কার্ল মার্কস এবং তাঁর ইতিহাস চেতনা

ইরফান হাবিব
ঐতিহাসিক ঘটনাদি আয়ত্ত করা যায় এবং সেই ঘটনাদির উন্মোচন, নির্বাচন ও ব্যাখার মাধ্যমে অতীত সম্পর্কে আমরা আমাদের জ্ঞানকে নিখুঁত করতে পারি। তিনি ইতিহাসের যথার্থতা সম্পর্কে মার্ক ব্লচের ধারণাকেও সমানভাবেই সমর্থন জানান, যেখানে মার্ক ব্লচ বলেছেন যে, ইতিহাসের যথার্থতা প্রকাশ পায়, কি কাজে তা ব্যবহার করা হচ্ছে তার উপর।

 

কার্ল মার্কসের দ্বিশতজন্মবর্ষ আমরা পালন করছি। এই মহান ব্যক্তির চিন্তাধারা অনুসরণ করে এবং সেই পথে কাজ করেই আমরা পারি তাঁকে সর্বোৎকৃষ্টভাবে শ্রদ্ধা জানাতে। তাঁর চিন্তাধারার মূলগত ভিত্তি ছিল ইতিহাস সম্পর্কে তাঁর ধারণা। আমাদের দেশ এবং বিশ্বব্যাপী মানুষের কাছে ইতিহাস সম্পর্কে তাঁর ধারণা বা চিন্তাধারা অত্যন্ত জীবন্ত এক অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতা হলো- মানবজাতির অতীতের সমগ্র অভিজ্ঞতা থেকে কিভাবে আমরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি এবং মানবসমাজের গতিধারার প্রবণতা সম্পর্কে বোঝাপড়াকে কাজে লাগিয়ে কিভাবে আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার পথে অগ্রসর হতে পারি।

ইতিহাসবিদ্যার আধুনিক প্রখ্যাত তত্ত্ববিদেরা যেভাবে তাত্ত্বিক বিষয়ে নিশ্চিত হন ঠিক সেভাবেই মার্কসও এগিয়েছেন। ইতিহাসবিদ ই এইচ কার বলেছেন : 'ঐতিহাসিক ঘটনাদি আয়ত্ত করা যায় এবং সেই ঘটনাদির উন্মোচন, নির্বাচন ও ব্যাখার মাধ্যমে অতীত সম্পর্কে আমরা আমাদের জ্ঞানকে নিখুঁত করতে পারি। তিনি ইতিহাসের যথার্থতা সম্পর্কে মার্ক ব্লচের ধারণাকেও সমানভাবেই সমর্থন জানান, যেখানে মার্ক ব্লচ বলেছেন যে, ইতিহাসের যথার্থতা প্রকাশ পায়, কী কাজে তা ব্যবহার করা হচ্ছে তার উপর। ইতিহাস নিরবচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়, বরং তা হলো আমাদের প্রকৃত অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন যার মাধ্যমে আমরা ভবিষ্যতের কর্মধারাকে সুনির্দিষ্ট রূপ দিতে পারি। সেই সুদূর ১৮৪৫ সালে মার্কসও একই কথা বলেছেন:

‘দার্শনিকেরা নানাভাবে বিশ্বের ব্যাখ্যা দিয়েছেন কিন্তু বিষয়টা হলো একে পাল্টানো’ (ফয়েরবাখের উপর থিসিস)। সুতরাং, প্রধানত আমাদের কর্মধারা এবং বর্তমান সময়ের কর্ম অনুশীলনকে যথাযথ রূপ দেওয়ার জন্যই ইতিহাস পাঠ করি আমরা। এই ইতিহাস অতীতে বিরাজমান পরিস্থিতি এবং সেই প্রেক্ষিতে তখনকার সময়ে তার প্রয়োগেরই মূলত রেকর্ড।

ইতিহাসকে দু’ভাবে ব্যবহার করা যায়। প্রথমটা হলো, অতীতের প্রধানত রাজনৈতিক অথবা সাংস্কৃতিক ঘটনাগুলির তথ্য বর্ণনা দেওয়া। অতীতের লেখকরা এরকমভাবেই বর্ণনা দিতেন। এর অর্থ হলো, বর্তমানের তুলনায় অতীতের এক সম্পূর্ণ ভিন্ন সামাজিক ও বৌদ্ধিক পরিবেশে ঘটে যাওয়া ঘটনা এবং যুগগুলিকে পূর্বসূরিদের চশমা দিয়ে দেখা। সেই সময়কার পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁদের বোঝাপড়ার সঙ্গে বর্তমান সময়ে পরিস্থিতি খুব কমই মিলবে এবং ফলত সেই শিক্ষা খুব কমই কাজে লাগবে। এ বিষয়টায় পেশাদার ঐতিহাসিকরা প্রায়শই জোর দেন যখন তাঁরা ইতিহাসের উৎসগুলোর গুণগত বক্তব্যগুলিকে বাতিল করেন। মার্কসও একই যুক্তি দেন যখন তিনি বলেন, ‘যেমন একজনকে বিচার করা যায় না সেই ব্যক্তি নিজের সম্পর্কে কি ভাবেন তা দ্বারা, ঠিক তেমনই অতীতের পরিবর্তনের সময়টাকে সেই সময়কার চেতনা দিয়ে আমরা বিচার করতে পারি না।’ (দ্য ক্রিটিক অব পলিটিক্যাল ইকোনমির ভূমিকা)। দ্বিতীয় পদ্ধতি হলো, মানব ইতিহাসের বিশ্বজনীন সাধারণ ব্যাখ্যার সঙ্গে কোনো দেশের বা অঞ্চলের নিজস্ব ইতিহাসের বর্ণনা মিলিয়ে দেখা। ইতিহাসের বিশ্বজনীন ব্যাখ্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশ বা অঞ্চলের ইতিহাসের নিরন্তর আদানপ্রদানই আমাদের ইতিহাস সম্পর্কে এক সঠিক বোঝাপড়ায় পৌঁছাতে সাহায্য করবে যা ইতিপূর্বে অতীত ইতিহাসে অস্বীকৃত ছিল। এমনকি খ্রিঃ পুঃ ৫ম শতাব্দীর হেরোডোটাসের তথ্যানুসন্ধানের ব্যাপকতা বা চতুর্দশ শতাব্দীর ইবন খালদুনের মতো নিখুঁত মনের ঐতিহাসিকের কাজেও এই অস্বীকৃতি দেখা যায়।

মার্কসের ইতিহাস সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি এসেছে যতটা তিনি জানতে পেরেছেন তার বিশ্বজনীন অভিজ্ঞতার নিষ্কাশনের মধ্য দিয়ে। আধুনিক যুগের দার্শনিকরা বিশেষত হেগেল, যেভাবে অতীতকে আধুনিক বৈজ্ঞানিক আলোকে বিশ্লেষণ বা উন্মোচন করে জ্ঞানের যে সমন্বয় করেছেন মার্কস তাকে অনুসরণ করেছেন এবং প্রকৃত তথ্যের ভিত্তিতে তার নির্যাস তিনি তুলে এনেছেন। যে কোনো ইতিহাস পাঠ করার ক্ষেত্রে এই নির্যাস এক সুসংহত কাঠামো হিসাবে আমাদের সামনে উপস্থিত হয়েছে।

সর্বপ্রথমে মার্কস মনে করেন মানুষের সামাজিক সংগঠনে কাজ করার মূল বৈশিষ্ট্য হলো যে সে তার বস্তুগত চাহিদা পূরণ করার জন্য সদাসর্বদা চেষ্টা চালায়। তার এই অভাব বা চাহিদা পূরণ হয় উৎপাদনের দ্বারা। এবং উৎপাদন করা তখনই কেবলমাত্র সম্ভব যদি নারী ও পুরুষ কোনো সমাজে বাস করে। মার্কস বলেছেন: ‘মানুষের বস্তুজীবনে উৎপাদন মানুষের সামাজিক রাজনৈতিক এবং বৌদ্ধিক জীবনের স্বাভাবিক পদ্ধতিকে নির্ধারণ করে।’ (ক্রিটিক অব পলিটিক্যাল ইকোনমির ভূমিকা)। মার্কসবাদের মূল ভিত্তি হলো এই ধারণা এবং এই কারণে ইতিহাসের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিকে বলা হয় ঐতিহাসিক বস্তুবাদ। ভাববাদী দার্শনিকদের কাছে ইতিহাস ভাব বা স্বর্গীয় অধ্যাদেশ বলে মনে হয়েছে অথবা আরো নিম্নস্তরের কাছে ইতিহাস পরিগণিত হয়েছে সহজাত ধর্মীয় অথবা জাতীয় অধ্যাদেশ হিসাবে। মার্কসবাদ এই দৃষ্টিভঙ্গির সম্পূর্ণ বিরোধী।

পরবর্তীকালে মার্কস মানুষের ইতিহাস-পূর্ব জীবনের অস্তিত্বকে চিহ্নিত করেন। তখন মানুষ উৎপাদন করত না। তারা (শিকার, মাছধরা, ফল সংগ্রহ ইত্যাদির মাধ্যমে) খাদ্য সংগ্রহ করত। মানুষ তখন ছিল প্রাগৈতিহাসিক এক শ্রেণিহীন সমাজে এক গোষ্ঠী হিসাবে (আদিম সাম্যবাদ)। কিন্তু সেই মায়া কৃষিকার্য শুরু হলো, সে ‘উদ্বৃত্ত’ অথবা ‘উৎপাদকের বেঁচে থাকার জন্য যা প্রয়োজন তার তুলনায় সে বেশি উৎপাদন’ করতে শুরু করল। সমাজ তখন দু'টি ভাগে বিভক্ত হলো- একদল যারা উৎপাদন করে এবং অন্যদল যারা উৎপাদনকারীকে উদ্বৃত্ত উৎপাদন ত্যাগ করতে বাধ্য করে। দ্বিতীয় দল বলপ্রয়োগ করে তাদের এই অবস্থান অর্জন করে এবং এর ফলে রাষ্ট্র এবং ব্যক্তি মালিকানার প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে ওঠে। মানুষ দাসের মতো মালিকের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হয়। একইরকমভাবে জমিও ব্যক্তি মালিকানায় চলে আসে। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বস্তুগত চাহিদা পূরণের জন্য মানুষের প্রচেষ্টা শ্রমজীবী মানুষের শ্রমে উৎপন্ন উদ্বৃত্ত দখল করার সংগ্রামের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। এই শ্রমজীবী মানুষ মূলত শ্রমিক এবং কৃষক। মানুষের সমাজও শোষণের সমাজে পরিণত হয় এবং তাই মার্কস ও এঙ্গেলস কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো'তে যথার্থই বলেন ‘সমাজের এতদিনকার প্রচলিত ইতিহাস হলো শ্রেণিসংগ্রামের ইতিহাস।’

যদি উদ্বৃত্ত উৎপাদন সৃষ্টিকারী সব সমাজব্যবস্থার মূল চলমান গ্রন্থি শ্রেণিসংগ্রাম হয়, তাহলে এই সমাজব্যবস্থা এবং তার মধ্যে শ্রেণিগুলির মধ্যেও পরিবর্তন ঘটে চলে। মার্কস মনে করেন যে, নিয়ম কখনোই পালটায় না তা হলো এই যে সবকিছুই পরিবর্তনশীল। উত্তরোত্তর এই পরিবর্তনশীলতা এমন সার্বিক পরিবর্তন সূচিত করে যে, মানুষের ইতিহাস কতগুলো বিচ্ছিন্ন সামাজিক রূপের পরম্পরা বলে মনে হয়। তবে কিভাবে উৎপাদন সংগঠিত হয়েছে তার উপর ভিত্তি করেই দাঁড়িয়ে থাকে প্রতিটি সামাজিক রূপ বা গঠন। সামাজিক গঠনের এই ভিত্তিকেই মার্কস বলেছেন উৎপাদন সম্পর্ক। এই উৎপাদন সম্পর্কের সীমারেখা তৈরি হয় ‘উৎপাদনের উপায়' অর্থাৎ সেই সময় প্রচলিত যন্ত্রপাতি এবং উৎপাদন প্রকৌশল দ্বারা। ইয়োরোপকে ভিত্তি করে মার্কস আদিম বা চিরায়ত সমাজ সংগঠনকে বিশ্লেষণ করলেন এবং দেখালেন যে, আদিম সমাজ নির্ভরশীল ছিল দাসপ্রথার উপর যা সামন্তযুগে নির্ভর করে দাস-কৃষি শ্রমিকের উপর। অবশেষে আসে বুর্জোয়া বা ধনতান্ত্রিক উৎপাদন প্রক্রিয়া যা নির্ভর করে মজুরি শ্রমিকের উপর। এটা সম্ভব হয় কলকারখানা ব্যবস্থা গড়ে ওঠার জন্য। ইয়োরোপে ধনতন্ত্রের উদ্ভব ঘটলেও এর বৈশিষ্ট্যই এমন ছিল যে তা বিশ্বব্যাপী এক ব্যবস্থায় পরিণত হয়। এই ব্যবস্থাই শেষতম শোষণভিত্তিক সামাজিক সংগঠন। এবং আমাদের লক্ষ্য হবে একে পরিবর্তন করে শ্রেণিশোষণহীন সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম করা।

সমাজ সংগঠনের এই যে পরিবর্তনের পরম্পরা- এর পেছনে কারণ কিছু স্পষ্টতই অন্ধ প্রাকৃতিক শক্তি নয় এবং স্পষ্টতই শ্রেণিসংগ্রাম যা মানুষ প্রতিনিয়ত করেছে। যেখানেই মানুষ কোনো কর্মপ্রক্রিয়া গ্রহণ করুক, সেই কর্মপ্রক্রিয়ার পেছনে থাকে তার স্বেচ্ছাকৃত চিন্তাভাবনা অথবা ‘চেতনা’ এবং কর্মপ্রক্রিয়ার চালিকাশক্তিই হলো এই চেতনা। মার্কসকে সব থেকে ভুল বোঝা হয়েছে এখানে। বস্তুগত পরিস্থিতিই নির্ধারণ করে মানুষের চেতনা, মার্কস এমন বলেছেন বলে ভুল বোঝা হয়। তাঁর বিখ্যাত উক্তি যা প্রায়শই এমন সরল ব্যাখ্যা তৈরি করেছে তা হলো, ‘মানুষের চেতনা তার অস্তিত্ব নির্ধারণ করে না, মানুষের সামাজিক অস্তিত্বই তার চেতনা নির্ধারণ করে।’ (ক্রিটিক অব পলিটিক্যাল ইকোনমির ভূমিকা)। বস্তুত আরেকটু এগিয়ে মার্কস নিজেই ব্যাখ্যা করেছেন উপরোক্ত ‘প্রতিপাদ্যের’ সারবত্তা। মার্কস বলেছেন, ‘এইভাবে মানবজাতি অবশ্যম্ভাবিভাবেই সেই কাজ সম্পাদন করার জন্য এগিয়ে যায় যা সমাধান করা সম্ভব হয়, কারণ আরো গভীরভাবে পরীক্ষা করলে এটাই সর্বদা দেখা যাবে যে, সমস্যাটি আপনা থেকে উদ্ভব হয়েছে ঠিক তখন, যখন এর সমাধানের বস্তুগত শর্তাদি ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে অথবা নিদেনপক্ষে তৈরি হওয়ার পথে রয়েছে।’

অন্যভাবে বলা যায় যে, চেতনার জগৎ সেই সময় প্রচলিত বস্তুগত সম্ভাবনার দ্বারা সীমাবদ্ধ। কিন্তু এছাড়া অন্য সীমাবদ্ধতাও রয়েছে এবং অতীতের সমাজগুলো নিজেদের সম্পর্কে এক যুক্তিসিদ্ধ অন্তদৃষ্টি লাভ করতে ব্যর্থ হয়েছে। যেমন, কোনো একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির ব্যক্তিরা যেমন কৃষকরা নিজেদের শ্রেণি সম্পর্কে অবহিত ছিল না। এক্ষেত্রে মানুষকে এই যুক্তিসিদ্ধ ধারণা থেকে দুর্বোধ্যতায় নিয়ে গেছে ধর্ম। মার্কস সেই কারনে শুরুতেই বলেছিলেন ধর্ম হচ্ছে 'মানুষের কাছে আফিম'।

একইভাবে যুক্তিহীন চেতনাতাড়িত মানুষের কর্মধারাও সমাজকাঠামোর জটিলতা নির্ধারণ করতে সহায়তা করতে পারে যদি বস্তুগত পরিস্থিতি বিরাজমান থাকে। উদাহরণ হিসাবে আমরা ভারতের জাতপ্রথাকে উল্লেখ করতে পারি। এই প্রথা তৈরি হয়েছিল নিরন্তর ধর্মীয় সম্মতিতে। মার্কস জাতপ্রথার এই সামাজিক বিভাজনকেই ‘ভারতের অগ্রগতি ও ক্ষমতার পথে নির্ণায়ক এক প্রতিবন্ধকতা' বলে চিহ্নিত করেছেন। অপরপক্ষে, মার্কস নিজেই শনাক্ত করেছেন যে, আধুনিক যুগে প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীরা পুঞ্জি সৃষ্টিতে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ' করেছিল। (পুঁজি, প্রথম খণ্ড) এইভাবে ধর্মীয় জগৎ বাস্তব 'জগতের প্রতিফলন' (মার্কস), বাস্তব জগতের জটিলতার উপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

তাহলে মার্কসের চিন্তাধারার কেন্দ্রীয় সূত্র হলো, পুঁজিবাদের অধীনে বস্তুগত অবস্থা মানুষের যে চেতনা তৈরি করে তা থেকে মানুষকে মুক্ত করা। এখানে মার্কস বলছেন- ‘প্রাচীন এবং রক্ষণশীল সংস্কার এবং মতামতগুলোর সঙ্গে এতদিনকার নির্দিষ্ট এবং বরফজমা সম্পর্কগুলো ধুয়েমুছে যায়, যা কিছু নবগঠিত ছিল তা শক্ত হাড়ে পরিণত হওয়ার আগেই প্রাচীন সংগ্রহশালায় চলে যায়। যা কিছু নিরেট গলে মিশে যায় বাতাসে, যা কিছু পবিত্র তা অবজ্ঞায় পরিণত হয় এবং অবশেষে মানুষ মানুষের প্রতি এবং জীবনের সত্যিকারের সম্পর্কগুলির প্রতি তার নরম অনুভূতিগুলি নিয়ে মুখোমুখি হতে বাধ্য হয়। (মার্কস-এঙ্গেলস, কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো)

চেতনার এই মুক্তি যন্ত্রপাতি, আধুনিক প্রযুক্তি, অর্থনীতি প্রভৃতির মতো বস্তুগত উপাদানের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলি যে সম্ভাবনা তৈরি করে তার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত এবং তা সম্ভব হয় শ্রেণিশোষণের অবলুপ্তি এবং সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। মার্কসবাদ অথবা বৈজ্ঞানিক সমাজবাদ মুক্তিপ্রাপ্ত চেতনার চূড়া তৈরি করে এবং শ্রমিকশ্রেণি (পুঁজিবাদের দ্বারা সৃষ্ট) তার লড়াই সংগ্রামের দ্বারা আসন্ন নতুন ধারার অগ্রদূত হয়ে ওঠে। কিন্তু এক্ষেত্রে শ্রমিকশ্রেণিকে নিজেকে সচেতন হতে হবে এবং বাস্তব পরিস্থিতি যে নতুন সম্ভাবনাকে সফল করে তুলতে পারে তা লাভ করার আগে শ্রমিকশ্রেণিকে তার নিজের ঐতিহাসিক ভূমিকা সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। কোনো অন্ধ এবং স্বতস্ফূর্তভাবে বিপ্লব হতে পারে না।

এই কারণে ‘নিমিত্তবাদী’ হওয়ার পরিবর্তে মার্কস জোর দিয়েছেন ধারণার চিন্তাধারার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার উপর এবং সে জন্য তিনি তৎকালীন প্রচলিত বুর্জোয়া চিত্তাধারার ব্যাপক সমালোচনা এবং কঠোর পরিশ্রম করে তার দর্শনগত এবং অর্থনীতিগত তত্ত্বের বিন্যাস ঘটিয়েছেন। যে উত্তরাধিকার তিনি আমাদের জন্য রেখে গেছেন তা কেবলমাত্র বিস্ময়কর বিপ্লবী তত্ত্বই নয়- তা এক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি যার সাহায্যে তাঁর অনুসৃত পথ ধরে আমরা আমাদের অতীত ও বর্তমানকে শ্রম ও অন্তর্দৃষ্টির সাহায্যে বিশ্লেষণ করতে পারি এবং এর উপর ভিত্তি করে আমাদের বিপ্লবী প্রয়োগকে উন্নত করতে পারি। অতএব, সমস্ত ‘সচেতন’ বিপ্লবীরই এই দায়বদ্ধতাই নির্দিষ্ট হয় যে, তাঁদের মার্কসের চিন্তাধারাকে আয়ত্ত করলেই চলবে না, তাকে ছড়িয়ে দিতে হবে, যার মধ্যেই নিহিত রয়েছে মার্কসবাদের বৈপ্লবিক অন্তঃসার। যদি তাঁরা এই দায়বদ্ধতা পালন করতে পারেন, তাহলে তাঁরা ইতিহাস থেকে শুধুমাত্র শিক্ষাই গ্রহণ করবেন না, তাঁরা ইতিহাস রচনা করবেন।

 

অনুবাদ: অমর বন্দ্যোপাধ্যায়

দেশহিতৈষী, কার্ল মার্কস জন্মদ্বিশতবর্ষ সংখ্যা


প্রকাশের তারিখ: ১৯-অক্টোবর-২০২২

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org