|
আরও বড় সঙ্ঘাতের পথে পশ্চিম এশিয়াপ্রবীর পুরকায়স্থ |
|
যুদ্ধ ও সংঘাত আরও ছড়িয়ে দেওয়ার যে সিঁড়ি, তার ধাপগুলো ধরে ক্রমশ আরও ওপরে ওঠাটাই ইজরায়েলের নীতি। এর ফলে ইজরায়েল পশ্চিম এশিয়াকে এখন টেনে এনে ফেলেছে আরও একটা বৃহত্তর যুদ্ধের মুখে। ইজরায়েল এখন লেবাননে ঢুকে পড়েছে এবং ইজরায়েলে পাল্টা মিসাইল হামলা চালিয়ছে ইরান। গত প্রায় এক বছর ধরে ইজরায়েল গাজায় যে গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে, এখন যুদ্ধটা শুধুমাত্র সেই গাজা এবং সেখানকার জনগণের ভবিষ্যতের প্রশ্নে আটকে নেই। যুদ্ধটা এখন এক নতুন পর্বে ঢোকার মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে যেখানে ইজরায়েল হুমকি দিয়েছে যে তারা ইরানের পরমাণু কেন্দ্রের ওপর হামলা চালাবে এবং তাতে পুরোপুরি মদত দেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এমনটা হলে এই ঝুঁকি রয়েছে যে, এই যুদ্ধ সমরাঙ্গনে টেনে আনবে ইয়েমেন, সিরিয়া ও ইরাককে। ফলে যুদ্ধটা হয়ে দাঁড়াবে আরও বৃহত্তর এবং এর বিশ্বজোড়া প্রভাব পড়বে এই অঞ্চলকে ছাপিয়ে। যুদ্ধবাজদের এখনকার নতুন লব্জ হল, যুদ্ধ আরও ছড়াচ্ছি কারণ যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়াটা আমরা আটকাতে চাই। এটাই এখন ইজরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চলতি বুলি। কিন্তু তারা একথা ভুলে গেছে যে, কোনও বড় দেশ যুদ্ধ না চাইলেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিল। কারণ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই যুদ্ধ ও সংঘাত আরও ছড়িয়ে দেওয়ার সিঁড়ির ধাপ বেয়ে ওপরদিকে উঠছিল। এবং সকলেই আশা করেছিল যে তাদের যুদ্ধবাজ চেহারাটা দেখে প্রতিপক্ষ ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাবে। বস্তুত ঘটেছিল তার উল্টোটাই। মার্কিন দার্শনিক জর্জ সান্তাইয়ানাকে উদ্ধৃত করে বলা যায়, ‘যারা অতীতকে স্মরণে আনতে পারে না তারা আগের কাজের পুনরাবৃত্তি করতে বাধ্য।’ তবে এবার ব্যতিক্রম হল, যুদ্ধের যে কোনও ঝুঁকি গিয়ে শেষ হতে পারে পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহারে। যদি ইরানের পারমাণবিক পরিকাঠামো ধ্বংস করার কাজে ইজরায়েলকে আমেরিকা মদত দেয়, তখন আমরা হয়ত দেখতে পারি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর পর্ব। কারণ রাশিয়া ও চীনের পক্ষে পশ্চিম এশিয়ায় নয়া উপনিবেশবাদের ফিরে আসা মেনে নেওয়া খুবই কঠিন হবে। গাজায় ইজরায়েলের হামলায় ধ্বংস হয়েছে সব ধরনের অসামরিক পরিকাঠামো। মৃত্যু হয়েছে ৪২,০০০ এরও বেশি নাগরিকের। গাজার ৮০ শতাংশের বেশি বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে। এবং বাসস্থান থেকে উচ্ছেদ হয়েছেন ১৯ লক্ষ মানুষ। এঁদের বেশির ভাগকেই বারে বারে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানচ্যুত হতে হয়েছে। গাজার যারা বাসিন্দা তাদের অধিকাংশই নাকবার সময় উচ্ছেদ হওয়া আসা শরণার্থি। তাঁদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলছেই। তবে এখন এই যুদ্ধ ঢাকা পড়ে গেছে ইজরায়েল যুদ্ধটা লেবাননেও ছড়িয়ে দেওয়ায় এবং এখন তারা ইরানকেও যুদ্ধে টেনে নামাতে চাইছে। এ সংক্রান্ত বৃহত্তর ছবিটির দিকে নজর দেওয়ার আগে, একথা মনে করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, ইজরায়েল সিরিয়ায় ইরানের দূতাবাসে বোমা হামলা চালিয়েছে, সেই হামলায় গুরুত্বপূর্ণ কূটনীতিক ও সামরিক অফিসারদের মৃত্যু হয়েছে। ইজরায়েল সিরিয়া আক্রমণও করেছে। এখনও তারা শুধু পুরো প্যালেস্টাইনই দখল করে নেই, অসলো চুক্তিতে প্যালেস্তাইনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, একই সঙ্গে সরকারি ভাবে সেই চুক্তিকে কবর দিয়ে দিয়েছে ইজরায়েল। ইজরায়েল কেন গাজার যুদ্ধ লেবাননেও ছড়িয়ে দিল? পেজার ও ওয়াকিটকি হামলা, হিজবুল্লা নেতা হাসান নাসরাল্লার হত্যা, লেবাননে আগ্রাসন— এসবের মধ্যে কোনও সামরিক কাণ্ডজ্ঞান নেই। এমনকী প্রায় এক বছর পরেও গাজার মতো ছোট একটা ভূখণ্ডে হামাসকে ধ্বংস করার সামরিক লক্ষ্য অর্জন করতে ব্যর্থ ইজরায়েল। তাই আপাতদৃষ্টিতে লেবাননে হামলা ও নাসরাল্লাকে হত্যার কোনও অর্থ নেই বলেই মনে হতে পারে। তবে এক্ষেত্রে যদি আমরা ইজরায়েলের আরও দুটি লক্ষ্য হিসাবের মধ্যে রাখি এবং এই অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র–ন্যাটোর বৃহ্ত্তর স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্যের সঙ্গে সেই দুই বিষয়কে যুক্ত করে দেখি, তাহলে ইজরায়েলের এসব কর্মকাণ্ডের অর্থ পরিষ্কার হবে। পশ্চিম এশিয়ায় (পশ্চিমী শক্তি ও আটলান্টিক শক্তিগুলি এই অঞ্চলকে ডাকে মধ্যপ্রাচ্য নামে) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়া, ইরানের উত্থান রুখতে মার্কিনী ব্যর্থতা, মার্কিন আগ্রাসনের পর ইরাকি জনগণের কাছ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এবং সিরিয়ায় জমানা বদলে ব্যর্থতা — এসবের মানে হল কার্টার নীতি বিপন্ন। এই নীতিতে বলা হয়েছিল যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দরকার হলে পারস্য উপসাগরে তাদের ‘জাতীয় স্বার্থ’ রক্ষা করার জন্য সামরিক শক্তি কাজে লাগাবে। অন্যভাবে বললে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস করে যে উপসাগরীয় এলাকার তেলের ভাণ্ডার তাদের ‘স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ’-এর অংশ। ইজরায়েল কেন সামরিক সম্প্রসারণ পশ্চিমে করতে চাইছে সেটা এই মার্কিন ভাবনার সঙ্গে খাপ খেয়ে যায়। এখানে ইজরায়েল কাজ করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর একটি বাহু হিসাবে। এবং বোঝা যায় কেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোভুক্ত ইউরোপীয় মিত্ররা পুরোপুরি ইজরায়েলকে মদত দিচ্ছে। এ থেকে আরও বোঝা যায়, কেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে বিবাদ মেটাতে নারাজ এবং কেন ইরাক, সিরিয়া ও লেবাননে জমানা বদলের প্রয়াস জারি রয়েছে। ইরানে ও লেবাননে গাজা যুদ্ধের সম্প্রসারণ শুরু হয়েছিল হামাসের রাজনৈতিক নেতা ইসমাইল হানিয়ে হত্যার মধ্যে দিয়ে। হানিয়ে প্রধানত থাকতেন কাতারে। তাঁকে হত্যা করা হয় ইরানে। ইরানের নতুন প্রেসিডেন্ট পেশনিয়ানের শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তিনি তেহরানে গিয়েছিলেন। এর আগে ইজরায়েলের বিরুদ্ধে যখন হামলা চালিয়েছিল, তখন ইরান ছোট আকারে হামলা চালিয়েছিল। সেই হামলা কী ধরনের হবে, কখন হবে সে সব কথা আগাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জানিয়েছিল ইরান। এবারে নাসরাল্লার হত্যার প্রতিরোধ নিতে যে পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইরান, সেটা খুবই বড় ধরনের মিসাইল হামলা। এর মধ্যে অনেকগুলি মিসাইল তিন স্তরের মিসাইল-প্রতিরক্ষা বর্ম ভেদ করে আঘাত হেনেছে। সেই তিন বর্ম হল আয়রন ডোম, ডেভিডস স্লিং এবং অ্যারো ব্যাটারিজ। মিলিটারি ওয়াচ পত্রিকা জানাচ্ছে, ইজরায়েলের উন্নত এফ ৩৫ স্কোয়াড্রন, নেভিটিম বিমান ঘাঁটির সদর দপ্তর ও হ্যাটজারিম বিমানঘাঁটিতে রাখা এফ ১৫ বিমানগুলির ইরানের এবারের হামলায় বেশ ভালরকম ক্ষতি হয়েছে। মিলিটারি ওয়াচ পত্রিকার ওয়েবসাইট জানাচ্ছে, ‘ইজরায়েলের কাছ থেকে পাওয়া ফুটেজ থেকে দেখা যাচ্ছে, কয়েক ডজন ব্যালিস্টিক মিসাইলকে পাল্টা হানায় আকাশে ধ্বংস করতে পারেনি ইজরায়েলের এয়ার ডিফেন্স নেটওয়ার্ক এবং তার ফলে সেগুলি একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে যার মধ্যে রয়েছে ইজরায়েলি গোয়েন্দা বাহিনী মোসাদের সদর দপ্তরও। তেল আভিভের ওই সদর দপ্তর হামলায় পুরো গুঁড়িয়ে গেছে।’ যদি সত্যিই এই বিশ্লেষণ নিখুঁত হয়, তাহলে বুঝতে হবে ইজরায়েল তাদের যে ত্রিস্তরীয় অ্যান্টি মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বড়াই করে তা ব্যর্থ হয়েছে। এবং এ ঘটনা এটাও দেখাচ্ছে, সমান শক্তিসম্পন্ন প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে যোঝার ক্ষেত্রে মিসাইল প্রতিরক্ষা বর্মের দুর্বলতা রয়েছে। পশ্চিমী জোট, যারা স্বঘোষিত ‘আইনের ভিত্তিতে স্থাপিত বিশ্ব ব্যবস্থার’ নেতা— আসলে যারা হাতে গোনা কয়েকটি পূর্বতন ঔপনিবেশিক ও স্থায়ী বসতির ঔপনিবেশিক দেশ— প্রত্যাশামতোই তারা চিৎকার করছে যে ইরান আন্তর্জাাতিক আইন ভেঙেছে এবং এর ভয়ঙ্কর পরিণাম কী হবে। অথচ ইজরায়েল যখন নাসরাল্লাকে হত্যা করল এবং বুবি ট্র্যাপ পেজার ও ওয়াকিটকি বিস্ফোরণে বহু হিজবুল্লা সদস্য এবং নিরীহ নাগরিকদের হত্যা করল, তখন কিন্তু পশ্চিমী শাসকেরা তার সমর্থনে যে হইচই জুড়ে দিয়েছিল সেটা তাদের ইরান সংক্রান্ত অবস্থানের সঙ্গে মেলে না। সিআইএর প্রাক্তন ডিরেক্টর লিঁও প্যানেট্টা লেবাননে ভয়ঙ্কর পেজার বিস্ফোরণকে সন্ত্রাসবাদ বলে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘এটা যে এক ধরনের সন্ত্রাসবাদ, আমি মনে করি, সে নিয়ে কোনও প্রশ্ন থাকতেই পারে না।…এটা একেবারে সরবরাহ ব্যবস্থার মধ্যে চলে এসেছে। এবং একবার যখন সরবরাহ ব্যবস্থার মধ্যে সন্ত্রাসবাদ ঢুকে পড়ে, তখন লোকের মনে প্রশ্ন জাগে এরপর তাহলে কী?’ হিউম্যান রাইট ওয়াচের মধ্য প্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার ডিরেক্টর লামা ফকিহ বলেন, ‘চালু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে বুবি ট্র্যাপ ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। বুবি ট্র্যাপ এমন জিনিস যে তাতে অসামরিক নাগরিকেরা আকৃষ্ট হতে পারেন কিংবা এমন জিনিস হতে পারে যা সাধারণ নাগরিকেরা প্রতিদিন ব্যবহার করেন। এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে যাতে সাধারণ নাগরিকেরা এই ভয়ঙ্কর ঝুঁকির সামনাসামনি না হন এবং একেবারে বিধ্বংসী দৃশ্যের সৃষ্টি না হয়। অথচ আজকের লেবাননে এই ধরনের ঘটনাই ঘটে চলেছে।’ নাসরাল্লার হত্যাকাণ্ডে বেইরুটের অনেকগুলি বহুতল বাড়ির একটা গোটা ব্লকই পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি বাঙ্কার বাস্টার বোমা ফেলে এবং সেই বোমা ফেলা হয় মার্কিন এফ ১৫ বিমান থেকে। এই অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটা কথাও বলেনি। অথচ এই বোমার আঘাতে প্রাণ গেছে নিরীহ নাগরিকদের। এবং হত্যা করা হয়েছে এমন এক রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকে যে সংগঠন নির্বাচনে অংশ নেয়, বহু ধরনের সামাজিক ও কল্যাণমূলক কাজকর্ম করে যার মধ্যে পড়ে হাসপাতাল, ক্লিনিক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালানো। এই হামলায় ব্যবহার করা হয়েছে ২০০০ পাউন্ডের বোমা , ব্যবহার করা হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি করা বিএলইউ-১০৯, সব মিলিয়ে মোট ৮০ হাজার কেজির বিস্ফোরক ফেলা হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি করা এফ ১৫ যুদ্ধবিমান থেকে যাতে ওপরের বাড়ি ও ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার ধ্বংস করা যায়। যে নির্লজ্জভাবে এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করা হল, তাতে ‘মুক্ত দুনিয়ার’ নেতার প্রতিক্রিয়া কী? প্রতিক্রিয়া হল, ইজরায়েলকে অভিনন্দন জানিয়েছে আমেরিকা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, সরকারের ধামাধরা অ্যাঙ্করের দল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মুখপাত্ররা এবং আরও বিভিন্ন ধরনের ‘বিশেষজ্ঞরা’ এই হামলাকে সমর্থন করেছেন এবং এদের বক্তব্য প্রচার করে মার্কিন মিডিয়া ইজরায়েলকে সমর্থন করা নিয়ে একেবারে হইচই ফেলে দিয়েছে। দেখেশুনে মনে হয় পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধকে আরও সম্প্রসারিত করার জন্য তারা যেন একেবারে মুখিয়ে রয়েছে। ইতিহাস যাদের স্মরণে থাকে তারা নিশ্চয়ই জানবেন যে, ১৯৮২ সালে ইজরায়েল যখন দক্ষিণ লেবানন দখল করে তারই প্রতিরোধের লড়াইয়ের মধ্যে থেকে নাসরাল্লার নেতা হিসাবে উত্থান ঘটে। লেবাননের দক্ষিণপন্থী মিলিশিয়ার সঙ্গে হাত মিলিয়ে ইজরায়েল সাবরা ও শাতিল্লা শরণার্থি শিবিরে হামলা চালায়। এই হামলায় ২ থেকে ৩ হাজার নারী ও শিশুকে গণহত্যা করা হয়। সেই সময় ইজরায়েলের সঙ্গে শান্তি চুক্তির জেরে পিএলও যোদ্ধারা লেবানন ছেড়ে চলে গিয়েছিল। এই গণহত্যা ও দক্ষিণ লেবাননে দখলদারির বিরুদ্ধে আমল ও কমিউনিস্ট পার্টি অফ লেবানন একসঙ্গে যুদ্ধে লড়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত ইজরায়েলকে পিছু হঠতে বাধ্য করেছিল। এই সশস্ত্র সংগ্রাম থেকেই হিজবুল্লা ও নাসরাল্লার উদ্ভব। ২০০৬ সালে ইজরায়েল ফের দক্ষিণ লেবাননে হামলা চালায় এবং সেই হামলাও প্রতিরোধ করেছিল হিজবুল্লা। তখন ইজরায়েল চেয়েছিল হিজবুল্লা বাহিনীকে লিটানি নদীর পূর্ব পাড় পর্যন্ত ঠেলে নিয়ে যেতে। কিন্তু তাদের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এবং ইজরায়েলি বাহিনীর ব্যাপক ক্ষতি হয়। যুদ্ধ আরও ছড়ানোর সিঁড়ির ধাপ বেয়ে ক্রমশ ওপরে ওঠা— যুদ্ধ আরও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি— এবং তার জেরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজরায়েল যদি ইরানের পরমাণু পরিকাঠামোর ওপর হামলা চালায়, এবং ইরান তার বদলা নেয় তেল আভিভের কাছে থাকা অ্যামোনিয়া প্লান্ট এবং ডিমোনা পারমাণবিক প্লান্টের ওপর হামলা চালিয়ে, তাহলে ইজরায়েলের এবং তাদের অসামরিক জনগণের বিপুল ক্ষতি হতে পারে। এ বিষয়ে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি ভারত তার অঙ্গীকার সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলছে এবং রাষ্ট্রসঙ্ঘের ভোটাভুটিতে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকছে। অথচ সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ গাজায় গণহত্যা চালিয়ে যাওয়ার জন্য ইজরায়েলের সমালোচনা করেছে। জোট নিরপেক্ষতার বদলে আমাদের বিদেশমন্ত্রী এখন বহুমুখী বোঝাপড়ার তত্ত্বের ওপর যেভাবে আস্থা রাখার কথা বলছেন, এবং তাতে ভারতের জোট নিরপেক্ষ অবস্থানের মূল যে বিষয়টি ছিল সেই আফ্রো-এশীয় জনগণের উপনিবেশবাদ থেকে মুক্তি ও সংহতি, সেটাই এখন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। এই মূল বিষয়টিকে বাদ দিলে ভারতের বহুমুখী বোঝাপড়ার মানে দাঁড়ায়, যে বিষয়টি এখন পৃথিবীকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা। সেই বিষয়টি হল, আফ্রিকা ও পশ্চিম এশিয়াকে উপনিবেশবাদের কবল থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করার শেষ অধ্যায় এখন রচিত হচ্ছে। বিশ্ব মঞ্চে এখন এটাই অভিনীত হচ্ছে, এবং এই স্বীকৃতিই এমনকি ন্যাটো সদস্যদেরও বাধ্য করছে প্যালেস্তিনীয় জনগণের বিরুদ্ধে ইজরায়েলের গণহত্যাকারী যুদ্ধের বিরোধিতা করতে। সূত্র: পিপলস ডেমোক্রেসি অনুবাদ: সুচিক্কণ দাস
প্রকাশের তারিখ: ১২-অক্টোবর-২০২৪ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |