ইতিহাসকে ফিরে দেখা জরুরি

ইরফান হাবিব
আমার বাবা মহম্মদ হাবিব আমাকে বলেছিলেন যে, ১৯৩০ এর দশকে তিনি একজন বিচারপতি সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। তাঁর নাম ছিল মিঃ সুলেইমান। সুলেইমান বলেছিলেন যে, তিনি ঘুমাতে পারছেন না। আমার বাবা তাকে প্রশ্ন করেন কেন তিনি ঘুমাতে পারছেন না। তিনি ছিলেন আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, বা আচার্য (আমার ঠিক মনে নেই) এবং হাই কোর্টের বিচারপতি, পরে সেই সময়কার ফেডারাল কোর্ট অফ দিল্লিতে তার পদোন্নতি হয়। তিনি বলেছিলেন, এই সব ‘শুভবুদ্ধিসম্পন্ন কমিউনিস্টদের’ জন্য রাতে তাঁর ঘুম হচ্ছে না। যখন বিচার চলছিল তখন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে যাদের বিচার চলছে তারা নিরপরাধ। এবং ব্রিটিশ আইনজীবীকে তিনি বলেন, উনি যা বলছেন তা পুরোপুরি আজগুবি— এবং কমিউনিস্টরা যা করেছে বলে তিনি দাবি করছেন সেটা বাস্তবত সম্ভব নয়।

প্রথম সীতারাম ইয়েচুরি স্মারক বক্তৃতা, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫, এইচকেএস ভবন, দিল্লি

কমরেড সীতারাম ইয়েচুরির প্রথম প্রয়াণ বার্ষিকীতে আমরা সমবেত হয়েছি। আমরা একথা জানি যে  তিনি ছিলেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) সাধারণ সম্পাদক। এবং যেহেতু মার্কসবাদই হল সেই বুনিয়াদি মতাদর্শ যাকে অনুসরণ করে চলে কমিউনিস্ট আন্দোলন, তাই আমার মনে হয়েছিল আমার উচিত প্রয়োগযোগ্যতার বিষয়ে, বস্তুত ভারতে মার্কসবাদী ধারণা পদ্ধতির প্রয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা করা। 

একথা সত্যি যে কমিউনিস্টরা ভারতে ব্রিটিশ শাসনের সমালোচনা করার আগেই এদেশে ব্রিটিশ শাসনের সমালোচনা বিরোধিতা করেছিলেন ভারতীয়রাই। কারণ ১৮৮০ সাল থেকেই দাদাভাই নওরোজি তাঁর সহকর্মীরা, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ যেভাবে ভারতকে শোষণ করছিল তার তীব্র সমালোচনা করছিলেন।  আজ যখন কেউ ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের মার্কসীয় সমালোচনার দিকে নজর দিচ্ছেন, তখন যাঁরা আমাদের নিজেদের জাতীয় ব্যক্তিত্ব, প্রধানত নওরোজি এবং আর সি দত্ত, তাদের প্রতিও আমাদের সম্মানপূর্ণ শ্রদ্ধা জানানোটাও হবে উপযুক্ত কাজ।  বিশেষ করে দাদাভাই নওরোজি বিশদে বর্ণনা করেছেন কীভাবে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ ভারতকে শোষণ করছিল। একথা ঠিক যে, তাঁরা ব্রিটিশের সমালোচনায় খুবই নরম শব্দ ব্যবহার করেছিলেন। তবে, তাদের সমালোচনা তখন যেমন ছিল তেমনি আজও, সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।       

সুতরাং, যখন আমরা প্রথম যুগের বিদগ্ধজনেদের, প্রথম যুগের জাতীয়তাবাদীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি, এবং কার্ল মার্কস এবং ফ্রেডেরিক এঙ্গেলসের মতো প্রথম যুগের বিদেশের বিদগ্ধজনেদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি, তখন আমরা শ্রদ্ধা জানাচ্ছি দাদাভাই নওরোজি এবং আর সি দত্তের প্রতিও। কারণ বিশেষ করে তাঁরাই স্পষ্ট করেছিলেন কীভাবে ব্রিটিশ ভারতকে শোষণ করছিল।                                                                 
আজ আমি বিশেষ ভাবে আগ্রহী কার্ল মার্কস সম্পর্কে এবং ভারতে উপনিবেশবাদ তার পরিণতি বিষয়ে মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গী সম্পর্কে। পুঁজি গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে উপনিবেশবাদ সম্পর্কে কার্ল মার্কসের সমালোচনার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। রয়েছে পুঁজি গ্রন্থের পরের দুটি খণ্ডেও। রয়েছে আমেরিকা থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্রে তাঁর লেখা নিবন্ধের মধ্যেও। এই নিবন্ধগুলি অনেকবার প্রকাশিত হয়েছে মস্কো এবং অন্যান্য জায়গা থেকে। এরপর ১৯৯১ সালে ওই নিবন্ধ সংকলন প্রকাশিত হয়েছে নিউ ইয়র্ক থেকে। 

এদেশে কমিউনিস্ট আন্দোলন শুরুর আগেই ঔপনিবেশিক ভারত সম্পর্কে কমিউনিস্ট দৃষ্টিভঙ্গী তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এই দৃষ্টিভঙ্গী প্রথম উপস্থাপিত করেন কার্ল মার্কস তাঁর ১৮৪০ সাল থেকে শুরু করা তাঁর নিবন্ধগুলির মধ্যে এবং উপস্থাপিত করেন ফ্রেডেরিক এঙ্গেলসও। এই সব লেখায় তাঁরা দেখিয়েছিলেন কীভাবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ভারতকে শোষণ করছে। কিন্তু ১৮৮০র পর থেকে ভারতীয় অর্থনীতিবিদ, বিশেষ করে দাদাভাই নওরোজি আর সি দত্ত, ভারতে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের সমালোচনা করেছিলেন। তাঁদের সমালোচনায় তাঁরা পরিশীলিত ভাষা ব্যবহার করেছেন। কিন্তু ব্রিটিশ যেভাবে তাদের ভারত শাসনের ন্যায্যতার দোহাই দিত, সেই যুক্তি খারিজ করার ক্ষেত্রে খুবই কার্যকর ছিল নওরোজি আর সি দত্তের লেখাগুলি। সুতরাং যখন আমরা ভারতে উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে কার্ল মার্কস কী বলেছিলেন তার প্রশংসা উচ্চারণ করছি, তখন উনবিংশ শতকের শেষের দিকে দাদাভাই নওরোজি আর সি দত্ত কী বলেছিলেন আমাদের তারও  প্রশংসা করতে হবে। কারণ তাঁরা ভারতে ব্রিটিশ শাসন এবং তাদের অর্থনৈতিক শোষণের কঠোর সমালোচনা তীব্র নিন্দা করেছিলেন। 

আমার মনে হয়, বলা যায় এটা আমার অনুভূতি যে, নওরোজি আর সি দত্ত যে শ্রদ্ধা স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য, আমাদের বিশ্ববিদ্যায়গুলিতে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কার্যত কিংবা যথেষ্ট পরিমাণে সেই স্বীকৃতির অভাব রয়েছে। তাই আমি মনে করি এখন সময় এসেছে যখন আমাদের নজর দেওয়া উচিত  ব্রিটিশ যে ভারতকে শোষণ করছিল তার মধ্যে তাঁরা কোন কোন ভুল অশুভ বিষয় দেখতে পেয়েছিলেন। দাদাভাই নওরোজি এবং আর সি দত্ত, দুজনের লেখাই প্রকাশিত হতে শুরু করে ১৮৮০ সাল থেকে। সেখানে তাঁরা দেখিয়েছেন কীভাবে প্রতি বছর ভারত থেকে লুঠ হয়ে যাচ্ছে দেশের আয় সম্পদের একটা বিশাল অংশ এবং সেই সম্পদ চলে যাচ্ছে ব্রিটেনে। এটা হল সেই তথাকথিত কর বা নজারানা, হল ভারতের সম্পদ ব্রিটেনে পাচার হয়ে যাওয়া। সেকারণেই একথা বলতে হবে যে, তাঁরা ছিলেন ভারতে ব্রিটিশ শাসনের কমিউনিস্ট সমালোচনার, মার্কসবাদী সমালোচনার, পূর্বসূরি। 

আমাদের দেশের নিজস্ব কমিউনিস্ট আন্দোলন প্রকৃতপক্ষে শুরু হয়েছিল গত শতাব্দীতে। এবং ১৯২০র দশকে ভারতে নানা ধরনের কমিউনিস্ট গোষ্ঠী আত্মপ্রকাশ করেছিল বিশেষ করে ১৯১৭ সালের সোভিয়েত বিপ্লবের প্রভাবের দরুন। গড়ে তোলা হয়েছিল কমিউনিস্ট গ্রুপ। এদেশে বিশেষভাবে ১৯১৭ সাল এবং সোভিয়েত বিপ্লবের পর কমিউনিস্ট আন্দোলন গড়ে উঠেছিল নানা স্তরের মধ্যে দিয়ে। সেই সব পর্বের আলোচনায় যাওয়ার কোনও ইচ্ছা আমার নেই। আমার সেই সময়ও নেই। 

তবে কথা মনে রাখা ভাল যে, ১৯৩০ এর মধ্যে এদেশে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি, একটি একক ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি, কার্যত গঠিত হয়েছিল। এই  পার্টি ইতিমধ্যেই ভারতে ব্রিটিশের নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। এর উদাহরণ হল তথাকথিত সেই ১৯২০র দশকের মীরাট ষড়যন্ত্র মামলা এবং অন্যান্য মামলা।

যদি একটু অন্য প্রসঙ্গে চলে যাই সে জন্য আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। কারণ এখানে আমি একটা তথ্যের উল্লেখ করব যা কোনওদিন ছাপা হয়নি, কারণ একজন বিচারক তথ্যটি দিয়েছিলেন। আমার বাবা মহম্মদ হাবিব আমাকে বলেছিলেন যে, ১৯৩০-এর দশকে তিনি একজন বিচারপতি সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। তাঁর নাম ছিল মিঃ সুলেইমান। সুলেইমান বলেছিলেন যে, তিনি ঘুমাতে পারছেন না। আমার বাবা তাকে প্রশ্ন করেন কেন তিনি ঘুমাতে পারছেন না। তিনি ছিলেন আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, বা আচার্য (আমার ঠিক মনে নেই) এবং হাই কোর্টের বিচারপতি, পরে সেই সময়কার ফেডারাল কোর্ট অফ দিল্লিতে তার পদোন্নতি হয়। তিনি বলেছিলেন, এই সবশুভবুদ্ধিসম্পন্ন কমিউনিস্টদেরজন্য রাতে তাঁর ঘুম হচ্ছে না। যখন বিচার চলছিল তখন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে যাদের বিচার চলছে তারা নিরপরাধ। এবং ব্রিটিশ আইনজীবীকে তিনি বলেন, উনি যা বলছেন তা পুরোপুরি আজগুবিএবং কমিউনিস্টরা যা করেছে বলে তিনি দাবি করছেন সেটা বাস্তবত সম্ভব নয়।

বিচারপতি সুলেইমান বলেছিলেন, তখন ব্রিটিশ প্রধান বিচারপতি তাঁকে বলেন, ‘মিঃ সুলেইমান আপনি কি জানেন যে ফেডারাল কোর্টের জন্য আপনার নাম বেছে নেওয়া  হয়েছে?’ পরে সেই পদে তাঁকে  নিয়োগ করা হয়েছিল। ব্রিটিশ প্রধান বিচারপতি তাঁকে বলেন, যদি কমিউনিস্টদের এই মামলা আপনি গড়বড় করে দেন, আপনার জানা উচিত সেক্ষেত্রে কী ঘটতে পারে?’ সুলেইমান বলেছিলেন, যদিও তিনি সাজা কিছুটা সংশোধন করেছিলেন, তবে সাজার পক্ষেই ছিলেন। কিন্তু তিনি বলতে চেয়েছিলেন যে, আইন এই ধরনের মামলাকে বৈধতা দেয় না। সুতরাং, তিনি বলেছিলেন, এর ফলে কমিউনিস্টদের আরও বেশি কয়েক বছর জেলে কাটাতে হয়েছিল। এসব কথা তিনি বলেছিলেন আমার বাবাকে। যখন আমার বাবা আগেকার মামলাগুলির স্মৃিতচারণ করতেন তখন সাধারণত তিনি আমাকে সেসব কথা বলতেন।  পরে আমি জানতে পারি বিষয়টা এভাবেই ঘটেছিল: সাজা কমানোর আবেদনে  সাড়া দিয়ে সাজায় সংশোধন করেছিলেন বিচারপতি সুলেইমান। তবে সাজা রদ করেননি। শুধু সাজার মেয়াদ কমিয়েছিলেন। এবং তার পরপরই দিল্লির ফেডারাল বিচারপতি হিসাবে তাঁকে নিয়োগ করা হয়েছিল। একই সঙ্গে তাঁকে করা হয়েছিল আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। 

ফলে জীবনে এমন যে সব ঘটনা ঘটে সেগুলোকে বিবেচনা করতে হবে। যখন কমিউনিস্টদের মামলা, বিশেষ করে তথাকথিত মীরাট ষড়যন্ত্র মামলা, বিচারকদের সামনে এসেছিল তখন ন্যায়বিচার নিশ্চিতভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ওরা হয়তো জরিমানা কমিয়েছিল, তবে জালিয়াতির স্বরূপ উন্মোচন করেনি। এবং আজকের দিনে যখনই আমরা কমিউনিস্ট আন্দোলনের অতীত নিয়ে ভাবি কিংবা বিষয়টিকে পর্যবেক্ষণ করি, তখন আমার মনে হয়, আমাদের পূর্বসূরীদের কথাও ভাবা উচিত যারা আমাদের জন্য নিপীড়সহ্য করেছিলেন গত শতকের ২০, ৩০ ৪০ এর দশকে। সেকারণেই আমি বিশেষভাবে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি বিশেষ করে কমিউনিস্ট নেতাদের তথাকথিত মীরাট বিচারের সম্পর্কে যে, বিচার অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯২০র দশকে।  

কমিউনিস্টদের কথা বলতে গেলে, কংগ্রেসের নেতারা তাঁদের সহ্য করতে পারতেন না। সহ্য করতে পারতেন না জওহরলাল নেহরু সহ অন্যান্য কয়েকজন কংগ্রেস নেতাকেও। কংগ্রেসের অভ্যন্তরে বারে বারে সোশালিস্টদের সঙ্গে সঙ্ঘাত বেধেছে। তখন কমিউনিস্টদের সোশালিস্টদের সঙ্গেই ধরা হত (তথাকথিত সোশালিস্টদের সঙ্গে পার্থক্য সামনে আসে আরও পরে) কখনও কখনও এমনটাও ঘটত যে, যখন জওহরলাল নেহরু তাঁর অনুগামীরা অবস্থান বদল করতেন, তখন এমনকী কংগ্রেস প্রতিনিধিদের মধ্যে বামেরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে যেতেন, এতে এমনকী আতঙ্কিত হয়ে পড়তেন মহাত্মা গান্ধী নিজে। এগুলি সবই ইতিহাসের অন্য আরেক দিকের কথা এবং এখন এবিষয়ে আমি যাচ্ছি না। 

তবে আমাদের কথা মনে রাখতে হবে যে, ১৯৩০-এর দশকে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের খুবই গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন কমিউনিস্টরা। এবং প্রায়ই তাঁরা সোশালিস্টদের সঙ্গে জোট বেঁধে চলতেন। ১৯৩০এর দশকের পর সামনে এসেছিল একটি সমস্যা, যার উৎসে ছিল কমিউনিস্টদের বিভাজন। আমি মনে করি এখন সময় এসেছে যখন এমনকী সেই নির্দিষ্ট পর্বটিও, মোটা দাগে ১৯৩০ থেকে ১৯৪৭-৪৮ পর্যন্ত, নিয়েও কমিউনিস্ট আন্দোলনের মধ্যে খোলাখুলি আলোচনা করতে হবে।

ভাষান্তর: সুচিক্কণ দাস
শেষাংশ আগামীকাল, শনিবার


প্রকাশের তারিখ: ২৬-সেপ্টেম্বর-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org