জনগণনার সাথে কেন জাতগণনাও চাই? 

দেবেশ দাস
এখন জনগণনায় যে-সমস্ত তথ্য নেওয়া হয়, তার মধ্যে আছে শিক্ষাগত অবস্থান, ধর্ম, ভাষা, বিবাহিত কিনা, বিবাহিত হলে কয়টি সন্তান, শারীরিক পঙ্গুত্ব আছে কিনা, পেশা, পরিযায়ী কিনা, পরিযায়ী হলে পরিযায়ী হওয়ার কারণ কী (চাকরি, ব্যবসা, ইত্যাদি) (লোকসভা প্রশ্নোত্তর, UNSTARRED প্রশ্ন ১৩১৫, ২৭শে জুলাই, ২০২১)। বাসস্থানের তথ্য (কয় কামরার ঘর, দেওয়াল বা ছাদ পাকা নাকাঁচা, মেঝে মাটির না পাকা), বাড়িতে টেলিভিশন/কম্পিউটার/মোটর সাইকেল/গাড়ি ইত্যাদি আছে কিনা, শৌচাগার আছে কিনা, বিদ্যুৎ আছে কিনা, জল আনতে দূরে যেতে হয় কিনা,  মোবাইল আছে কিনা, ইত্যাদি তথ্য নেওয়া হয়।

বিহারে জাতগণনার রিপোর্ট বেরিয়েছে। তাই নিয়ে এখন হইচই। ২০১১ সালে দেশে জাতগণনা হয়েছিল। সরকার সেই রিপোর্ট চেপে রেখে দিয়েছে। কেনই বা তা প্রকাশ করা হচ্ছে না? জাতগণনা কী? জনগণনার সাথে এর তফাৎ কী? 

চান বা না-চান, জাত আছে

জাত-ব্যবস্থা ভারতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য, যা সারা পৃথিবীতে আর কোথাও নেই। ঐতিহাসিক ইরফান হাবিব এই জাত-ব্যবস্থা সম্বন্ধে বলেছেন- "বিভিন্ন মাত্রায় জাতবিন্যাস যেখানেই সেটাই ভারত। ...কেউ বলতে পারেন এটাই ভারতীয়ত্ব" (সাক্ষাৎকার-ইরফান হাবিব, মার্কসবাদী পথ, আগষ্ট, ২০০৪)। 

 

জাতব্যবস্থার উৎস

ভারতে এই জাত-ব্যবস্থার কারণ ঐতিহাসিক। আমাদের দেশের জাত-ব্যবস্থার উৎসের ইঙ্গিত রয়েছে ঋগ্বেদ-এ। যা রচিত হয় আজ থেকে প্রায় ৩৫০০ বছর আগে খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ থেকে খ্রিষ্টপূর্ব ১০০০ সময়ে ঋগ্বেদ-এ মানুষকে চারবর্ণে (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র) ভাগ হয়, প্রতিটি বর্ণের আলাদা আলাদা পেশা ঠিক করে দেওয়া হয়। (ঋগ্বেদ, মন্ডল ১০, সুক্ত ৯০, ধারা ১২)। এই সমস্ত বর্ণের মিশ্রণে ও পুনঃমিশ্রণে সৃষ্টি হয় বিভিন্ন জাতের আর পরে প্রতিটি জাতের পেশা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। আনথ্রোপোলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া ১৯৯০ সালে একটি তথ্য প্রকাশ করে বলে যে, দেশে অন্তত ৪৬৩৫টি বিভিন্ন জাত আছে, যারা সাংস্কৃতিক ও জীবনযাত্রায় স্পষ্টতই একে অপরের সাথে পৃথক (https://ansi.gov.in/people-of-india/)।  

মনুস্মৃতি (দ্বিতীয় শতাব্দী) ধর্মগ্রন্থের সময়কালে আরও কঠোরভাবে বিভিন্ন জাতের পেশাকে নির্দিষ্ট করা হয় ঈশ্বরের নামে। প্রতিটি জাতের সামজিক অবস্থানও কঠোরভাবে নির্দিষ্ট করা হয়— কেউ উঁচু জাত, কেউ নিচু জাত। যত নিচু জাত, তত তার সামাজিক অধিকার কম, সম্পদ কম। যেখানে বিভিন্ন বর্ণের মিশ্রণে ও পুনঃমিশ্রণে বিভিন্ন জাতের তৈরি হয়েছিল, মনুস্মৃতি সেই মিশ্রণ বন্ধ করে দেয়। মনুস্মৃতির মূল অবদান— ‘বর্ণসঙ্কর সর্বনাশের মূল’ (মনুস্মৃতি, অধ্যায় ৮, শ্লোক ৩৫৩), মানে বাধ্যতামূলকভাবে এক জাতে বিবাহ প্রথা বা অন্তর্বিবাহ (endogamy) চালু, ভিন্ন জাতে বিবাহ চলবে না। ফলে জাতে জাতে মিশ্রণ ঘটল না। জাতগুলি থেকেই গেল। 

 

মনুস্মৃতি-র নিদান আজও চলছে

মনুস্মৃতি-র সেই নীতি আজও আমাদের সমাজে সত্যি। সারণি-১ দেখুন, কোনো একদিনের আনন্দবাজার পত্রিকায় হিন্দু ধর্মাবলম্বী পাত্র-পাত্রীর বিজ্ঞাপনে পাত্র ও পাত্রীদের ৪ জন বাদে সকলেই নিজের জাতের কথা উল্লেখ করেছেন। এই ৪ জনকে ধরতে পারি যে তাদের অসবর্ণ বিবাহে আপত্তি নেই, বাকিদের মধ্যে সরাসরি ‘অসবর্ণ চলিবে’ কথাটা লিখেছেন মাত্র ১৯ শতাংশ। জাতে জাতে মিশ্রণ না-হলে, ভিন্ন ভিন্ন জাত তো থেকেই যাবে। 

সারণি-১: একটি রবিবারে আনন্দবাজারে পাত্র পাত্রী বিজ্ঞাপন 
(আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৯ মে, ২০২২)


আপনি চান বা না-চান জাত আছে। মানুষের মনের মধ্যে আছে, সামাজিক কাজেও তার ছাপ রয়েছে। সেই সমস্ত ভিন্ন ভিন্ন জাতে কত লোক আছে? কেমন তাদের অবস্থা? আপনি জানতে চান বা না-চান, শেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, জাত ভিত্তিতে সামাজিক ও শিক্ষাগত, এমনকি অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়ার ঘটনা ঘটছে, আর তা প্রকাশ হয়ে পড়ছে নানা সমীক্ষায়।   

পিছিয়ে পড়া জাত

মনুস্মৃতি বলেছে, যতই জাত হোক, তারা চারটি বর্ণের মধ্যে পড়বে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কোন জাত উঁচু, কোন জাত নিচু? মনুস্মৃতি-তে এর ব্যাখ্যা আছে। উঁচু বর্ণের পুরুষের সাথে নিম্নবর্ণের মহিলার মিশ্রণে যে-জাত তৈরি হয়েছে তার বর্ণ ধরা হবে পিতার উচ্চবর্ণ, কিন্তু জাতের সামাজিক অবস্থান হবে উচ্চবর্ণ পিতার নিচে, নিম্নবর্ণের মায়ের উপরে (মনুস্মৃতি, অধ্যায় ১০, শ্লোক ১০, ১৪, ২৭)। আবার নিম্নবর্ণের পুরুষের সাথে উচ্চবর্ণের মহিলার মিশ্রণে যে-জাত তৈরি হয়েছে, তার বর্ণ ধরা হবে পিতার নিচু-বর্ণ, কিন্তু তার জাতের সামাজিক অবস্থান হবে নিম্নবর্ণ পিতারও নিচে (মনুস্মৃতি, অধ্যায় ১০, শ্লোক ২৭)।  

মনুস্মৃতি অনুযায়ী নিম্নবর্ণ পুরুষের সাথে উচ্চবর্ণ মহিলার মিশ্রণ অন্যায়। সেই অন্যায় ঘোরতর পাপ হয়ে যায় যখন শূদ্র বর্ণের পুরুষের সাথে উচ্চবর্ণ মহিলার মিশ্রণ ঘটে। যেমন শূদ্র পুরুষের সাথে ব্রাহ্মণ মহিলার মিশ্রণে তৈরি সন্তানের জাত হচ্ছে চণ্ডাল (মনুস্মৃতি, অধ্যায় ১০, শ্লোক ১২, ১৬), চণ্ডাল হচ্ছে নিম্নতম জাত, চণ্ডাল এতটাই খারাপ যে তার স্পর্শ পাপ, কখনো কখনো দর্শনও পাপ।     

ফলে শূদ্র বর্ণের পুরুষের সাথে উচ্চবর্ণ কোনো মহিলার মিশ্রণে যে-সন্তান হয়েছে, তার বর্ণ শূদ্র, কিন্তু তার জাতের সামজিক অবস্থান শূদ্রেরও নিচে। এরা অস্পৃশ্য। এদেরকে আজ দলিত বলে। সরকারিভাবে এরা তপশিলি জাতিভুক্ত (scheduled caste)। ঐতিহাসিক রোমিলা থাপার লিখেছেন সমাজে শূদ্রদের নিচে আরেকদল মানুষ ছিল যারা হচ্ছে পতিত, যারা ঘৃণিত বা হীনজাতি, তারা থাকত শহরের বাইরে, সমাজের নোংরা কাজগুলি করত, বাকি সমাজের থেকে তারা ছিল সামাজিকভাবে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন (Romila Thapar, ‘Chapter III (Society and Economic Activity)’, Asoka and the Decline of the Maury’s, Oxford University Press, 1997)।  

মনুস্মৃতি অনুযায়ী সব শূদ্রের পেশা হচ্ছে, উচ্চ তিন বর্ণের সেবা করা। কিন্তু তাদের মধ্যে যারা নিচের দিকে, অর্থাৎ দলিত, তাদের সরাসরি সেবা করার অধিকার ছিল না, উচ্চবর্ণর বাড়িতে তারা চাকর হতে পারত না, তাদের অবস্থান বাড়ির বাইরে। তারা মুচি, ডোম ইত্যাদি। যাদের সরাসরি সেবা করার অধিকার ছিল, তারাও পশ্চাৎপদ, কিন্তু দলিতদের থেকে তারা এগিয়ে, তারা অস্পৃশ্য ছিল না। এই অংশকে আজ অন্যান্য অনগ্রসর জাতি (Other Backward Castes) বা ওবিসি বলা হয়।    

আদিবাসীদের বিষয়টা আলাদা। পৃথিবীর বহু দেশেই আদিবাসীদের দেখতে পাওয়া যায় ও তাদের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য বিশ্ব জুড়ে দেখতে পাওয়া যায়। প্রথমত, তাদের বাস ছিল বনে-জঙ্গলে-পাহাড়ে, আধুনিক নগর সভ্যতা থেকে দূরে, আজও এদের বেশিরভাগই তাই। দ্বিতীয়ত তাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এরা স্বেচ্ছায় নিজ জনজাতির মধ্যেই বৈবাহিক সম্পর্ক করে, এদের সাথে অন্যদের মিশ্রণ ঘটে না। ভারতে অন্যদের ক্ষেত্রে মিশ্রণ নিষিদ্ধ করেছে মনুস্মৃতি, কিন্তু আদিবাসীরা স্বেচ্ছায় মিশ্রণ বন্ধ করেছে। এই আদিবাসীদের আমাদের দেশে সরকারিভাবে তপশিলি জনজাতি (scheduled tribes) বলা হয়। এরা আদি অবস্থায় সনাতন বা হিন্দু ধর্মে ছিল না, এখনো অনেকেই হিন্দু ধর্মে নেই, এদের আলাদা সংস্কৃতি যা আজও হিন্দু ধর্মের সংস্কৃতি থেকে আলাদা। 

দেশে দেশেই আদিবাসীরা পিছিয়ে, তাদের সম্পদ কম, আধুনিক শিক্ষায় পিছিয়ে, আমাদের দেশেও তাই। কিন্তু আমাদের দেশে অন্য আরও জনগোষ্ঠী পিছিয়ে। মনুস্মৃতি-র আমলে শূদ্রদের সম্পদ রাখার অধিকার ছিল না, শিক্ষালাভের অধিকার ছিল না। সেই পরম্পরায় আজও শূদ্ররা ‘সামাজিক ও শিক্ষাগত’ দিক দিয়ে পিছিয়ে। শূদ্রদের মধ্যে দলিতদের অবস্থান তো একেবারে নিচে, তাদের অবস্থা আরও খারাপ। 

দলিতরা যেহেতু ঘৃণার বস্তু ছিল, তারা শুধু সম্পদ ও শিক্ষা থেকেই বঞ্চিত ছিল না, তাদের উপর সামাজিক নিপীড়ণ-ও চলত (ধর্ষণ, খুন, অস্পৃশ্যতা), যা আদিবাসীদের উপরও কিছুটা বিস্তৃত হয়। সেই নিপীড়ণ যে আজও চলছে তাই নয়, পরিসংখ্যান বলছে সেই নিপীড়ণ বাড়ছে। ওবিসিরা ‘সামাজিক ও শিক্ষাগত’ দিক দিয়ে পিছিয়ে, তবে এদের উপর দলিত-আদিবাসীদের মতো সামাজিক নিপীড়ণ নেই । 


পিছিয়ে পড়া জাতগুলির জনসংখ্যা
 

আমাদের দেশে জনগণনা করে স্বরাষ্ট্র দফতরের অধীন Registrar General and Census Commissioner of India। সেই জনগণনায় তপশিলি জাতি ও তপশিলি জনজাতির গণনা হয়। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী এদের শতাংশ যথাক্রমে ১৬.৬ ও ৮.৬। সংবিধানে ১৯৫১ সালে সংশোধনীর মাধ্যমে তপশিলি জাতি ও তপশিলি জনজাতিদের  জন্য বিশেষ সুযোগ সৃষ্টি করার কথা বলা হয়েছিল, তাছাড়াও অন্যান্য সামাজিক ও শিক্ষাক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া অংশের জন্যও এই সুযোগ সৃষ্টি করার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু তপশিলি জাতি ও তপশিলি জনজাতি বাদ দিয়ে সামাজিক ও শিক্ষাগতভাবে পিছিয়ে পড়া জাত কোনগুলো? মণ্ডল কমিশন ঠিক করেছিল ‘সামাজিক ও শিক্ষায় অনগ্রসর গোষ্ঠীসমূহ’ কারা। মণ্ডল কমিশন বলেছিল যে এই অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণিরা (ওবিসি) জনসংখ্যার ৫২ শতাংশ। কিসের ভিত্তিতে এই ৫২ শতাংশ বলা হয়েছিল? তা হচ্ছে ১৯৩১ সালে যে সমস্ত জাতেরা সামাজিক ও শিক্ষা ক্ষেত্রে পিছিয়ে ছিল, তাদের শতাংশ ছিল ৫২ শতাংশ। 

কিন্তু ১৯৩১ সালের ৫২ শতাংশ কি ২০২৩ সালেও ৫২ শতাংশ আছে? সেটা কমতে পারে, বাড়তে পারে। আবার এমন তো হতেই পারে যে ১৯৩১ সালে কোনো জাত সামাজিক ও শিক্ষাগতভাবে পশ্চাৎপদ ছিল, আজ সে এগিয়ে গেছে। বা এর উল্টোটাও হতে পারে, কোনো জাত সেই সময় এগিয়েছিল, আজ পিছিয়ে গেছে। এটা কীভাবে জানা যাবে? জনগণনার সাথে জাতগণনা না-হলে তা সঠিকভাবে জানা সম্ভব নয়। 

 

জনগণনা, জাতগণনা

পরাধীন ভারতে জনগণনার সাথে জাতগণনাও শুরু হয়েছিল। জনগণনায় জনসংখ্যা সংক্রান্ত নানা তথ্য (অর্থনৈতিক, সামাজিক, শিক্ষাগত, ইত্যাদি) যখন নেওয়া হত, তখন প্রতিটি মানুষকে জিজ্ঞাসা করা হত তার জাত কী? ফলে কোন জাতের মানুষ অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে পিছিয়ে আছে তা বোঝা যেত।  

এখন জনগণনায় যে-সমস্ত তথ্য নেওয়া হয়, তার মধ্যে আছে শিক্ষাগত অবস্থান, ধর্ম, ভাষা, বিবাহিত কিনা, বিবাহিত হলে কয়টি সন্তান, শারীরিক পঙ্গুত্ব আছে কিনা, পেশা, পরিযায়ী কিনা, পরিযায়ী হলে পরিযায়ী হওয়ার কারণ কী (চাকরি, ব্যবসা, ইত্যাদি) (লোকসভা প্রশ্নোত্তর, UNSTARRED প্রশ্ন ১৩১৫, ২৭শে জুলাই, ২০২১)। বাসস্থানের তথ্য (কয় কামরার ঘর, দেওয়াল বা ছাদ পাকা না কাঁচা, মেঝে মাটির না পাকা), বাড়িতে টেলিভিশন/কম্পিউটার/মোটর সাইকেল/গাড়ি ইত্যাদি আছে কিনা, শৌচাগার আছে কিনা, বিদ্যুৎ আছে কিনা, জল আনতে দূরে যেতে হয় কিনা,  মোবাইল আছে কিনা, ইত্যাদি তথ্য নেওয়া হয়। 

এর সাথে এখন জনগণনায় জিজ্ঞাসা করা হয় তপশিলি জাতি বা তপশিলি জনজাতি কিনা। তাতে বোঝা যায় যে এই অংশের মানুষরা পিছিয়ে আছে কিনা। যেমন ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী তপশিলি জাতি ও তপশিলি জনজাতি দেশের জনসংখ্যার যথাক্রমে ১৬.৬ ও ৮.৬ শতাংশ, কিন্ত মোট স্নাতকের মধ্যে তারা যথাক্রমে ৮.১ ও ২.৬ শতাংশ, মানে শিক্ষায় তারা পিছিয়ে। আবার তপশিলি জাতি ও তপশিলি জনজাতিদের মধ্যে দু-কামরার বেশি ঘর আছে যথাক্রমে ১৮ ও ১৯ শতাংশ পরিবারে, অন্যান্যদের ক্ষেত্রে সেটা ৩৩ শতাংশ। এরকম আরও ভুরিভুরি তথ্য পাওয়া যায় জনগণনার রিপোর্টে, যেখানে দেখা যায় যে প্রতিটি ক্ষেত্রেই তপশিলি জাতি ও তপশিলি জনজাতিরা পিছিয়ে আছে।   যদি কেউ তপশিলি জাতি বা তপশিলি জনজাতি হন তবে তিনি কোন জাত বা জনগোষ্ঠী তাও জিজ্ঞাসা করা হয়। তাতে তপশিলি জাতির মধ্যে যেমন বিভিন্ন জাত আছে বা তপশিলি জনজাতির মধ্যে যে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী আছে, তাদের মধ্যে কোন জাত বা জনগোষ্ঠী এগিয়ে আছে তা বোঝা যায়। ১৯৫০ সালের সরকারি গেজেটে এরকম ৬৩০টি জাতকে তপশিলি জাতিভুক্ত ও ২৪৫টি জনগোষ্ঠীকে তপশিলি জনজাতি ভুক্ত করা হয়। তারপরে এই সংখ্যা আরও বেড়েছে। 

কিন্তু এদের বাইরেও তো জাত আছে। প্রতিবারই জনগণনার সময় এরকম কথা ওঠে যে তপশিলি জাতি ও তপশিলি জনজাতির বাইরে অন্যান্য জাতদের তথ্যও জাতগণনার সাথে নেওয়া হোক। বিশেষত যারা ওবিসি-ভুক্ত তাদের সম্বন্ধেই এই কথা ওঠে। 

 

জাতের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষাগত পার্থক্য 

নানা সরকারি সমীক্ষায় মাঝে মাঝেই এটা বেরিয়ে পড়ে যে ওবিসিদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষাগত অবস্থা খুব ভালো নয়। সরকারি সমীক্ষার উপর ভিত্তি করে এক গবেষক ২০১৮ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে সমাজের বিভিন্ন অংশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে আলোচনা করেছেন (Nitin Kumar Bharti, Wealth Inequality, Class and Caste in India, 1961-2012, World Inequality Lab, Paris School of Economics, November, 2018)। এই গবেষণাপত্রটিতে সম্পদের বিচারে পাঁচটি শ্রেণি বিভাগ করা হয়েছে— দরিদ্রতম, দরিদ্রতর, মাঝারি, ধনীতর ও ধনীতম। সম্পদের বিচারে এই পাঁচটি ভাগে সমাজের বিভিন্ন সম্প্রদায় কত শতাংশ আছে তা গবেষণাপত্রটিতে দেখানো হয়েছে। তার মধ্যে দরিদ্রতম ও ধনীতম অংশটি সারণি-২-তে দেখানো হল।

সারণি-২: সম্পদের বিভিন্ন সূচকে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের শতাংশ 



গবেষক অবশ্য তাঁর গবেষণাপত্রে এই সারণি বাদেও আরও অনেক তথ্য পেশ করেছেন, যাতে বোঝা যাচ্ছে যে তপশিলি জাতি, তপশিলি জনজাতি, ওবিসিরা অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে। যদিও সরকারি সমীক্ষার উপর ভিত্তি করেই এই সমস্ত তথ্য পেশ করা হয়েছে, তবুও সেই সমীক্ষা কতটা বিশ্বাসযোগ্য? তপশিলি জাতি বা জনজাতিদের ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই করার একটা রাস্তা আছে— তা হচ্ছে জনগণনার রিপোর্ট নেওয়া, যে জনগণনায় মুষ্টিমেয় লোকের উপর সমীক্ষা করা হয় না, সকলের তথ্য নেওয়া হয়। কিন্তু ওবিসিদের ক্ষেত্রে সে সুযোগ নেই। সেই সুযোগ জনগণনায় এলে ক্ষতি কী? তাছাড়া উপরের সারণিতে সামগ্রিকভাবে ওবিসিদের কথা বলা হচ্ছে। তার মধ্যে বিভিন্ন জাতের তথ্য সেখানে নেই। সেই তথ্য যদি পাওয়া যায়, তাহলে যদি দেখা যায় যে কোনো জাত সামাজিক ও শিক্ষাগতভাবে অনেক এগিয়ে গেছে, তবে সেই জাতের লোকেদের ওবিসির সুযোগ-সুবিধা থেকে বাদ দেওয়া যেতে পারে। আবার যদি এটা দেখা যায় যে এখন যারা ওবিসি তালিকাভুক্ত নন, এরকম কোনো জাত আসলে সামাজিক ও শিক্ষাগত দিক থেকে পিছিয়ে গেছে, তাহলে, তাদের ওবিসি তালিকাভুক্ত করা যেতে পারে। জাত-গণনা করে সেক্ষেত্রে লাভই হবে। 

জাতগণনা হয়েছিল ২০১১ সালে

জাত-গণনার দাবি প্রতিবারই জনগণনার সময় উঠলে ২০১১ সালে ইউপিএ সরকার জাতগণনা করে।    জনগণনার সাথে এই জাতগণনা হয়নি, আলাদা করে সেই কাজ করেছিল গ্রামীন বিকাশ দফতর এবং হাউসিং ও শহুরে দারিদ্র্য দূরীকরণ দফতর। একে বলা হয় সামাজিক অর্থনৈতিক জাতগণনা (Socio Economic and Caste Census -SECC)। এই জাতগণনায় খরচ ধার্য হয়েছিল সেই সময়ে প্রায় ৪৮৯৪ কোটি টাকা। এত টাকা খরচ করে যে-রিপোর্ট তৈরি করা হল, আজ বারো বছর হয়ে গেল, সে-রিপোর্ট প্রকাশ করা হল না। দ্বিতীয় ইউপিএ সরকার ২০১১ সাল থেকে ২০১৪ সাল এই তিন বছর সময় পেয়েও এই রিপোর্ট বার করেনি, কিন্তু বর্তমানে কংগ্রেস দল থেকে এই রিপোর্ট প্রকাশ করার দাবি জানানো হয়েছে। তারপরে বিজেপি সরকার গত নয় বছরে এই রিপোর্ট বার করেনি। কেন রিপোর্ট বেরোচ্ছে না? এই রিপোর্টের দাবিতে খুব হইচই হলে সরকার আংশিক রিপোর্ট বার করে ২০১৬ সালে, কিন্তু সেখানে আসল তথ্যই নেই, তা হচ্ছে জাতের তথ্য।  

 

সরকার জাতগণনার রিপোর্ট কেন প্রকাশ করছে না?

গ্রামীন বিকাশের সংসদীয় কমিটি ২০১৬ সালের ৩১শে আগষ্ট লোকসভার অধ্যক্ষের কাছে এক রিপোর্টে জানিয়েছে যে ২০১১ সালের জাতগণনার যে-তথ্য আছে তা পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে ৯৮.৮৭ শতাংশ মানুষের তথ্য নির্ভুল, বাকি ১.১৩ শতাংশ মানুষের তথ্য ঠিক করার কথাও তারা বলে। কিন্তু আজ পর্যন্ত সেই তথ্য ঠিক করা হল না। সমস্ত তথ্য দেওয়া হয়েছে সামাজিক ন্যায় ও ক্ষমতায়নের দফতরে (Ministry of Social Justice and Empowerment)। সেই দফতর আর কিছু করেনি। সরকার এই রিপোর্ট প্রকাশ করলে দেশের বিভিন্ন জাতের মানুষ কী অবস্থায় আছে সেটা প্রকাশ হয়ে যাবে। স্পষ্টতই সরকার তা প্রকাশ করতে চাইছে না। কেন? তাতে কি দেখা যাবে যে যাদের অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি বলা হয়, তাদের অবস্থা যে বিভিন্ন সমীক্ষায় প্রকাশ হয়েছে, বাস্তবে অবস্থা তার চেয়েও খারাপ। যা হয়তো সরকারের অস্বস্তির কারণ হতে পারে। ২০১৮ সালের ৩১ আগষ্ট আসন্ন ২০২১ সালের জনগণনার প্রস্তুতি বিষয়ে সরকারি স্তরে একটি সভা হয় তদানীন্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং-এর সভাপতিত্বে। এই সভার পর সরকারের পক্ষ থেকে একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়— ‘ওবিসি সম্বন্ধে তথ্য সংগ্রহ করার পরিকল্পনা হয়েছে’। এই প্রেস বিজ্ঞপ্তিটি এই ওয়েবসাইটে পাবেন—  https://pib.gov.in/PressReleasePage.aspx?PRID=1544651। আসলে ২০১১ সালের জাতগণনার রিপোর্টকে কি চাপা দিতেই ২০১৮ সালে সরকার প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলেছিল যে সরকার জনগণনাতে ওবিসিদের গণনাও করবে?

রিপোর্ট প্রকাশ না-করে সরকারের আরেকটা লাভ আছে। রিপোর্টের তথ্য সরকারের কাছে আছে। সেই রিপোর্ট দেখে সরকার জানে, কোন জাত এগিয়ে, কোন জাত পিছিয়ে। তার ভিত্তিতে সরকার গোপনে গোপনে প্রস্তুতি নিতে পারে। সরকার জানে, কোন জাতের কী অভাব, সেই অনুযায়ী তার নিজস্ব রাজনৈতিক দল বা সংগঠনকে পরিচালনা করতে পারে সেই জাতের লোকদের সংগঠিত করতে, এমনকি দরকারে এক জাতের বিরুদ্ধে আরেক জাতকে লড়িয়ে দিতেও পারে।   

 

সরকার জাতগণনা চায় না 

২০১৮-এর যে-প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সরকার বলেছিল যে সরকার ওবিসি জনগণনা করবে, তারপর থেকে সরকার একেবারে চুপ হয়ে যায়। যে-সভার উপর ভিত্তি করে এই প্রেস বিজ্ঞপ্তি হয়েছিল, সেই সভার মিনিটস আর পাওয়া যায় না। ২০২১ সালের ১০ মার্চ রাজ্যসভায় এক প্রশ্নোত্তরে মন্ত্রী জানান যে স্বাধীনতার পর সরকারের এটা নীতি যে তপশিলি জাতি ও তপশিলি জনজাতি বাদে আর কারও ক্ষেত্রে জাতভিত্তিক গণনা হবে না (রাজ্যসভা প্রশ্নোত্তর, UNSTARRED প্রশ্ন ১৮১৩, ১০ মার্চ, ২০২১)। একেবারেই অসত্য কথা। স্বাধীনতার পর সরকারের এই নীতি ঠিক হলে ২০১১ সালে জাতগণনা কেন করানো হল সরকারের দুটি দফতর দিয়ে? 

সরকার জাতগণনা চায় না বা তার রিপোর্ট বের করতে চায় না, কারণ কোন জাত এগিয়ে বা কোন জাত পিছিয়ে তা সরকার জনগণকে জানাতে চায় না। পিছিয়ে পড়া কোনো জাতের কথা জানালে, তার সম্বন্ধে সরকারের কিছু করার দায় থেকে যায়, সরকার সে-দায় নিতে চায় না। দ্বিতীয়ত, সরকার দেখবে কোন জাতের প্রভাব বেশি, কোন জাতকে তুললে তার রাজনৈতিক সুবিধা, বেশি ভোট পাওয়া যাবে, অতএব সেই জাতকেই নিজেদের বানানো কমিটি দিয়ে সমীক্ষা করিয়ে তাকে ওবিসি ঘোষণা করা হবে। আমাদের রাজ্যে মমতা ব্যানার্জিও তাই, কিসের ভিত্তিতে কোন কোন জাতকে ওবিসি করা হচ্ছে, তার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

 

জাতগণনা করতেই হবে

আপনি চান বা না-চান, জাত আছে। জাতের ভিত্তিতে বৈষম্যও আছে। আচ্ছা, ধরুন, তর্কের খাতিরে ধরেই নিলাম বৈষম্য নেই, সেই তথ্যটাই জাতগণনা করে জানানো হোক না? সত্যকে জানতে ভয় কোথায়?     

 

জাতগণনা দূরের কথা, জনগণনাই বন্ধ

সারা পৃথিবীতেই দেশে দেশে ২০২১ সালে জনগণনা শুরু হয়েছে, আমাদের দেশ বাদে। ২০২১ সালে সরকার বলেছে যে কোভিডের কারণে অনির্দিষ্টকালের জন্য জনগণনা বন্ধ। সেই থেকে ২০২১ সালের জনগণনা বন্ধ হয়ে আছে। শুধু জাতগণনা নয়, জনগণনাতেও যে সমস্ত তথ্য উঠে আসে তার মুখোমুখি হতেও কি সরকার ভয় পাচ্ছে?  


প্রকাশের তারিখ: ১৪-অক্টোবর-২০২৩

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org