পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল স্টারলিঙ্কের ৫০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টার্মিনাল। এগুলো একটা সমান্তরাল ইন্টারনেট ব্যবস্থা চালু করার পক্ষে যথেষ্ট। তেহরান নিজেদের ইন্টারনেট অফ করে দেওয়া মাত্রই এগুলো চালু হয়ে যাবে।

এছাড়া রয়েছে কোন সময়ে চালু করা হবে সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। থাকছে লজিস্টিকসের সমস্যাও। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে বাইডেন মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলিকে অনুমতি দিয়েছিলেন নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর জন্য। সেই সময়েই ইরানে বিপুল পরিমাণে স্টারলিঙ্কের টার্মিনাল ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। সেই সময়ে ইরানে চলছিল মাশা আমিনি প্রতিবাদ আন্দোলন। ২০২৫ সালের জুনে ইরান ও ইজরায়েলের মধ্যে যে ১২ দিনের যুদ্ধ হয় তখন এই সব টার্মিনালের অনুপ্রবেশ আরও বাড়ে। তখন মাস্ক ঘোষণা করেছিলেন ইরানের আকাশে ‘স্টারলিঙ্কের বিম চালু রয়েছে’। ইরানের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, এই সব বিম বা রশ্মিগুলো কাজে লাগিয়েছিল ইজরায়েলিরা তাদের ড্রোন ও বিমান হামলার সমন্বয় ঘটানোর জন্য। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে উপগ্রহ যোগাযোগের একটা ছায়া নেটওয়ার্ক সারা ইরান জুড়ে তৈরি করে রাখা হয়েছিল। অপেক্ষা ছিল শুধু সুযোগ বুঝে চালু করার। 

ইরানের ঘটনায় বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলির হস্তক্ষেপের ছাপ ঢেকে রাখা অসম্ভব। মোসাদ প্রকাশ্যেই বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছিল, ‘‌আমরা আপনাদের সঙ্গে আছি। শুধু দূর থেকে এবং মুখের কথাতেই নেই। আমরা মাঠে ময়দানেও আপনাদের সঙ্গে রয়েছি।’‌ প্রাক্তন মার্কিন বিদেশ সচিব মাইক পম্পেও ছিলেন সিআইএ-এরও ডিরেক্টর। তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছিলেন, ‘‌যারা রাস্তায় রয়েছেন সেই সব ইরানিদের জানাই শুভ নববর্ষ। তাদের পাশে দাঁড়িয়ে মোসাদের যে সব এজেন্ট কাজ করছেন তাদেরও জানাই শুভ নববর্ষ।’‌ এগুলো সাংকেতিক বার্তা নয়। দেশের ভেতরে থেকেই যে এসব কাজ কারবার চলছে এগুলো তারই প্রকাশ্য স্বীকৃতি।

কয়েকটি কুর্দিশ গোষ্ঠীও মার্কিন–ইজরায়েলি অ্যাকশন প্ল্যানে যোগ দিয়েছে। সাতটি কুর্দ বিরোধী গোষ্ঠী যার মধ্যে রয়েছে কুর্দিস্তান ফ্রি লাইফ পার্টি (‌পিজেএকে)‌ তারাও ৮ জানুয়ারির দিন ডাকা সাধারণ ধর্মঘটকে সমর্থনের ডাক দিয়েছিল। পিজেএকে পিকেকে–র অধীন গোষ্ঠী এবং তুর্কিয়ে এদের সন্ত্রাসবাদী অ্যাখ্যা দিয়েছে। কুর্দিস্তান ফ্রিডম পার্টি (‌পিএকে)‌ দাবি করেছে, তারা কেরমানশাহ এলাকায় ইরানের রেভলিউশনারি গার্ডদের ওপর হামলা চালিয়েছে। রয়টার্সের রিপোর্টে, তুর্কিয়ের গোয়েন্দা সংস্থা এমআইটি ইরানের রেভলিউশনারি গার্ডদের সতর্ক করে দিয়ে জানিয়েছিল, সশস্ত্র কুর্দিশ যোদ্ধারা ইরাক ও তুর্কিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে ইরানে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করছে। তেহরানের দাবি, এই সব যোদ্ধাদের ‘‌পাঠানো হয়েছিল’‌ অশান্তিকে আরও উস্কে দিতে। তুর্কিয়ে এই সব খবর দিয়েছিল অনুপ্রবেশ ঠেকানোর লক্ষ্যে।

ইরানে জমানা বদলের নাটক চেনা ছক ধরেই এগিয়েছে। ২৯ ডিসেম্বর রাষ্ট্রসঙ্ঘে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়ালজ বলেছিলেন, ‘‌ইরানের মানুষ স্বাধীনতা চান।  আমরা সেই সব ইরানিদের পাশে আছি যারা রাস্তায় নেমেছেন।’‌ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পোস্ট করেছেন, ‘সাহায্য পৌঁছচ্ছে।’‌ নিউ ইয়র্ক টাইমস ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, ট্রাম্পের কাছে সামরিক হামলা চালানোর কথাও বলা হয়েছিল। অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, ১৫ জানুয়ারির মধ্যে ‘‌ওয়াশিংটনের  কয়েক ডজন শীর্ষস্থানীয় সামরিক, রাজনৈতিক ও কূটনীতিক অফিসার এবং গোটা পশ্চিম এশিয়া মনে করেছিল আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তেহরানে বোমাবর্ষণ শুরু হবে।’‌

পাল্টা ইলেকট্রনিকস হামলা

ইরান এসবের যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে তাতে প্রমাণ হচ্ছে দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলি সাম্রাজ্যবাদী প্রযুক্তিগত হামলা মোকাবিলার ক্ষেত্রে আর অসহায় অবস্থায় নেই। স্টারলিঙ্কের সিগন্যাল জ্যাম করার ক্ষেত্রে তিনটি বিষয়ে ইরানের সক্ষমতা স্পষ্ট।

এর মূল ভিত্তি ছিল জিপিএস পরিষেবা প্রত্যাহার। স্টারলিঙ্কের টার্মিনালগুলি জিপিএস সিগন্যালের ওপর নির্ভরশীল। সেই সিগন্যাল দিয়েই টার্মিনালগুলি কোথায় আছে বোঝা যায় এবং সেগুলিতে উপগ্রহ যোগাযোগ সক্রিয় করে তোলা যায়। জিপিএস এল ১ ব্যান্ডে একটানা উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বাধা সৃষ্টি করে ইরানের বাহিনী স্টারলিঙ্কের টার্মিনালগুলিকে এমন এলোমেলো করে দিয়েছিল যে, সেগুলি তাদের সঠিক অবস্থান নির্ণয় করতে পারে না। এর জেরে সংযোগ ছিন্ন হয়ে যায়। এবং সেটা করা যায় উপগ্রহকে প্রভাবিত না-করেই।

দ্বিতীয় স্তরে সরাসরি রেডিওফ্রিকোয়েন্সি জ্যামিং করা হয়। ইরান কাজে লাগিয়েছিল মোবাইল জ্যামিং ইউনিট।  এই ইউনিটগুলি স্টারলিঙ্কের হাই ফ্রিকোয়েন্সি Ku‌–ব্যান্ড (‌১০.৯–১৪ গিগাহার্জ)‌ এবং Ka–ব্যান্ড (১৮–৪০ গিগাহার্জ) ফ্রিকোয়েন্সিকে টার্গেট করেছিল। ফিল্টার ডট ওয়াচ জানাচ্ছে, এই সব ইউনিট পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে একেবারে স্থানীয় স্তরে বাধার এলাকা তৈরি করেছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্যাটার্নটি যেন ‌‘‌ইউক্রেনে ব্যবহার করা রাশিয়ার জ্যামিং কৌশলের প্রায় নকল।’‌

তৃতীয় হাতিয়ারটি ছিল রাশিয়ার ইলেকট্রনিক যুদ্ধের হাতিয়ার যা ইরানকে দেওয়া হয়েছিল ২০২৪–২০২৫ সালে। ডিফেন্স সিকিওরিটি এশিয়া জানিয়েছে, ক্রাসুকা –৪ সিস্টেম, যেটা আসলে ট্রাকের ওপর চাপানো ব্রডব্যান্ড জ্যামার এবং যেগুলির কার্যকারিতা ১৫০ থেকে ৩০০ কিলোমিটার পর্যন্ত, সেগুলিকে ইরানে পাঠানো হয়েছিল। এগুলি স্টারলিঙ্কের ব্যবহার করা X/Ku/Ka ‌ব্র্যান্ডের উপগ্রহ সংযোগ ছিন্ন করে দিতে পারে। ইরান পেয়েছিল মুরমানস্ক–বিএন–লং রেঞ্জ ই ডব্লিউ সিস্টেম। এগুলি ৫০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত সংযোগ জ্যাম করতে সক্ষম। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, রাশিয়া ও চীনের বিশেষজ্ঞরা সহায়তা করেছে স্টারলিঙ্কের বিরুদ্ধে এই সব হাতিয়ার ঠিক জায়গায় বসিয়ে কাজে লাগাতে।

এসবের ফলাফল ছিল নাটকীয়। ৮ জানুয়ারি শাটডাউনের ৩০ মিনিটের মধ্যে ক্লাউডফ্লেয়ার রেকর্ড করেছিল যে, ইরানের ইন্টারনেট ট্র্যাফিক ৯৮ শতাংশ ধ্বসে পড়েছে। এর ফলে দেশের মধ্যে সংযোগের মাত্রা নেমে এসেছিল স্বাভাবিক স্তরের মাত্র ২ শতাংশের নীচে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হল স্টারলিঙ্ক, যা ছিল প্রতিবাদীদের জীবনরেখা, তার মাধ্যমে সম্প্রচার মূলত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিল। এবং নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিল ঠিক তখনই যখন তা সবচেয়ে বেশি দরকার ছিল। 

ব্যর্থ হামলা

এখানে সময়টা লক্ষ করার মতো। ১৫ জানুয়ারি মনে হল ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা করার নির্দেশ দেওয়ার জন্য তৈরি। কাতারে আল উদেইদ বায়ুসেনা ঘাঁটি ছাড়তে শুরু করল মার্কিন সেনা। আকাশসীমা বন্ধ করে দিল ইরান। অথচ সেদিন বিকেলে হামলার আদেশ আর এল না। ট্রাম্প ঘোষণা করলেন, ‘অন্যদিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা সূত্র’ তাঁকে জানিয়েছে ইরান সরকার বিরোধীদের হত্যা করা বন্ধ করেছে। মার্কিন হামলা প্রত্যাহার করে নেওয়া হল।

তাহলে বদলটা হল কোথায়? সাক্ষ্যপ্রমাণ থেকে দেখা যাচ্ছে, ইরান যে সফলভাবে ইন্টারনেট পরিষেবা ব্ল্যাক আউট করে দিয়েছিল তাতেই শাসন বদলের ছকটা বাধা পায়। স্টারলিঙ্ক না-থাকায় প্রতিবাদীদের কার্যকলাপকে সমন্বিত করার পরিকাঠামো ভেঙে পড়েছিল। ইরানের শাসকদের অত্যাচারের ভিডিও সারা বিশ্বের দর্শকদের কাছে একেবারে টাটকা না-পৌঁছে দিতে না-পারার ফলে প্রচার যন্ত্র তার ধার হারিয়ে ফেলে। দেশের ভেতরে যে সব এজেন্ট ও সম্পত্তি ছিল সেগুলির সঙ্গে যোগাযোগ করার ক্ষমতা না-থাকায়, গোয়েন্দাদের কার্যকলাপও দিশাহীন হয়ে পড়ে।  বহু উচ্চকিত কালার রেভলিউশনের কুনাট্যরঙ্গ, যা ২০১৪ সালে ইউক্রেনে আরও শানিয়ে তোলা হয়েছিল,  ২০২০ সালে বেলারুশে যা সংগঠিত করার চেষ্টা হয়েছিল, যা ২০২২ সালের ইরানে আংশিক ভাবে প্রয়োগ করা হয়েছিল, সেটা এবার আটকে গেল প্রযুক্তির দেওয়ালে। 

ইরানের সরকার ঘোষণা করল তারা ‘বিদেশি গুপ্তচরবৃত্তির নেটওয়ার্ক’কে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। যারা মোসাদের হয়ে কাজ করছিল তাদের গ্রেপ্তার করল ইরানের রেভলিউশনারি গার্ডেরা। এবং জানাল, তল্লাশিতে উদ্ধার হয়েছে অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ এবং বোমা তৈরির মশলা। এগুলো বিভিন্ন বাড়িতে মজুত করা হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের সম্প্রচারে দেখা গেল বাজেয়াপ্ত করা স্টারলিঙ্কের টার্মিনালগুলো যে অবস্থায় প্যাকিং করে পাঠানো হয়েছিল তখনও  সেভাবেই রয়ে গেছে। জানানো হল, এগুলি ‘ইলেকট্রনিক গুপ্তচরবৃত্তি এবং অন্তর্ঘাত চালানোর হাতিয়ার’ যা প্রতিবাদের এলাকাগুলিতে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। 

এখানে ইউক্রেনের সঙ্গে ফারাকটা লক্ষ্যণীয়।  ২০২২ সালে রাশিয়া স্টারলিঙ্কের সিগন্যাল জ্যাম করার চেষ্টা করেছিল। তখন কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সফটঅয়্যার আপডেট করে দেয় স্পেশ এক্স। তখন ইলন মাস্ক গর্ব করে বলেছিলেন, তাদের কোম্পানি যে কোনও অবস্থায় কাজ করতে পারে। কিন্তু ইরানে স্টারলিঙ্কের দ্রুত আপডেট করা সফটঅয়্যার বন্ধ ইন্টারনেট পরিষেবা ফের চালু করতে পারেনি। রাশিয়ার ইলেকট্রনিক যুদ্ধের যে হাতিয়ার, যা ইউক্রেন ও সিরিয়ার সংঘাতের মধ্যে দিয়ে আরও উন্নত করে তোলা হয়েছিল, সেগুলো এবার ইরানে পাঠানো হয়েছিল। উপগ্রহ সিগন্যাল আটকানোর কাজে চীনা বিশেষজ্ঞদের দক্ষতাও বারে বারে ইরানকে দেওয়া হয়েছে। ইরান আবার সেগুলিকে আরও উন্নত করেছে এবং সিআইএ-মোসাদের পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়েছে। এবং নিজেদের দেশজ যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছে। দক্ষিণ গোলার্ধ এভাবেই পাল্টা লড়াই লড়তে শিখছে।

কয়েকটি সিদ্ধান্ত

ইরান যে ইলেকট্রনিকস যুদ্ধে জিতল তার প্রভাব এখনকার সংকটে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তথ্যের পরিসরে উপগ্রহ প্রযুক্তি অপছন্দের শাসকদের গলা টিপে ধরবে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলিকে এমন আশ্বাস দিয়ে রেখেছে উপগ্রহ প্রযুক্তির একচেটিয়া মালিকেরা। সেটাকে ইরানে অন্ততপক্ষে আংশিকভাবে ব্যর্থ করা গেছে। স্পেস এক্সের মালিকানায় রয়েছে ৬০০০ উপগ্রহ। এগুলোর দাম কয়েকশ কোটি টাকা। সেগুলোকে স্থলভিত্তিক ব্যবস্থার সাহায্যে নিষ্ক্রিয় করে তোলা যায়, তোলা যায় খুবই সামান্য খরচে। এটাই ইরানের আংশিক সাফল্যের প্রভাব। 

এটা শুধুমাত্র সাধারণভাবে উপগ্রহ প্রযুক্তির বিষয় নয়। বিশ্বজুড়ে সংযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য সত্যিকারের সম্ভাবনা রয়েছে এই প্রযুক্তির হাতে। সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা সাধারণ নাগরিকদের কাজে লাগা পরিকাঠামোকে যেভাবে শাসক বদলের ষড়যন্ত্র সফল করার লক্ষ্যে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে, এটা তার বিরুদ্ধে একটা রায়। যখন মাস্ক ঘোষণা করেন টার্গেট করা দেশের ওপর ‘আমাদের রশ্মিগুলি চালু রয়েছে’, যখন সিআইএ-এর প্রাক্তন ডিরেক্টর প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন যে প্রতিবাদীদের ভিড়ে মিশে রয়েছে তাদের এজেন্টরা, যখন চোরাচালানের মাধ্যমে পাঠানো ৫০০০ টার্মিনাল সক্রিয় করে তোলার অপেক্ষায় থাকে, তখন মানবিক অজুহাতের ছদ্মবেশটুকুও খসে পড়ে।

এই ঘটনার তাৎপর্য শুধু পশ্চিম এশিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভারতের ক্ষেত্রেও এ থেকে শিক্ষা নিতে হবে। মোদি সরকার স্টারলিঙ্ককে লাইসেন্স দেওয়ার পথে হাঁটছে। তারা ভারতে পরিষেবা দেবে। এর ফলে এদেশে বিদেশি সংস্থা টেলিকম স্পেকট্রামের মালিক হতে পারবে না, কিংবা সরাসরি টেলিকম পরিষেবা দিতে পারবে না— দীর্ঘদিনের এই অবস্থান থেকে সরে আসছে মোদি সরকার। মার্কিন চাপে এ-নিয়ে প্রকাশ্য বিতর্ক এড়িয়ে এভাবে উল্টোপথে হাঁটা, তাতে আমাদের সার্বভৌমত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যদি ইরানে শাসক বদল করার জন্য উপগ্রহ সংযোগকে হাতিয়ার হিসাবে কাজে লাগানো যায়, তাহলে সেই অস্ত্র যে কোনও জায়গায় ব্যবহার করা হতে পারে। সুতরাং ভালো করে না ভেবেচিন্তে স্টারলিঙ্ককে এদেশে ব্যবসা করার অনুমতি দেওয়ার পদক্ষেপের বিষয়টি মোদি সরকারের পুনর্বিবেচনা করা উচিত, ‘ভারতের ওপর রশ্মিগুলি সক্রিয় হওয়ার’ আগেই।

যারা ওয়াশিংটন ও তেল আভিভে শাসক বদলের কারিগর, তাদের কাছে ইরান একটা বড়োসড়ো ধাক্কা। দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলির কাছে এই ঘটনা একটা শিক্ষা— প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্ব ঐচ্ছিক বিষয় নয়। বরং আমাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য এটা আবশ্যিক। 

সূত্র : পিপলস ডেমোক্রেসি
ভাষান্তর: সুচিক্কণ দাস


প্রকাশের তারিখ: ৩১-জানুয়ারি-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org