কার কৌশলে কে জেতে!

প্রসূন ভট্টাচার্য
কিন্তু যখন রাজনৈতিক দলগুলি সেই পদ্ধতি ব্যবহার করছে তখন রাজনৈতিক দলও যে আসলে ‘মুনাফা’ করার বাজারে নেমেছে সে-কথাটা আর নিছক অনুমান, সন্দেহ, অভিযোগ হিসাবে থাকে না, তত্ত্বগতভাবেও প্রমাণিত ও স্বীকৃত হয়। রাজনীতি তো ব্যবসা নয়, তাহলে ‘মুনাফা’ আসে কোথা থেকে? সোজা কথায়, ভোটে জিতে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর লুট দুর্নীতির মাধ্যমে।

‘হ্যালো! আমি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্রী। গবেষণা পত্রের একটি সমীক্ষার জন্য আপনার কাছে জানতে চাইছি, গত নির্বাচনে আপনি কাকে ভোট দিয়েছিলেন?’

এই ধরনের ফোন কল নিশ্চয়ই আপনি ইতিমধ্যেই পেয়ে গিয়েছেন। যদি নাও পেয়ে থাকেন, আপনার পরিচিতরা যে পেয়েছেন তা নিশ্চয়ই জেনে গিয়েছেন। কোন কোন রাজনৈতিক দলের বরাত পাওয়া ভোট কুশলী কোম্পানিগুলো এই ধরনের ফোন করাচ্ছে তা নিয়েও নিশ্চয়ই কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু আপনি কি সত্যিই এই কোম্পানিগুলির শক্তি ও কার্যধারা সম্পর্কে যথেষ্ট অবহিত?

প্রশ্নটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভারতের রাজনীতিকে এরাই এখন নিয়ন্ত্রণ করতে নেমেছে। 

যারা কেবল চিরাচরিত ধারার রাজনীতির সঙ্গে পরিচিত তাঁরা হয়তো ভাবছেন, রাজনৈতিক দলগুলি তাদের নিজস্ব মতাদর্শের ভিত্তিতে নিজস্ব নেতাদের সামনে রেখে নিজস্ব কৌশলে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে, জনগণ যাকে সমর্থন করে তার ভিত্তিতে কেউ জেতে, কেউ হারে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক থেকে এই ধারায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে। রাজনৈতিক দলকে পরিচালনা করছে কর্পোরেট স্ট্র্যাটেজিস্ট কোম্পানি। এটা নিছক কিছু টাকার বিনিময়ে কনসালটেন্সি বা পরামর্শদান নয়, এটা বিপুল টাকার বিনিময়ে ভোটে জেতানোর শর্তে রাজনৈতিক দল ও তাদের কাজকর্মকে সম্পূর্ণ পরিচালনার অধিকার। 

যে কর্মকৌশল ও পদ্ধতি এক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় তা সাধারণভাবে নতুন নয়। এগুলি বিভিন্ন বড়ো বড়ো কোম্পানি তাদের পণ্য ও পরিষেবা বিক্রয়ের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু সেগুলি ছিল বাণিজ্যিক মুনাফার লক্ষ্যে। বাজার থেকে বিপুল পরিমান তথ্য সংগ্রহ করা, সেই তথ্যের বিশ্লেষণ করে বাজার ও ভোক্তাদের যথাসম্ভব বোঝা, সেই পরিপ্রেক্ষিতে কোম্পানির পণ্য ও পরিষেবা বিক্রি বৃদ্ধির নির্দিষ্ট স্ট্র্যাটেজি নির্ধারণ করা এবং সেই স্ট্র্যাটেজির রূপায়নের জন্য প্রচার ও অন্যান্য কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে ভোক্তাদের মনোভাবে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটানো। কোম্পানি এর জন্য কত টাকা খরচ করবে তা নির্ভর করে কোম্পানি এর মাধ্যমে বিক্রি বাড়িয়ে কত টাকা মুনাফা করতে পারবে তার ওপরে।

কিন্তু যখন রাজনৈতিক দলগুলি সেই পদ্ধতি ব্যবহার করছে তখন রাজনৈতিক দলও যে আসলে ‘মুনাফা’ করার বাজারে নেমেছে সে-কথাটা আর নিছক অনুমান, সন্দেহ, অভিযোগ হিসাবে থাকে না, তত্ত্বগতভাবেও প্রমাণিত ও স্বীকৃত হয়। রাজনীতি তো ব্যবসা নয়, তাহলে ‘মুনাফা’ আসে কোথা থেকে? সোজা কথায়, ভোটে জিতে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর লুট দুর্নীতির মাধ্যমে।

তাহলে ভোট কুশলী কোম্পানিকে বরাত দিয়ে টাকা ঢাললে জনমত পরিবর্তন করে ভোটে জেতা যায়? প্রযুক্তি, বিশেষত কমিউনিকেশন প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নতির সুযোগে এটা বাস্তবতা। আইপ্যাক-সহ যে কোনও কোম্পানির ওয়েবসাইটে যান, তাদের কর্ণধারদের বক্তব্যগুলো পড়ুন ও শুনুন। মোদ্দা কথা যা তারা বলছে, ‘আমাদের কাছে জ্ঞান, প্রযুক্তি ও পরিকাঠামো রয়েছে— যা ব্যবহার করে আমরা যে কোনও রাজনৈতিক নেতা ও সংগঠনের অনুকুলে জনমত সংগঠিত করে তুলতে পারি। কিন্তু এটা ভুল ধারণা যে আমরা ক্লায়েন্টদের নিছক পরামর্শ দিয়ে থাকি। কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করার জন্য আমরাই স্ট্র্যাটেজি তৈরি করি ও তা অনুসরণ করে ক্লায়েন্টদের পদক্ষেপ নিতে বলি। সাফল্য শুধু আমাদের স্ট্র্যাটেজির ওপরেই নির্ভর করে না, তা রূপায়নে আমাদের নির্দেশ ক্লায়েন্ট সঠিকভাবে পালন করছে কিনা তার ওপরেও নির্ভর করে।’ 

তাহলে সব মিলিয়ে কী দাঁড়ালো? টাটা বিড়লা গোয়েঙ্কা আদানি আম্বানিদের কোম্পানিগুলো যখন এই কাজটাই করে তখন সেটা কর্পোরেট স্ট্র্যাটেজি। এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছনোর মতো সেখানে লক্ষ্য স্থির, যেনতেন প্রকারেণ মুনাফা নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক দল যখন একইভাবে বিপুল টাকা ঢেলে ভোট কুশলী সংস্থাকে নিয়োগ করছে তখনও তাই, যেনতেন প্রকারেণ জয় নিশ্চিত করতে। জয়ের পরে দুর্নীতি, সেখান থেকেই তাদের ‘মুনাফা’ আসবে। 

সবার প্রথম বলি কাকে দেওয়া হল? মতাদর্শ। রাজনৈতিক দলের মতাদর্শের আর কোনও গুরুত্ব রইল না। সেনাবাহিনীর মতো ওপর থেকে নিচে কম্যান্ড ফলো করাই এখানে দস্তুর, রাজনৈতিক দলকেও ভোট কুশলী সংস্থার সমস্ত নির্দেশ মান্য করে চলতে হবে, জয় ছিনিয়ে আনার জন্য। ভোট কুশলী সংস্থার পদ্ধতিতে এখানে দূষণ অনিবার্য। জনস্বার্থবাহী, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার সম্প্রসারণের রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠা করতে গেলে তার থেকে ‘মুনাফা’ লোটা সম্ভব নয়। আর ‘মুনাফা’ লোটা রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠা করে ভোট কুশলী সংস্থার লুটের ভাগীদারী নিশ্চিত করতে গেলে জনসাধারণ, বিশেষত শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব নয়। 

পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূলের মতো আঞ্চলিক দল যাদের নির্দিষ্ট কোনও রাজনৈতিক মতাদর্শই নেই, এক্ষেত্রে তাদের কোনও সমস্যাও নেই। বস্তুত, রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের দাবি, তৃণমূল গত পনেরো বছরে ক্রমশ রাজনৈতিক দল থেকে একটি কর্পোরেট রাজনৈতিক কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে— যার প্রতিটি পদক্ষেপ নির্ধারিত হয় দলীয় বৃত্তের বাইরে, আইপ্যাকের অফিসে। মমতা ব্যানার্জি ও তাঁর ভাইপো আইপ্যাককে যে এক্তিয়ার দিয়েছেন তাতে তৃণমূলের বাকি সমস্ত নেতা থেকে জনপ্রতিনিধি এমনকি মন্ত্রীরাও আসলে ওই কোম্পানির হুকুম পালনের সৈনিকে পরিণত হয়েছেন। এমনকি সংবিধান বহির্ভূতভাবে প্রশাসনিক অফিসের ভিতরেও কাজ করছে আইপ্যাকের হাত। মতাদর্শহীন একটি দল এভাবেই আইপ্যাক-পার্টিতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু বিজেপি কিংবা কমিউনিস্ট পার্টিগুলির ক্ষেত্রে? তাদের তো নির্দিষ্ট মতাদর্শ রয়েছে। পরস্পরের সম্পূর্ণ বিপরীত মতাদর্শ, হলেও মতাদর্শই তাদের চালিকা শক্তি। তাদের ক্ষেত্রে? কে ওপরে থাকবে: পার্টি নাকি ভোট কুশলী সংস্থা?

ঠিক এই কারণেই কোনও কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষে কখনোই আইপ্যাকের মতো কোনও কোম্পানিকে নিয়োগ করে তার পূর্ণ আনুগত্য মেনে রাজনীতি করা সম্ভব নয়। উলটো দিক থেকে যে কমিউনিস্ট পার্টি মতাদর্শগত কারণে ‘মুনাফা’র রাজনীতি করা আইপ্যাকের মতো সংস্থাকে বিপুল ফি মেটাতে পারবে না, তাদের হয়ে কাজ করাও কোনও ভোট কুশলী সংস্থার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু সমাজের বস্তুগত পরিস্থিতি নির্ধারণে এবং তার পরিবর্তনের লক্ষ্যে কমিউনিকেশন প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নতিকে ব্যবহার করা কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষেও অবশ্যই সম্ভব, তবে ভিন্ন পদ্ধতিতে। লেনিন এবং মাও জে দঙের শিক্ষা— একাজ করা উচিতও। তাঁরা তাঁদের সময়কালের কমিউনিকেশন কৌশল ও প্রযুক্তিকে দৃষ্টান্তমূলকভাবে ব্যবহার না-করলে হয়তো সেখানে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবই সফল হত না।

বিজেপির ক্ষেত্রে বিষয়টা এমন নয়। তাদের সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্ব যাকে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী মতাদর্শ বলা চলে, তার সঙ্গে ‘মুনাফা’র কোনও সংঘাতই নেই। প্রকৃতপক্ষে এমন ফ্যাসিবাদী শাসনে দুর্নীতি ও কর্পোরেট লুট অবাধ হয় বলেই মুনাফা আরও বৃদ্ধি পায়। এই কারণে আরএসএস বিজেপির মতাদর্শ নিয়ে ভোট কুশলী সংস্থাগুলির এগোতে কোনও সমস্যাই নেই। বিজেপি প্রক্রিয়াটিকে আরও নিখুঁত করতে নিজেরাই সংস্থা তৈরি করে নিয়েছে। শেষপর্যন্ত দেশের শাসকদলের হাতে তো আর মুনাফার টাকার কোনও ঘাটতিই নেই। তাই টাকার জোরে প্রযুক্তির অপব্যবহারে, সুষমা স্বরাজ, অরুণ জেটলি কিংবা আদবানি বেঁচে থাকতেই তারা গুজরাট থেকে কুখ্যাত নরেন্দ্র মোদীকে দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করিয়ে ছাড়তে পারে। সাম্প্রদায়িকতা আর কর্পোরেট লুট এখানে পরস্পরকে হাত ধরাধরি করে টেনে তোলে।

পশ্চিমী ধনতান্ত্রিক দেশগুলিতে নাগরিকরা অধিকার সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে অনেক সচেতন। সেখানে জনসাধারণের ব্যক্তিগত তথ্যের যথেচ্ছ ব্যবহার কিংবা জনমত নির্মাণে কর্পোরেট পুঁজির যথেচ্ছ কারবার নিয়ে বিদগ্ধ জনসমাজে অন্তত বিতর্ক আছে। রাষ্ট্রের তরফে এই ধরনের কারবার নিয়ন্ত্রণে অন্তত কিছু আইনও আছে। কিন্তু ভারতে এই নিয়ে কোনও আইন নেই, ভোট কুশলী সংস্থাগুলির কর্মপদ্ধতি নিয়ন্ত্রণে কোনও আইনী কাঠামোও নেই। তারা দেদার বেআইনী কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে যা দেশের গণতন্ত্রকে ধংস করছে। 

একটি সাবান কিংবা কোল্ড ড্রিঙ্ক কোম্পানিকেও পণ্য মার্কেটিং কমিউনিকেশনের ক্ষেত্রে বহু নীতি ও আইন মেনে কাজ করতে হয়। কিন্তু ভোটকুশলী সংস্থাগুলি বেপরোয়া। তারা কিছুই মানছে না। কারণ তারা যাদের জন্য বেআইনী কাজগুলি করছে তারাই ক্ষমতাসীন থাকছে। 

দারোগার জন্য চুরি করতে বের হলে চোরের কি আর কোনও ভয় থাকে?


প্রকাশের তারিখ: ১৪-মার্চ-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org