কেহ নাহি জানে কার আহ্বানে কত মানুষের ধারা

রতন খাসনবিশ
আমাদের অনুমান, ভারতবর্ষে যেটিকে সনাতন ধর্ম বলা হয় সেটি বহু ঈশ্বরবাদী আর সেকারণেই বহুত্ববাদী। আদি ধর্মটির এই বহুত্ববাদী প্রবণতাটিতেই দেশটি বহুত্ববাদী হয়ে ওঠার প্রেরণা লাভ করে। ইসলাম সহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষেরা যারা এদেশে বসবাস করতে এসেছেন,  এই দেশটি সব মানুষকেই বহুত্ববাদকে স্বীকার করে নেওয়ার বাস্তবতার সম্মুখীন করেছে।  এখান থেকেই গড়ে উঠেছে ভারতীয়ত্ব বোধ। ভারতবর্ষে যে একটা ভারতীয়ত্বের সত্তা আছে, এই কথা এখন দৃঢ়ভাবে উচ্চারণ করার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

ভারতবর্ষের ইতিহাস বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী ভারতবাসীর ইতিহাস। এই ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষেরাই ভারতবর্ষে এনেছে এক বহুত্ববাদী মাত্রা। এটি একটি ঐতিহাসিক সত্য। ভারতবর্ষকে যারা গভীরভাবে অনুসন্ধান করেছেন তারা প্রত্যেকেই একথা উপলব্ধি করেছেন। এদেশকে যারা শাসন করেছে কিন্তু কখনই এদেশের মানুষের সুখ-দুঃখের অংশীদার হয়নি, তাদের পক্ষে এই বাস্তবতার গভীরতা উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। ভারতের ইতিহাসে তেমন একমাত্র একটি জাতিই আছে যারা এই ব্যতিক্রমী গুণের অধিকারী। আমাদের দুর্ভাগ্য আমরা ভারতবর্ষকে চেনার চেষ্টা করেছি এই শাসক জাতটির চোখ দিয়ে। এই শাসক জাতটি আমাদের শিখিয়েছে, বহু মানুষের যুগ্ম সাধনার ফল যে ভারত, সেই ভারতের কোনও অস্তিত্বই ছিল না। ভারতবর্ষ ছিল বিবদমান বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষদের সঙ্ঘাতভূমি। যে শাসকেরা এইভাবে ভারতবর্ষকে চিনিয়ে দেবার চেষ্টা করেছিল, কালের নিয়মেই তাদের পিছু হঠতে হয়েছে। হয়ত আমরা ভুলেই গেছি যে, এই শাসকেরা ভারতবাসীদের চিহ্নিত করেছিল অ্যাজ দ্য লেসার ব্রিড উইদআউট  দ্য ল (কিপলিং)। হয়ত আমরা একথাও ভুলে গেছি যে, প্রাক্‌-ব্রিটিশ ভারতে বিভিন্ন বর্ণ ও ধর্মের ভিত্তিতে চিহ্নিত যে মানুষেরা নিঃশব্দে  ইতিহাস রচনা করে গেছেন, শাসক ইংরেজ বোঝাতে চেয়েছে এই ইতর মানুষেরা আসলে দ্য হোয়াইট ম্যানস বার্ডেন। যে শাসক ইংরেজ ভারতবর্ষে সাম্রাজ্য গড়েছে কিন্তু  ভারতবাসী হওয়ার স্বপ্ন দেখেনি, তারা আমাদের শিখিয়েছে এই দেশটা হল ইতর সেই মানুষদের বাসভূমি যাদের সভ্য করার দায়িত্ব নিয়েছে সাম্রাজ্যবাদী সাদা মানুষেরা। আমাদের দুর্ভাগ্য, আমাদের শিক্ষিত মানুষদের ইতিহাস চেতনা গড়ে উঠেছে যারা আমাদের ইতর মানুষ হিসাবে চিন্তা করত তাদের দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে। দার্শনিক হেগেল বলেছিলেন, এশিয়া বাস করে প্রাগৈতিহাসিক যুগে। ব্রিটিশরা এনেছিল তার ওপরে এক বর্বরতার মাত্রা । ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত ভারতবাসী এদের কাছ থেকেই চেনার চেষ্টা করেছিল সেই উপনিবেশবাদীদের চিন্তায় গড়ে ওঠা ভারতবর্ষ।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের ভাবনাচিন্তায় জারিত যে ভারতবাসী, তাদের কাছে ভারতের ইতিহাস এই রকমই যে, হানাহানিতে দীর্ণ বিভিন্ন সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষের দেশ ছিল এই ভারতবর্ষ। এই ভারত কখনই ঐক্যবদ্ধ ছিল না। এই চিন্তাকেই কিছুটা প্রসারিত করে এটাও পাওয়া যায় যে, প্রকৃত ভারতবর্ষকে আসলে গড়ে নিতে হবে এক বিশেষ ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠিত করে যেখানে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী সকলেই ‘অপর’। তাদের বাদ দিয়েই গড়ে উঠবে ভারতের প্রকৃত জাতিরাষ্ট্র। এই কথাগুলি সমাজজীবনে নানা সময়ে নানা ভাবে ভারতচিন্তার বুনিয়াদি বিষয় হিসাবে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। এখন যে হিন্দু রাষ্ট্রের কথা শোনা যাচ্ছে, তার ভিত্তি আছে এখানেই। অখণ্ড ভারতকে ভাগ করে পাকিস্তান গড়ার স্বপ্ন যারা দেখেছিল, শাসক ইংরেজদের ভারতরাষ্ট্র সম্পর্কিত চিন্তার সবচেয়ে ভাল ছাত্র ছিল সম্ভবত তারাই। তাদের বিপরীতে যারা অসাম্প্রদায়িক চেতনার অন্য ভারত চেয়েছিলেন, তারা ব্রিটিশের ভারতচিন্তার বিপরীতে নিজেদের অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। সাম্প্রদায়িক হানাহানির সত্য তাঁরা অস্বীকার করেননি। কিন্তু তাঁরা জানতেন এই হানাহানির ঊর্ধ্বে এক ভারতচিন্তা আছে ইংরেজ কখনই যার স্পর্শ পায়নি।  না পাওয়ার কারণ তারা এদেশে থেকে যাবার চেষ্টা করেছে ভারতবাসী হিসাবে নয়, শাসক ইংরেজ হিসাবে। ইংরেজরা অর্থাৎ শাসক ইংরেজরা প্রকৃত ভারতবর্ষকে অনুভব করার সুযোগ পায়নি। কিন্তু তৎপূর্ববর্তী সমস্ত জাতিগোষ্ঠী এই বিচিত্র দেশে এসে অন্য একটি সত্তা আবিষ্কার করেছে, সেই সত্তাটি হল ভারতীয়ত্বের সত্তা। সাম্রাজ্যবাদী চিন্তায় ভারতবর্ষকে যারা অনুভবে আনার চেষ্টা করেছেন এই সত্তাটির অস্তিত্ব তারাও অনুভব করেননি। ঔপনিবেশিক ভারতে সামান্য কিছু শিক্ষিত ভারতবাসী অনুভব করেছিলেন এই সত্তাটি। এই অনুভবের আশ্চর্য প্রকাশ যে কবিতাটিতে তার নাম ‘ভারততীর্থ’। 

ভারতবর্ষে যে একটা ভারতীয়ত্বের সত্তা আছে, এই কথা এখন দৃঢ়ভাবে উচ্চারণ করার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। বিশেষত, ভারতীয় মুসলমানদের মূল্যায়ণ করার ক্ষেত্রে বক্তব্যটি নিয়ে তীব্র বিরোধিতার সম্মুখীন হওয়া অপ্রত্যাশিত নয়। একথা মনে রেখেই, হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ভারতবর্ষের ইতিহাস (মোগল যুগ) থেকে একটি অংশ উদ্ধৃত করছি। ‘আমাদের কোনও কোনও খ্যাতনামা ঐতিহাসিক বলতে সঙ্কুচিত হননি যে, এদেশে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে অনিতক্রম্য ব্যবধান থেকে গেছে। ব্যষ্টি ও সমষ্টি রূপে তারা স্বতন্ত্র, এমনকী প্রায়শ শত্রুভাবাপন্নই থেকেছে।  এযুক্তির স্বপক্ষে বিভিন্ন ঘটনার উল্লেখ অবশ্য করা যায়। কিন্তু বৃহত্তর সত্য (এবং মূলগত অর্থে সদা স্মরণীয়) হল এই যে অতলান্তিক থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত দ্রুত বিস্তৃতির কালে যখন ইসলামি সভ্যতা ও সংস্কৃতির ইমারত নানা দেশে গড়ে উঠছিল, তখন সেই সব দেশের তুলনায় একমাত্র ভারতবর্ষে প্রাথমিক সঙ্ঘর্ষ ও বিরোধের অভিজ্ঞতা সাঙ্গ হওয়ার পর, ইসলাম এই আজব দেশের আত্মীয় হয়ে গেছে। ঠিক এমন ঘটনা অন্যত্র হয়নি — সঙ্গীত, চিত্রকলা, স্থাপত্য, ভাস্কর্য, শাসনব্যবস্থা, ভোজনপ্রথা, সামাজিক ও  সাংস্কৃতিক বিকাশের দিক থেকে মুসলমান ও অমুসলমান ধারার সংমিশ্রণ যেমন হয়েেছ তেমন অন্য কোথাও হয়নি।’ (ভারতবর্ষের ইতিহাস, মোগল যুগ,  পরিশিষ্ট ৪, পৃষ্ঠা ২৫৯-৬০)। যুক্ত করা উচিত এই কথাটি যে, এই আজব দেশে ইসলাম পর্যন্ত তার ভারতীয় সংস্করণ খুঁজতে বাধ্য হয়েছে। আরও যুক্ত করা উচিত এই যে, ব্যতিক্রম শুধু ব্রিটিশ সভ্যতা এদেশে যা কখনও আত্মীয় হওয়ার চেষ্টা করেনি, এদেশের মানুষকে যা দ্য লেসার ব্রিড হিসাবে দেখতে চেয়েছিল। আরও যোগ করা যায় যে, এই ব্রিটিশই ইসলাম যে এই আজব দেশে আত্মীয় হয়ে গেছে এটাকে অস্বীকার করে টু নেশন থিয়োরি দিয়ে দেশটিকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করতে চেয়েছিল।

ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত ভারততত্ত্ববিদেরা এই ইতিহাস অস্বীকার করতে চায় যে, আজকের পাঞ্জাবি ভাষার অন্যতম জনক এক জন মুসলমান সাধু (বাবা ফরিদে)। মালিক মহম্মদ জৈশি রাজস্থান কাহিনি থেকে লিখছিলেন পদ্মাবতী কাব্য । আজকে যাকে আমরা রাজভাষা বলি সেই হিন্দি ভাষায় এটি হল প্রথম কাব্য যা প্রকাশিত হয়েছিল তুলসীদাসের রামায়ণ রামচরিতমানস-এর ৩৪ বছর আগে। উত্তর ভারতে বহুল প্রচলিত ভাষা ছিল উর্দু, যেটি সৃষ্টি করেছেন হিন্দু এবং মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষেরা। মারাঠি ভাষায় অসামান্য অবদান আছে মুসলমান লেখকদের। ইংরেজ শিক্ষিত ভারততত্ত্ববিদেরা এদেশে যখন ‘ক্রুসেড’ খুঁজছেন, হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে যুদ্ধের ‘ক্রুসেড’, তখন ভারতীয় বাস্তবতা এটাই যে, ‘জনসাধারণের জীবনযাত্রা উভয় ধর্মাবলম্বীকে এনে দিয়েছিল সেযুগের উপযোগী পরস্পর সম্পর্কের সখ্যবোধ, আর সাধুসন্তের দল এমন পরিবেশ সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন যাতে অনৈক্যের চাপে মনকে ভারাক্রান্ত রাখতে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়নি। দৈনন্দিন জীবনের কর্মব্যস্ততা উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে পরস্পরের নৈকট্য ও সৌহার্দ্য গঠনে সহায় হয়েছিল। আর ভাবের দিক থেকে মিলনের সূত্র তারা খুঁজে পেয়েছিল।’ (হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, তদেব, পৃষ্ঠা ২৬১)।

ভারতবর্ষের ইতিহাস ব্রিটিশ যে ভাবে লিখেছিল তার পুনর্মূল্যায়ণ দরকার, এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের একটা বড় অংশ এটা হৃদয়ঙ্গম করেছিলেন। এটা তারা বুঝেছিলেন যে, বহু যুগ ধরে এই ভারতবর্ষ বিশ্বের নানা অংশ থেকে বহু জাতিগোষ্ঠীকে আকৃষ্ট করেছে। তারা এই আশ্চর্য দেশটিতে বসবাস করতে এসেছিলেন এবং বসবাস করতে গিয়ে আবিষ্কার করেন দেশটিকে ধারণ করে রাখে তার বহুত্ববাদ। বসবাস যারা করেননি এই আজব দেশের আজব বহুত্ববাদ অনুভব করার সাধ্য তাঁদের নেই। বহুত্ববাদ এই শিক্ষা দেয় যে, বিভেদ স্বীকার করেই অথবা একে সঙ্গে নিয়েই দেশটিতে বসবাস করতে হবে। আমাদের অনুমান, ভারতবর্ষে যেটিকে সনাতন ধর্ম বলা হয় সেটি বহু ঈশ্বরবাদী আর সেকারণেই বহুত্ববাদী। আদি ধর্মটির এই বহুত্ববাদী প্রবণতাটিতেই দেশটি বহুত্ববাদী হয়ে ওঠার প্রেরণা লাভ করে। ইসলাম সহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষেরা যারা এদেশে বসবাস করতে এসেছেন, হীরেন মুখার্জির ভাষায়, এই আজব দেশটি সব মানুষকেই বহুত্ববাদকে স্বীকার করে নেওয়ার বাস্তবতার সম্মুখীন করেছে।  এখান থেকেই গড়ে উঠেছে ভারতীয়ত্ব বোধ, কোরান ও হাদিস যা রুখে দিতে পারেনি। ইসলাম কাবার দিকে তাকিয়ে থাকে , এটা যদি সত্য হয় তাহলে এটাও সত্য যে, ইসলাম ধর্মাবলম্বী ভারতীয়রা মৃত্যুকালে কাবার খোঁজ করেন না, খোঁজ করেন তার বাপ-দাদার কবর যেখানে আছে সেই মাটিকে। 

ব্রিটিশ যেভাবে ভারতবর্ষকে দেখতে শিখিয়েছিল, সেই লেসার ব্রিডের ভারত নয়, স্বাধীন গণতান্ত্রিক চেতনাসম্পন্ন যে ভারত সে ভারত অবশ্যই এক বহুত্ববাদী ভারত। টু নেশন থিয়োরির চেতনায় গড়ে ওঠা এদেশে যে মনুবাদী দলটি আছে, ভারতবর্ষ কী এটা যারা কখনই অনুভব করতে চায়নি, সেই ইংরেজ-সৃষ্ট হিন্দুত্ববাদীরা এক নতুন ইতিহাস গড়তে চায়। এই ইতিহাস গড়ার বাস্তবতা নেই। দ্বিজাতি তত্ত্ব অবলম্বন করে ব্রিটিশ পোষিত জিন্নার যা পরিণতি হয়েছে, আরেক ব্রিটিশ-পোষিত দ্বিজাতিতত্ত্ববাদী সাভারকারের সন্তানসন্ততির জন্য পড়ে আছে সেই ভবিষ্যৎ। 


প্রকাশের তারিখ: ১৯-মার্চ-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org