|
জল বনাম পানি: বৈপরীত্য ও সমন্বয়ের দুটি অনিবার্য প্রতীকআবুল হাসনাত |
আর একটি মজার ব্যপার। মুসলমান যখন ‘হিন্দু হোটেলে’ বা রেস্তোরাঁয়, বাজার-দোকানে বা ‘হিন্দু-পরিবেশে’ কথাবার্তা বলেন, তখন ‘পানি’ না-বলে ‘জল’-ই বলেন; কিন্তু মুসলমানের সঙ্গে বা মুসলমানি পরিবেশে কথা বলার সময় বলেন ‘পানি’। অপরদিকে হিন্দুরা সাধারণত সর্বক্ষেত্রেই ‘জল’ বলেন, ‘পানি’ ব্যবহার করেন না,— বাংলার বাইরে গেলে অবশ্য অন্য কথা। এর থেকে আর একটি দুঃখজনক দূরত্বের প্রতি আমাদের দৃষ্টি যায়। দেশের মধ্যে অসংখ্য হিন্দু হোটেল এবং মুসলিম হোটেল অহরহ হিন্দু-মুসলমানকে বিচ্ছিন্ন করে চলেছে, যার ভূমিকা জল ও পানির মতোই। |
[লেখাটি গত শতকের আটের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে লেখা। প্রায় বছর চল্লিশ আগে। ফলে সেই পরিপ্রেক্ষিত মাথায় রেখে পড়তে হবে।—মার্কসবাদী পথ] দুই বন্ধু, সিরাজ আর প্রদীপ, গল্প করতে করতে এক মাঠের পাশ দিয়ে চলেছে। সিরাজ: হ্যাঁ, খুব খুশি। প্রদীপ: নিজের জমির কথা মনে হচ্ছে, বুঝি? এবার ফসল মনে হয় ভালোই হবে। সিরাজ: তাই তো মনে হয়। আকাশের দেবতা এবার বেশ সন্তুষ্ট ছিলেন, তাই না? প্রদীপ: তাঁর তো মর্জি বোঝা ভার। এবার কিন্তু সত্যি, জল ভালোই হয়েছিল। সিরাজ: তা তো বটেই। ওপরের পানি না-পেলে চাষ আবাদ কী করে হত? উপরের দুই বন্ধু নিজেদের মধ্যে আলোচনার কালে শব্দ ব্যবহারের মধ্য দিয়ে আপনার অজান্তে একটি মিলনের সেতু তৈরি করে ফেলেছিল। সেটা কিন্তু তারা টের পায়নি। বাংলার নিজস্ব শব্দ ভাণ্ডারের মধ্যে কবে যেন অসংখ্য বিদেশি (এক্ষেত্রে ফারসি) শব্দ আবলীলায় নিজের জায়গা করে নিয়েছে এবং বাঙালিত্ব অর্জন করেছে তা আমরা চট করে খেয়ালই করি না। প্রথম কথা, প্রদীপ খেয়াল করেনি যে সে সিরাজের বাংলা রূপ, আর সিরাজও ভাবতে পারেনি যে প্রদীপের আরবি রূপান্তর। তারা আরও ভাবেনি, ‘সবুজ’, ‘ময়দান’, ‘খুব’ ‘খুশি’,’ বেশ’, ‘জমি’ ‘ফসল’ ‘মর্জি’ ‘আবাদ’ দৈনন্দিন কথায় ব্যবহৃত এই সব শব্দগুলি আসলে ফারসি। এখন চমৎকারভাবে তারা বঙ্গীকৃত হয়ে গেছে। অর্থাৎ কী অপরূপভাবে ভাষার মধ্য দিয়ে ওরা কত কাছাকাছি চলে এসেছে। আর ঐ যে শেষ বেলায় প্রদীপ বলেছে ‘জল’, আর সিরাজ বলেছে ‘পানি’, একমাত্র ঐ সময়েই তারা আপনার অজান্তে স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছে, আর ঐখানেই তারা বিচ্ছিন্ন হয়েছে। জল বনাম পানি। আমরা সবাই ছেলেবেলা থেকে শুনে আসছি, ‘জলের অপর নাম জীবন’। অথচ জল আর পানি এই দুটি শব্দের মধ্যে এমন দুটি পরস্পরবিরোধী সংস্কৃতি ভাবনাকে এক দুঃখজনক অন্ধত্বের সাথে লালন করে আসা হয়েছে, যা জল আর জীবনের সমীকরণকে ভ্রুকুটি করে চলেছে দীর্ঘদিন। ‘বড়ো ভ্রান্তভাবে ভাবা হয়েছে ‘জল’ এক বিশেষ ধর্মসম্প্রদায়ের দ্বারা ব্যবহৃত, ‘পানি’ অপর একটির দ্বারা। দুটি শব্দের এই পার্থক্য (অথচ দুটি শব্দ এক বিশেষ বস্তুকে বোঝায়, যা সকল মানুষেরই প্রয়োজন) শেষ পর্যন্ত দুটি সম্প্রদায়ের পার্থক্যের অনিবার্য প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। মানুষের এই নির্বোধ কলহে ও বিদ্বেষে ঐ শব্দ দুটি নিঃশব্দ বিদ্রূপ করে চলেছে প্রতিবাদের ছলে, সে-খবর রাখার সময় নেই আমাদের। সংস্কৃতির অঙ্গনে অক্ষম কলরব সুস্থ জীবনের সর্বনাশ ডেকে আনে। কেন এই ভ্রান্তি? হিন্দুরা বলেন জল, আর মুসলমানরা বলেন পানি। প্রথমোক্তরা ভাবেন, ‘পানি’ বললে যবনের ভাষা ব্যবহার করা হল, দ্বিতীয়োক্তরা ভাবেন, ‘জল’ বললে নাম লেখানো হল হিন্দুর ঘরে। ঠিক এই কারণেই পাকিস্তান আমলে পূর্ব বাংলায় (বর্তমান বাংলাদেশে) আমরা ‘পানি উন্নয়ন বোর্ড’ এবং ইত্যাকার শব্দের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। যেন মুসলমানত্ব প্রকাশের একটা নির্ভরযোগ্য শব্দ-প্রতীক এর দ্বারা পাওয়া গেল। এই সমগ্র মনোভাব এবং এই ভ্রান্তি সম্পর্কে আলোচনা আমাদের কিছু সাংস্কৃতিক সমস্যার গভীরে নিয়ে যায়, যা শুধু ভাষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যে সব মুসলমান ‘পানি’ ব্যবহার করেন, আর যে সব হিন্দু ‘পানি’ ব্যবহার করেন না, উভয়েই মনে করেন, পানি কোনও আরবি, ফারসি বা উর্দু শব্দ, যা মুসলমানের ভাষা; আর জল বাংলা তথা ভারতীয় শব্দ। প্রথম ভ্রান্তি এখানেই। ভাষার বা শব্দের পরিচয় ধর্মে নয়, একটি দেশের ভৌগোলিক সীমানায়, সে-দেশের সমাজে, সাংস্কৃতিক পরিবেশে, পরিমণ্ডলে। সেইজন্য ভাষায় হিন্দু-মুসলমান বলে কিছু নেই। মুসলমানের ভাষা, হিন্দুর ভাষা, এভাবে না-বলে বলা উচিত, আরবের বা পারস্যের ভাষা, ভারতের বা বাংলার ভাষা। আরবে দীর্ঘদিন ধরে আরবি ভাষা ব্যবহার করেছেন সেখানকার মুসলমান, ইহুদি, খ্রিস্টান। লেবাননের কবি, জন্মসূত্রে খ্রিস্টান, কহলিল জিব্রান আরবি ভাষাতেই সাহিত্য রচনা করে খ্যাতি অর্জন করেছেন। ঠিক সেইভাবেই ভারতে বা বাংলায় বাংলা ভাষা ব্যবহার করেন যাঁরা, তাঁরা হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, জৈন ইত্যাদি নানা কিছু। ভাষা যে ধর্মের সীমানা মানে না, পৃথিবীর বিভিন্ন সাহিত্য (বিশেষ করে যে-দেশে বিভিন্ন ধর্মগোষ্ঠীর মানুষ বাস করেন) পাঠ করলেই তা বোঝা যাবে। যে রক্ত-স্নানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে) উর্দুর বাদশাহীকে নস্যাৎ করে বাংলা ভাষাকে শ্রদ্ধার আসনে বসানো হয়েছে, সেটাও এই ইঙ্গিত বহন করে। এই যে আমরা লিখলাম উর্দুর বাদশাহি— এতে কিন্তু উর্দু ভাষার প্রতি বিন্দুমাত্র কটাক্ষ নেই, উর্দু ভাষাটিকে ব্যবহার করে যে বাদশাহির আয়োজন হচ্ছিল তার প্রতিই শ্লেষ প্রযুক্ত হয়েছে মাত্র। আমাদের ভারতের সাহিত্যের কথাও আলোচনা করা যেতে পারে। আমরা অনেক হিন্দু লেখকের কথা জানি, যাঁরা ভালো আরবি ফারসি জানতেন, এবং বিশেষ করে ফারসি ভাষায় উত্তম গ্রন্থ রচনা করেছেন, যথা লক্ষ্মীনারায়ণ, অচল দাস, ব্রাহ্মণ রায় চন্দ্রভান, কনকা বা কংকা, নরনারায়ণ, সানজাহাত প্রমুখ (দ্রষ্টব্য: অধ্যাপক রেজাউল করীম প্রণীত সংস্কৃতি সমন্ধয়; কিছু ভাবনা, পৃ. ৩৮-৪৬)। আধুনিক ভারতে রামমোহনের অতি বিখ্যাত গ্রন্থ তুহফাতুল মুওয়াহহিদীন (এর অর্থ একেশ্ববাদীদের নিকট উপহার) ফারসি ভাষায় রচিত, আর তার ভূমিকা আরবি ভাষায়। অনুরূপভাবে, বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় ধর্মপরিচয়ে মুসলিমদের লেখা সাহিত্য সেই সেই ভাষার ইতিহাসে গৌরবময় ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। আমির খুসরৌর উর্দু-হিন্দি কাব্য (লিটারারি হিসট্টি অফ পারসিয়া গ্রন্থের বিশ্ব-বিখ্যাত লেখক এডোয়ার্ড ব্রাউন ঐ গ্রন্থের ২য় খণ্ডে (পৃ. ৫৩২) উল্লেখ করেছেন, পারস্যের স্বনামধন্য কবি শেখ সা’দি হিন্দুস্থানি কিংবা উর্দু ভাষায় কিছু কবিতা লিখেছেন), মালিক মুহম্মদ জায়সীর হিন্দি পদুমাবৎ, মংঝন ও কুতুবনের রচনা, মির্জা জানজানান মাজহারের হিন্দি রচনা সবই এই সত্যকে বহন করে চলেছে যে-উর্দু ভাষায় উত্তরপ্রদেশ বা বিহার অঞ্চলের মুসলিমদের মতো অনেক প্রথিতযশা হিন্দু লেখকও উত্তম সাহিত্য রচনা করেছেন। মুনশি প্রেমচাঁদ বা ফিরাকের নাম কে না জানেন? এই সঙ্গে আর একটি ব্যাপার স্মরণ করা যেতে পারে। পাঠান ও মোগল আমলে হিন্দু-মুসলমানের ভাব বিনিময়ের ফলে তুলনামূলক ধর্ম-সংস্কৃতি নিয়ে অনেক আলোচনা ও গ্রন্থ-রচনা সম্ভব হয়েছিল। শাহজাহানপুত্র দারা শিকোহ মূল সংস্কৃত থেকে ফারসি ভাষায় ৫০টি উপনিষদ অনুবাদ করেছিলেন সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতদের সহযোগিতায়। এই কাজের কিছুটা ফরাসি পণ্ডিত ও পর্যটক আঁকেতিল্ দ্যু পেরঁ (২০০৫ সালে যাঁর মৃত্যুর দুশো বছর পূর্ণ হয়েছে) ফরাসি এবং ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। বহু দিন মনে করা হত, এইটেই ইউরোপীয় কোনও ভাষায় উপনিষদের প্রথম তর্জমা। আধুনিক গবেষণায় জানা যায়, আঁকেতিলেরও পূর্বে এর ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন A Grammar of Bengal Language-এর লেখক ন্যাথানিয়েল ব্রেসি হ্যালএড, কিন্তু তিনি তা প্রকাশ করেননি, পাণ্ডুলিপি আকারেই এটি দীর্ঘ দিন বন্দি হয়ে ছিল। আঁকেতিলের ল্যাটিন অনুবাদ পাঠ করে জার্মান দার্শনিক শোপেনহাউয়ার সহ ইয়োরোপের বহু মনীষী চমৎকৃত হন। উপনিষদের এই বিশ্বভ্রমণের জন্য দারার ভূমিকা চিরকাল স্মরণযোগ্য। দারা আর একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজও করেছিলেন। বেদান্ত আর সুফি ভাবনার তুলনামূলক আলোচনা করে গ্রন্থ লিখেছেন মাজমাউল বাহরায়েন (এর অর্থ— দুই সমুদ্রের মিলন)। এইসব যুগান্তকারী সৃষ্টি সম্ভব হয়েছিল ভাষা ও সংস্কৃতিকে ধর্মের বন্ধনে বেঁধে রাখা হয়নি বলে। বিশ্ব সংস্কৃতির পাঠক মাত্রই জানেন, এককালে আরব পণ্ডিতেরা বিভিন্ন সময়ে ভারতে এসে সংস্কৃত এবং গ্রিসে গিয়ে গ্রিক ভাষা শিক্ষা করে সেখানকার জ্ঞান-বিজ্ঞান-সাহিত্য পাঠ করে সেগুলি আরবি ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। মূর্তি উপাসক বলে তাঁদের ভাষা সাহিত্য পাঠ করা অনুচিত, এই মানসিক দৈন্য তাঁদের ছিল না। এটা তো তাঁদের গৌরব বটেই, বিশ্ব-সংস্কৃতির পক্ষেও খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই আরবি ভাষান্তরে ইহুদিরাও পণ্ডিতের নিষ্ঠা ও সততা নিয়ে যোগদান করেছিলেন। ভারতে মুসলমান আমলে রামায়ণ মহাভারত সহ অন্যান্য ভারতীয় গ্রন্থ আরবি-ফারসিতে অনুবাদ করা হয়েছিল। বিভিন্ন মানুষের হাতে এক রামায়ণ-এরই অনুবাদ হয়েছিল কুড়ি-বাইশবার। পরবর্তীকালে হ্যালএড যে মহাভারত-এর ইংরাজি অনুবাদ করেছিলেন সে ঐ ফারসি রূপান্তর থেকেই। সংস্কৃতির ইতিহাসে এসবের তাৎপর্য গভীর। আকবরের সময়ে এই ভাববিনিময়ের ফলেই ‘রচিত’ হয়েছিল আল্লোপনিষদ যাকে বিবেকানন্দ প্রক্ষিপ্ত বলে মনে করেছেন, আমরাও করি। এই উপনিষদে ‘আল্লা’ এবং ‘মহম্মদ’ শব্দের ব্যবহার অন্যান্য সংস্কৃত শব্দের ধ্বনি এবং শব্দ গঠন রীতির সঙ্গে এমন বিসদৃশ যে এটিকে অনেক পরবর্তীকালের রচনা বলে মনে হওয়াই স্বাভাবিক। তাছাড়া আরবি সেমেটিক ভাষা পরিবারভুক্ত এবং সংস্কৃত ইন্দো-এরিয়ান ভাষা পরিবারভুক্ত; এবং এই দুই পরিবারে কোনও রক্তের সম্পর্ক ছিল না। অবশ্য কোনও কোনও শব্দে যে মিল ছিল সে-আলোচনায় পরে আসছি। সুতরাং আল্লোপনিষদ কঠ, কেন, শ্বেতাশ্বতর বা অন্যান্য উপনিষদের মর্যাদা পায়নি; কিন্তু হিন্দু-মুসলমানকে নিকটবর্তী করেছে। সংস্কৃতির ইতিহাসে তার মূল্য কম নয়। তাহলে দেখতে পাচ্ছি, মানুষ বহু ক্ষেত্রে ধর্মের সীমানা ছাড়িয়ে ভাষা-সাহিত্য সংস্কৃতি নিয়ে চর্চা করেছে। ভাষার ধর্ম পরিচয় অনুসন্ধানকেই আমরা জল ও পানি প্রসঙ্গে প্রথম ভ্রান্তি বলেছিলাম। এ-প্রসঙ্গে আরও একটি ভ্রান্তি রয়েছে। আরবি-ফারসিকে যদি আরব-পারস্যের ভাষা না-বলে সংকীর্ণভাবে মুসলমানের ভাষা বলা হয়, তাতেও ‘পানি’ একেবারেই মুসলমানের শব্দ নয়। পানি একান্তভাবেই ভারতীয় শব্দ; সংস্কৃত পান বা পানীয়ের সঙ্গেই এর আত্মীয়তা। আরবিতে জলকে বলে ‘মাউন’ আর ফারসিতে বলে ‘আব’। পানি ভারতীয় শব্দ হিসাবেই হিন্দি বা হিন্দুস্থানিতে প্রবেশ করেছে। বাংলা অঞ্চল পেরোলেই বিহার উত্তর প্রদেশে যে ব্যাপকভাবে ‘পানি’র ব্যবহার লক্ষ করি, তাতে অনেক বাঙালি হিন্দুও যোগ দেন। আর হিন্দুস্তানিরা যে ‘পানি’ ব্যবহার করেন সেটাও ‘মুসলমানী’ শব্দের প্রতি কোনও প্রীতির বশে নয়, এটি ভারতীয় শব্দ বলেই। একই রকমভাবে, কাকা বলতে চাচা, ভাইপো বলতে ভাতিজা ইত্যাদি আত্মীয়তাবাচক বহু শব্দ তথাকথিত মুসলমানী নয়, হিন্দুস্তানি। এই ভ্রান্তি কেন ঘটল, জানা দরকার। হিন্দি বা হিন্দুস্থানির মতো উর্দুও ভারতীয় ভাষা। এর জন্মও বেশি দিনের নয়। ‘উর্দু’ একটি তুর্কি শব্দ, এর অর্থ শিবির, ক্যাম্প। প্রচলিত মত এই যে, মুসলমান আমলের গোড়ার দিকে যখন বিভিন্ন শিবিরভুক্ত বিদেশি ফারসি-ভাষী সৈন্যদের সঙ্গে ভারতের সৈন্যদের ভাব-বিনিময়ের অসুবিধা দেখা দেয়, তখন হিন্দভি, খড়িবোলি ইত্যাদির সঙ্গে ফারসির (আর ফারসির হাত ধরে কিছু আরবিরও) সংমিশ্রণে একটি সাধারণ যোগাযোগের ভাষা তৈরি হয়। সেটি উর্দু। অবশ্য উর্দুর জন্মকথা নিয়ে এই সেনাছাউনি তত্ত্বের বিরুদ্ধ মতও আছে। সেসব নিয়ে আলোচনার জায়গা এটি নয়, এবং তাতে আমাদের মূল প্রতিপাদ্য হেরফের হবে না। ভারত ভূখণ্ডে জন্ম হয়েছে বলে অনিবার্যভাবেই বিভিন্ন ভারতীয় বুলিতে প্রচলিত শব্দ উর্দুর মধ্যে মিশে আছে, আছে বহু সংস্কৃত থেকে আগত শব্দও। যেমন ‘কলিজা’। অবশ্য উর্দু-হিন্দির অহরহ যোগাযোগের ফলে বহু আরবি-ফারসি শব্দ লিখিত ও কথ্য হিন্দির মধ্যেও প্রবেশ করেছে, যেমন ‘কাফি’। এই আরবি শব্দটির অর্থ হচ্ছে যথেষ্ট। রবীন্দ্রনাথ ‘বে আব্রু’-র সঙ্গে বাংলা ‘তা’ যোগ করে লিখেছেন ‘বেআব্রুতা’, যেটি মিশ্রশব্দ নির্মাণ-রীতির দৃষ্টান্ত। যেমন ইংরাজি ডাক্তার (ডক্টরের বাংলা রূপান্তর) আর ফারসি ‘খানা’ (স্থান) মিলে হয়েছে ‘ডাক্তারখানা’। আর যে ‘বাবা’কে আমরা সবাই বাংলা বলেই জানি, সেই বাবাও কোনও কোনও অভিধান মতে আরবি/ফারসি শব্দ, কোনও কোনও মতে তুর্কি। আমরা যে আরব্য রজনীর গল্প পড়ি ‘আলি বাবা’, সেটিও বাংলা মুলুক থেকে ঘুরে যাওয়ার পরে বাংলা শব্দ চয়ন করে লেখা নয়। যাই হোক। আমরা আবার উর্দুর মধ্যে ফিরে যাই। উর্দু যে আদতে ভারতীয় ভাষা তার একটি ‘বড়ো প্রমাণ, বিভিন্ন ভারতীয় শব্দ উচ্চারণ করার জন্য এ-ভাষায় কিছু বর্ণের আয়োজন করতে হয়, যা ফারসিতে নেই, যেমন ‘ড’, ‘ঢ’, ‘ঢ়’, ‘ট’, ‘ছ’ ধ্বনি। আরবি ভাষা যখন অন্যান্য দেশের শব্দকে গ্রহণ করেছে, তখন পৃথক বর্ণের সৃষ্টি করেনি, নিজ বর্ণমালার কাঠামোর মধ্যে রেখেই সেই শব্দ উচ্চারণ করার চেষ্টা করেছে। উদাহরণ স্বরূপ, প্লেটোকে আরবরা বলত ‘আফ্লাতুন’, অ্যারিস্টটলকে বলত ‘আরাস্তু’। অবশ্য আরবির এই ‘ত’ ধ্বনি আদি গ্রিক ‘ত’-(ইংরাজিতে ‘ত’ নেই বলেই হয়তো ইংরেজিতে ‘ট’ ব্যবহার করতে হয়েছিল) ধ্বনির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সম্পূর্ণ আরবি বর্ণমালা গ্রহণ করেও পারস্যের ভাষা ফারসি অন্তত চারটি নতুন বর্ণ গড়ে নিয়েছিল যে সব আরবি ভাষায় দরকার হত না। একই রকমভাবে, উর্দু ভারতীয় বংশজাত বলেই ভারতীয় ভাষার ধ্বনিকে ধারণ করতে সে নতুন চিহ্ন বানিয়েছে যা ফারসিতে ছিল না। পরবর্তী কালে এটি মুসলমানের ভাষা বলে মনে করার সম্ভাব্য দুটি কারণ: এক, এতে অনেক আরবি-ফারসি শব্দ রয়েছে; দুই, এই ভাষার আকার (স্ক্রিপ্ট) এবং লিখন পদ্ধতি আরবি ফারসির মতো। তাছাড়া ভারতের একটি বৃহৎ অংশের মুসলমানের ধর্ম-সংস্কৃতির আলোচনা এবং ধর্মপরিচয়ে মুসলমান প্রখ্যাত কবি সাহিত্যিকদের বিপুল অবদানের মধ্য দিয়ে এ-ভাষার একটি স্বতন্ত্র ধর্মীয় চরিত্রপ্রাপ্তি ঘটেছে। তাই সংস্কৃত কিংবা হিন্দভি কিংবা অন্য কোনও ভারতীয় সূত্র থেকে উর্দুতে অনুপ্রবিষ্ট চাচা, ভাতিজা বা পানি শব্দগুলি ‘মুসলমানি’ অবয়ব লাভ করে বিপুল সংখ্যক মুসলমানের কাছে (বাঙালি, বিহারি, অসমী, উত্তরপ্রদেশী) উপস্থিত হয়েছে, একই সঙ্গে হিন্দু বাঙালিরও এক বৃহৎ অংশ মনে করেন এসবই মুসলমানের শব্দ। মজার কথা হল, তথাকথিত মুসলমানের ভাষা আরবি কিংবা ফারসিতে এই তিনটি শব্দের কোনওটিই নেই। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের শব্দকোষ ঘাঁটলেই দেখা যাবে, পানি তো বটেই, চাচা এবং ভাতিজার উৎস মোটেই ‘মুসলমানের ভাষা’ আরবি/ফারসি নয়, ‘হিন্দুর ভাষা’ সংস্কৃত। এই ভ্রান্তির ফলে একাংশ বাঙালি মুসলমান যেমন ‘জল’ উচ্চারণ করতে চান না (সাম্প্রতিক কালে অবশ্য এই অনীহা অনেক কেটে গেছে), বাঙালি হিন্দুও তেমনি ‘পানি’ উচ্চারণে বিরত থাকেন। মুসলমান যেমন মনে রাখেন না যে তিনি এমন বহু শব্দ ব্যবহার করেন, যা কঠোরভাবে বিচার করলে মুসলমানি বাতাসে গড়ে ওঠেনি, ঠিক তেমনি হিন্দুও ভুলে যান বাংলা শব্দ ভাণ্ডারে এমন সব শব্দ যুক্ত হয়েছে, যার উৎস সংস্কৃত বা ভারতীয় ভাষা পরিবারে মেলে না। দীর্ঘদিন ভারতে ফারসি সরকারি ভাষা ছিল বলে নানাসূত্রে আমাদের সমাজ-জীবনে এবং কাব্য সাহিত্যেও বহু ফারসি (কিছু আরবিও) শব্দ প্রবেশ করেছে, এবং পৃথিবীর অন্যান্য ভাষার মতো এখানেও ফারসি শব্দগুলি একেবারেই বাংলা শব্দ হয়ে গেছে। এগুলি এত পরিচিত যে, উল্লেখের অপেক্ষা রাখে না। বাজার, দলিল, হুকুম, মামলা, আমদানি, রফতানি, বেশি, কম, মোতায়েন (আরবি শব্দ ‘মোতাইয়ান’ থেকে জাত, যেমন সৈন্য ‘মোতায়েন’ করা) ইত্যাদি শব্দগুলি বাঙালি মুসলমানের মতো বাঙালি হিন্দুও ব্যবহার করেন, শুধু ব্যবহার করেন না ভারতীয় শব্দ ‘পানি’! আর একটি মজার ব্যপার। মুসলমান যখন ‘হিন্দু হোটেলে’ বা রেস্তোরাঁয়, বাজার-দোকানে বা ‘হিন্দু-পরিবেশে’ কথাবার্তা বলেন, তখন ‘পানি’ না-বলে ‘জল’-ই বলেন; কিন্তু মুসলমানের সঙ্গে বা মুসলমানি পরিবেশে কথা বলার সময় বলেন ‘পানি’। অপরদিকে হিন্দুরা সাধারণত সর্বক্ষেত্রেই ‘জল’ বলেন, ‘পানি’ ব্যবহার করেন না,— বাংলার বাইরে গেলে অবশ্য অন্য কথা। এর থেকে আর একটি দুঃখজনক দূরত্বের প্রতি আমাদের দৃষ্টি যায়। দেশের মধ্যে অসংখ্য হিন্দু হোটেল এবং মুসলিম হোটেল অহরহ হিন্দু-মুসলমানকে বিচ্ছিন্ন করে চলেছে, যার ভূমিকা জল ও পানির মতোই। অবশ্য বাঙালি মুসলমান যেমন কখনও কখনও জল ব্যবহার করেন, বাঙালি হিন্দুও যে একেবারেই পানি ব্যবহার করেন না, তা নয়। মুসলমান যখন বর্ণপরিচয়-এ পাঠ করেন ‘জল পড়ে, পাতা নড়ে’ তখন কোনও আপত্তি থাকে না; বা যখন তিনি নজরুলের সেই সুন্দর গজলটি গাইতে থাকেন, ‘এত জল ও কাজল চোখে পাষাণী আনলে বল কে?’ তখন তিনি জলের মধ্যে হিন্দুয়ানি দেখেন না, ‘মোতির মালা’ দেখেন। আবার হিন্দু যখন বাজারে গিয়ে ‘পানিফল’ কেনেন, তখন তা বোঝানোর জন্য দোকানদারকে ‘জলফল’ বলেন না। আবার ‘জলপানি’ শব্দটি এক অদ্ভুত সমন্বয়ের মাধ্যমে উভয় সম্প্রদায়কেই উচ্চারণ করিয়েছে— যদিও তার অর্থ আলাদা। আসলে প্রতিদিনের ব্যবহৃত শব্দ যে স্বচ্ছন্দ গতি এবং শক্তি লাভ করে, তার ফলে সে সাহিত্যেও স্থান পাবার যোগ্য হয়ে ওঠে, কোনও কোনও শব্দ একেবারে অপরিহার্যতা অর্জন করে। এই ইঙ্গিতই আচার্য দীনেশচন্দ্র সেন করেছিলেন। তিনি বলতে চেয়েছিলেন, ছুঁৎমার্গ ভাষাকে দুর্বল, ভ্রষ্টগতি করে ফেলে। জোর করে ইজ্জতের (মূল উচ্চারণটা হবে: izzat) বদলে সম্মান, আমদানির বদলে আগমন, কবুলের বদলে স্বীকার, খেসারতের বদলে ক্ষতিপূরণ ব্যবহার করা সব সময় ঠিক নয়। এতে ভাষা জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আমরা একালে নতুন করে “আবহাওয়া”র বদলে আকাশবাণীতে “জলহাওয়া” শুনছি। “আবহাওয়া”র মধ্যে দীর্ঘ দিনের যে একটি পরিচিত প্রতিক্রিয়া (স্টক রেসপন্স) গড়ে উঠেছে, জলহাওয়ায় তা নেই। বাংলা সাহিত্যে, কবিতায় তো বটেই, গদ্যেও-অনেক শক্তিশালী লেখক আরবি ফারসি শব্দ ব্যবহার করেছেন। নজরুলের কাব্য যদি আমরা ছেড়েও দিই, তাহলেও রবীন্দ্রনাথের মতো কবি বা বিবেকানন্দের মতো লেখক পাব, যাঁরা অসংখ্য আরবি ফারসি শব্দ ব্যবহার করেছেন। রবীন্দ্রনাথের কাব্যে বা গদ্যে পাই: খুব, খুশি, বাজার, খবরদার, বেআব্রু প্রভৃতি বহু আরবি ফারসি শব্দ; আর বিবেকানন্দের লেখায়: বাকি, হুঁশিয়ার, রোজ, জমি, আসবাব, ঈশা (বহু স্থানেই তিনি যিশুখ্রিস্ট না-বলে ঈশা বলেছেন, ইমিটেশন অফ ক্রায়েস্ট অনুবাদ করার সময় লিখেছেন, ঈশানুসরণ)। অনুরূপভাবে মুসলমান কবি সংস্কৃত বা সংস্কৃতবহুল বাংলা ব্যবহার করে গাম্ভীর্যপূর্ণ সাহিত্য রচনা করেছেন। এর দুটি বড়ো দৃষ্টান্ত: সৈয়দ আলাওল এবং কাজী নজরুল ইসলাম। নজরুল কিছু অপরিহার্য আরবি ফারসি ব্যবহার করেছেন, যার স্থান নির্ণয় শিল্পের মহৎ প্রয়োজনে পরীক্ষিত হয়ে গেছে। তাঁর ব্যবহৃত ‘হিম্মৎ’ (“কাণ্ডারী-হুঁশিয়ার”), ‘হায়দরী হাঁক’ (“কারার ঐ লৌহ-কপাট”), শারাবী গজল এবং আরও বহু শব্দ গ্রহণ করতে পাঠকের আর আপত্তি নেই। কিন্তু কোনও কোনও ক্ষেত্রে নজরুল নিজেই পরিবর্তন করেছিলেন। তাঁর বিখ্যাত “চল্ চল্ চল্” গানে এই রকম দুটি চরণ ছিল: ‘তাজা ব তাজার’ গাহিয়া গান পরবর্তী সময়ে তিনি এটাকে পরিবর্তিত করে লিখলেন (যা বর্তমান স্বীকৃত পাঠ): নবনবীনের গাহিয়া গান ফারসি গজলের সম্রাট হাফেজের একটি বিখ্যাত গজলে ‘তাজা ব তাজা’ শব্দগুচ্ছটি আছে: ‘মত্রেবে খোশ্নওয়া বগৌ তাজা ব তাজা নও বনও’। নজরুল এর অনুবাদও করেছিলেন: ‘আরো নতুন নতুনতর শোনাও গীতি গানেওয়ালা’। সেই জন্য- ‘চল্ চল্ চল্’ গানে এই অংশটুকু উদ্ধৃতি-চিহ্নের মধ্যে আছে। কিন্তু পরবর্তীকালের পরিবর্তনটি ইঙ্গিতপূর্ণ। অনুরূপভাবে একই গানে ‘নয়া জামানার মিনারে মিনারে নব ঊষার আজান’, এই অংশটিও পরিবর্তিত হয়ে দাঁড়ায় ‘মৃত্যুতোরণ দুয়ারে দুয়ারে জীবনের আহ্বান’। এবং বলা বাহুল্য এই পরিবর্তিত রূপটি সুন্দরতর হয়েছে (এ-প্রসঙ্গে বিস্তৃত আলোচনা পাওয়া যাবে নজরুল-গবেষক রফিকুল ইসলামের “নজরুলের চল্ চল্ চল্ বা নতুনের গান প্রসঙ্গে” প্রবন্ধে, দেখুন, নন্দন পত্রিকা, আষাঢ়-শ্রাবণ, ১৩৯৩, পৃ. ১৫৩-৬০)। ধ্বনি ও আবহ সৃষ্টিতে ‘মহাশ্মশান’ ‘গোরস্তান’-এর চেয়ে গভীর এবং শক্তিশালী শব্দ। মহাশ্মশানকে সজীব করার মধ্যে গভীরতর দায়িত্ব পালনের ইঙ্গিত আছে। তবে এই গানের শব্দ পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিত লিখিত আর একটি প্রবন্ধে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে এই পরিবর্তন সম্ভবত শিল্প সৃষ্টির নান্দনিক প্রয়োজনে নয়, একান্তই সামাজিক প্রয়োজনে সম্পন্ন করতে হয়েছিল। ‘তাজা ব তাজা’ বা ‘গোরস্তান’ শব্দগুলিকে গ্রহণ করতে হিন্দু শ্রোতাদের অসুবিধা হবে মনে করেই কিছু রদবদল করা হয়েছিল (আসাদুল হক, “শব্দের পালাবদলে নজরুলের একটি কোরাস গান”, শিল্পকলা, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, পুনর্মুদ্রিত ঝড় ৩১ ডিসেম্বর-৬ জানুয়ারি সংখ্যা, ২০০৮)। আর একটি মজার ব্যাপার মনে পড়ল। পাকিস্তান আমলে পূর্ব-বাংলার কোনও এক শ্রেণির বাংলা পাঠ্যপুস্তকে ‘তাজা ব তাজা’ এবং ‘গোরস্তান’ শব্দ ব্যবহৃত দেখেছিলাম। সম্ভবতঃ ‘নয়া জমানার...’ ইত্যাদি লাইনটিও ছিল। তৎকালীন পাঠ্যপুস্তক রচয়িতাগণ নজরুলের পরিবর্তনকে গ্রহণ না-করে শিখা পত্রিকায় (ঢাকা, ১৯২৮) প্রকাশিত তাঁর পূর্ব-পাঠকে গ্রহণ করে সাংস্কৃতিক অনুদারতা প্রকাশ করেছিলেন। এই ভাষাকেন্দ্রিক ও সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা জাতীয় সাহিত্য সৃষ্টিতে বাধা সৃষ্টি করে। গোপাল হালদার বলেছেন (বাংলা সাহিত্যের রূপরেখা, ১ম খণ্ড) সৈয়দ আলাওলের কাব্যেই প্রথম বৃহৎ জাতীয় অনুভূতির স্বাদ পাই। তার প্রধান কারণ, আলাওল ভারতীয় তথা বাঙালি ঐতিহ্য পুরোপুরি আত্মসাৎ করে এক ধর্মনিরপেক্ষ বাংলা সাহিত্য রচনা করেছিলেন– মুসলমানি সাহিত্য সৃষ্টি করেননি। এই কারণে বাঙালি মুসলমান রচিত শাশ্বত সাহিত্যে আমরা অনেক শব্দ বা ভাবানুষঙ্গ পাই, যার মধ্যে সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতার চিহ্ন নেই। নজরুলের বহু কবিতায় গানে হিন্দু মুসলমান পুরাণ এবং ভাবানুষঙ্গ যেভাবে সপ্রেম সহাবস্থান লাভ করেছে, তাতে পাঠকমাত্রই পুলকিত হন। তাঁর ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর’ গানে একটি চরণ আছে: ‘দিগম্বরের জটায় লুটায় শিশু চাঁদের কর’। এখানে শিবের মাথায় চাঁদ এবং মেঘের ফাঁকে চাঁদ— এই দুটি চিত্র সুন্দরভাবে সম্মিলিত হয়ে আমাদের আনন্দবর্ধন করে। আবার অপরদিকে ভারতচন্দ্র বা মধ্যযুগের অমুসলিম কবিদের কারও কারও যে ফারসি সাহিত্যের সঙ্গে সদ্ভাব ছিল তা বোঝা শক্ত নয়। উনিশ শতকের কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের সম্ভাবশতক (মহৎ ভাব সম্বলিত একশোটি কবিতা) তো অনেকাংশে সাদি-হাফেজের কাব্যের ভাবানুবাদ। এই সমন্বয়ের সুরই একটি দেশের জাতীয় সাহিত্যের সুস্থ সুর। বাঙালি মুসলমান লেখক বা পাঠক যখন মনে করেন, তিনি বাংলা সাহিত্যের স্রষ্টা বা অনুরাগী, তখন বাংলা ভাষায় রচিত হিন্দু-পৌরাণিক কাব্য সাহিত্য পাঠ করতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। তিনি রামায়ণ মহাভারত পাঠ করে বিপুল আনন্দ লাভ করতে পারেন। আবার তেমনি বহু বাঙালি মুসলমান পাঠক আছে, যাঁরা রামায়ণ-মহাভারত বা ভারতীয় ধ্রুপদি ভাষায় রচিত আরও সব অসামান্য রচনা পাঠ করতে চান না; তাঁদের ধারণা, ওগুলির মধ্যে ইসলামি জীবনাদর্শের সমর্থন নেই বা তার চিত্র নেই। কিন্তু অদ্ভুত কথা, যাঁরা ফারসি মহাকবি ফেরদৌসির শাহনামা পাঠ করেন গভীর আনন্দের সঙ্গে, তাঁরা ভাবেন না, শাহনামা ইসলামি জীবনাদর্শের কাব্য নয়। প্রাক-ইসলামি (৭ম শতাব্দীতে আরব কর্তৃক পারস্য অধিকারের পূর্ব পর্যন্ত) যুগের কিছু পৌরাণিক এবং আধা-ঐতিহাসিক রাজাদের কাহিনি হচ্ছে শাহনামা। পারস্য সাহিত্যের নবজাগরণ চিহ্নিত করা হয় ফেরদৌসির সময় থেকে; কেন-না, পারসিকরা আরবের ধর্ম যেভাবে নিয়েছিল, সংস্কৃতি সেভাবে নেয়নি, তার প্রথম উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত শাহনামা। ফেরদৌসি খুবই পরিশ্রম করে আরবি শব্দ পর্যন্ত পরিহার করার চেষ্টা করেছেন; সমগ্র শাহনামা-য় (শাহনামা একটি বিশালাকার গ্রন্থ) আরবি শব্দ শতকরা ৪ বা ৫ ভাগের বেশি নয়। ফেরদৌসি সচেতনভাবে পারস্যের জাতীয় সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন ইসলামের প্রথম গৌরবের যুগে (ফেরদৌসির জন্ম: ৯৭৩ খ্রিস্টাব্দ, ইসলামের বয়স তখন তিনশো বছরের কিছু বেশি হবে) ফেরদৌসির এই আরবি শব্দ এবং ইসলামি সংস্কৃতি-পরিহার খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। যাইহোক, মুসলিমরা, শাহনামা-য় ইসলামি পরিমণ্ডল পান না, তবু যদি তা পাঠ করে আনন্দ লাভ করতে পারেন, অনুরূপভাবে রামায়ণ-মহাভারত-এর অন-ইসলামিক পরিমণ্ডলেও আনন্দ লাভ করাই স্বাভাবিক। আর এক দিক থেকে দেখা যাক। ইতালির মহাকবি দান্তের ভিভাইন কমেডি পৃথিবীর সকল দেশের সকল ধর্মের মানুষের সঙ্গে মুসলমানদের কাছেও শ্রদ্ধেয়। কেন-না, সমগ্র বিশ্ব সাহিত্যে এ এক অক্ষয় সম্পদ। কিন্তু ডিভাইন কমেডির নরক-পরিকল্পনায় যেভাবে সর্বনিম্ন স্তরে হজরত মহম্মদ ও হজরত আলির জন্য স্থান নির্ণয় করা হয়েছে (বরং মুসলিম দাশর্নিক-প্রবর ইবনে সিনা এবং ইবনে রুশদ আরও একটু নিরাপদ স্বস্তিদায়ক স্থান লাভ করেছেন), তাতে ‘মানবতাবাদী’ দান্তের ইসলাম-বিরোধী মনোভাবই ব্যক্ত হয়েছে। অথচ পণ্ডিতেরা স্বীকার করেন, দান্তে বহুভাবে ইসলামের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। কিন্তু তার জন্য কই মুসলমানরা ডিভাইন কমেডি-কে তো নিষিদ্ধ করেননি। কিন্তু ইসলামের আর্বিভাবের বহু পূর্বে রচিত রামায়ণ মহাভারত-এ সামান্যতম ইসলাম-বিরোধী কথা প্রকাশিত হয়নি, হওয়ার সম্ভাবনাই ছিল না। ভিন্ন ধর্মীর কাব্য পাঠে অনীহা কিন্তু অনুদার মনোভাবের পরিচায়ক। নজরুল কিংবা আলাওলের মধ্যে তা ছিল না। এর বিপরীত চিত্রও অনুরূপভাবে দুর্ভাগ্যজনক। ভারতবর্ষে মুসলমান বাদশাহ বা বাদশাহকন্যা ইত্যাদি অবলম্বনে রচিত উপন্যাস, নাটকাভিনয় যেভাবে এককালে আদৃত হয়েছিল, তেমন আর কিছু নয়। বঙ্কিমচন্দ্র এবং বঙ্কিম-অনুসারী লেখকরা উদ্দেশ্য-প্রণোদিত বিদেশি পর্যটকদের গ্রন্থ পাঠ করে অনেক ক্ষেত্রে ভ্রান্ত তথ্য হতে প্রাপ্ত মালমশলা অবলম্বন করে কিছু কিছু ক্ষেত্রে একদেশদর্শী চিত্র পরিবেশন করেছিলেন। ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রেও ভারতীয় ও ব্রিটিশ ঐতিহাসিকদের একদিকে সামন্ততান্ত্রিক, অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক সীমাবদ্ধতা নিরপেক্ষ তথ্য পরিবেশনে বিশ্লেষণে ভ্রান্তি ঘটিয়েছে। এই অস্বচ্ছ দৃষ্টি দীর্ঘদিন ধরে মুসলমানের রচিত সাহিত্যকে উদারভাবে গ্রহণ করতে বাধা দিয়েছে। এর সঙ্গে স্মর্তব্য আমাদের বাংলা সাহিত্যের শ্রদ্ধেয় ইতিহাস লেখকগণ মুসলিম রচিত সাহিত্যকে পৃথকভাবে চিহ্নিত করেছেন ‘ইসলামি বাংলা সাহিত্য’ বলে। বাংলা সাহিত্যের আলোচনায় এই সীমানা নির্দেশ ‘জাতের নামে বজ্জাতিকেই’ স্মরণ করিয়ে দেয়। যাই হোক। একমাত্র নজরুল ইসলামই সার্থকভাবে মুসলিম অনুষঙ্গকে হিন্দু-পাঠকদের কাছে গ্রহণীয় ও সহনীয় করে তুলতে পেরেছিলেন। তার কারণ অবশ্য তাঁর সাম্যদৃষ্টি, তাঁর উদার জাতীয়তাবাদী প্রবণতা। কিন্তু এখানেও লক্ষ করা গেছে, অনেক পাঠক “বিদ্রোহী” কবিতার ‘জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি’ বা ‘ইস্রাফিলের শিঙ্গা’ বা ‘রুম ঝুম ঝুম ঝুম রুম ঝুম’ গানের ‘ঈদের চাঁদ ও চায়’ এগুলিকে ভালোবেসেও মুসলিম অনুষঙ্গে অভিজ্ঞতার অভাবে এদের শিল্প-সৌন্দর্যের গভীরে প্রবেশ করতে পারেন না। এক্ষেত্রেও অবশ্য ব্যতিক্রমের মহত্বকে স্বীকার করছি। হিন্দু-মুসলিম সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি এই পারস্পরিক অনাগ্রহ আরও বৃহৎ পটভূমিতে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতি প্রসঙ্গেও লক্ষ করা গেছে। মধ্যযুগে ইসলামের কাছে ইয়োরোপ সাধারণভাবে ঋণী ছিল। এই ঋণ ইয়োরোপের বিভিন্ন ভাষার সাহিত্যে সঞ্চারিত হয়েছিল। সাধারণভাবে দর্শন, বিজ্ঞান, গণিত, ভূগোল, জ্যেতির্বিজ্ঞান এসব এক্ষেত্রে আরবি শব্দ স্প্যানিশ, ফরাসি, পর্তুগিজ, ইংরাজি শব্দভাণ্ডারে গৃহীত হয়েছিল। আমরা আজকে অনেকেই খোঁজ রাখি না, ‘এলিকসির’, ‘জেনিথ’, ‘নাদির’, ‘অ্যাজিওর’, ‘অ্যালজেব্রা’, ‘কেমিস্ট্রি’, ‘সোফা’, ‘অ্যালবাট্রস’, ‘সিরাপ’ ইত্যাদির মতো বহু শব্দের উৎস আরবি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ইয়োরোপের জ্ঞান-বিজ্ঞানের আধুনিকীকরণের ফলে প্রাচ্যের কাছে যখন তার এই সাংস্কৃতিক ঋণগ্রহণ পর্বের অবসান ঘটল, তখন সে প্রাচ্যকেই রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উভয় দিক দিয়ে বাধ্য করল আত্মসমর্পণে। দীর্ঘদিন ধরে আমরা দেখি, প্রাচ্য সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্পর্কে তাদের উগ্র সাম্রাজ্যবাদী বীতরাগ ও অশ্রদ্ধা। আঠারো শতকে এসে আবার তাঁদেরকে প্রাচ্যমুখী হতে দেখি। ভারতবর্ষে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার সুবাদে নির্বিঘ্ন প্রশাসনিক প্রয়োজনে তাঁরা একদিকে আরবি-ফারসি, অপরদিকে সংস্কৃত শিখতে শুরু করেন। ভারতীয় ও আরব-পারস্যের সংস্কৃতি ও সাহিত্যের প্রতি নতুন করে একটি পরোক্ষ অনুরাগ জন্মলাভ করল। এই প্রাচ্য-অনুরাগীদের মধ্যমণি ছিলেন স্যার উইলিয়াম জোনস্। তাঁর অসংখ্য অবদানের মধ্যে একটি হল এই আবিষ্কার যে, সংস্কৃত, প্রাচীন পারসিক এবং আরবি ভাষার মধ্যে কোনও এক দূর অতীতে একটি আত্মীয়তার সূত্র ছিল। যখন তিনি চট্টগ্রামে বসে শাহনামা পাঠ করছিলেন, তখনই এই অসাধারণ ইশারাটি লক্ষ করেন তিনি। অবশ্য তার পূর্বে বাংলা ব্যাকরণ-রচয়িতা হ্যালএড সাহেব তাঁর ব্যাকরণের ভূমিকায় এই ইঙ্গিত করেছিলেন, এবং তারও পূর্বে করেছিলেন ইতালির সাসেতি। আরও একটি চিত্তাকর্ষক ব্যাপার লক্ষ করার মতো। আরবির মধ্যে কিছু কিছু সংস্কৃত শব্দ অনুপ্রবিষ্ট হয়েছিল। ‘বিদায়’ এই শব্দটি আরবি ‘আল-বিদা’ শব্দের উৎস। ভাষাচার্য সুনীতকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর ইরানিয়ানিজম নামক ইংরেজি গ্রন্থে আরবি ‘দীন’ (ধর্ম), সংস্কৃত ‘ধ্যান’ এবং প্রাচীন পহ্লভি ‘দায়ানা’ শব্দের মধ্যে আত্মীয়তার কথা আলোচনা করেছেন। এমনকী কোরাণেও কিছু কিছু ভারতীয় শব্দ রয়েছে বলে কিছু কোরাণ-বিশেষজ্ঞের অভিমত। যেমন ‘তুবা’, ‘সানদাস’ ইত্যাদি। (এ-সম্বন্ধে অধ্যাপক রেজাউল করীম তাঁর পূর্বোক্ত সংস্কৃতি সমন্বয় কিছু ভাবনা গ্রন্ধে গোলাম আলি আজাদের বক্তব্য সূত্রে আলোচনা করেছেন, পৃ.৭)। যাই হোক, যা বলছিলাম। মূলত স্যার উইলিয়াম জোন্স্-এর অভিভাবকত্বে ভারতে এবং ইয়োরোপে পাশ্চাত্য লেখক ও পাঠকদের মধ্যে একটি প্রাচ্য অনুরাগ সৃষ্টি করা সম্ভব হয়েছিল। তার ফলে একদিকে ইংরাজি-রোমান্টিক কবি লেখকদের মধ্যে আরবি ফারসি ও সংস্কৃত সাহিত্য ও দর্শন পাঠ, অপরদিকে জার্মানিতেও অনুরূপ আগ্রহ লক্ষ করা গেল। ইংরাজি সাহিত্যে রোমান্টিক ভাবান্দোলনে জার্মান ট্রানসেন্ডে্নটালিজম (অতীন্দ্রিয়বাদ)-এর যে ছায়াপাত অনেকে লক্ষ করেছেন, তা অন্তত কিছু পরিমাণে ভারতীয় দর্শন এবং আরবি-ফারসি, বিশেষ করে ফারসি সুফি কাব্য দর্শনের দ্বারা প্রভাবিত ছিল। জার্মানির এই প্রাচ্য অনুরাগের মহৎ দৃষ্টান্ত গ্যেটে। মূলত জোনস ও হের্ডরের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি প্রাচ্য সাহিত্য-সংস্কৃতির অনুরাগী হয়ে ওঠেন। কালিদাসের শকুন্তলা নাটকের জোন্স-কৃত ইংরাজি অনুবাদের জার্মান অনুবাদ (অনুবাদক— গেয়র্গ ফরস্টার) পাঠ করে গ্যেটে শকুন্তলার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন এবং একটি ছোটো গীতকবিতা রচনা করেছিলেন, হের্ডরও লিখেছিলেন কবিতা। শকুন্তলা-কে ভারতীয়দের কাছে শ্রদ্ধেয় করে তোলার আলোচনায় গ্যেটের এই কবিতা উদ্ধৃত করা হয়ে থাকে (রবীন্দ্রনাথ তাঁর “শকুন্তলা” প্রবন্ধে গ্যেটের মূল ভাবকে এইভাবে বলেছেন: ‘তরুণ বয়সের ফুল ও পরিণত বয়সের ফল’, ‘স্বর্গ ও মর্ত্য’ ইত্যাদি)। বিদ্যাসাগরও ভারতীয় নাটকের আলোচনা প্রসঙ্গে এই কথা উল্লেখ করেছেন। অনুরূপভাবে গ্যেটেও হাফেজ-এর অনুবাদে অনুপ্রাণিত হয়ে জীবনের শেষ দিকে লেখেন ওয়েস্ট-ইস্টার্ন দিওয়ান (কয়েক বৎসর পূর্বে জার্মান বিশেষজ্ঞ কবি অধ্যাপক অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত বাংলা কাব্য-ছন্দে এর একটি ভাবানুবাদ প্রকাশ করেছেন: প্রাচী-প্রতীচীর মিলন বেলার পুঁথি)। এই গ্রন্থের Notes and References অংশে গ্যেটে হাফেজ ভক্ত এবং অনুবাদক জোন্স্-এর প্রশংসায় মুখর হয়ে ওঠেন এবং সাহিত্য-সংস্কৃতির আলোচনায় তাঁর বিশ্ব-দৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এই নীতি অনুসরণের জন্য সামগ্রিকভাবে আবেদন জানান। পাশ্চাত্য সমালোচকরা যে প্রাচ্য কাব্যের বিষয়বস্তু, আঙ্গিক এবং চিত্রকল্পের রূঢ় সমালোচনা করে থাকেন, জোনস্-এর মতো গ্যেটেও তাতে ক্ষুদ্ধ হন। গ্যোটের এই বিশ্ব-দৃষ্টি ছিল বলেই তিনি হাফেজের দিওয়ানের অনুসরণে নিজেও দিওয়ান রচনা করেন। রোমান্টিক যুগের ইংরাজি কাব্যেও আমরা আরবি-ফারসি সংস্কৃত সাহিত্যের পদধ্বনি লক্ষ করি। ওয়ার্ডসওয়ার্থ, কোলরিজ, বায়রন, শেলি, কিটস, টমাস মুর, রাবার্ট সাদে, টেনিসন, ব্রাউনিং, ম্যাথ্যু আরনল্ড, ফিটজেরাল্ড (এই শেষোক্ত কবির জন্মবর্ষেই যিনি জন্মেছেন, সেই ভারতীয় কবি ডিরোজিওর ইংরাজি কাব্যও বিবেচনাযোগ্য) প্রমুখ কবিদের রচনার এক উল্লেখযোগ্য অংশে আরবি-ফারসি এবং সংস্কৃত কাব্যের অনুপ্রেরণা কারো সজাগ দৃষ্টি এড়িয়ে যায় না। এমনকি তাঁদের কাব্যে আরবি-ফারসি সংস্কৃত শব্দের উপস্থিতি তাদের প্রাচ্য অনুষঙ্গের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। গুল, বুলবুল, গুলনেয়ার (গুলনাহার) ছাড়াও জেনিথ, অ্যাজিওর অথবা সমরখন্দ, বোখারা, ফেজ প্রভৃতি স্থানবাচক শব্দ এবং ভারতীয় শব্দ অবতার, ব্রহ্ম, আমন, চম্পক (শেলি), কামিনী (ডিরোজিও) প্রভৃতি শব্দ ইংরাজি সাহিত্যের প্রাচ্য-প্রাপ্তিতে সহায়তা করেছে। এই বিশ্ব-দৃষ্টি বা সাহিত্য-সংস্কৃতিকে উদার দৃষ্টিতে গ্রহণ করা এবং সম্ভব হলে জারক রসে সিক্ত করে আগ্রাস করা মহৎ সাহিত্য সৃষ্টিতে সহায়তা করে। আধুনিক বাংলার সাহিত্য সমাজ ও সংস্কৃতিতে আমি এই মুক্ত দৃষ্টির পুনরুদ্বোধন কামনা করছি। আঠারো ও উনিশ শতক পর্যন্ত ব্যাপক ও উদার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। তাই আমরা রামমোহন, মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, ভাই গিরীশচন্দ্র, মোশারফ হোসেন, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, কাজী নজরুল ইসলাম— এঁদের মধ্যে সমন্বয়ী সুর লক্ষ করেছি, যার দ্বারা অপর সংস্কৃতিকে উদারভাবে নিজ সংস্কৃতির মধ্যে স্থান করে দিয়েছেন। কখনও কখনও মুসলমান শিখেছেন সংস্কৃত, আর হিন্দু শিখেছেন ফারসি। কিন্তু সেই দৃষ্টি বর্তমানে আচ্ছন্ন। সমাজে, রাজনীতিতে, এমনকী সংস্কৃতির চেতনার মধ্যেও এক সংকীর্ণ পরিমণ্ডল তৈরি হয়েছে। এর জন্য বিভেদের প্রাচীর প্রতিদিন অলংঘ্য হয়ে উঠেছে। অতি সামান্য ব্যতিক্রমী অংশ বাদ দিলে, বতর্মানের অমুসলিম লেখক-পাঠকরা (বৃহদংশ মুসলিমও আছেন) আর হাফেজ, সা’দি, রুমির নাম শোনেন না, অথচ এককালে বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতিতে এঁদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হত। বিগত শতকের গোড়ার দিকে ওমর খৈয়ামের কবিতার বেশ কিছু অনুবাদ হয়েছিল। কিছুদিন পূর্বে সুভাষ মুখোপাধ্যায় হাফেজের কিছু কবিতার অনুবাদ করেছিলেন অন্য একজনের সাহায্যে। কিন্তু নজরুল ইসলাম ছাড়া ওমর বা হাফেজের কবিতার প্রাণের গভীরে আর কেউ প্রবেশ করতে পারেননি, সম্ভবত তার কারণ তাঁরা ফারসি জানতেন না। সকল স্তরের শিক্ষক সমাজও ছাত্রদের মধ্যে বিভিন্ন সংস্কৃতির প্রতি এই শ্রদ্ধার ভাবকে সঞ্চারিত করতে পারছেন না। জ্ঞান এত সংকুচিত হয়ে পড়েছে যে, ‘জল’ আর ‘পানি’ যোজন যোজন দূরে অবস্থান করছে। এইটি দুর্ভাগ্যজনক। আজ আমাদের দেশে নানাভাবে বিচ্ছিন্নতা, সাম্প্রদায়িকতা, উগ্র জাতীয়তা এক প্রবল শক্তি অর্জন করেছে; এ থেকে দেশকে অনেকটা রক্ষা করতে পারে উদার সাহিত্য-সংস্কৃতির পুনরুদ্বোধন। সাহিত্য আলোচক যাঁরা, তাঁরাও এই বিশ্ব-দৃষ্টিকে মহৎ সাহিত্যের আবশ্যিক চরিত্র-লক্ষণ বলে দাবি করুন। ‘অপর’ সাহিত্য-সংস্কৃতিকে অবহেলায় দূরবর্তী করে রাখলে ‘নিজ’ সংস্কৃতির শুধু সংকীর্ণতাই নয়, স্বাস্থ্যের অভাবও সূচিত হয়। এর আশু অবসান চাই। ‘জলের’ সঙ্গে ‘পানির’, হিন্দুর সঙ্গে মুসলমানের, সংস্কৃতির সঙ্গে সংস্কৃতির মিলন আধুনিক বাংলা সাহিত্য ও সমাজকে মহৎ, উদার ও শক্তিমান করে তুলুক। সূত্র- আবুল হাসনাত, জল বনাম পানি, ২০০৮। প্রথম প্রকাশ- শারদীয়া মুর্শিদাবাদের খবর। এক ক্লিকেই ফলো করুন মার্কসবাদী পথের হোয়াটস্যাপ চ্যানেল
প্রকাশের তারিখ: ০৭-আগস্ট-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |