|
কবিগুরুকেও পুশব্যাক!টিম মার্কসবাদী পথ |
গানটি কবিগুরু লিখেছিলেন বঙ্গভঙ্গের প্রেক্ষাপটে। ব্রিটিশের বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তখন সরব অখণ্ড বাংলা। ৭ আগস্ট ১৯০৫, গানটি প্রথম গাওয়া হয় কলকাতা টাউন হলে। বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করে আয়োজিত প্রতিবাদসভায়। একটি প্রবন্ধ পাঠের আসরে। পরে প্রকাশিত হয় সঞ্জীবনী পত্রিকায়, কবির স্বাক্ষরসহ। কবির বয়স তখন ৪৪। সেদিন এই গান যেভাবে অখণ্ড বাংলার সমাজকে আলোড়িত করেছিল, তা নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী ঘটনা। সেদিন এই গানে ছিল বিভেদের বিরুদ্ধে ঐক্যের আহ্বান। |
রবীন্দ্র সংগীত গাওয়াও এখন রাষ্ট্রদ্রোহ! রবীন্দ্রনাথ আজ বেঁচে থাকলে নিশ্চিত জেলে যেতেন! না-হলে অবধারিত পুশব্যাক! এবং কী আশ্চর্য, দু’দেশেই দুই মৌলবাদের লক্ষ্য তিনি! ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।’ বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্ত থাকা শ্রীভূমি জেলার বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা বিধুভূষণ দাস দলীয় সভায় গেয়েছিলেন কবিগুরুর এই গান। তাও বক্তৃতার সূত্র ধরে, দু’ লাইন। বাঙালিপ্রধান বরাক উপত্যকায় যা একটি স্বাভাবিক ঘটনা। আর সেই ‘অপরাধে’ ওই প্রবীণ নেতাকে ‘দেশদ্রোহী’র তকমা দিয়েছে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার। কবিগুরুর এই গান গাওয়াকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ কাজ বলে দেগে দিয়েছেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী। বাংলার জনাকয়েক বিজেপি নেতা সুর চড়িয়েছেন, এই রাজ্যে তারা ক্ষমতায় এলে গানটিকে নিষিদ্ধ করবে। কারণ, কবিগুরুর লেখা এই গানটিরই প্রথম দশ লাইন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। গানটি কবিগুরু লিখেছিলেন বঙ্গভঙ্গের প্রেক্ষাপটে। ব্রিটিশের বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তখন সরব অখণ্ড বাংলা। ৭ আগস্ট ১৯০৫, গানটি প্রথম গাওয়া হয় কলকাতা টাউন হলে। বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করে আয়োজিত প্রতিবাদসভায়। একটি প্রবন্ধ পাঠের আসরে। পরে প্রকাশিত হয় সঞ্জীবনী পত্রিকায়, কবির স্বাক্ষরসহ। কবির বয়স তখন ৪৪। সেদিন এই গান যেভাবে অখণ্ড বাংলার সমাজকে আলোড়িত করেছিল, তা নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী ঘটনা। সেদিন এই গানে ছিল বিভেদের বিরুদ্ধে ঐক্যের আহ্বান। এই গানে কোথাও নেই কোনও উগ্র জাতিগৌরব, দেশগৌরব। আছে ভালোবাসার কথা। আছে বাংলার অপার সৌন্দর্যের অনুপুঙ্খ কাব্যিক বর্ণনা। ‘আমার সোনার বাংলা’ কথাটি রূপক। নেপথ্যে এক রূপকথা। আছে কিংবদন্তি, আছে বাংলার গৌরবময় ইতিহাস। ‘চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস, আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি।’ এ গানেই রয়েছে ‘ও মা, আমার যে ভাই তারা সবাই, ও মা, তোমার রাখাল তোমার চাষি।’ এভাবেই কবিগুরু কৃষক-জীবনের সঙ্গে গড়েছেন আত্মীয়তার বন্ধন। কিন্তু হঠাৎ এই ব্যগ্রতা, এই আকুলতা নিয়ে বাংলার রূপ বর্ণনা আর গুণ গাইতে ব্যস্ত হলেন কেন কবি? ব্রিটিশরা তখন তার শাসন মজবুত করতে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিভেদ উসকে দেওয়ার লক্ষ্যে বঙ্গভঙ্গের ঘোষণা করেছে। এই ঘোষণার মধ্যে ঔপনিবেশিক শক্তির চাতুরী আর বাঙালির সাম্প্রদায়িক বিভাজনের সর্বনাশা পরিণতি দেখে কবির সংবেদনশীল মন দারুণভাবে বিচলিত হয়। স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়ায় কবি প্রায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। এতদিন পদ্মাপারের জমিদারির গ্রামগুলি ছিল তাঁর ভাবজগতের বিষয়। অনিন্দ্যসুন্দর, শান্ত, অনুপম। প্রকৃতি আর প্রকৃতিরই সন্তান গ্রামের মানুষ, তাঁদের জীবন তাঁর মননে-মনে জুগিয়েছে ভাবনার খোরাক। কিন্তু এবারে দেশ ও মানুষের ভবিষ্যতের সংকট। বিচলিত ও উদ্বিগ্ন তিনি। তীব্রভাবে অনুভব করলেন বাঙালির এক প্রাণ এক জাতি হিসেবে বিকাশের প্রয়োজনীয়তা। ‘বাঙালির প্রাণ, বাঙালির মন, বাঙালির ঘরে যত ভাই বোন— এক হউক, এক হউক।’ নিজে পথে নামলেন তিনি। জোড়াসাঁকো বাড়ি থেকে বেরিয়ে অদূরবর্তী নাখোদা মসজিদে ঢুকে সেখানকার মুসলমান প্রার্থনাকারীদের হাতে পরিয়ে দিলেন রাখি। সেই রাখি ছিল হিন্দু-মুসলমান প্রীতির প্রতীক। মিছিলের পুরোভাগে থেকে গাইলেন—‘বিধির বাঁধন কাটবে তুমি এমন শক্তিমান’। জমিদারি দেখভালের কাজে রবীন্দ্রনাথ তখন বহুবার কুষ্টিয়া, পাবনা, নওগাঁ এলাকায় আসা-যাওয়া করছেন। থাকছেন। তখনই পূর্ব বাংলার বিভিন্ন আঙ্গিকের লোকগান, বাউল গানের সঙ্গে তাঁর নিবিড় পরিচয়। ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি তিনি রচনা করেন শিলাইদহের বাউল গগন হরকরার রচনা ‘আমি কোথায় পাব তারে আমার মনের মানুষ যে রে’ গানটির সঙ্গে মিলিয়ে। মুহম্মদ মন্সুর উদ্দিনের এক মহৎ কাজ বাউল গানের সংকলন প্রকাশিত হয় ১৯২৭ সালে, হারামণি নামে। সেই সকলনের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ লেখেন: ‘আমার লেখা যাঁরা পড়েছেন, তাঁরা জানেন বাউল পদাবলীর প্রতি আমার অনুরাগ আমি অনেক লেখায় প্রকাশ করেছি। শিলাইদহে যখন ছিলাম, বাউল দলের সঙ্গে আমার সর্বদাই দেখা-সাক্ষাৎ ও আলাপ-আলোচনা হত। আমার অনেক গানেই আমি বাউলের সুর গ্রহণ করেছি এবং অনেক গানে অন্য রাগরাগিণীর সঙ্গে আমার জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে বাউল সুরের মিলন ঘটেছে। এর থেকে বোঝা যাবে বাউলের সুর ও বাণী কোন্ এক সময়ে আমার মনের মধ্যে সহজ হয়ে মিশে গেছে। আমার মনে আছে, তখন আমার নবীন বয়স, শিলাইদহ অঞ্চলেরই এক বাউল কলকাতায় একতারা বাজিয়ে গেয়েছিল— ‘কোথায় পাব তারে/ আমার মনের মানুষ যে রে!’ আমাদের সংস্কৃতির শিকড়ে আছে বাউল সাধকেরা। তাঁদের গানে কিছু আধ্যাত্মিক বিষয় থাকলেও মানবিক দিকটাই ছিল প্রধান। এবং তা ছিল হিন্দু-মুসলমানের মিলিত সংগীত সাধনা। বাউলসংগীতের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাই বলেছিলেন, ‘এ জিনিস হিন্দু-মুসলমান উভয়েরই, একত্র হয়েছে, অথচ কেউ কাউকে আঘাত করেনি। এই মিলনে সভা-সমিতির প্রতিষ্ঠা হয়নি, এই মিলনে গান জেগেছে, সেই গানের ভাষা ও সুর অশিক্ষিত মাধুর্যে সরস। এই গানের ভাষায় ও সুরে হিন্দু-মুসলমানের কণ্ঠ মিলেছে। কোরান-পুরাণ ঝগড়া বাধেনি। এই মিলনেই ভারতের সভ্যতার সত্য পরিচয়, বিবাদ বিরোধে বর্বরতা।’ মধ্যযুগে বাংলায় পাঁচালি, যাত্রা, সংগীত রচনা ও অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে গড়ে উঠেছিল বেশ উন্নত সংস্কৃতি। ধর্মের আবরণ থাকলেও, তার মানবিক দিক ছিল প্রধান। অনেক ক্ষেত্রে শোষিত মানুষের ক্ষোভের প্রকাশ ও সংগ্রামের দিকও ছিল। যেমন কবীর লিখেছিলেন, ‘হিন্দুর হিন্দুয়ানী, মুসলমানের মুসলমানী দুইই দেখিলাম। ইহাদের কেহই পথের সন্ধান দিতে পারিল না।’ তাঁর অনেক বক্তব্য ছিল যথেষ্ট উচ্চমানের দার্শনিকতায় পূর্ণ। কবীরের বেশকিছু দোহার ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ নিজে। পরে তা সংস অব কবীর নামে প্রকাশ করে নিউ ইয়র্কের ম্যাকমিলান। তার আগেই অবশ্য প্রকাশিত হয়েছে কবীরের নির্ভেজাল বচন-সংগ্রহ। কবিগুরুর প্রত্যক্ষ প্রেরণা ও তাগিদে ক্ষিতিমোহন সেনের কবীর । শুধু কবীর নন, সেই কবে নানুরের চণ্ডীদাস বলেছিলেন, ‘শুন হে মানুষ ভাই/ সবার উপর মানুষ সত্য/ তাহার উপর নাই।’ ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, আমাদের সংস্কৃতিতে ধর্মীয় চেতনা কখনোই প্রাধান্য বিস্তার করেনি। বরং শিকড়ে রয়েছে অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মানবিক মূল্যবোধ ও উদার দৃষ্টিভঙ্গি। সেই কবে লালনের উচ্চারণ: ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’। বাঙালির ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতি, যার উপর নির্ভর করে বাঙালি বাঙালি হয়ে উঠেছিল, তাতে হিন্দু-মুসলমান দুইয়েরই অবদান আছে। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচয়িতা দীনেশচন্দ্র সেন যেমন বলেছিলেন, ‘বাঙ্গালার জনসাধারণ বলিতে কাহাদিগকে বুঝিতে হইবে?’ নিজেই সে প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন দীনেশচন্দ্র, ‘ইহারা জৈন নহেন, বৌদ্ধ নহেন, খৃষ্টান নহেন, হিন্দু নহেন, মুসলমান নহেন– ইঁহারা বাঙ্গালী।’ বাঙালি সভ্যতার গ্রহণশীলতা আর প্রশ্ন-প্রবণতা দুই-ই আছে। যে গুণগুলি একসময় বড়ো রকমের স্বীকৃতি পেয়েছে। তার থেকে বিচ্যুত হলে, সেগুলি ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। এটা পশ্চাৎমুখী চিন্তা নয়। নজরুলের ভাষায় বিদ্রোহী চিন্তার মধ্যেও অতীতের ঐতিহ্যের স্বীকার খুবই প্রয়োজন। তাছাড়া, সঙ্গত প্রশ্ন হল: কারা দেশদ্রোহী? কারা দেশপ্রেমিক? সাভারকার, বাজপেয়ীর মতো যাঁরা মুচলেকা দিয়েছিলেন, যাঁরা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ধরিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁরা দেশপ্রেমিক? না কি ভগৎ সিং, লক্ষী সায়গলরা দেশপ্রেমিক? গীতা, গ্রন্থ সাহিব নয়। ফাঁসির ঠিক আগে ভগৎ সিং পড়ছিলেন লেনিন। তবে কি ভগৎ সিংয়ের দেশপ্রেমে খামতি ছিল? তিনি কি দেশদ্রোহী! স্বাধীনতা সংগ্রামে যাদের ন্যূনতম কোনও অবদান নেই, উলটে ব্রিটিশরাজকে সহযোগিতা করেছে— তারা দেশপ্রেমিক? না কি ক্ষুদিরাম, সূর্য সেন, কল্পনা দত্তরা দেশপ্রেমিক? যে সঙ্ঘ পরিবার ব্রিটিশ শাসকদের দালালি করেছে, তারা দেশপ্রেমিক? না কি যে মুসলিমরা ব্রিটিশ জমানার বিরোধিতা করেছেন, রক্ত ঝরিয়েছেন, তাঁরা দেশপ্রেমিক? দেশের সরকারি কলকারখানা যারা জলের দরে বিদেশিদের হাতে তুলে দিচ্ছে, জল-জঙ্গল-খনির অবাধ লুটের সুযোগ করে দিচ্ছে, তারা দেশদ্রোহী নয় তো কারা দেশদ্রোহী? যারা বিপুল অংকের করের টাকা গায়েব করে দিচ্ছে, যারা কালো টাকা লুকিয়ে রেখে পিঠটান দিচ্ছে, তারা জাতীয়তা-বিরোধী নয়তো, কে জাতীয়তা-বিরোধী? আসলে ‘দেশপ্রেম’ আর ‘জাতীয়তাবাদ’ শব্দ দু’টিকে সাধারণভাবে সমার্থক মনে হলেও, মোটেই এক নয়। আবার দেশপ্রেম আর ‘দেশভক্তি’-ও এক নয়। ‘প্রেমে’র মধ্যে থাকে দ্বন্দ্ব-বিরোধ। অন্যদিকে, ‘ভক্তির’ মধ্যে থাকে নিঃশর্ত আনুগত্য, প্রশ্নহীন সমর্পণ। আমরা প্রেমের পক্ষে। ভক্তিতে নেই। দেশপ্রেমে নিবেদন থাকে। থাকে না অন্যের প্রতি বিদ্বেষ কিংবা হিংসা। যে দেশে লেখা হয়েছিল ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য’, হিন্দুত্বের এই জাতীয়তাবাদে সে দেশের এক বিরাট অংশের মানুষকে না কি এখন চলতে হবে ফতোয়া মেনে, ‘নত শিরে’। ঘরে বাইরে উপন্যাসে নিখিলেশ এক জায়গায় বলছেন, ‘দেশকে সাদা ভাবে দেশ বলে জেনে যারা সেবা করতে উৎসাহ পায় না, চিৎকার করে মা মা বলে, দেবী বলে মন্ত্র পড়ে, তাদের সেই ভালোবাসা দেশের প্রতি তেমন নয়, যতটা নেশার প্রতি।’ কিংবা বিমলার আত্মকথনে স্বামী নিখিলেশের যে মনোভাব রবীন্দ্রনাথ ব্যক্ত করেছেন: ‘তিনি (নিখিলেশ) বলতেন, দেশকে আমি সেবা করতে রাজি আছি, কিন্তু বন্দনা করব যাঁকে তিনি ওর চেয়ে অনেক উপরে। দেশকে যদি বন্দনা করি তবে দেশের সর্বনাশ হবে।’ রবীন্দ্রনাথের দেশপ্রেম হলো তাঁর মানবতাবাদ। সব ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের মানুষকে অকৃত্রিম ভালোবাসা। পক্ষান্তরে এই পৃথিবীর সকল মানুষকে ভালোবাসা। আমরা তাই দেশপ্রেমিক। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিকতাবাদী। বাঙালির চিন্তাধারার পরম্পরার মধ্যে যে দিকগুলি নজর করার মতো, তার মধ্যে একটি গুণ হল বাঙালি সভ্যতার গ্রহণশক্তি এবং সমন্বয়প্রীতি। অন্যদের সংস্কৃতি গ্রহণ, নতুন সংস্কৃতি চয়ন ও গ্রহণের ক্ষেত্রে নিজের ইতিহাস ও পরম্পরাকে ধারণ করা। ‘আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া/ বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া।’ প্রকাশের তারিখ: ০৩-নভেম্বর-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |