|
কাকাবাবুর কথায় যা মনে আসেহরেকৃষ্ণ কোঙার |
তিনি শুধু কমিউনিস্ট আন্দোলনের পথিকৃৎই ছিলেন না, তিনি সেই আদর্শে নিজেকেও ব্যক্তিগতভাবে গড়ে তুলেছিলেন। মনে হয় যেন সহজভাবেই তিনি তা করতে পেরেছিলেন। কমিউনিস্ট হতে হলে নিজেদের "শ্রেণিচ্যুত" (ডিক্লাসড) করতে হবে বুর্জোয়া সমাজের প্রভাব হতে নিজেদের মুক্ত করে বিপ্লবী শ্রমিকশ্রেণির গুণাবলী আয়ত্ত করতে হবে, নিজেদের স্বভাব, চালচলন, ব্যবহার সেই মতো ঢেলে সাজাতে হবে- এই কথাগুলি আমরা জানি। কিন্তু এগুলি নিজেদের জীবনে কতটুকু করতে পেরেছি তাই হল বড় কথা। এ বিষয়ে অনেক ফাঁক রয়ে গেছে। কিন্তু কাকাবাবুর জীবনে আমরা এগুলির সার্থক প্রয়োগ দেখতে পাই। |
নভেম্বর বিপ্লবের বজ্রনির্ঘোষ বর্তমান শতাব্দীর বিশ দশকে যখন আমাদের দেশে সাম্যবাদের আদর্শকে বয়ে নিয়ে এল তখন যে মানুষটি তাকে ঠিকমত ধরতে পেরেছিলেন এবং সারা জীবন নিষ্ঠার সঙ্গে তাকে আঁকড়ে রেখেছিলেন, যিনি নিজের সমগ্র ব্যক্তিসত্তাকে সেই আদর্শের উপযোগী করে গড়ে তুলেছিলেন, যিনি কোনদিন সে আদর্শ হতে নিজেকে বিচ্যুত হতে দেন নাই, যিনি সেই আদর্শকে চিন্তার স্তর হতে শ্রমিক-কৃষক ও জনগণের সংগঠিত বিপ্লবী আন্দোলনের মধ্যে রূপ দিয়েছেন এবং সারা জীবনের সাধনার মধ্য দিয়ে শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে পরিচালিত গণমুক্তির এক বিপ্লবী বাহিনী সৃষ্টি করে গেছেন তিনিই হলেন আমাদের শ্রদ্ধেয় মুজফ্ফর আহ্মদ, আমাদের সকলের প্রিয় কাকাবাবু। অন্যান্য অনেকের মত আমি নিজেও কাকাবাবুর সৃষ্ট সেই বাহিনীর একজন সৈনিক মনে করে গর্ববোধ করি। কাকাবাবুর জীবনের বিভিন্ন দিক, তাঁর অবদান ও তাঁর শিক্ষা সম্বন্ধে অনেকে লিখেছেন ও লিখবেন, তাঁর বিভিন্ন সময়ের মূল্যবান লেখাগুলিকে সংকলিত করার সিদ্ধান্ত আমাদের পার্টির রাজ্য কমিটি হতে নেওয়া হয়েছে। তাই এই সব বিষয়ের কোন কিছুতে আমি যাব না। আমি নিজে প্রধানত কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত, তাই এই বিষয়ে কাকাবাবুর মহান অবদানকে আমি শ্রদ্ধাবনতচিত্তে স্মরণ করি। আমার ধারণা আমাদের দেশে তিনিই প্রথম কৃষকদের সংগঠিত করার তাৎপর্য এবং কৃষক আন্দোলনের রূপরেখা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। শ্রমিকশ্রেণির সহযোগী হিসাবে কৃষকদের সংগঠিত করতে হবে এবং তাদের আন্দোলনকে অর্থনীতিবাদের গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ রাখলে চলবে না, জমিদারী ব্যবস্থার মূলোৎপাটনের জন্য সমাজ বিপ্লবের আদর্শে কৃষকদের রাজনীতিগতভাবে সচেতন করতে হবে, শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে তাদের বিপ্লবী শক্তি হিসাবে সংগঠিত করতে হবে। আপ্তবাক্য হিসাবে এই কথাগুলিকে আজ আমরা সহজভাবে গ্রহণ করি। কিন্তু বিশ-তিরিশ দশকের যুগে এই কথাগুলি এমনিভাবে বলা সহজ ছিল না। আমি জানি না কাকাবাবুর আগে আর কেউ এমনি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন কি না। কাকাবাবু শুধু নীতি প্রচার করেন নাই, একে বাস্তবে রূপ দিতে, এই ভিত্তিতে সক্রিয়ভাবে কৃষক আন্দোলন গড়ে তুলতে তিনি চেষ্টা করেছেন। যতদিন মাঠে ময়দানে কাজ করার শারীরিক ক্ষমতা তাঁর ছিল ততদিন তিনি এই সাধনা করে গেছেন। ১৯৬৯ সালে বড়শূল কৃষক সম্মেলনে তিনি শেষ যোগ দিতে পেরেছিলেন। ভারতে বিপ্লবী কৃষক আন্দোলন সৃষ্টিতে এবং তার পথনির্দেশে কাকাবাবুর অবদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই বিষয়েও আজ আমি বেশি কিছু লিখতে চাচ্ছি না। তবে অকপটে স্বীকার করব যে, কাকাবাবু যে সঠিক পথের নির্দেশ দিয়েছেন এবং যার ভিত্তি নিজেই তৈরি করেছেন তাকে আমরা বেশ খানিকটা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারলেও এ বিষয়ে আমাদের যথেষ্ট দুর্বলতা ও অপূর্ণতা রয়েছে, কাকাবাবুকে স্মরণ করে এই শপথই আজ গ্রহণ করব যে এই দুর্বলতা দূর করার জন্য আমরা সর্বতোভাবে চেষ্টা করব। কমরেড মুজফ্ফর আহমদের চরিত্রের গুণাবলীর মধ্যে আমরা কমিউনিস্ট হিসাবে এক আদর্শ মানুষকে দেখতে পাই। তিনি শুধু কমিউনিস্ট আন্দোলনের পথিকৃৎই ছিলেন না, তিনি সেই আদর্শে নিজেকেও ব্যক্তিগতভাবে গড়ে তুলেছিলেন। মনে হয় যেন সহজভাবেই তিনি তা করতে পেরেছিলেন। কমিউনিস্ট হতে হলে নিজেদের "শ্রেণিচ্যুত" (ডিক্লাসড) করতে হবে বুর্জোয়া সমাজের প্রভাব হতে নিজেদের মুক্ত করে বিপ্লবী শ্রমিকশ্রেণির গুণাবলী আয়ত্ত করতে হবে, নিজেদের স্বভাব, চালচলন, ব্যবহার সেই মতো ঢেলে সাজাতে হবে- এই কথাগুলি আমরা জানি। কিন্তু এগুলি নিজেদের জীবনে কতটুকু করতে পেরেছি তাই হল বড় কথা। এ বিষয়ে অনেক ফাঁক রয়ে গেছে। কিন্তু কাকাবাবুর জীবনে আমরা এগুলির সার্থক প্রয়োগ দেখতে পাই। কমিউনিস্ট হিসাবে আদর্শনিষ্ঠা, সাহস ও দৃঢ়তা, শত্রুর প্রতি ঘৃণা, জনগণের প্রতি ভালবাসা সহজ সারল্য, আত্মপ্রচার বিমুখতা, সমষ্টিগত চিন্তা, শৃঙ্খলাবোধ কমরেডদের প্রতি দরদ সবকিছুই তাঁর মধ্যে মূর্ত ছিল। এত গুণের যোগাযোগ একই সাথে একই ব্যক্তির মধ্যে যা খুব সহজ নয় তাই দেখেছি কাকাবাবুর মধ্যে। তাই তিনি মহান। বিশ দশকের প্রথম দিকে যখন দেশে বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রভাব ও মধ্যবিত্তসুলভ সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের প্রভাব রাজনীতিতে আগ্রহী মানুষের মনকে দু'দিকে টেনেছে, তখন এই দুইয়ের প্রভাব কাটিয়ে কমিউনিস্ট মতবাদকে সঠিক বলে গ্রহণ করা এবং গভীর আত্মবিশ্বাস নিয়ে সেই আদর্শে জনগণকে সংগঠিত করা, মোটেই সহজ ও স্বাভাবিক ছিল না। তখনকার রাজনীতির স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে কাকাবাবু আত্মবিশ্বাস ও ভবিষ্যৎ দৃষ্টি নিয়েই এই কাজেই নেমেছেন। সহজ অগ্রগতি বা জয়ের অলীক আশা তাঁর ছিল না। তিনি জানতেন যে কঠিন কঠোর বন্ধুর পথে তাঁকে যেতে হবে। বিজ্ঞানীর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তিনি এগিয়েছেন। ভাবাবেগে বিহ্বল হতে, আশু সাফল্যে আত্মহারা হতে বা কঠিন পরিস্থিতিতে বিচলিত হতে তাঁকে কোনদিন দেখিনি বা এ সম্বন্ধে কোনদিন কিছু শুনিনি। আত্মীয় পরিজন হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে সারাজীবন একাগ্রচিত্তে তিনি সাধনা করে গেছেন। তাঁর সাহস, দৃঢ়তা ও স্বচ্ছদৃষ্টি ছিল অপূর্ব। কঠিন রোগ আক্রমণ করে তাঁকে কোনদিন দুর্বল করতে পারেনি। মীরাট মামলায় আসামীর কাঠগড়ার দাঁড়িয়ে তিনি সাম্রাজ্যবাদকে যেভাবে অভিযুক্ত করেছেন এবং সাম্যবাদের আদর্শকে তুলে ধরেছেন তার তুলনা ইতিহাসে বিরল। আদর্শনিষ্ঠা ও শ্রেণিদৃষ্টিভঙ্গি ছিল তাঁর প্রখর। সংস্কারবাদী বা হঠকারী বিচ্যুতি তাঁকে কোনদিন আচ্ছন্ন করতে পারেনি। ১৯৪২-৪৪ সালের সংস্কারবাদী বিচ্যুতি বা ১৯৪৮-৫০-এ হঠকারী বিচ্যুতি যখন পার্টিকে গ্রাস করেছিল, তখন তিনি তাতে গা ভাসান নাই। এই সময়ে তিনি যে অসুখী ছিলেন তা যাঁরাই তাঁর সংস্পর্শে এসেছেন তাঁরাই জানেন। কিন্তু তাঁর পার্টি শৃঙ্খলাবোধ ছিল অপূর্ব। পার্টির ভুল হয়েছে, বিচ্যুতি হয়েছে, কিন্তু যেহেতু পার্টি ছিল বিপ্লবী পার্টি তাই বিশ্বস্ত সৈনিকের মত তিনি পার্টির শৃঙ্খলাকে সহজভাবে মেনে চলেছেন। কিন্তু যখন সংশোধনবাদী নেতৃত্ব পার্টিকে দখল করে শ্রমিকশ্রেণির পার্টিকে শেষ করে দিতে চেয়েছে তখন তিনি তার বিরুদ্ধে বলিষ্ঠভাবে দাঁড়িয়েছেন। ১৯৫৯-৬৪তে যখন আমরা সংশোধনবাদী নেতৃত্বের ধ্বংসমূলক কাজ হতে পার্টিকে বাঁচাবার জন্য সংগ্রাম করেছি তখন তিনি ছিলেন আমাদের উৎসাহ ও প্রেরণাদাতা। কাকাবাবু ছিলেন পার্টির প্রতিষ্ঠাতা, কমিউনিস্ট আন্দোলনের পথিকৃৎ, কমিউনিস্ট আন্দোলনে তাঁর অবদান অসামান্য। কিন্তু তাঁর মধ্যে সামান্যতম আত্মশ্লাঘা কোনদিন দেখা যায় নাই। নিজেকে জাহির করা বা প্রচার করা তাঁর স্বভাবের বাইরে। সবসময়ে তিনি নিজেকে পিছনে রেখেছেন এবং পার্টি ও আদর্শকে সামনে রেখেছেন। পার্টির প্রয়োজনে যখন আমরা তাঁর জন্মদিবস পালনের সিদ্ধান্ত করি তখন তাঁর সম্মতি পেতে আমাদের অনেক বেগ পেতে হয়েছিল। আমলাতান্ত্রিকতা বা আত্মকেন্দ্রিকতার সামান্যতম লক্ষণ তাঁর মধ্যে দেখেছেন - এমন কথা কেউ বলতে পারবেন না। তিনি ছিলেন এই সবের বিরুদ্ধে মূর্তিমান নীরব প্রতিবাদ। আত্মশ্লাঘার ঠিক বিপরীত হল অতি-বিনয়তা, এটাও কাকাবাবুর ছিল না। সত্যকার কমিউনিস্টসূলভ সারল্য ও পার্টিগত চিন্তার তিনি ছিলেন মূর্ত প্রতীক। কোনো কমিউনিস্টের পক্ষেই এই গুণগুলি আয়ত্ত করা সহজ নয় অনেক সাধনার সচেতন প্রচেষ্টায় তা অর্জনের চেষ্টা করতে হয়। কিন্তু কাকাবাবুর কাছে এগুলি ছিল যেন সহজাত। কাকাবাবুর বহুমুখী প্রতিভা ও তাঁর শিক্ষা সম্বন্ধে এই ছোট প্রবন্ধে আমি কিছু লেখার চেষ্টা করি নাই। তাঁর চরিত্রের মাত্র দু-একটি বৈশিষ্ট্য, যা এই মূহূর্তে আমার চোখের সামনে ভেসে উঠেছে, যা প্রত্যেকটি কমিউনিস্ট কর্মীর কাছে অপরিসীম তাৎপর্যপূর্ণ বলে আমার মনে হয়েছে, তাই লিখলাম। যে আদর্শের জন্য কাকাবাবু তাঁর সারা জীবন উৎসর্গ করে গেছেন, তাকে বাস্তবায়িত করার জন্য ভারতের শ্রমিকশ্রেণি ও জনসাধারণ কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে আজ এগিয়ে চলেছে। এমনি দিনে কাকাবাবুর স্মৃতিকে সামনে রেখে নিজেদের প্রস্তুত করার জন্য নূতন করে শপথ নিলাম।
কমরেড মুজফ্ফর আহ্মদের জীবনাবসান ঘটে ১৯৭৩ সালের ১৮ই ডিসেম্বর। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কমরেড হরেকৃষ্ণ কোঙার ১৯৭৪ সালের জানুয়ারি মাসের 'নন্দন' সাহিত্য পত্রিকায় এই প্রবন্ধটি লেখেন। এ বছরেরই জুলাই মাসে কমরেড হরেকৃষ্ণ কোঙারের জীবনাবসান ঘটে। কমরেড মুজফ্ফর আহ্মদের স্মৃতির উদ্দেশে কমরেড হরেকৃষ্ণ কোঙারের শ্রদ্ধার্ঘটি পুনঃপ্রকাশ করা হল। প্রকাশের তারিখ: ০৫-আগস্ট-২০২৪ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |