|
মনুবাদের লেন্সে যাদবপুরদীধিতি রায় |
|
গত কয়েকদিন ধরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে ঢুকে বিজেপি-র বহিরাগত দুষ্কৃতীরা কিভাবে তাণ্ডব চালিয়েছে তা আমরা দেখেছি। আমরা এও দেখলাম, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি কি সাবলীলভাবে সেই দুষ্কৃতীদের তাণ্ডব চালানোতে লাইসেন্স দিলেন। তাদের লক্ষ্য: যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় দখল। সেই লক্ষ্য পূরণের জন্য শিল্পাচার্য নন্দলাল বসুর সৃষ্টি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলককেও ভেঙে ফেলতে আরএসএস-এর দুইবার ভাবতে হয়নি। শুধু তাই নয়, এই তাণ্ডব, বিশৃঙ্খলতাকে বৈধতা দিতে বিজেপি ঘটিয়েছে আরও ন্যাক্কারজনক এক ঘটনা। যাদবপুর বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক মিছিলে হেঁটেছেন একটি পোস্টার ধরে, যেখানে লেখা— ‘বিকৃতকামা, বিকৃতমনা, বিকটদর্শন, বিপথগামীরা মেধাবীর ছদ্মবেশ ছাড়ো।’ পোস্টারের প্রতিটি শব্দই যাদবপুরের পড়ুয়াদের উদ্দেশ্য করে। এবং আরও নির্দিষ্টভাবে ছাত্রী ও প্রান্তিক লিঙ্গের ছাত্রদের লক্ষ্য করে বলা। এই শব্দগুলোর আভিধানিক অর্থ দেখলেই বোঝা যায় এর দ্বারা আসলে কোন দর্শনের প্রচার করা হচ্ছে। ‘বিকৃতকামা’ একটি স্ত্রীলিঙ্গ শব্দ। অর্থাৎ এটি কেবল নারীদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। যে নারীদের যৌনতা, যৌন আকাঙ্খা রুচিহীন বা স্বাভাবিক নয়, বা বিকৃত, বা অস্বাভাবিক যৌন কাম সম্পন্ন নারী। বিকৃতমনা শব্দটির অর্থ, স্বাভাবিকত্বের বাইরে গিয়ে অস্বাভাবিক এবং রুচিহীন চিন্তাভাবনা। বিকটদর্শন মানে, যে মানুষকে দেখতে বিশ্রী, বা কুৎসিত, বা বিকট। বিপথগামী শব্দের সরল অর্থ, যে ব্যক্তি সঠিক পথ বা নীতি ত্যাগ করে ভুল বা অসৎ পথে চলছে। অর্থাৎ, বিধায়ক শর্বরী মুখার্জির ব্যবহার করা এই শব্দগুলোর মাধ্যমে বাক্যটির মানে দাঁড়ায়: যে মেয়েদের যৌনতা বিকৃত, ভাবনা চিন্তা রুচিহীন, যাদের দেখতে অত্যন্ত কুৎসিত, যারা ভুল আদর্শে বিশ্বাসী— তারা পরে আছে মেধার মুখোশ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে উৎকর্ষকে বিজেপি উপেক্ষা করতে পারেনি এটা বোঝা গেল। কিন্তু এই শব্দগুলো বলার পেছনে কী কারণ? আর এই স্বাভাবিকত্ব বা বিকৃত তা ঠিক করার মাপকাঠিই বা কী? যৌনতা নিয়ে এমনিতে সমাজের খোলামেলা আলোচনাতে বেশ ছুতমার্গ থাকে, তার ওপর নারীর যৌনতা আরও যেন নিষিদ্ধ বিষয়! শর্বরী মুখার্জিদের মূল মাথা আরএসএস-এর প্রধান মোহন ভাগবত বর্তমানে এলজিবিটিকিউআইএ+ পরিচয়ের মানুষদের নিয়ে নরম অবস্থান নিতে বাধ্য হলেও, সঙ্ঘ বরাবর প্রান্তিক লিঙ্গ ও যৌনতাকে ‘অস্বাভাবিকত্ব’ বা ‘বিকৃতি’ বলেই মনে করে। অর্থাৎ স্বাভাবিকত্ব ও অস্বাভাবিকত্ব এর মাপকাঠি হল সঙ্ঘের নিজস্ব মূল্যায়ন। একজন মানুষের জন্মসূত্রে জৈবিক লিঙ্গগত পরিচিতি (বায়োলজিক্যাল সেক্স) যাই হোক না কেন, তিনি কোন সামাজিক লিঙ্গগত পরিচিতি (জেন্ডার)-কে গ্রহণ করবেন এবং কোন যৌনতার পরিচিতিকে গ্রহণ করবেন, সেটা একান্তই তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। সেটা রাষ্ট্র ঠিক করে দিতে পারে না, জনপ্রতিনিধিরাও পারেন না। এই দেশের সংবিধান ২১ নং ধারাতে একজন ব্যক্তির মর্যাদাকে রক্ষার প্রশ্নে সেই অধিকার নাগরিকদের দিয়েছে। একজন মানুষকে দেখতে কেমন তার ওপর ভিত্তি করে তাকে অবমাননা করা একটি নিম্নরুচির মানসিকতার পরিচয়। ‘বিকট দর্শন’ শব্দটি মহিলাদের ক্ষেত্রে কেবল বডি শেমিং নয়, বরং একজন মেয়ের সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধ থাকলে পিতৃতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামো সেই মেয়েটির শরীরের, চরিত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ চাপিয়ে তাকে দুর্বল করতে চায়। এই সমাজে ‘সৌন্দর্য’ আর ‘অসৌন্দর্যের’ ধারণা সামাজিক কাঠামোর দ্বারা নির্মিত। মার্কসীয় নন্দনতত্ত্বের দৃষ্টিতে সমাজের প্রভাবশালী শ্রেণি ও প্রতিষ্ঠানগুলি মানুষের চিন্তা, রুচি ও মূল্যবোধকে প্রভাবিত করে। ফলে একটি নির্দিষ্ট ধরনের শরীর, পোশাক, ত্বকের রং, মুখের গঠন বা জীবনযাপনকে ‘আদর্শ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। সৌন্দর্যের সংজ্ঞার পিছনে বাজার অর্থনীতির তীব্র প্রভাব আছে। অনেক সময় আমরা দেখি, প্রতিবন্ধী মানুষকে বোঝাতেও কুৎসিত, ভয়ঙ্কর, বিশ্রী বিশেষণগুলো ব্যবহার করা হয়। এগুলো আসলেই সামন্ততন্ত্রের অবশেষ হিসাবে কুসংস্কারযুক্ত সমাজের প্রতিফলন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে ফ্যাসিবাদ রাষ্ট্রের ওপর অর্থনৈতিক বোঝা হিসাবে দেখে। প্রতিবন্ধী মানুষকে নাৎসিদের হত্যার হিসেব দেখলেই এই কথা স্পষ্ট হয়। অর্থাৎ, বিকটদর্শন শব্দটির অভিঘাত কতখানি, এবং এর দ্বারা কাদের ওপর আক্রমণ চালাতে চায় আরএসএস— তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। মনুস্মৃতিতে মনু কী বলেছেন, তা থেকে আমরা ধারণা পাই, যৌনতা সম্পর্কে সঙ্ঘের অভিমতের। মনু লিখেছেন, সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষা করতে, নারীর যৌনতাকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নারীর শরীরের ওপর সর্বদা কর্তৃত্ব থাকবে একজন পুরুষের। মনুস্মৃতির ২.২১৩ ও ২.২১৪ শ্লোকে নারীর যৌনতা পুরুষকে বিপথে চালনা করার জন্য দায়ী বলা হয়েছে। ৯.২ ও ৯.৩ শ্লোকে নারীর স্বাধীনতার ওপর পুরুষের নিয়ন্ত্রণের বিধান দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ মনুসংহিতা, মেয়েদের যৌনতার স্বাভাবিকত্বকে সমাজের বিপদ হিসাবে উল্লেখ করেছে। আজ থেকে ২২০০ বছর আগে মনু যে অবমাননাকর মন্তব্য লিখে গিয়েছেন মেয়েদের সম্পর্কে, তার উত্তরসুরী হিসাবে শর্বরীও সঠিক পথেই আছেন। তাদের আদর্শ একজন মহিলার যৌনতাকে অস্বাভাবিক বা সরাসরি বিকৃত বলতেই শেখায়। মনুসংহিতায় শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, ‘অ-সুন্দর’ নারীর ধারণা সম্পর্কেও উল্লেখ আছে। যা সবই পিতৃতান্ত্রিক ধারণার ফসল ও আধিপত্যবাদী মানসিকতার পরিচয়। সহজ কথায়, রাজনৈতিক আদর্শ এর বিরোধিতা ঘটলে মেয়েদের বেলায় সেই বিরোধ কেবল রাজনীতির স্তরে আটকে থাকে না। রাষ্ট্র সেই বিরোধিতাকে মেয়েটির চরিত্র, মেয়েটির যৌনতা, মেয়েটির মর্যাদার ওপর আক্রমণ করে দমন করতে চায়। মনু এটাই শিখিয়েছেন আরএসএস-কে। উদারবাদী অর্থনীতি মেয়েদের ত্বকের রঙ, শারীরিক গঠন-সহ সব কিছুকে একটি নির্দিষ্ট মাপকাঠির মাধ্যমে পণ্য হিসাবে বাজারজাত করে মুনাফা করতে চায়। নয়া উদারবাদ মহিলার শরীরের নানা বৈশিষ্ট্যকে বাজারের চাহিদামতো সুন্দর বা অসুন্দর বলে ব্যাখ্যা করে। খুব সহজ উদাহরণ, যে গায়ের লোম স্তন্যপায়ীকে বাকি প্রাণীদের থেকে আলাদা করে জীবজগতে গর্ব অর্জন করালো, মেয়েদের বেলায় সেই গায়ের লোমকেই পুঁজিবাদ ‘হেরিডিটি অফ শেম’ বলে দাগিয়ে দিল। বাজার পেল হেয়ার রিমুভাল ক্রিম। আর মহিলারা নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী প্রসাধন করতে পারল না, সমাজের নিয়ম মেনে চলতে হল সুন্দর হওয়ার তাগিদে। একইসঙ্গে সামাজিক কাঠামোর নামে, শৃঙ্খলা-মূল্যবোধ-সংস্কৃতির নামে আরএসএস-বিজেপি মেয়েদের যৌনতা, তার সৌন্দর্য, তার শরীরের ওপর অধিকারকে নিয়ন্ত্রিত করে তার পায়ে শিকল পরিয়ে রাখতে চায়। বহুকাল আগে মেয়েরা যখন নিজমুখে তাদের লড়াইয়ের কথা, বঞ্চনার কথা লেখা শুরু করলো, তখন রাষ্ট্রের মুখপাত্ররা বলেছে, মেয়েরা সব নিয়ে লিখুক, শুধু রাজনীতি, দর্শন আর ধর্ম বাদে। মেয়েরা পালটা প্রশ্ন করেছে, তাহলে বাকি কি থাকল! এটাই সারকথা। একজন মেয়ের রাজনীতি করা আরএসএস-এর অপছন্দ। মেয়েরা ঘর সামলাবে, সংসারের বাকি পুরুষদের সেবা করবে, বংশবৃদ্ধি করবে— এটাই মেয়েদের কাজ! সে রাজনীতি করবে, তা-ও আবার বাম রাজনীতি, নিজের অধিকারের জন্য লড়াই করবে সেটা আরএসএস মানতে পারে না। তাই মেয়েদেরকে কটূক্তি করতে হবে। তার গায়ের রঙ, তাকে দেখতে কেমন, তার যৌনতা সম্পর্কে মন্তব্য করতে হবে। যিনি করছেন তিনি যতই মহিলা হোন না কেন, এটাই তার রাজনীতি। এই দেশের যে সংবিধানকে আরএসএস অস্বীকার করতে চায়, সেই সংবিধান নাগরিকদের অধিকার দিয়েছে ব্যক্তি স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষার। একজন জনপ্রতিনিধির এই ধরণের আচরণ বা মন্তব্য সেই সংবিধানের ধারণার পরিপন্থী। নারীর শালীনতা বা মর্যাদাকে অপমান করার উদ্দেশ্যে করা অবমাননাকর মন্তব্য, আপত্তিকর শব্দ বা অঙ্গভঙ্গি ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৭৯ ধারা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। মহিলাদের সম্পর্কে বিদ্বেষমূলক মন্তব্য, যার মাধ্যমে ঘৃণার উদ্রেক করা হচ্ছে তাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বিধায়ক হিসাবে শর্বরী এই অপরাধগুলো করেছেন। যদিও রাষ্ট্রের নারীবিদ্বেষী মনোভাব এই ঘটনাকে গুরুত্ব দেয়নি। এবং দেবেও না। বিজেপি-আরএসএস তার মতামতের ভিন্নতাকে অস্বাভাবিকত্ব বা বিকৃত বলে মনে করে। অপরত্বের নির্মাণ করে তার মাধ্যমেই। তাই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় যার জন্ম স্বাধীনতার আন্দোলন থেকে, যে বিশ্ববিদ্যালয় এই রাজ্যের অন্যতম উৎকর্ষের কেন্দ্র, সেই প্রতিষ্ঠানের ছাত্রীদের আচরণ আর আর মনুবাদের মহিলাদের সম্পর্কে মূল্যায়নের সঙ্গে এক নয়। তাই সঙ্ঘের লেন্সে যাদবপুরের মেয়েরা অস্বাভাবিক, বিকৃত। আসলে কেবল যাদবপুর নয়, এই দেশের সকল মেয়ে, যারা আধিপত্যবাদের সামনে মাথা নত না করে প্রতিরোধ করছে, তারা সবাই সঙ্ঘের কাছে চরিত্রহীন, বিকৃত! এই লড়াই তাই কেবল দু’টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে নয়। তার চেয়েও অনেক বড় লড়াই। এটা মতাদর্শের লড়াই। দেশ বিভিন্নতাকে ‘বৈচিত্র’ হিসাবে গ্রহণ করবে, নাকি ‘অস্বাভাবিকত্ব’ বলে বর্জন করবে— তার লড়াই। এই লড়াই নারী-বিদ্বেষী রাষ্ট্র হবে, নাকি লিঙ্গ-সংবেদনশীল সমাজ গঠন হবে— তার লড়াই। এই সময় একজন মহিলা হিসাবে, একজন সংবেদনশীল মানুষ হিসাবে বিজেপি-কে ঘৃণা করা ছাড়া এবং তার বিরূদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা ছাড়া আর কোনও রাস্তা নেই। প্রকাশের তারিখ: ১০-সেপ্টেম্বর-২০২৬ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |